সড়কে মৃত্যুর হিসাব মেলে না, দায়ও না
ডব্লিউএইচওর প্রাক্কলনে ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়কে প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন মারা গেছেন, যেখানে পুলিশের নথিতে মৃত্যু ৫ হাজার ৮৪ জনের। দেশে কোনো অভিন্ন দুর্ঘটনা তথ্যভান্ডার নেই। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৩১৪টি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে মাত্র ২১টিতে ঘটেছে মোট দুর্ঘটনার ১৪ শতাংশ। টিআইবির গবেষণায় অভিযোগ, বাস-মিনিবাস মালিকেরা বছরে প্রায় ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদা ও ঘুষ দেন। বিআরটিএ প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছে। চালকেরা দিনে ১৬–১৭ ঘণ্টা কাজ করেন, নিয়োগপত্র ছাড়াই। মহাসড়কে তিন চাকার যান নিষিদ্ধ হলেও তা কার্যকর হয়নি।#RoadSafety #Bangladesh #RoadCrash #BRTA #MeehaNews

আজ ২২ অক্টোবর, জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। দুর্গাপূজার ছুটির কারণে দিবসের মূল আয়োজন পিছিয়ে ২৮ অক্টোবর নেওয়া হয়েছে। সড়ক অবশ্য কোনো ছুটি মানে না। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি নাটোর-পাবনা মহাসড়কে বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে ট্রাক ও বাসের সংঘর্ষে ১২ জন মারা গেছেন। এমন খবর এখন প্রায় প্রতিদিনের। প্রশ্ন হলো, প্রতিদিন কতজন মারা যাচ্ছেন, আর তাঁদের মৃত্যুর দায় কার। দুটি প্রশ্নের কোনোটিরই সোজা উত্তর রাষ্ট্রের খাতায় নেই।
শুরুটা হিসাব দিয়ে, কারণ সমস্যার প্রথম গিঁট সেখানেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও, WHO) পঞ্চম বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন মারা গেছেন। একই বছর পুলিশের নথিতে মৃত্যু ৫ হাজার ৮৪ জনের, অর্থাৎ প্রায় ছয় গুণ কম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) ২০২৩-২৪ সালে একটি জাতীয় জরিপ চালিয়েছে। জরিপ বলছে, সড়কে বছরে প্রায় ২৪ হাজার ২৩৩ জন মারা যান, দিনে গড়ে ৬৬ জন। স্থায়ীভাবে পঙ্গু হন বছরে প্রায় ৩৮ হাজার, দিনে ১০৪ জন। অন্যদিকে গণমাধ্যমের খবর গুনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ২০২৫ সালে ৯ হাজার ১১১ জনের মৃত্যুর হিসাব দিয়েছে। সংখ্যাগুলোর এই ফারাক মূলত পদ্ধতির। কেউ গোনেন থানার নথি, কেউ পত্রিকার খবর, কেউ ঘরে ঘরে জরিপ চালান, কেউ পরিসংখ্যানগত মডেলে প্রাক্কলন করেন। কিন্তু যে রাষ্ট্র নিজের সড়কে মৃত্যুর সংখ্যাই নিশ্চিত করে জানে না, সে কোথায়, কেন আর কার হাতে মানুষ মরছে, তা মাপবে কী দিয়ে? পুলিশ, হাসপাতাল ও বিআরটিএর তথ্য মিলিয়ে একটি অভিন্ন দুর্ঘটনা তথ্যভান্ডার এখনো নেই।
এই অন্ধকারে কিছু আলো ফেলেছে বেসরকারি গবেষণা। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের প্রায় ৩৭ হাজার দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে ৩১৪টি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে মাত্র ২১টি “অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” এলাকায় ঘটেছে মোট দুর্ঘটনার ১৪ শতাংশ। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে এক বছরে ৮২টি দুর্ঘটনায় ৪২ জন মারা গেছেন। এর প্রায় ৬৫ শতাংশই দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে চলন্ত গাড়ির ধাক্কা। অর্থাৎ মৃত্যু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নয়, নির্দিষ্ট কিছু বাঁক, মোড় ও সড়কাংশে জমাট বেঁধে আছে। অথচ ব্ল্যাক স্পট চিহ্নিত করার দায় কার, সেই প্রশ্নে বিআরটিএ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে (সওজ) দেখিয়েছে, আর সওজ প্রথম আলোর কাছে কোনো মন্তব্য করেনি। ২০২৪ সালে দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল, দেশের বেশির ভাগ সড়কে কোনো নিরাপত্তা নিরীক্ষা (রোড সেফটি অডিট) হয়নি।
টাকার অভাবকে একমাত্র কারণ বলা কঠিন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৪ সালের এক গবেষণায় প্রাক্কলন করেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৪ বছরে সড়ক ও মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ দুর্নীতিতে গেছে। অঙ্কে তা ২৯ হাজার ২৩০ থেকে ৫০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। টিআইবির দাবি, রাজনীতিক, আমলা ও ঠিকাদারের ত্রিপক্ষীয় যোগসাজশে এই অর্থ ভাগ হয়েছে। সংস্থাটি এ-ও জানিয়েছে, সওজের কাছে তথ্য চেয়ে তারা পায়নি। এর বাইরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সওজের ৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকার একটি সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প ২০২৩ সালে অনুমোদন পেয়েছে, মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। বরাদ্দ যে আছে, তা বোঝা যায়। কিন্তু কয়টি ব্ল্যাক স্পট সংশোধন হলো আর তাতে মৃত্যু কতটা কমল, এমন কোনো প্রকাশ্য হিসাব এই প্রতিবেদনের জন্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সড়ক যদি ফাঁদ হয়, গাড়ি আর চালক সেই ফাঁদের চালিকাশক্তি। ২০২৩ সালে বিআরটিএ জানিয়েছিল, দেশে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যান পাঁচ লাখের বেশি, যার প্রায় ৭০ শতাংশ সড়কে চলছে। ডেইলি স্টারের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া যানের সংখ্যা ২০১৯ সালের ৪ লাখ ৭৯ হাজার থেকে বেড়ে ৬ লাখ ১৭ হাজারে দাঁড়িয়েছিল। ওই সময় বিআরটিএর যান্ত্রিক পরীক্ষাযন্ত্র ছিল একটি, পরিদর্শক প্রায় ১৪০ জন, ফলে বেশির ভাগ গাড়ি পরীক্ষা হতো চোখের দেখায়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ঝালকাঠিতে ১৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ট্রাকচালকের বৈধ লাইসেন্স ছিল না। একই মাসে ফরিদপুরে ১৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় বাসটির রুট পারমিট, ফিটনেস সনদ, ট্যাক্স টোকেন কিছুই ছিল না। টিআইবির আরেক গবেষণায় অভিযোগ করা হয়, বাস ও মিনিবাস মালিকেরা বছরে প্রায় ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদা ও ঘুষ দেন। বিআরটিএর কর্মীরা মালিকদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বছরে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা নেন বলেও অভিযোগ করা হয়। বিআরটিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার প্রতিবেদনটিকে “অনুমাননির্ভর, অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সেবা ডিজিটাল হওয়ায় ঘুষের সুযোগ নেই।
চাঁদাবাজির প্রশ্নে সবচেয়ে শিক্ষণীয় হলো এর রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা। ২০২৪ সালের আগস্টে প্রথম আলোর অনুসন্ধান দেখায়, প্রতিটি বাস ও ট্রাক থেকে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে দিনে অন্তত ৭০ টাকা তোলা হয়। বিআরটিএর যানবাহনের হিসাব ধরে এর বার্ষিক অঙ্ক দাঁড়ায় অন্তত ১ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। সরকার বদলের পর আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি-ঘনিষ্ঠ নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন পরিবহন কার্যালয়ের দখল নেন বিএনপি-ঘনিষ্ঠরা। নতুন নিয়ন্ত্রকদের একজন, বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া তখন দাবি করেন, তাঁরা চাঁদাবাজি বন্ধে কাজ করবেন। বিএনপি নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, দখল ও দলীয়করণের বিরুদ্ধে দলের কঠোর নির্দেশনা আছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো নির্দিষ্ট হারে যে টাকা তোলে, তিনি তাকে চাঁদাবাজি মনে করেন না, কারণ এটি “সমঝোতার ভিত্তিতে” হয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, এ অবস্থান ক্ষমতাসীন দলের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের পরিপন্থী। এখানে কোনো একক দলের গোপন নকশার প্রমাণ মেলে না। যা মেলে তা একটি কাঠামো, যেখানে হাত বদলায়, ব্যবস্থা টিকে থাকে।
এই কাঠামোর সবচেয়ে নিচে আছেন চালক। দেশ রূপান্তরের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে পাবনা-সাতক্ষীরা রুটের চালক মুকুল হোসেন জানিয়েছেন, তিনি ভোর পাঁচটার আগে বের হন, টানা ছয় ঘণ্টা গাড়ি চালান, আধঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে আবার ফেরেন। দিনে কাজ করেন ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা। ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও তাঁর নিয়োগপত্র নেই, নির্ধারিত বেতন নেই, যেদিন গাড়ি চলে না সেদিন আয়ও নেই। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা। ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহাসড়কে টানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালানোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ডেইলি স্টারের তথ্যমতে, সেই নির্দেশনা কার্যত উপেক্ষিত। ক্লান্তির পরিণতি নথিতেও আছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পাবনা-ঢাকা মহাসড়কে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যুর পর মাধপুর হাইওয়ে থানার ওসি জানিয়েছিলেন, ধারণা করা হচ্ছে চালক ঘুম ঘুম অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন। মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসিও ভোরের দুর্ঘটনার পেছনে ক্লান্তি আর ঘুমকে দায়ী করেছেন। চালকদের কর্মঘণ্টা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের কোনো পূর্ণাঙ্গ উপাত্ত অবশ্য পাওয়া যায়নি, আর সেটিও এক ধরনের তথ্য।
মহাসড়কের আরেক বাস্তবতা ধীরগতির যান। ২০১৫ সাল থেকে ২২টি মহাসড়কে তিন চাকার যান নিষিদ্ধ। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট দক্ষিণ-পশ্চিমের ১০ জেলার মহাসড়কেও একই নির্দেশ দেন। তবু যাত্রী কল্যাণ সমিতির ২০২৫ সালের হিসাবে দুর্ঘটনায় জড়িত শনাক্ত যানের মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ, নসিমন-করিমন-মাহিন্দ্রা-লেগুনা ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে দুর্ঘটনা বাড়ার জন্য সংস্থাটি ছোট যানের অবাধ চলাচলকেই দায়ী করেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে সড়কে নিহত ৪২৩ জনের মধ্যে ৮৮ জন ছিলেন তিন চাকার যানের যাত্রী। হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত ডিআইজি খায়রুল আলম ২০২৪ সালে স্বীকার করেছিলেন, “লোকবলের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।” সমস্যাটি শুধু আইন প্রয়োগের নয়, জীবিকারও। এই যানগুলো গ্রামের মানুষের সস্তা বাহন, হাজারো পরিবারের রুটিরুজি। আলাদা সার্ভিস লেন না থাকায় নিষেধাজ্ঞা হয় কাগজে থাকে, নয়তো অভিযানের দিন সংঘাত বাধে।
সচেতনতার ঘাটতিও উপাত্তে স্পষ্ট। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২ হাজার ৯৮৩ জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন শুধু সেপ্টেম্বরেই ১০৬ জন পথচারীর মৃত্যুর হিসাব দিয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে চিহ্নিত ঝুঁকির তালিকায় হেলমেট, সিটবেল্ট ও শিশুর সুরক্ষা আসন ব্যবহার না করার কথাও আছে। অথচ বিআরটিএ ও সওজের সড়ক নিরাপত্তা সেলের সচেতনতা কার্যক্রম মূলত লিফলেট বিতরণ আর দিবসকেন্দ্রিক আয়োজনে সীমিত। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ছয় মাস পরপর বৈঠকে বসার কথা। প্রথম আলোর তথ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরে কাউন্সিল বসেছে একবার, বর্তমান সরকারের সময়ে একবারও নয়।
সরকারের প্রতিশ্রুতি অবশ্য আছে। মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম প্রথম আলোকে বলেছেন, ফিটনেসবিহীন যান চলতে দেওয়া হবে না। ২০৩০ সালের মধ্যে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু অর্ধেকে নামানো এবং ২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন করার আশা তাঁর। খাতটি দীর্ঘদিন অগোছালো ছিল বলে সংস্কারে সময় লাগবে, এমন যুক্তিও দিয়েছেন তিনি। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামসুল হক অবশ্য বলছেন, মৃত্যু অর্ধেকে নামানোর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সরকারের নেই। তাঁর মতে, বিজ্ঞানভিত্তিক টেকসই পরিকল্পনা ছাড়া প্রতিশ্রুতি কাজে আসবে না।
তাহলে উত্তরণ কোথায়? প্রমাণ যে পথ দেখায়, তা কোনো একক জাদুকরী সমাধান নয়। প্রথম কাজ হিসাবটা মেলানো। দরকার পুলিশ, হাসপাতাল ও বিআরটিএর তথ্য জুড়ে একটি প্রকাশ্য দুর্ঘটনা তথ্যভান্ডার, যাতে প্রতিটি মৃত্যু গোনা হয় আর প্রতিটি ব্ল্যাক স্পটের সংশোধন ও তার ফল জনসমক্ষে থাকে। এরপর আইন প্রয়োগ যতটা সম্ভব মানুষের হাত থেকে যন্ত্রের হাতে দেওয়া, যেমন স্বয়ংক্রিয় গতি-ক্যামেরা ও ডিজিটাল জরিমানা, যাতে রাস্তায় দরকষাকষির সুযোগ কমে। চালকের নিয়োগপত্র, নির্ধারিত মজুরি ও মহাসড়কে বিশ্রামাগার শুধু শ্রম অধিকারের প্রশ্ন নয়, যাত্রীর জীবনেরও প্রশ্ন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ধীরগতির যানের জন্য মহাসড়কে সার্ভিস রোড এবং জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠনের সুপারিশ করেছে। দুর্ঘটনার পর দেরিতে ও নিম্নমানের চিকিৎসাও মৃত্যু আর পঙ্গুত্ব বাড়ায়, প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লিখিত কারণগুলোর মধ্যে এটিও আছে। তাই মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ট্রমা-সেবার ব্যবস্থা উত্তরণের অংশ হওয়া জরুরি। সবচেয়ে কঠিন কাজটি রাজনৈতিক। পরিবহন সংগঠনের অর্থ আদায়কে “সমঝোতা” বলা হোক বা “চাঁদাবাজি”, কত টাকা উঠছে, কোথায় যাচ্ছে আর তার বিনিময়ে সড়ক কতটা নিরাপদ হচ্ছে, সেই হিসাব প্রকাশ্য না হলে দখলের হাতবদলই চলবে, সংস্কার নয়। আওয়ামী লীগ আমলে পরিবহন নেতাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হতো, আজ বিএনপি-ঘনিষ্ঠ নেতাদের ক্ষেত্রেও ঠিক সেই প্রশ্নই তুলতে হবে।
বছরে হাজার হাজার মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়, একটি ধরন। ধরন বদলায় তখনই, যখন তাকে মাপা হয়, প্রকাশ করা হয় এবং কারও না কারও কাছে জবাব চাওয়া যায়। এই তিনটির কোনোটিই এখনো নিশ্চিত হয়নি।





