রেমিট্যান্সে ধাক্কা এখনো নেই, ঝুঁকি জমছে সৌদি শ্রমবাজারে
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে অক্টোবরের প্রথম ১৩ দিনে ১৪০ কোটি ৫০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। সৌদি আরব থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এসেছে ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা মোট প্রবাহের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। বিএমইটির তথ্যমতে, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদিতে যাওয়ার ছাড়পত্র নেওয়া কর্মী গত বছরের চেয়ে প্রায় ৪৬ শতাংশ কমেছে। ঢাকা থেকে ৬১টি ফ্লাইট ব্যাহত হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রী ৮ হাজার ৩৮১ জন। আইএমএফ সৌদি অর্থনীতির ২০২৬ সালে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকোচনের পূর্বাভাস দিয়েছে। সৌদিতে মূল্যস্ফীতি আগস্টে ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ, ফলে প্রবাসীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে—এমন প্রমাণ সরকারি পরিসংখ্যানে মেলেনি। প্রবাসীরা ব্যাংক এড়িয়ে হুন্ডিতে যাচ্ছেন, এমন দাবির পক্ষে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। হুন্ডির প্রবাহ মাপার নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাবও নেই। #Remittance #SaudiArabia #Houthi #Bangladesh #MeehaNews

সোমবার বেলা দুইটায় দাম্মামের ফ্লাইট ধরার কথা ছিল নোয়াখালীর সেনবাগের আবুল হোসেনের। সকাল দশটায় তিনি পৌঁছে যান ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ছয় বছর ধরে সৌদি আরবে টাইলসের মিস্ত্রির কাজ করেন তিনি। ছুটি কাটিয়ে ফেরার টিকিট কেটেছিলেন তিন মাস আগে। বিমানবন্দরে এসে জানলেন, ফ্লাইট বাতিল। প্রথম আলোকে তিনি বলেছেন, সময়মতো কাজে ফিরতে না পারলে চাকরি রাখা কঠিন হবে, আর তাতে সংসার পড়বে অনিশ্চয়তায়।
আবুল হোসেনের ফ্লাইট বাতিলের সপ্তাহেই বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ হিসাব ভিন্ন এক ছবি দেখাচ্ছে। অক্টোবরের প্রথম ১৩ দিনে দেশে এসেছে ১৪০ কোটি ৫০ লাখ ডলারের প্রবাসী আয়। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে তা ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। জুলাই থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত মোট এসেছে ৯৯৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার, প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। দুই ছবিই সত্য। রেমিট্যান্সের নদী এখনো বইছে, কিন্তু উজানে, অর্থাৎ সৌদি শ্রমবাজারে, একের পর এক বাঁধ পড়ছে।
সৌদি-হুতি সংঘাত রেমিট্যান্স কমিয়ে দিচ্ছে, এমন দাবি এখন পর্যন্ত সরকারি পরিসংখ্যানে সমর্থন পায় না। আবার সংঘাতের কোনো প্রভাব নেই, এ সিদ্ধান্তও টেকে না। যা প্রমাণিত, তা হলো সৌদিতে কর্মী যাওয়ার ধস, ফ্লাইট বিপর্যয়, বাংলাদেশিদের প্রাণহানি এবং সৌদি অর্থনীতির সংকোচনের পূর্বাভাস। যা এখনো প্রমাণিত নয়, তা হলো কর্মহারা বা ফেরত আসা কর্মীর সংখ্যা, সৌদিতে বাংলাদেশি শ্রমিকের আয় ও ওভারটাইম কমার মাত্রা এবং হুন্ডিতে প্রবাহ সরে যাওয়ার পরিমাণ। এই তিন ফাঁকের ওপর দাঁড়িয়ে এখনকার আশঙ্কা ও আশ্বাস, দুটোই ওজন করতে হবে।
আগে মূল হিসাবটা দেখা যাক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈধ ব্যাংকিং পথে এসেছে প্রায় ৩ হাজার ৫৬০ কোটি ডলার, যা এক অর্থবছরের সর্বোচ্চ রেকর্ড। আগের অর্থবছরের ৩ হাজার ৩২ কোটি ডলারের চেয়ে এটি ১৭ শতাংশের বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এসেছে ৮৫৯ কোটি ডলার, বছর ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। মাসওয়ারি ছবি অবশ্য সমান নয়। জুলাইয়ে এসেছিল ২৮৬ কোটি ডলার, আগস্টে প্রায় ২৯৭ কোটি। সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাবে এসেছে ২৭৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের সেপ্টেম্বরের ২৬৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারের চেয়ে মাত্র ৩ শতাংশ বেশি। কেউ এই মন্থর প্রবৃদ্ধিকে যুদ্ধের ছায়া বলে পড়তে চাইতে পারেন। কিন্তু একটি মাসের ওঠানামা থেকে প্রবণতা টানা যায় না। সেপ্টেম্বরের পরপরই অক্টোবরের প্রথম ১৩ দিনে প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৬ শতাংশে উঠেছে। দৈনিক হিসাব অবশ্য প্রাথমিক, পরে সংশোধিত হতে পারে।
বাংলাদেশের রেমিট্যান্সে সৌদি আরবের ভার বেশ বড়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত থেকে পাওয়া যায়, সৌদিতে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি থাকেন। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তাঁরা পাঠিয়েছেন ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা মোট প্রবাহের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। গত অর্থবছরে সৌদি থেকে এসেছিল প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার, মোট প্রবাহের ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ সৌদির অংশ কমেনি, বেড়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদুল আলম ঢাকা পোস্টে প্রকাশিত মতামত-নিবন্ধে সৌদিতে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশির কথা লিখেছেন। এই সংখ্যার সূত্র নিবন্ধে স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ও এই দাবির ব্যবধান এখানে অমীমাংসিত রাখা হলো। সৌদিসহ উপসাগরীয় ছয় দেশ থেকে আসে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এর হার ছিল ৪৭ শতাংশ।
এই নির্ভরতার পটভূমি এক মাসের নয়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হয়। হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz) দিয়ে জাহাজ চলাচল মাসের পর মাস বিঘ্নিত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবরের পূর্বাভাস ধরে নিয়েছে, প্রণালি ২০২৭ সালের মার্চ থেকে ধীরে ধীরে খুলবে। জুলাই থেকে হুতিরা সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচলে বাধা দিতে চেয়েছে। ফ্রেইটোসের সাপ্তাহিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় নয় মাস শান্ত থাকার পর তারা আগস্ট পর্যন্ত বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলা চালায়। সেপ্টেম্বরে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, হুতিরা ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল দখলে নিয়েছে এবং বাব এল-মান্দেব (Bab el-Mandeb) প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার্যত তাদের হাতে। এরপর আবহা, জিজান ও নাজরানের বিমানবন্দরে হামলার খবর এসেছে, জানিয়েছে চ্যানেল আই অনলাইন। গত সপ্তাহে লক্ষ্য হয়েছে রিয়াদ।
১০ অক্টোবর শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হন। এটি পাঁচ দিনে ওই বিমানবন্দরে চতুর্থ হামলা বলে প্রথম আলো জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি, তাঁদের একজন সৌদিতে কর্মরত ছিলেন। আহত হয়েছেন ২৭ জন বাংলাদেশি, যাঁদের ১১ জন কর্মী এবং ১৬ জন ওমরাহ ভিসায় যাওয়া যাত্রী। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এক ওমরাহযাত্রীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। সৌদি কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের কার্যক্রম ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করেছে। হুতিরা সৌদির বিমানবন্দর ও তেলস্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বলে ফ্রান্স ২৪ জানিয়েছে। উল্টো দিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বলেছে, হুতিরা সামরিক তৎপরতার জন্য বেসামরিক ও জ্বালানি স্থাপনা ব্যবহার করছে, আর তারা ইয়েমেনে হুতিদের জ্বালানি টার্মিনালে হামলা চালিয়েছে। হুতিরা পাল্টা দাবি করেছে, হামলার আগেই জ্বালানি মজুত সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। দুই পক্ষের কোনো দাবিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
১৩ অক্টোবর রাতে দাহরানে আরামকোর একটি ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলেছে, ঘটনায় সীমিত আগুন লেগেছে, কেউ আহত হননি। রয়টার্সের বরাতে কানাডার গ্লোব অ্যান্ড মেইল কোম্পানির একটি নামহীন সূত্রের কথা জানিয়েছে। সেই সূত্র বলেছে, সদর দপ্তর-চত্বরের একটি টাওয়ারের ওপরের তিন তলা ক্ষতিগ্রস্ত। এই দুই বিবরণ মেলে না, আর ভবনের পরিচয়ও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। আরামকোর কার্যক্রম চলছে বলে জানিয়েছে অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ৩৬০। ১৪ অক্টোবর ব্রেন্ট (Brent) অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৬ দশমিক ০৬ ডলারে স্থির হয়, জানিয়েছে নেশন থাইল্যান্ড।
বাংলাদেশে এসবের প্রথম আঘাত পড়েছে আকাশপথে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) হিসাবে ১২ ও ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত ৬১টি ফ্লাইট ব্যাহত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রী ৮ হাজার ৩৮১ জন। ডেইলি স্টার বাংলার তথ্যে এর ২২টি সরাসরি ও ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট। একই পত্রিকার পরের দিনের শিরোনামে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৯ ও ১০০ ফ্লাইট এবং ১৪ হাজার ও ১৫ হাজার যাত্রীতে। বিমান ১৭ অক্টোবর এবং ইউএস-বাংলা ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটের ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত রেখেছে। রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি যাত্রী আটকা পড়েছিলেন। দূতাবাস তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে এবং প্রায় ৪০০ জনকে দাম্মামের কিং ফাহাদ বিমানবন্দর হয়ে দেশে পাঠিয়েছে।
বায়রার সদস্য ও বিএমইটি সূত্রের হিসাব তুলে প্রথম আলো লিখেছে, এ বছর গড়ে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ জন নতুন কর্মী সৌদি গেছেন, আর ছুটিতে আসা ৬০০ থেকে ৭০০ জন ফিরে গেছেন। সেই হিসাবে তিন দিনে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কর্মীর আটকা পড়ার কথা। বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেছেন, অনেকের ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যেতে পারে। আগে কুয়েত যুদ্ধ ও করোনার সময় আটকে পড়াদের ভিসা নবায়ন হয়েছিল, এবারও সৌদির সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেছেন, যাঁরা আটকা পড়েছেন, তাঁদের বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা হবে। যুদ্ধের শুরুর দিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রেমিট্যান্সের ভবিষ্যৎ আসলে ঝুলে আছে এই শ্রমবাজারের ওপর। বিএমইটির তথ্যে প্রথম আলো জানিয়েছে, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছেন ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৩২ জন, গত বছরের একই সময়ে ছিল ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬ জন। কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ। শুধু সৌদির ক্ষেত্রে সংখ্যা ৫ লাখ ৭২ হাজার ৫৪ থেকে নেমেছে ৩ লাখ ১১ হাজার ৫৬৭-তে, কমার হার প্রায় ৪৬ শতাংশ। ২০২৪ সালে সৌদি গিয়েছিলেন সোয়া ছয় লাখ কর্মী, গত বছর সাত লাখ ৫৫ হাজারের বেশি। এ বছর প্রথম নয় মাসে গেছেন প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার। ভিন্ন সময়সীমায় হিসাব করলে ভিন্ন হার আসে। নয় মাসের হিসাবে সিটিজেনস ভয়েসের ধরা হার ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ। মানবজমিন ১ মার্চ থেকে ১০ অক্টোবর ধরে লিখেছে, সৌদিতে কর্মী যাওয়া ৪ লাখ ৫০ হাজার ৯০৭ থেকে ২ লাখ ১ হাজার ৩৬১-তে নেমে প্রায় ৫৫ শতাংশ কমেছে। এই তিন হিসাব একই ধাঁচের, শুধু সময়ের জানালা আলাদা। আর সৌদি সরকারের ছাড়পত্রের তথ্যে ডেইলি স্টার বাংলা জানিয়েছে, শুধু সেপ্টেম্বরেই সৌদি ৩২ হাজার ৯১৫ কর্মী নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। কর্মসংস্থানমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা বলছেন, যুদ্ধের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কর্মী গেছেন। তবে প্রথম বছরে ১৫ লাখ কর্মী পাঠানোর সরকারি লক্ষ্য হয়তো পূরণ হবে না, মানছেন প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নিজেই।
তাহলে কর্মী যাওয়া প্রায় অর্ধেক কমলেও রেমিট্যান্স কেন বাড়ছে? এর উত্তর একটি ব্যাখ্যামূলক অনুমান। প্রবাসী আয় আসে মূলত আগে থেকে কর্মরত কয়েক লাখ মানুষের কাছ থেকে। নতুন কর্মী যাওয়া কমলে তার প্রভাব রেমিট্যান্সে পড়তে মাসের পর মাস লাগে। আলী হায়দার চৌধুরীর মতে, প্রকৃত প্রভাব বোঝার জন্য কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। এই ব্যাখ্যা চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, একটি যুক্তিসংগত পাঠ মাত্র।
মার্চে ঈদের মৌসুম এবং যুদ্ধের শুরুতে আতঙ্কে সঞ্চয় পাঠানো প্রবণতার কারণেও প্রবাসী আয় বেড়েছিল বলে বাংলাস্ট্রিম লিখেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ঈদের আগের সেই সময়ের গতি আশাব্যঞ্জক ছিল বলে দেখিয়েছিল। এসব কারণে এই অর্থবছরের অংশবিশেষ হয়তো আর পুনরাবৃত্ত হবে না।
সৌদিতে কর্মরত বাংলাদেশিদের আয় আদৌ কমেছে কি না, সে প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি। দেশভিত্তিক বা পেশাভিত্তিক মজুরি ও ওভারটাইমের কোনো জরিপ বা সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া গেছে, তা কিছু বিচ্ছিন্ন বিবরণ। মানবজমিনে সৌদির এক রেস্তোরাঁ-মালিক শহীদুল বলেছেন, হামলার পর তাঁর রেস্তোরাঁ দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল এবং পর্যটক না থাকায় আয় কমেছে। এক জনের অভিজ্ঞতা থেকে লাখ লাখ শ্রমিকের চিত্র আঁকা যায় না। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে সৌদির ভাবমূর্তি ধাক্কা খেলে কর্মীর চাহিদা কমবে। এটি পূর্বাভাস, পরিসংখ্যান নয়।
সৌদি অর্থনীতির পূর্বাভাসে অবশ্য চাপ স্পষ্ট। ১৩ অক্টোবরের বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে আইএমএফ বলেছে, সৌদির জিডিপি (GDP) ২০২৬ সালে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হবে। জুলাইয়ে তারা ১ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলেছিল, ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে এই হিসাব হরমুজ প্রণালি ২০২৭ সালের মার্চে খোলার ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে, আর পূর্বাভাসটি রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলাগুলোর আগের, জানিয়েছে এএফপি। আইএমএফ সৌদিকে অঞ্চলের কম ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বলেছে, কারণ তার রপ্তানিপথ বহুমুখী। এর বড় অংশ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন, যা লোহিত সাগরের উপকূলে অশোধিত তেল পৌঁছে দেয়। ল’ওরিয়ঁ টুডে এএফপির বরাতে লিখেছে, ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর হামলায় সেপ্টেম্বরে পাইপলাইনটি সাময়িক বন্ধ ছিল। এখানেই সৌদির দুর্বল জায়গা: হরমুজ এড়িয়ে যে পথে তেল যাচ্ছে, সেটি পড়েছে হুতিদের হুমকির সাগরে। কেপলারের হিসাবে আল জাজিরা জানিয়েছিল, বাব এল-মান্দেব দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এশিয়ায় যায়।
তেলের দামের ওঠানামা এই সমীকরণে সরল নয়। ব্রেন্টের দাম এখন ১০৪ থেকে ১০৬ ডলারের ঘরে। আইএমএফের হিসাবে ২০২৬ সালে গড় দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৬ ডলার হতে পারে, ২০২৫ সালে ছিল ৬৮ ডলার (সিটিজেনস ভয়েসের উদ্ধৃতিতে)। দাম বেশি মানেই সৌদির আয় বেশি নয়, কারণ আইইএর হিসাবে সেপ্টেম্বরে উপসাগরীয় অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধপূর্ব মাত্রার প্রায় ৭৫ শতাংশে ফিরেছে। বাড়তি দামের সুফল তাই পরিমাণ ও নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করছে। শ্রমিকের মজুরির সঙ্গে এর সম্পর্ক পরোক্ষ। নির্মাণ, খুচরা ব্যবসা ও সেবা খাতে সরকারি-বেসরকারি ব্যয় ও আস্থা কমলে সেখানকার কর্মসংস্থান চাপে পড়ে। আর বাংলাদেশের অদক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিকের বড় অংশ এসব খাতেই কাজ করেন।
প্রবাসীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, এমন দাবিও যাচাই করা দরকার। সৌদির পরিসংখ্যান সংস্থা গাস্তাতের হিসাবে আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ, বাসাভাড়া বেড়েছিল ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। খাদ্য ও পানীয়ের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ, পরিবহনে ২ শতাংশ। আইএমএফও ২০২৬ সালে সৌদির মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৯ শতাংশ ধরেছে, যা বিশ্ব গড় ৪ দশমিক ৭ শতাংশের অনেক নিচে। অক্টোবরের হামলার প্রভাব এই তথ্যে এখনো ধরা পড়েনি। কিন্তু অন্তত আগস্ট পর্যন্ত সৌদিতে ব্যয়বৃদ্ধির কোনো ঢেউ দেখা যায়নি।
ব্যয়ের চাপ বরং বাংলাদেশের নিজের ঘরে বেশি। বিবিএসের হিসাবে সেপ্টেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ, গড় মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকৃত মজুরি কমছে। এতে প্রবাসী আয়ের ওপর পরিবারগুলোর নির্ভরতা বাড়ে। ডেইলি স্টার বাংলার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে সৌদি থেকে। অর্থাৎ একই সংঘাত রেমিট্যান্সের আয় এবং জ্বালানির ব্যয় দুই দিকেই চাপ দিতে পারে। সিটিজেনস ভয়েসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার চলতি অর্থবছরে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতাদের কাছ থেকে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। সৌদি থেকে সারের চারটি চালান এসেছে বলে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সরবরাহ ব্যাহত হলে ওমানের দুকম বন্দর ব্যবহারের বিকল্প রয়েছে।
লোহিত সাগরের পরিবহন ব্যয় নিয়েও দুই ধরনের তথ্য আছে। রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যয়বৃদ্ধি বাস্তব। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী জানিয়েছেন, হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প পথে যাওয়ায় প্রতি কনটেইনারের পরিবহন ব্যয় ১ হাজার ৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ৫ হাজার ডলারে পৌঁছেছে, মুনাফার হার প্রায় দুই শতাংশ পয়েন্ট কমেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাজার থেকে ক্রয়াদেশ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। অন্য দিকে বৈশ্বিক চিত্র ঘোলাটে। ক্লার্কসনস রিসার্চের হিসাবে অক্টোবরের প্রথম দুই সপ্তাহে সুয়েজ খালে কনটেইনার পরিবহন ২০২৩ সালের অর্ধেকের বেশি মাত্রায় উঠেছে। ড্রিউরির সূচক অনুযায়ী এশিয়া-ইউরোপ রুটের ভাড়া টানা ১৩ সপ্তাহ কমেছে বলে একাধিক প্রতিবেদন জানিয়েছে। ফ্রেইটওয়েভসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সৌদিতে হুতি হামলা বাড়ায় লোহিত সাগরে নতুন করে বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সামগ্রিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা মেলেনি। জাহাজ ভাড়ার ঢেউ তাই বাংলাদেশের রপ্তানিকারকের জন্য আগেই ঝুঁকি। সৌদিতে প্রবাসী শ্রমিকের দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে তার সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
এবার সেই প্রশ্নটি, যা এই প্রতিবেদনের মূল আলোচ্য: সংকটের সময় প্রবাসীরা কি ব্যাংক এড়িয়ে হুন্ডিতে অর্থ পাঠাচ্ছেন? এমন দাবির পক্ষে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। উল্টো, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এপ্রিলে বলেছিলেন, প্রবাসীরা এখন বৈধ ব্যাংকিং পথে পাঠাতে উৎসাহী। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ডিএমডি মোহাম্মদ শহীদউল্লাহ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর হুন্ডি ও হাওয়ালার বিরুদ্ধে অভিযানে এর চাহিদা কমেছে। ইস্ট এশিয়া ফোরামে জুনে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক যোগাযোগসম্পন্ন দালালেরা বাজার থেকে সরে গেলে অনেক প্রবাহ ব্যাংকে ঢুকেছে। আগের বছর ডিসেম্বরে একই ফোরামের আরেক বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছিল, দ্রুত স্থানান্তর, কম কাগজপত্র ও প্রতিযোগিতামূলক দরের কারণে হুন্ডি পুরোপুরি যায়নি। ব্যাংক ও খোলাবাজারের দরের ফারাক কমানো, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বাড়ানো এবং কাগজপত্র সহজ করার কথাও সেখানে বলা হয়েছে। নিউ এজে প্রকাশিত এক মতামত অনুযায়ী, বিভিন্ন গবেষণায় ২২ থেকে ৫৬ শতাংশ রেমিট্যান্স অনানুষ্ঠানিক পথে আসার কথা বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সংখ্যা কারও জানা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং ডেটায় হুন্ডি দেখা যায় না। বৈধ রেমিট্যান্স বাড়ছে, এ তথ্য থেকে হুন্ডি কমেছে বলা যেমন নিরাপদ নয়, তেমনি বৈধ প্রবাহের একটি মাসের মন্থরতাকে হুন্ডি বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ ধরাও নিরাপদ নয়। আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিময় হার ডলারপ্রতি ১২৩ টাকা ৩৯ পয়সা। অক্টোবরের খোলাবাজারের দর নিয়ে কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে সাম্প্রতিক যে তথ্য মিলেছে, তা আজকের পত্রিকার ২০২৫ সালের শেষ দিকের প্রতিবেদন। তাতে খোলাবাজারে ডলার ১২৬ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল, ব্যাংক দর ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। ফারাক ছিল ৩ টাকা ৭০ পয়সা। দুই দরের ফারাক বাড়লে হুন্ডির আকর্ষণ বাড়ে। এই ফারাকের হালনাগাদ তথ্য হাতে না থাকাই এই বিশ্লেষণের একটি সীমা।
নিরাপত্তার হিসাব আরও কঠিন। প্রথম আলো প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানিয়েছে, এ বছর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর ১২ অক্টোবর পর্যন্ত হামলায় ১৪ বাংলাদেশি মারা গেছেন, যাঁদের আট জন নিবন্ধিত কর্মী। মানবজমিন একই সময়ে লিখেছে, গত দুই দিনে সৌদিতে অন্তত চার বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এই ব্যবধান মেটানোর মতো সমন্বিত তথ্য কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের হিসাবে এ বছর জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে এসেছে ৪ হাজার ৬৪টি মরদেহ। প্রথম আলো লিখেছে, সবচেয়ে বেশি কর্মী মারা যান সৌদিতে। তবে এটি সব কারণের মৃত্যুর হিসাব, এখানে যুদ্ধজনিত মৃত্যু আলাদা করা যায় না। ইয়েমেন সীমান্ত-লাগোয়া জিজান ও নাজরানে কাজ করা বাংলাদেশিদের সংখ্যা বা নিরাপত্তা-ঝুঁকির কোনো আঞ্চলিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। রিয়াদের দূতাবাস প্রবাসীদের ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল এলাকা এড়াতে বলেছে। ১১ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তিতে আরও সতর্ক করা হয়েছে, সংঘাতের ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ বা শেয়ার করা সৌদি আইনে দণ্ডনীয় হতে পারে।
দেশে ফেরা বা কাজ হারানোর প্রশ্নেও ফাঁক রয়ে গেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সংঘাতে প্রবাসীদের চাকরি হারানো ও দেশে ফেরার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ড. ফরিদুল আলম নিবন্ধে লিখেছেন, অনেক প্রবাসী ইতিমধ্যে চাকরি হারিয়ে ফিরে এসেছেন, কিন্তু কোনো সংখ্যা বা সূত্র দেননি। প্রথম আলোর একটি মতামত-নিবন্ধে বলা হয়েছে, গত এক দশকে প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী অপ্রত্যাশিতভাবে ফেরত এসেছেন, ২০২৬ সালে ফেরার হার অনেক বেশি। সেই হিসাব সৌদি বা যুদ্ধ-নির্দিষ্ট নয়। সরকারের পক্ষ থেকে চলতি বছরের ফেরত কর্মীর কোনো সমন্বিত সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। যাঁরা ফিরে আসেন বা ফিরতে পারছেন না, তাঁদের পরিবারের মানসিক ও আর্থিক চাপ কতটা, তা নিয়ে কোনো জরিপ খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবুল হোসেনের মতো এক একজনের গল্পই এখন সেই ফাঁকের একমাত্র সাক্ষী।
নীতিগত প্রতিক্রিয়া এখনো মূলত সতর্কতা ও বিকল্প বাজারের সন্ধানে সীমিত। প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বাসসকে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খোঁজা হচ্ছে, আর সেখানে অবৈধ হয়ে পড়া কর্মীদের বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। প্রবাসীকল্যাণের সঙ্গে জড়িত সূত্র বলছে, ২০১১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যে ১ কোটি ১০ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন, তাঁদের প্রায় ৭৯ শতাংশ গেছেন মাত্র পাঁচ দেশে এবং ৯৪ শতাংশ ১০ দেশে। এই কেন্দ্রীভবনই ঝুঁকির মূল। ব্র্যাকের শরিফুল হাসান ও আলী হায়দার চৌধুরী সৌদির সঙ্গে দ্রুত আলোচনা ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার কথা বলছেন। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলছেন, এই মুহূর্তের অগ্রাধিকার সৌদিতে থাকা বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার তাগিদ দিয়েছেন। পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ চারটি ঝুঁকির কথা বলেছেন: সৌদির শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সে বিঘ্ন, তেলের দাম, মূল্যস্ফীতির কারণে বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হওয়া এবং বাব এল-মান্দেব এলাকায় হামলা বাড়লে পরিবহন বিলম্ব ও ব্যয়বৃদ্ধি।
এ পর্যন্ত যা প্রমাণিত, তার সারকথা এই:
বাংলাদেশের বৈধ রেমিট্যান্স এখনো বাড়ছে, কিন্তু তার জোগানদার শ্রমবাজারের প্রবেশদ্বার সংকুচিত হচ্ছে। এই দুই গতির ফারাক কত দিন টিকবে, তা নির্ভর করছে হামলার স্থায়িত্ব, সৌদির অর্থনৈতিক আস্থা এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার ওপর।
কে দায়ী, কার জয় বা পরাজয় হবে, সেটি বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। বাংলাদেশের স্বার্থ প্রমাণযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে নিজের নাগরিকদের নিরাপত্তা, আয় ও ফেরার পথ নিশ্চিত করা। এর জন্য চারটি জিনিস দরকার। প্রথমত নয়, বরং সবার আগে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএমইটির মাসিক দেশভিত্তিক রেমিট্যান্স ও কর্মী-গমনের তথ্য নিয়মিত ও দ্রুত প্রকাশ করা, যাতে অক্টোবর-ডিসেম্বরের প্রবণতা সৌদি-নির্দিষ্টভাবে পড়া যায়। ফেরত কর্মী ও ভিসা মেয়াদ-সংকটে থাকা কর্মীর একটি নিবন্ধন, সরকারি তরফে প্রকাশ্য। হুন্ডির আনুমানিক হিসাব দিলে তার পদ্ধতি স্পষ্ট করা। আর হতাহতের তালিকা মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের মধ্যে সমন্বয় করে একটি অভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশ করা। এই চার তথ্য না থাকলে সংকটের মাত্রা নিয়ে বিতর্ক চলবে অনুমান আর আশঙ্কার জোরে। থাকলে অন্তত বোঝা যাবে, রেমিট্যান্সের নদী কোথায় বাঁক নিচ্ছে।





