‘বাড়ি তো নয় পাখির বাসা গোলপাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি’।
সুন্দরবনের আশেপাশে বসত বাড়ি হলে পল্লীকবি হয়তো ‘আসমানী কবিতা’ এভাবেই লিখতেন। ভেন্নাপাতা না লিখে লিখতেন গোলপাতা। ভেন্না পাতার ছানি বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লেও গোলপাতার ক্ষেত্রে কিন্তু এমনটি নয়। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার হতদরিদ্র আসমানিরা ঘর ছাওয়া ও ঘরের বেড়া দেওয়ার জন্য বছরের পর বছর ব্যবহার করে আসছে গোলপাতা। হালের ঢেউটিনের কথা বাদ দিলে দীর্ঘদিন ধরে এটাই ছিল এ এলাকার ঘর ছাওয়ার একমাত্র অবলম্বন। আমজনতার হাতে হাতে সহজ লভ্য ছাতা উঠে আসার আগে গোলপাতা দিয়ে বানানো ‘জুমুড়’ নামক একধরনের আচ্ছাদনই ছিল বর্ষাকালের নিত্যসঙ্গী।
গোল নয় গোলপাতাঃ
নাম গোলপাতা হলেও গোলাকার পাতা কিংবা বৃত্তাকার কোন কোন গুঁড়ির অস্তিত্ব আপনি খুঁজে পাবেন না গোলপাতার ঝোপঝাড়ে। বাংলায় গোলপাতা, ইংরেজিতে নিপা পাম আর বিজ্ঞানীরা যত্ন করে এর নাম রেখেছেন নিপা ফ্রুটিক্যানস (Nypa fruticans)। নামকরনের পর এবার দেয়া যাক গোলপাতা গাছের দৈহিক বিবরণ। কেতাবী বর্ননায় না গিয়ে সাধারণভাবে বললে, একটি নারকেল গাছের গুঁড়ি কেটে ডাটা সমেত পাতা গুলো কাদামাটিতে বসিয়ে দিলে যেমন দেখাবে গোলপাতা ঝোপ দেখতে ঠিক তেমন হবে। গাছের কোন গুঁড়ি থাকেনা। পাতা গুলো নারিকেল গাছের পাতার চেয়ে ঘন। রঙের দিক থেকে গাঢ় সবুজ। ফুল বের হয় তালের মত, যাকে খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় বলে মুচি। কচি এই মুচি কেটে রস বের করা হয়। অনেকেই গুলো ফল একসাথে গুচ্ছফল তৈরি করে। দেখতে বড়সড় একটা কারুকাজ করা ফুটবলের মত।
গোলপাতার গুড়ঃ
তাল, খেজুর ও আখের গুড় আমাদের নিত্যদিনের খাদ্য তালিকার অংশ হলেও গোলপাতার গুড়ের নাম শুনেই আমাদের আনেকেই আকাশ থেকে পড়তে পারেন। আকাশ থেকে পড়লেও গোলপাতার গুড়ের গল্পটা কিন্তু সত্য। স্বাদটাও কিন্তু তাল-খেজুরের মত মিষ্টি মিষ্টি, গন্ধটাও অত্যন্ত লোভনীয়। গুড় তৈরির জন্য গোলপাতার সুমিষ্ট রস আহরণের নিয়মটা তালের মত, আখ কিংবা খেজুরের রস সংগ্রহের মত নয়। তালের ফুলের কচি ডাটা কেটে যেভাবে রস বের করা হয়, গোলপাতার রসও বের করা হয় সেভাবে। এই রস জ্বাল দিয়েই তৈরি হয় সুস্বাদু সিরাপ, গুড় আর পাটালী। থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার গোলপাতার গুড়ের জন্য নামকরা হলেও বাংলাদেশে নোয়াখালীসহ উপকূলের কয়েকটি অঞ্চলে গুড় তৈরির জন্য গোলপাতার বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে। অথচ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনে গোলপাতার গুড় তৈরির সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। গোলপাতার গুড় তৈরির কলাকৌশল আমাদের উপকূলীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেলে বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রার দুয়ার খুলে যাবে সুন্দরবন থেকে।
বাঘ মামাদের আড্ডাখানাঃ

এতক্ষণ যাবত গোলপাতার কেরামতির বয়ান শুনতে শুনতে যারা বিমোহিত হয়েছেন, তাদের জন্য ভয়ঙ্কর একটা দুঃসংবাদ আছে। গোলপাতার ঝোপঝাড় কিন্তু বাঘ মামাদের নিরাপদ আস্তানা। সুন্দরবনের পেশাজীবীদের মধ্যে সবচে মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকে গোলপাতা সংগ্রহকারীরা। এরপরে মৌয়ালদের অবস্থান। গোলপাতার ঝোপ এত ঘন যে এর ভিতর দিয়ে হাত দুয়েক দূরের কোন কিছু দেখার জো থাকে না। এক ধ্যানে গোলপাতা কাটার সময় পেছন থেকে বাঘমামা হালুম করে ঝাঁপিয়ে পড়ল কিনা তা ভেবে দেখার কোন ফুরসৎ পায় না গোলপাতা সংগ্রহকারীরা। অন্ধকার, ঘন ঝোপের ভিতরে গোলপাতা কাটা, কাটা গোলপাতা বয়ে নৌকায় নেয়া, সব কিছু করতে হয় প্রাণ হাতে নিয়ে। দুরুদুরু মন। এই বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘাড়ের উপর।











চমৎকার লেখনী!
এরকম গবেষণাধর্মী লেখা আরো বেশি বেশি চাই।