মূল কনটেন্টে যান
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬৫ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
অনুসন্ধানী ও সর্বশেষ বাংলা সংবাদ
সর্বশেষ

ইশরাক বলির পাঁঠা, না শৃঙ্খলার বার্তা

এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং বিএনপির কয়েকজন সংসদ সদস্য ইশরাককে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার বলি বা অতিরিক্ত কঠোর শাস্তির শিকার মনে করছেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র, অর্থমন্ত্রী ও কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, এটি দলে জবাবদিহি ও শৃঙ্খলার বার্তা। জামায়াতের আমিরও বলেছেন, অস্ত্র হাতে না থাকলেই ভালো হতো। ইশরাককে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে, এমন কোনো নথিভুক্ত প্রমাণ মেলেনি। ভিডিওটি তাঁর নিজের ফেসবুক পেজেই প্রকাশিত হয়েছিল। এটি শৃঙ্খলা ছিল নাকি বলিদান, তা নির্ভর করবে পুলিশি তদন্ত এবং দলের অন্য নেতাদের ক্ষেত্রে একই মাপকাঠি খাটে কি না, তার ওপর।#Bangladesh #BNP #IshraqueHossain #Politics #MeehaNews

ইশরাক বলির পাঁঠা, না শৃঙ্খলার বার্তা

বাংলা বাগধারায় “বলির পাঁঠা” সেই প্রাণী, যে নিজে কিছু না করেও অন্যের পাপের দায়ে কাটা পড়ে। প্রতিমন্ত্রীর পদ হারানো ইশরাক হোসেনকে নিয়ে এখন সেই প্রশ্নই ঘুরছে। তবে পাঁঠা নিজে হেঁটে গিয়ে হাড়িকাঠে মাথা দেয় না, আর ইশরাক নিজেই পিস্তল হাতে নেমেছিলেন মাদক তাড়াতে। ফিরলেন মন্ত্রিত্ব খুইয়ে। তাহলে তিনি কি অন্যের ব্যর্থতার বলি, কোনো পরিকল্পনার অংশ, নাকি নিজের কাজের দায় নিজেই মেটালেন?

ঘটনাক্রম দিয়ে শুরু করা যাক। ১৭ অক্টোবর শনিবার পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানের একটি ভিডিও প্রকাশিত হয় তাঁর নিজের ফেসবুক পেজেই। তাতে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এক হাতে পিস্তল আর অন্য হাতে হ্যান্ডমাইক নিয়ে কয়েকজনকে ধাওয়া করছেন। একই ভিডিওতে তাঁর এক দেহরক্ষীকে এক তরুণকে লাথি মারতে দেখা যায়।

রোববার একাধিক গণমাধ্যম সরকারি সূত্রের বরাতে খবর দেয়, বিকেলে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেছেন। রাতে বিটিভির স্ক্রলে খবরটি প্রচারিত হয়, কিছুক্ষণ পর সরিয়েও নেওয়া হয়। ইশরাকের দপ্তর খবরটিকে “বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে আইনি ব্যবস্থার হুমকি দেয়, আর ইশরাক নিজে বলেন “গুজব”। সোমবার দুপুরে সেই ইশরাকই প্রেসক্লাবে দাঁড়িয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। রাতের “গুজব” সকালে সত্য হয়ে গেল, মাঝখানে শুধু এক রাতের ঘুম।

“বলির পাঁঠা” তত্ত্বের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠ এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর। তাঁর মতে, মাদক দমনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার ফাঁদে পড়েছেন ইশরাক: “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দোষ করেন, আরেকজন সেই পাপে ভোগেন।” দ্য ডেইলি স্টারকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির কয়েকজন সংসদ সদস্য বলেছেন, শাস্তিটা “সম্ভাব্য সবচেয়ে কঠোর” মনে হচ্ছে। একজন নারী সংসদ সদস্যের প্রশ্ন, একটি ভুলের জন্য কি একটি রাজনৈতিক জীবন উপেক্ষা করা যায়?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে বলেছেন, অপরাধের তুলনায় দণ্ড অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এর পেছনে দলের ভেতরের রাজনীতিও কাজ করে থাকতে পারে বলে তাঁর সন্দেহ। ইশরাকের অনুসারীদের মনোভাব যেন সেই পুরোনো প্রবাদ: যার জন্য চুরি করি, সে-ই বলে চোর।

উল্টো দিকে শৃঙ্খলার যুক্তিও কম শক্ত নয়। প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, সরকারের বার্তা পরিষ্কার, জবাবদিহি সর্বস্তরে থাকবে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেছেন, কেউ জনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ঊর্ধ্বে নয়, “দলের সবার এটা বোঝা দরকার ছিল।” গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, ইশরাকের শাস্তি মাদকবিরোধী অভিযানের জন্য নয়, আচরণের জন্য। সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ একজন মন্ত্রীর প্রকাশ্যে অস্ত্র দেখানোকে “নিন্দনীয় অপরাধ” বলেছেন।

বিরোধী দলও এখানে প্রায় একমত। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ইশরাক হয়তো ভালো উদ্দেশ্যেই করেছিলেন, তবে অস্ত্র হাতে না থাকলেই ভালো হতো। আইনও ইশরাকের পক্ষে খুব একটা নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্র নীতিমালা অনুযায়ী, আত্মরক্ষার অস্ত্র এমনভাবে প্রদর্শন করা যায় না, যাতে ভীতি তৈরি হয়।

ইশরাকের রাজনৈতিক অতীতও এই আলোচনায় ঢুকে পড়ছে। তিনি অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে। ২০২৫ সালের মে মাসে মেয়র পদের দাবিতে তাঁর অনুসারীরা নগর ভবন ঘেরাও করে ফটকে তালা দিয়েছিলেন, ইশরাকও তাতে যোগ দেন। তখন নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়েছিল।

প্রথম আলোর বিশ্লেষণ বলছে, তখন থেকেই দলের ভেতরে তাঁর পরিপক্বতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। জেএসডির স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেনের ভাষায়, ইশরাক অস্ত্র দিয়ে ক্ষমতা দেখানোর প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

এবার “পরিকল্পনা” তত্ত্ব। ইশরাক কি কোনো সাজানো চিত্রনাট্যের চরিত্র? এই প্রতিবেদনের জন্য দেখা কোনো সংবাদ, বিশ্লেষণ বা দলীয় বক্তব্যে এমন কোনো নথিভুক্ত প্রমাণ মেলেনি। ভিডিওটি তাঁর নিজের পেজ থেকে ছড়িয়েছে, কেউ গোপনে ধারণ করে ফাঁস করেনি।

ঘটনাক্রমের বিশৃঙ্খলাই পরিকল্পনার বিপক্ষে সবচেয়ে বড় সাক্ষী। সাজানো নাটকে বিটিভির স্ক্রল উঠে আবার নামে না, প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর রাতে আইনি ব্যবস্থার হুমকি দিয়ে সকালে পদত্যাগের ঘোষণা দেয় না। বরং যে দৃশ্য দেখা গেল, তা অপ্রস্তুত এক সরকারের দ্রুত ক্ষতি সামলানোর চেষ্টা।

তবে মাহদী আমিন ফেসবুকে লিখেছেন, এই পদত্যাগ “কোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়”, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক দায়িত্বের পথ খুলতে পারে। কেউ কেউ এতে ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনের ইঙ্গিত দেখছেন। সেটি অনুমান, প্রমাণ নয়।

তাহলে আসল প্রশ্নটা কোথায়? সাংবাদিক সাবির মোস্তফা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে লিখেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ উঠলেই পদত্যাগ করানো আসলে “ফাটল ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা”। তাঁর উদাহরণ, ২৬ সেপ্টেম্বর জেএসডির জাতীয় সম্মেলনে বিএনপির লোকজনের হামলার অভিযোগ উঠলেও আয়োজকের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থার খবর মেলেনি।

মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলায় ঘনিষ্ঠজনদের নাম আসার পর ১ অক্টোবর সংসদ সদস্যপদ ছেড়েছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, যদিও তিনি জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তিন সপ্তাহে দুটি পদত্যাগ শৃঙ্খলার বার্তা হতে পারে। আবার এমন নিয়মের ইঙ্গিতও হতে পারে, যেখানে ক্যামেরার সামনে ধরা পড়লে তবেই বিচার হয়। পার্থক্যটা ঠিক হবে পরের ঘটনাগুলোয়।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে / তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।” দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নেও কথাটা খাটে। যে অন্যায় করে, আর দলের ভেতরে যে তা দেখেও চুপ থাকে, মাপকাঠি দুজনের জন্যই এক হওয়া উচিত, ক্যামেরায় ধরা পড়ুক বা না পড়ুক।

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, ইশরাক পুরোপুরি বলির পাঁঠা নন, কারণ পিস্তলটা তাঁর হাতে কেউ গুঁজে দেয়নি। আবার পরিকল্পনার অংশ হওয়ার প্রমাণও নেই। তিনি সম্ভবত সেই রাজনীতির প্রতীক, যেখানে ক্ষমতার প্রদর্শন আর জনসেবার সীমারেখা প্রায়ই গুলিয়ে যায়।

পদত্যাগে গল্পের শেষ হয়নি। সামনে তিনটি প্রশ্ন:

  • ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের তদন্তে কী বেরোয়।

  • অভিযানে আটক যে মানুষেরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছিলেন, তাঁদের কী হলো।

  • পরের “ইশরাক” দলের অন্য কোনো কোণে দেখা দিলে একই মাপকাঠি খাটে কি না।

এই তিনটির উত্তরই বলবে, এটি শৃঙ্খলা ছিল, নাকি মুখ বাঁচানোর বলিদান। পুরোনো উপদেশটি তাই সব পক্ষের জন্যই প্রযোজ্য: ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।

প্রতিবেদনটি আপনার কাছে কেমন লাগল?

আবু আনান

বিশেষ প্রতিবেদক

বিশেষ প্রতিবেদক

এই প্রতিবেদনে কোনো তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে সংশোধনী নীতি অনুযায়ী আমাদের জানান।

মন্তব্য

মন্তব্য দেখতে বা লিখতে চাপ দিন। মন্তব্য সম্পাদকীয় নীতিমালা মেনে প্রকাশ হয়।

মিহা স্পেশাল

আজ

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

পাঠের রং

এখন যা বেশি খোঁজা হচ্ছে

যেকোনো পাতায় / চাপলেই খোঁজ খুলবে। ফলাফলে বিভাগ, তারিখ ও ধরন দিয়ে ছাঁকতে পারবেন।