হুতিদের হাতে কোন অস্ত্র, আসছে কোথা থেকে, সৌদি আরব সব হামলা ঠেকাতে পারছে না কেন
১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি। হুতিদের হাতে ইরানি নকশার ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন আছে। যন্ত্রাংশ চোরাই পথে ইরান ও চীন থেকে আসছে বলে প্রতিবেদন রয়েছে। ইরান অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একসঙ্গে নানা গতির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন, সৌদি আরবের বিশাল আয়তন এবং প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুত আকাশ প্রতিরক্ষাকে চাপে ফেলছে। হামলার কারণে রিয়াদে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বাসা থেকে কাজ ও স্কুলে অনলাইন ক্লাস চালু হয়েছে। একটি বড় জ্বালানি সম্মেলনও বাতিল হয়েছে।#Houthi #SaudiArabia #Yemen #MiddleEast #MeehaNews

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। দেশটির বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও সব হামলা ঠেকাতে পারছে না। সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে ১০ অক্টোবর (শনিবার) রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের হিসাবে এতে ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি এবং দুজন বাংলাদেশি। পরে কয়েকটি প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ১৩ বলা হয়েছে। হামলার দায় স্বীকার করেছে হুতিরা। রয়টার্সের বরাতে বলা হয়েছে, এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
হুতিরা কারা, কেন এখন সংঘাত
হুতিরা ইয়েমেনের সংখ্যালঘু জায়দি সম্প্রদায়ের, যারা শিয়াদের একটি শাখা। ১৯৯০-এর দশকে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে তারা প্রথম প্রতিরোধে নামে। ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের পর ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হলেও চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। হুতিরা সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে বাব আল-মানদেব প্রণালিসহ লোহিত সাগর উপকূলের বড় অংশ দখল করে। হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় সৌদি তেল রপ্তানির জন্য এই পথই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুধু রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরেই হুতিরা অন্তত ২০ বার হামলা চালিয়েছে।
অস্ত্রভান্ডারে কী আছে
হুতিদের হাতে বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ballistic missile), ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র (cruise missile) ও ড্রোন আছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর অনেকটাই ইরানি মডেলের আদলে তৈরি:
মাঝারি পাল্লার ‘খাইবার শেখান’ ও ‘তুফান’ (পাল্লা ১,৩৫০ থেকে ১,৯৫০ কিলোমিটার ধারণা করা হয়)।
‘কুদস-৪’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, যার পাল্লা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার।
দুই ধাপের ‘প্যালেস্টাইন-২’, যার হাইপারসনিক সক্ষমতা আছে বলে ধারণা করা হয়।
ইরানের ‘শাহেদ’ ড্রোনের স্থানীয় সংস্করণ ‘ওয়ায়েদ-১’ ও ‘ওয়ায়েদ-২’।
অস্ত্র আসছে কোথা থেকে
সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান হুতিদের অস্ত্র ও অর্থ দিচ্ছে। ইরান তা অস্বীকার করে। মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে যন্ত্রাংশ তৈরি হয়ে নৌকা, কনটেইনারবাহী জাহাজ ও ওমান-ইয়েমেন সীমান্ত দিয়ে ইয়েমেনে যায়। সেখানে সেগুলো জোড়া লাগানো হয়। কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ (সিএআর) এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদনে চীনা প্রতিষ্ঠানের নামও এসেছে। ইয়েমেন কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি দুটি চালান জব্দ করেছে, যাতে ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন-সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ ছিল। জাতিসংঘের সাবেক বিশেষজ্ঞ হেনরি টমসনের ধারণা, অন্তত দুই বছর ধরে চীন থেকে ‘সলিড ফুয়েল’চালিত ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ আসছে। জব্দ চালানের নথিতে থাকা চীনা প্রতিষ্ঠানের নাম গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি।
সৌদি প্রতিরক্ষা কেন ভেদ হচ্ছে
হুতিরা একসঙ্গে বিভিন্ন গতির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, ফলে একসঙ্গে এত হুমকি সামলানো কঠিন। কিংস কলেজের গবেষক নওয়াফ ওবায়েদ বলেন, সৌদি আরবের বিশাল আয়তনের কারণে বহু হামলা ঠেকানোর পরও একটি সফল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এ ছাড়া ইরান যুদ্ধের শুরুর মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা প্যাট্রিয়ট (Patriot) ও থাড (THAAD) প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত খরচ করেছে। সৌদি আরবও মজুত নিয়ে সমস্যায় আছে। সৌদি বিমান হামলায় হুতিদের গুদাম ও ড্রোন কারখানা লক্ষ্য করা হলেও তাদের হাতে কত ক্ষেপণাস্ত্র আছে, তা স্পষ্ট নয়।
প্রভাব
হামলার পর রিয়াদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করতে বলেছে। নগর কর্তৃপক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাসের নির্দেশ দিয়েছে। রাজধানীতে নির্ধারিত একটি বড় জ্বালানি সম্মেলনও শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়েছে। বিডিনিউজ২৪-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে সৌদিগামী প্রায় ১০০ ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। আহতদের মধ্যে ২৭ জন বাংলাদেশি।
হুতিদের দাবি, ইয়েমেনে সৌদি হামলার জবাবেই তারা পাল্টা আঘাত করছে। হুতি-নিয়ন্ত্রিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশনে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, সৌদি আগ্রাসন না থামলে আরও ভয়াবহ পরিণতি আসবে। চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ ফারেয়া আল-মুসলিমির মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বছরের পর বছর হুতিদের সামরিক শক্তিকে অবমূল্যায়ন করেছে।





