কবির জন্ম, কবির প্রস্থান

আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতূহলভরে।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘১৪০০ সাল’
শতবর্ষ পরের অচেনা পাঠকের কাছে প্রশ্নটা রেখে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ২৩ অক্টোবর এলে সেই প্রশ্ন ফিরে আসে দুই কবির নামে। ১৯২৯ সালের এই দিনে পুরান ঢাকায় জন্ম নিয়েছিলেন শামসুর রাহমান। ২০১২ সালের এই দিনে কলকাতায় চিরবিদায় নেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। একজনের আগমন আর আরেকজনের প্রস্থান, একই তারিখে বাঁধা পড়ে আছে দুই বাংলার কবিতা।
শামসুর রাহমানের কবিতা পড়লে মনে হয়, তিনি শব্দ দিয়ে একটি দেশের মানচিত্র আঁকছিলেন। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আসাদের রক্তভেজা শার্টকে তিনি পতাকা করে তুলেছিলেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতায়। একাত্তরের অবরুদ্ধ ঢাকায় বসে লিখেছিলেন ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’। সেখানে গ্রামের বিধবা থেকে শহরের শিশু পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সারি একে একে দাঁড়ায় স্বাধীনতার অপেক্ষায়। আর ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় স্বাধীনতাকে তিনি খুঁজেছেন দৈনন্দিন জীবনের চেনা দৃশ্যে, মানুষের হাসি, উৎসব আর অধিকারের মধ্যে।
স্বাধীনতা তুমি পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন।
স্বাধীনতা তুমি
উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন।
স্বাধীনতা তুমি
বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ।
২০০৬ সালের আগস্টে তিনি চলে গেছেন। কিন্তু প্রতি মার্চ আর ডিসেম্বরে তাঁর কবিতা ফিরে আসে মঞ্চে, মিছিলে, পাঠ্যবইয়ের পাতায়।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পটা আবার সীমান্ত পেরোনোর। জন্ম অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে, আজকের মাদারীপুরে। বেড়ে উঠেছেন কলকাতায়। পঞ্চাশের দশকে ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকাকে ঘিরে যে তরুণ কবিরা বাংলা কবিতায় নতুন স্বর আনলেন, তিনি ছিলেন তাঁদের সামনের সারিতে। ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতায় ছেলেবেলায় পাওয়া প্রতিশ্রুতি একে একে ভেঙে যাওয়ার যে বেদনা, তা দুই বাংলার আবৃত্তিমঞ্চে আজও বহুল উচ্চারিত। ‘নীরা’কে নিয়ে লেখা কবিতাগুলো হয়ে আছে বাংলা প্রেমের কবিতার এক অনন্য অধ্যায়।
বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,
যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে
সেদিন আমার বুকেও এরকম আতরের গন্ধ হবে !
ভালবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি
দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮ টি নীলপদ্ম
তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ
এখনো সে যে কোন নারী !
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনা !
গদ্যেও তিনি সমান বিস্তৃত। ‘সেই সময়’ উনিশ শতকের কলকাতার গল্প বলে, ‘প্রথম আলো’ শতাব্দীর বাঁকবদলের। আর ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এ দেশভাগে ছিঁড়ে যাওয়া দুই বাংলাকে এক মলাটে বেঁধেছেন তিনি, যেখানে আছে একাত্তরের বাংলাদেশও। কিশোরদের জন্য গড়েছেন কাকাবাবুকে, আর ‘নীললোহিত’ ছদ্মনামে লিখেছেন চিরতরুণ এক ভবঘুরের কথা।
দুজনের পথ আলাদা, তবু কোথাও যেন মিলে যায়। একজন ঢাকায় থেকে লিখেছেন একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন। অন্যজন জন্মভূমি পূর্ববঙ্গ ছেড়ে গিয়েও বারবার ফিরেছেন তার কাছে, উপন্যাসের পাতায়। রবীন্দ্রনাথ জানতে চেয়েছিলেন, শতবর্ষ পরে কেউ কবিতাখানি পড়বে কি না। ২৩ অক্টোবর সেই প্রশ্নের একটা উত্তর দেয়: কবি আসেন, কবি চলে যান, কবিতা থেকে যায়।
দিনের অন্যান্য ঘটনা:
বিষাণ সিং বেদির প্রয়াণ (২০২৩): ভারতের সাবেক অধিনায়ক ও বাঁহাতি স্পিন বোলার বিষাণ সিং বেদি মারা যান।
ফিরে দেখা, বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪): ২২ ও ২৩ অক্টোবর বিহারের বক্সারে মীর কাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা ও মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সম্মিলিত বাহিনী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হয়। এর পরের বছর কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওডিশার দেওয়ানি লাভ করে।
বিশ্ব ইতিহাস
ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সূচনা (১৮৫৩): উসমানীয় সাম্রাজ্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে। রুশ-তুর্কি এই সংঘাতে পরে ব্রিটেন ও ফ্রান্স যোগ দিলে তা ক্রিমিয়ার যুদ্ধ নামে পরিচিত হয়।
নারীর ভোটাধিকারের মিছিল (১৯১৫): যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ভোটাধিকারের দাবিতে ফিফথ অ্যাভিনিউ ধরে মিছিল করেন ২৫ হাজারের বেশি নারী। সেবারের গণভোটে দাবি হেরে গেলেও দুই বছর পর, ১৯১৭ সালে, নিউইয়র্কের নারীরা ভোটাধিকার পান।
দ্বিতীয় আল আলামিনের যুদ্ধ (১৯৪২): মিসরের আল আলামিনে জেনারেল মন্টগোমারির নেতৃত্বে ব্রিটিশ অষ্টম আর্মি জার্মান ফিল্ড মার্শাল রোমেলের জার্মান-ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে। এই যুদ্ধ উত্তর আফ্রিকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
পেলের জন্ম (১৯৪০): ব্রাজিলে জন্মগ্রহণ করেন ফুটবল কিংবদন্তি পেলে, একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে যিনি তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছেন।



