ব্রাজিলে লুলার জয়, সার্বিয়ায় ভুচিচের পরাজয়, ফিলিস্তিন প্রশ্নে কী বার্তা
প্রথম ধাপে পিছিয়ে থেকেও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়েছেন লুলা। ফ্লাভিও ফল মানেননি, ভোট বাতিল চেয়ে আদালতে যাওয়ার কথা বলেছেন। সার্বিয়ার আগাম সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদের জোট ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর কাছে হার স্বীকার করেছেন আলেক্সান্দার ভুচিচ। ভোটার উপস্থিতি ছিল যুগোস্লাভিয়া ভাঙার পর সর্বোচ্চ। ফিলিস্তিনের পক্ষে সরব লুলা ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্ক রেখেছেন। অন্যদিকে ভুচিচের আমলে সার্বিয়া থেকে ইসরায়েলে অস্ত্র যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।#Lula #Brazil #Serbia #Palestine #MeehaNews

প্রথম ধাপে পিছিয়ে থেকেও ব্রাজিলে নাটকীয়ভাবে আবার জয় পেয়েছেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। অন্যদিকে সার্বিয়ায় সংসদ নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন দেশটির দীর্ঘদিনের নেতা আলেক্সান্দার ভুচিচ। ফিলিস্তিন প্রশ্নে লুলার অবস্থান আর ইসরায়েলের সঙ্গে ভুচিচের ঘনিষ্ঠতার কারণে দুই দেশের এই নির্বাচনী ফল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও আলোচনায় এসেছে।
গতকাল রোববার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে কট্টর ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়েছেন লুলা। ফ্লাভিও ব্রাজিলের সাবেক কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে। এ জয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে চলেছেন লুলা।
রিও টাইমস জানিয়েছে, দেশটির সর্বোচ্চ নির্বাচনী আদালতের (টিএসই) হিসাবে সব কেন্দ্রের ভোট গণনা শেষে লুলা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট। ফ্লাভিও পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ।
গত ৪ অক্টোবর প্রথম ধাপে ফ্লাভিওর চেয়ে অল্প ব্যবধানে পিছিয়ে ছিলেন লুলা। তখন তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। দ্বিতীয় ধাপে সেই ফল উল্টে যায়। প্রথম ধাপে ভোট না দেওয়ার হার ছিল ২১ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে তা নেমে আসে ১৯ দশমিক ২২ শতাংশে। লুলার মিত্রদের মতে, ভোটারদের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনাই তাঁর জয়ের বড় কারণ।
তবে পরাজয় মেনে নেননি ফ্লাভিও। রিও টাইমসের তথ্যমতে, তিনি বলেছেন, লুলার জয় তিনি স্বীকার করতে পারছেন না। দ্বিতীয় ধাপের ভোট বাতিল চেয়ে আদালতে যাবেন বলেও জানিয়েছেন।
লুলার জয়ে তাঁর ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান নতুন করে সামনে এসেছে। ২০২২ সালের জুনে নির্বাচনী প্রচারের সময় ব্রাজিলের ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি কেফিয়াহ (ফিলিস্তিনি স্কার্ফ) পরেছিলেন। তখন তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের আমাদের পূর্ণ মনোযোগ ও সংহতি প্রাপ্য।’ মুক্ত ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের অধিকারের পক্ষেও কথা বলেন তিনি।
২০১০ সালে পশ্চিম তীর সফরের সময়ও লুলা বলেছিলেন, তিনি একটি ‘স্বাধীন ও মুক্ত ফিলিস্তিন’ দেখতে চান। ওই বছরই তাঁর শাসনামলে ব্রাজিল ১৯৬৭ সালের সীমানায় ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
তবে ইসরায়েলের সঙ্গেও স্বাভাবিক সম্পর্ক রেখেছেন লুলা। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তাঁর আগের দুই মেয়াদে ব্রাজিল ও ইসরায়েলের মধ্যে অস্ত্র ও নিরাপত্তা সহযোগিতার চুক্তি হয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তিনি কয়েকবার সাক্ষাৎ করেছেন। ইসরায়েলি পার্লামেন্টে (নেসেট) দেওয়া বক্তৃতায় নিজেকে ‘ইসরায়েলের বন্ধু’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন। বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমঝোতা গড়ার চেষ্টার জন্য পরিচিত লুলা নতুন মেয়াদে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা বদলাবেন, তা নিয়ে তাই প্রশ্ন রয়েছে।
গতকাল রোববার সার্বিয়ার আগাম সংসদ নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেছেন ভুচিচ। আল-জাজিরা জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পদে লড়তে গত সেপ্টেম্বরে তিনি প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়েছিলেন। ভুচিচ নিজেই বলেন, ‘এটা স্পষ্ট, আমরা এ নির্বাচনে হেরে গেছি।’
ভোটের নমুনা হিসাবের ভিত্তিতে ভুচিচ জানান, বিরোধী জোট ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পেতে যাচ্ছে, তাঁর দল পেতে পারে ১০৫টি। ২৫০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনে দরকার ১২৬টি আসন। চূড়ান্ত ফল এখনো ঘোষিত হয়নি।
এ পরাজয়ের পেছনে রয়েছে প্রায় দুই বছর ধরে চলা তরুণদের সরকারবিরোধী আন্দোলন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদে রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যু হয়। এরপর সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন তরুণেরা। সেই আন্দোলন থেকেই উঠে আসে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’।
এবার ভোটও পড়েছে রেকর্ড। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর এটাই সর্বোচ্চ।
ভুচিচের পরাজয় স্বীকারের পর বেলগ্রেডে উল্লাসে মেতে ওঠেন বিরোধী সমর্থকেরা। রাস্তায় নেমে আসেন হাজারো মানুষ, আতশবাজি, নাচ-গান আর স্লোগানে মুখর হয় শহর। পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মাঝের একটি পার্কে ভুচিচের দল সার্বিয়ান প্রোগ্রেসিভ পার্টির সমর্থকেরা প্রায় ১৮ মাস ধরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছিলেন। জনতা সেগুলোও ভেঙে দেয়।
সার্বিয়ার নির্বাচনে মূল ইস্যু ছিল দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন। তবে ভুচিচের পরাজয়ের পর ইসরায়েলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বেলগ্রেড সফর করেন ইসরায়েলের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলি কোহেন। সার্বিয়ার সংবাদমাধ্যম এন১ লিখেছে, এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এটি ছিল কোনো ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম সার্বিয়া সফর।
গাজা যুদ্ধের সময়ও সার্বিয়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একই সময়ে দেশটি জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দিয়েছে এবং গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। আবার অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম বালকান ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং নেটওয়ার্কের (BIRN) প্রতিবেদনে এসেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর সার্বিয়া থেকে ইসরায়েলে অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান গেছে।
আল-জাজিরার ২০২৪ সালের এক বিশ্লেষণে বিশ্লেষকেরা বলেছেন, ভুচিচ আদর্শিক নেতা নন। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি পররাষ্ট্রনীতি বদলান। বিশ্লেষক ভুক ভুকসানোভিচের মতে, ওয়াশিংটনে ইসরায়েলপন্থী লবি সংগঠন এআইপ্যাকের (AIPAC) সম্মেলনে ভুচিচের বক্তৃতা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের সহায়তা পাওয়ার চেষ্টার অংশ।
ফিলিস্তিনের পক্ষে সরব লুলার জয় আর ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ ভুচিচের পরাজয়, ভিন্ন দুই দেশের দুই নির্বাচনী ফল। তবে দুটিই আন্তর্জাতিক রাজনীতির চলমান টানাপোড়েনের দুটি আলাদা ছবি সামনে এনেছে।





