মাস্কের ‘নির্ভুল’ ওডিসি, ভুল মানল গ্রক নিজেই
ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ মুক্তির পর গত ২২ জুলাই ইলন মাস্ক ঘোষণা দেন, বছর শেষের আগেই গ্রক ইমাজিন হোমারের ওডিসির একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য, ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল চলচ্চিত্র বানাবে। তিন মাস পর, ২৩ অক্টোবর, এসেছে মাত্র সাত মিনিটের একটি ‘পর্ব’। সমালোচকেরা এটিকে নিম্নমানের এআই কনটেন্ট বলেছেন। ওয়্যার্ডের প্রশ্নের জবাবে গ্রক নিজেই বলেছে, পর্বটি ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল নয়, আর ওডিসি কোনো ঐতিহাসিক দলিলও নয়। নোলানের ছবিটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৮০ কোটি ডলার আয়ের পথে।#Grok #xAI #ElonMusk #TheOdyssey #MeehaNews

প্রতিশ্রুতিটা ছিল বিশাল। জুলাইয়ের শেষে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখলেন, বছর শেষ হওয়ার আগেই তাঁর প্রতিষ্ঠান এক্সএআইয়ের (xAI) ভিডিও তৈরির মডেল গ্রক ইমাজিন (Grok Imagine) বানাবে হোমারের ‘ওডিসি’র পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। তাঁর ভাষায়, তা হবে ‘ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল’ এবং ‘হোমারের শিল্পের প্রতি বিশ্বস্ত’।
তিন মাস পর এসেছে সেই প্রতিশ্রুতির প্রথম নমুনা। কিন্তু পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নয়, এসেছে সাত মিনিটের একটি ‘পর্ব’। আর মজার ব্যাপার হলো, এর ঐতিহাসিক নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন করলে স্বয়ং গ্রক জবাব দিচ্ছে: না।
যেভাবে শুরু
ক্রিস্টোফার নোলানের মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র ‘দ্য ওডিসি’ যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পায় গত ১৭ জুলাই, প্রধান চরিত্রে ম্যাট ডেমন। মুক্তির আগেই ছবিটির অভিনয়শিল্পী নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। হেলেন অব ট্রয় চরিত্রে লুপিতা নিয়ং’ও আর সিনন চরিত্রে এলিয়ট পেজকে নেওয়ায় মূলত ডানপন্থী সমালোচকেরা আপত্তি তোলেন।
সমালোচকদের মধ্যে সবচেয়ে সরব ছিলেন মাস্ক। দ্য প্রিন্টের তথ্যমতে, প্রথম ট্রেইলারের পর তিনি নোলানের বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগ তোলেন। তাঁর অভিযোগ, অস্কারের যোগ্যতা পেতে নোলান ওডিসিকে বিকৃত করেছেন। এরপর ২২ জুলাই দেন গ্রক দিয়ে ‘নির্ভুল’ ওডিসি বানানোর ঘোষণা।
তবে বক্স অফিস ভিন্ন কথা বলেছে। জর্ডান নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২৫ কোটি ডলার বাজেটের ছবিটি আগস্টের শেষেই আয় করেছে ১৫৫ কোটি ডলারের বেশি, আর এগোচ্ছে প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের দিকে। এটি এখন নোলানের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বেশি আয়ের ছবি।
সাত মিনিটের ‘গ্রডিসি’
গত ২৩ অক্টোবর এক্সে মাস্ক ছোট্ট একটি পোস্টে শেয়ার করেন ‘ওডিসি উইথ গ্রক ইমাজিন’। পর্বটি বানিয়েছে এআই বিনোদন প্রতিষ্ঠান ওয়ান্ডার স্টুডিওস (Wonder Studios)। পরিচালক হিসেবে দেভ ওয়াকারের নাম আছে। এতে দেখানো হয়েছে, ইথাকার রাজা ওডিসিয়াস ট্রয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে চাননি, কিন্তু আনুগত্যের শপথে বাঁধা পড়ে সেনাদল নিয়ে পাড়ি দেন সাগর।
মার্কিন প্রযুক্তি সাময়িকী ওয়্যার্ড (WIRED) পর্বটিকে বলেছে ‘এআই স্লপ’ (AI slop), অর্থাৎ যান্ত্রিকভাবে বানানো নিম্নমানের কনটেন্ট। তাদের পর্যালোচনায় যেসব দুর্বলতা উঠে এসেছে:
চরিত্রদের ঠোঁটের নড়াচড়া সংলাপের সঙ্গে মেলে না, সংলাপ বলার ভঙ্গিও আড়ষ্ট।
ওডিসিয়াস ছাড়া প্রধান কোনো চরিত্রের নাম পরিচয় করানো হয়নি।
ইথাকা ছাড়ার পরপরই চরিত্রেরা ট্রয়ের তীরে পৌঁছে যায়, মাঝখানে সময়ের কোনো চিহ্ন নেই।
এক্স ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়াও ছিল কড়া। দ্য প্রিন্ট জানিয়েছে, কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল’ সংস্করণে চরিত্রেরা ইংরেজিতে কথা বলে কেন। কেউ দেখিয়েছেন বেল্টের বকলস আর মধ্যযুগীয় পোশাকের মতো কালবিরোধী উপাদান।
গ্রকের আত্মস্বীকৃতি
সবচেয়ে চমকপ্রদ মোড়টা এসেছে গ্রকের কাছ থেকেই। ওয়্যার্ড চ্যাটবটটিকে জিজ্ঞেস করে, পর্বটি কি ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল? সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রক সরাসরি না বলেছে। তার ব্যাখ্যা:
পর্বটি হোমারের মহাকাব্যের রূপান্তর, বাস্তব ঘটনার ঐতিহাসিক পুনর্গঠন নয়।
ওডিসির চরিত্রদের ঐতিহাসিক অস্তিত্বের প্রমাণ নেই। মহাকাব্যটিতে ব্রোঞ্জ যুগ আর পরবর্তী লৌহ যুগের উপাদান মিশে আছে, অনেক খুঁটিনাটি সাহিত্যিক কল্পনা।
চরিত্রেরা কথা বলছে ব্রিটিশ উচ্চারণের আধুনিক ইংরেজিতে, হোমারের গ্রিক ভাষায় নয়।
দৃশ্যপট গড়ে উঠেছে আধুনিক চলচ্চিত্রের ছাঁচ আর এআইয়ের প্রশিক্ষণ-ডেটা থেকে, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে নয়। উদাহরণ হিসেবে গ্রক যুদ্ধের দৃশ্যে অশ্বারোহী বাহিনীর উপস্থিতিকে সেই যুগের প্রচলিত পুনর্গঠনের সঙ্গে অসংগত বলেছে।
গ্রকের উপসংহার, ওডিসি নিজেই কোনো ঐতিহাসিক দলিল নয়।
আসল প্রশ্নটা কোথায়
গল্পটা শুধু একটি ব্যর্থ ভিডিওর নয়। এটি দেখায় জেনারেটিভ এআই (generative AI) নিয়ে প্রযুক্তি জগতের বড় প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব সক্ষমতার ফারাক। পূর্ণদৈর্ঘ্য, সুসংগত, শিল্পমানসম্পন্ন চলচ্চিত্র বানানো এখনো এআইয়ের নাগালের বাইরে বলেই মনে হচ্ছে। সাত মিনিটের পর্বেও চরিত্রের ধারাবাহিকতা, সংলাপের সঙ্গে ঠোঁটের মিল আর গল্পের গতি ধরে রাখা যায়নি।
আরেকটি দিকও আছে। দেবদেবী, জাদুকরি আর দানবে ভরা হাজার বছরের পুরোনো এক মহাকাব্যকে ‘ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল’ করার দাবিটাই গোড়া থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। ওয়্যার্ডের মন্তব্য, যে দাবি মাস্ক করেছিলেন, তা পূরণ করা অসম্ভব, আর তাঁর নিজের এআই সেটাই মনে করিয়ে দিয়েছে।
মাস্কের বেঁধে দেওয়া সময় শেষ হতে আর দুই মাসের কিছু বেশি বাকি। পূর্ণদৈর্ঘ্য ‘গ্রডিসি’ আসবে কি না, এক্সএআই এখনো তা জানায়নি।





