কয়রায় ইউপি নির্বাচন: সাত ইউনিয়নে কারা সম্ভাব্য প্রার্থী
খুলনার কয়রা উপজেলায় ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচারে নেমেছেন। উপজেলা জামায়াতে ইসলামী সাতটি ইউনিয়নেই একক প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। বিএনপি কোনো ইউনিয়নে প্রার্থী ঘোষণা করেনি, প্রতিটিতে একাধিক নেতা মনোনয়ন চাইছেন। কয়রা সদর ইউনিয়নে আগে ঘোষিত জামায়াত প্রার্থী মিজানুর রহমান উপজেলা পরিষদের ভাইস…

খুলনার কয়রা উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে এখনো দেরি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতিমধ্যে মাঠে নেমেছেন। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের অলিগলি, হাটবাজার, পথসভা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে প্রচার। উপজেলা জামায়াতে ইসলামী সাতটি ইউনিয়নেই একক প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। বিএনপি কোনো ইউনিয়নে আগাম প্রার্থী ঘোষণা করেনি, প্রতিটিতে একাধিক নেতা মনোনয়ন চাইছেন। কয়েকটি ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও কয়েকজনের নাম আলোচনায় আছে।
সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৭ সালের প্রথম দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে পারে বলে আভাস মিলছে।
এলাকার প্রেক্ষাপট
সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত দুর্যোগপ্রবণ কয়রা খুলনা জেলার বৃহত্তম উপজেলা। জেলা সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। ১৯৮০ সালে এখানে থানা গঠিত হয়, ১৯৮৩ সালে তা উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। সাত ইউনিয়নে ভোটার ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ জন, ভোটকেন্দ্র ৬৭টি। ইউপি নির্বাচনে কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এলাকার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি, মৎস্যচাষ (বিশেষ করে লবণাক্ত পানির চিংড়ি ঘের) ও সুন্দরবনের বনজ সম্পদ। একই সঙ্গে তাঁদের মোকাবিলা করতে হয় জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ, নদীভাঙন, সুপেয় পানির সংকট, লবণাক্ততা, বারবার দুর্যোগ, আবাসন সমস্যা ও অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। নদীবেষ্টিত ৭ নম্বর দক্ষিণ বেদকাশীসহ দুর্গম এলাকায় যাতায়াতের দুর্ভোগ নির্বাচন পরিচালনা ও প্রচার—দুই ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়ী হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফলের প্রভাব স্থানীয় নির্বাচনেও পড়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। জামায়াত আগাম প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে সক্রিয়, বিএনপিও স্থানীয় নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে তৎপর। আওয়ামী লীগ কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকায় দলটির সমর্থক ও সংখ্যালঘু হিন্দু ভোটারদের অবস্থান নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই ভোটারদের সমর্থন পেতে প্রার্থীরা সামাজিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ঘরে ঘরে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
কয়রা প্রেস ক্লাবের সভাপতি শেখ হারুন অর রশিদ বলেন, “কয়রা উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় এখানকার মূল সমস্যাগুলো জাতীয় রাজনীতির চেয়েও বেশি স্থানীয় জীবনসংগ্রামের সঙ্গে জড়িত। জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট মানুষকে প্রতিদিন তাড়া করে। প্রার্থীরা আগাম মাঠে নেমেছেন ঠিকই, তবে রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সুশীল সমাজ থেকে আমরা এমন প্রতিনিধি চাই, যারা জয়ী হয়ে উপকূল রক্ষা ও দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।”
ইউনিয়নভিত্তিক সম্ভাব্য প্রার্থী
১ নম্বর আমাদী: জামায়াতের একক প্রার্থী মাওলানা সাজ্জাদুল ইসলাম। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী আবুল কালাম আজাদ, ইঞ্জিনিয়ার জাহিদুর রহমান শোভন, জোবায়ের আহমেদ ও আ. হামিদ। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন শাহ মো. রওশন হাবিব সুমন ও আহাদ খোকন।
২ নম্বর বাগালী: জামায়াতের একক প্রার্থী মাওলানা সালাহ উদ্দিন। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে আছেন এস এম এ রহিম, আশরাফুল ইসলাম পল্টু ও সাইফুজ্জামান। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওলিউল্যাহ ও সোহরাব হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
৩ নম্বর মহেশ্বরীপুর: জামায়াতের একক প্রার্থী সাংবাদিক এম আইয়ুব আলী। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী জি এম রফিকুল ইসলাম, নাজমুল হুদা, হাবিবুন্নবী পীর আলী ও মেহেদী হাসান।
৪ নম্বর মহারাজপুর: জামায়াতের একক প্রার্থী মাস্টার মো. সাইফুল্লাহ হায়দার। বিএনপির পক্ষে রয়েছেন মনিরুজ্জামান বেল্টু, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক শরিফুল আলম ও নুরুল ইসলাম খোকা। স্বতন্ত্র তালিকায় আছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এম আনোয়ার হোসেন, সাবেক চেয়ারম্যান মাস্টার সদর উদ্দিন আহমেদ ও বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ।
৫ নম্বর কয়রা সদর: উপজেলার প্রাণকেন্দ্র এই ইউনিয়নে প্রার্থী নিয়ে নতুন হিসাব-নিকাশ দেখা দিয়েছে। আগে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাওলানা মিজানুর রহমানের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য তাঁকে ভাইস চেয়ারম্যান পদে মনোনীত করায় প্রার্থী নির্বাচন নতুন করে মূল্যায়ন করা হয়। ২ অক্টোবর, শুক্রবার জামায়াতে ইসলামী কয়রা বাজার কমিটির বারবার নির্বাচিত সভাপতি ও সাবেক ছাত্রনেতা সরদার জুলফিকার আলমকে চূড়ান্তভাবে মনোনীত করেছে।
বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে আছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব নুরুল আমীন বাবুল ও জেলা বিএনপির সদস্য এম এ হাসান। স্বতন্ত্র তালিকায় আছেন সাবেক চেয়ারম্যান এইচ এম হুমায়ুন কবির, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এস এম লুৎফর রহমান, হাফেজ আসাদুল ইসলাম (হিরক রাজা) ও মোহাম্মদ আলী রেজা।
জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী সরদার জুলফিকার আলম বলেন, “আমি দলের একজন সাধারণ কর্মী। আমার ওপর অর্পিত এই দায়িত্বকে আমি কোনো অর্জন কিংবা পদ হিসেবে দেখি না; বরং এটি আমার জন্য একটি আমানত, একটি দায়িত্ব এবং মানুষের সেবা করার সুযোগ।” তিনি আরও বলেন, “আমার কাছে চেয়ারম্যান হওয়া বড় কথা নয়; মানুষের আস্থা অর্জন করাই সবচেয়ে বড় বিষয়।” সময় ও বাস্তবতার সীমাবদ্ধতায় এখন সবার বাড়িতে গিয়ে দেখা করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী এম এ হাসান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক অনুষ্ঠানে গিয়ে ইতিমধ্যে প্রচার চালিয়েছেন, তা এখনো চলছে। তিনি বলেন, “বিএনপি একটি বৃহৎ জনপ্রিয় দল। কয়রার নদীভাঙন রক্ষা ও সুপেয় পানির সংকট নিরসনে আমাদের প্রার্থীরাই চিরকাল সোচ্চার ছিলেন। দলের সিদ্ধান্ত এলে সব নেতাকর্মী এক হয়ে মাঠে নামবেন।”
৬ নম্বর উত্তর বেদকাশী: জামায়াতের একক প্রার্থী জি এম মাস্টার নূর কামাল। তিনি ইউনিয়ন জামায়াতের আমীরের দায়িত্ব পালন করছেন। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী সরদার মতিয়ার রহমান, আবুল কালাম আজাদ কাজল ও সিরাজুল ইসলাম।
৭ নম্বর দক্ষিণ বেদকাশী: জামায়াতের একক প্রার্থী সাবেক মেম্বার মো. বেলাল হোসেন। বিএনপি থেকে মাঠে আছেন মঞ্জুর আলম নান্নু, গাজী সিরাজুল ইসলাম ও ওসমান গনি খোকন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মো. খলিলুর রহমান।
ভোটার ও অন্যদের বক্তব্য
সুন্দরবন-সংলগ্ন এই অঞ্চলের ভোটারদের মূল দাবি টেকসই বেড়িবাঁধ, নদীভাঙন রোধ ও সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধান। মদিনাবাদ গ্রামের ভোটার আসলাম হোসেন শাহিন জানান, তাঁরা এমন প্রতিনিধি চান, যিনি সব সময় দুঃসময়ে পাশে থাকবেন।
উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, “মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যোগ্য নেতৃত্বের অভাব অনুভব করছে। তৃণমূলের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা ইতিমধ্যে ৭টি ইউনিয়নেই প্রার্থী চূড়ান্ত করেছি। কয়রার মানুষ এবার পরিবর্তনের পক্ষে।”
কয়রা উপজেলা পানি কমিটির সভাপতি ও কয়রা সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এইচ এম শাহাবুদ্দীন মনে করেন, এলাকার ভাগ্যোন্নয়নে কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।




