লাশকাটা ঘরে একদিন
আলমগীর রিয়াদ

এক.
ভোর চারটের দিকে কয়েকজনের চিৎকারে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। কিছুক্ষণ পর চার তলা থেকেই বুঝতে পারলাম বাসার নিচে চোর পিটানো হচ্ছে। শার্টটা গলায় চাপিয়ে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম দ্রুত।
নিচে গিয়ে দেখি সাত আটজন মিলে সমান তালে পেটাচ্ছে বছর তেইশের এক যুবককে। যুবকটার মুখ থেকে একটু পর পর উচ্চারিত হচ্ছে, ও বাবা! ও মারে!
যেন জন্মের পর শুধু ওই দুটো শব্দই শেখানো হয়েছে তাকে, আর কোন শব্দ জানা নেই তার। আমি গিয়ে যুবকটার খুব কাছাকাছি দাঁড়ালাম। দেখলাম তার মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে চুইয়ে চুইয়ে। রক্ত দেখলে আমার উত্তেজনা হয় প্রচন্ড। উত্তেজনায় আমার হাত কাপা শুরু হয়। এগিয়ে গিয়ে যুবকটার কান বরাবর সমস্ত শক্তি দিয়ে একটা থাপ্পড় লাগাই। সে হুরমুড়িয়ে পড়ে গেলে কোমরে আরেকটা লাথি দিয়ে বলি,
-হতচ্ছাড়া থুতু ফেল। তারপর নিজেই তুলে নে। দেখিস একফোটা থুতুও যেন মাটিতে না পড়ে থাকে।
আমি খেয়াল করলাম সবাই মোটামুটি সরে দাঁড়িয়ে নতুন নাটকটা উপভোগ করতে শুরু করেছে।
থুতু তোলার পর্ব শেষ হলে আমি নতুন উদ্যোমে শুরু করি দ্বিতীয় পর্ব।
-ওই বদমাশের বাচ্চা জামা খোল, প্যান্টও খুলবি।
যুবকটা হঠাৎ আমার পা জড়িয়ে ধরলো। বললো,
-স্যার আমারে ছাইড়া দেন। আমি আর চুরি করুম না।
আমি মধ্য বয়স্ক একজনকে ইশারা করতেই সে জোর করে যুবকটাকে বিবস্ত্র করে দিলো।
যুবকের অসহায় অবস্থা দেখে উপস্থিত সবাই একচোট হেসে নিল। আমিও হাসলাম, হা হা শব্দে। তারপর আরেকজনকে বললাম,
-ভাই একটা ইট নিয়ে আসেন। তারপর ওর গোপনাঙ্গে বাইন্ধ্যা দেন। এই হতভাগার শক্তি কতটুকু। কি ভাই আপনারা দেখতে চাননা?
সবাই চিৎকার করে আমাকে সমর্থন জানালো। ইট বাঁধা সম্পন্ন হওয়ার পর যুবকটারে জিজ্ঞেস করলাম,
-কিরে হতচ্ছাড়া আর করবি চুরি?
যুবকটা কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলো ততক্ষণে। সে ধপাস করে উপুড় হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। আর উঠলো না। নাড়ি টিপে দেখলাম বেঁচে নাই।
-এই ব্যাটা তো মইরা গ্যাছে।
জানাতেই লোকজনের মাঝে কিছুটা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল বুঝতে পারলাম। তাদের জানালাম,
-ভয়ের কিছু নাই। চোর মাইরা কেউ জেলে গেছে এমন রেকর্ড আমাদের দেশে নাই। লাশটা এখানেই থাকুক। ওসি আমার বন্ধু মানুষ। কাল সকালে আইসা দুটো বেনসন পকেটে দিলেই সুরসুর করে লাশ নিয়া যাইবো৷
লাশটা ওখানে রেখে আমি বাসায় চলে এলাম। অনেক ধকল গেছে। এবার একটু ঘুমানো যাক।
দুই.
-স্যার এখানে দশ আছে। বাকি পাঁচ লাখ ফাইল হাতে পাওয়ার পর।
-ধরে নিন আপনার ফাইল রেডি। এবার বাসায় গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমান।
রফিক সাহেবকে বিদায় করে পিয়নকে চা দিতে বলি। চায়ে চুমুক দিতেই গতকাল রাতের হতভাগা যুবকটার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে ওর রক্তমাখা মুখটা। হঠাৎ আমার মনে হয় আমি চা খাচ্ছি না, কাপ ভর্তি যেন ওই যুবকটার রক্ত।
-ওয়াক!
আমাকে উপেক্ষা করে আমার ভেতর থেকে সমস্ত কিছু বেরিয়ে আসতে থাকে একে একে। বেরিয়ে আসে নাড়িভুড়ি, ফুসফুস। রক্তে ভেসে যেতে থাকে আমার ডেস্ক, চেয়ার, টেবিল ও মেঝে।
তিন.
যুবকটার সাথে আমার দ্বিতীয়বার এবং শেষবার দেখা হলো লাশকাটা ঘরে। পাশাপাশি শুয়ে ছিলাম দুইজন। যুবকটাকে বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল কেন জানি। ভাবলাম,
-শালায় কি জাইনা গেল, আমিও ওর মত নিছক একটা চোর। পার্থক্য শুধু টাকার অঙ্কে। ও হাজার টাকা চুরি করে আর আমি লাখ!
একজন ডাক্তার এসে যখন ওর বুকটা চিরে দিলো তখনো সে হাসছিলো আর আমি ভয়ে চোখ নামিয়ে নিয়েছিলাম। ছুরি এতো ধারালো হতে পারে আমার ধারণারও অতীত ছিলো।
যখন আমার পালা এলো আমি ডাক্তারকে জানালাম,
-যদি সে ছুরিটা না ব্যবহার করে তবে আমি তাকে দশ লক্ষ টাকা দেব।
ডাক্তার বোধকরি কানে কম শোনেন। তিনি ছুরি হাতে ধীরপায়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকলেন।
আমি চিৎকার করে বললাম,
-আচ্ছা পনের লাখ, নগদ!

