স্টাফ রিপোর্টার ঢাকা, ৩০ আগস্ট ২০২৬
আসন্ন মৌসুমে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) আয়োজন করছে না বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। গত ২০ আগস্ট মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল। তবে সিদ্ধান্তটির পেছনের মূল কারণ হিসেবে তিনি যে ৪০ কোটি টাকা লোকসানের হিসাব তুলে ধরেছেন, তা নিয়েই এখন বিসিবির ভেতরে-বাইরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
কেন স্থগিত হলো টুর্নামেন্ট
তামিম ইকবাল সংবাদ সম্মেলনে জানান, টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য বোর্ডের হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই, পাশাপাশি বিপিএল ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর চুক্তি লঙ্ঘন এবং বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসান—এসবই বিবেচনায় নিয়ে টুর্নামেন্ট আপাতত স্থগিত রেখে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এসব সমস্যার সমাধান না করে লোকসান গুনে টুর্নামেন্ট চালিয়ে যাওয়াকে তিনি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন না।
বিসিবি সভাপতির দাবি, শেষ দুই আসর আয়োজন করতে গিয়ে বোর্ডের প্রায় ৪০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে—যেখানে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্ট থেকে বোর্ডের লাভবান হওয়ারই কথা।
লোকসানের হিসাব নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধ
তামিমের এই ৪০ কোটি টাকা লোকসানের দাবিকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। বিসিবির সাবেক পরিচালক আসিফ আকবর এই হিসাবকে সরাসরি “সর্বৈব মিথ্যা” আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছেন। বোর্ডের ভেতরে এই প্রকাশ্য মতবিরোধ ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিপিএলের আর্থিক হিসাব এখনো পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়—আর সে কারণেই ক্রিকেটমহলে একটি নিরপেক্ষ অডিটের দাবিও জোরালো হচ্ছে।
দুর্নীতির প্রেক্ষাপট নতুন নয়
বিপিএল স্থগিতের এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ আসেনি। গত বছরের আগস্টে বিসিবি নিজেই আইসিসির ইন্টেগ্রিটি ইউনিটকে বিপিএলের দুর্নীতি দমনে সরাসরি যুক্ত করেছিল, আর সংস্থাটির সাবেক প্রধান অ্যালেক্স মার্শালকে নিয়োগ দিয়েছিল পরামর্শক হিসেবে। এর ফল হিসেবে চলতি বছরের মে মাসে বিসিবির ইন্টেগ্রিটি ইউনিটের তদন্তের ভিত্তিতে ১২তম বিপিএল ঘিরে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির টিম ম্যানেজার ও সহ-মালিক, একজন ঘরোয়া ক্রিকেটার এবং আরেকটি দলের টিম ম্যানেজার—অভিযোগের মধ্যে ছিল ম্যাচের ফলাফল নিয়ে বাজি ধরা এবং তদন্তে অসহযোগিতা।
এর প্রভাব পড়েছে খেলোয়াড় নির্বাচনেও। সন্দেহভাজন ফিক্সিংয়ের কারণে সাম্প্রতিক বিপিএল নিলামে দেখা যায়নি এনামুল হক বিজয়, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের মতো অভিজ্ঞ কয়েকজন ক্রিকেটারকে।
সামনে কী
তামিম ইকবাল অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, বিপিএল চিরতরে বন্ধ হচ্ছে না। তাঁর ভাষ্য, এটি একটি বড় বাণিজ্যিক পণ্য এবং এতে মানুষের আগ্রহ আছে বলেই বিসিবির মর্যাদা ও স্বচ্ছতা বজায় রেখে সামনে এগোতে চান তিনি। দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট ক্যালেন্ডার নিয়ে ইতিমধ্যে ৬০-৭০ শতাংশ কাজ গুছিয়ে আনা হয়েছে বলে জানান তিনি, এবং চূড়ান্ত ঘোষণায় “নতুনত্ব” দেখা যাবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর প্রত্যাশা, আগামী বছরের এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে নতুন কাঠামোর জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে।
বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে তামিম বলেন, দেশের নিয়মকানুন ও নীতি এক্ষেত্রে অনুকূল কিনা তা খতিয়ে দেখেই এগোতে হবে—কোনো নীতিগত বাধা থাকলে তা সম্ভব হবে না।
ক্রিকেটারদের জন্য কী অর্থ বহন করছে এই সিদ্ধান্ত
দেশের একমাত্র ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট এক মৌসুম না হলে সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন ক্রিকেটাররা—বিষয়টি বিসিবি সভাপতি নিজেও স্বীকার করেছেন। তবে বোর্ডের অগ্রাধিকার এখন স্পষ্ট: আর্থিক স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত না করে টুর্নামেন্ট চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে সাময়িক বিরতি নিয়ে কাঠামোগত সংস্কারকেই বেছে নিয়েছে বিসিবি।
চূড়ান্তভাবে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই, লোকসানের স্বচ্ছ অডিট এবং দুর্নীতিবিরোধী নজরদারি—এই তিনটি বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া বিপিএল মাঠে ফেরার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন ক্রিকেট-সংশ্লিষ্টরা।











মন্তব্য করুন