মূল কনটেন্টে যান
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬১৩ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
অনুসন্ধানী ও সর্বশেষ বাংলা সংবাদ
সর্বশেষ

ঠাকুরগাঁওয়ে ব্যালটের চেয়েও বড় পরীক্ষা আস্থার

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে যাওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ১৮৫টির মধ্যে ১৮৩টি কেন্দ্রের বেসরকারি ফলে বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন পেয়েছেন ২ লাখ ২৪ হাজার ১৬৫ ভোট। জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৫০ ভোট। জামায়াতের অভিযোগ, কয়েকটি কেন্দ্রে ব্যালট বইয়ের মুড়িতে আগাম সিল দেওয়া হয়েছিল, এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে, ভোটারদের ভয় দেখানো হয়েছে। দলটি অভিযোগের পক্ষে কেন্দ্রভিত্তিক সংখ্যা বা তালিকা দেয়নি। নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব ভোটকে শান্তিপূর্ণ বলেছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সকালে কোনো কেন্দ্র থেকে অভিযোগ আসেনি। প্রথম আলোর মাঠ প্রতিবেদন বলছে, ডাব প্রতীকের যে ১৮ জন পোলিং এজেন্টের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁদের ৮ জন প্রার্থীর নামই বলতে পারেননি। বিএনপির অভিযোগ, এই এজেন্টরা জামায়াতের লোক।#Thakurgaon #ByElection #ElectionCommission #Bangladesh #MeehaNews

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে একটি ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের সারি
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোট দিতে কেন্দ্রে নারী ভোটারদের সারি। বৃহস্পতিবার, ঠাকুরগাঁও। ফাইল ছবি

বিকেল চারটায় ব্যালট বাক্সের মুখ বন্ধ হলো। ঠাকুরগাঁও জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে তখন ফলাফলের কাগজ জমতে শুরু করেছে। ঠিক তখন ঢাকার মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। রাত নয়টায় রিটার্নিং কর্মকর্তা ১৮৫টির মধ্যে ১৮৩টি কেন্দ্রের বেসরকারি ফল ঘোষণা করলেন। ধানের শীষের মির্জা ফয়সল আমীন পেয়েছেন ২ লাখ ২৪ হাজার ১৬৫ ভোট, দাঁড়িপাল্লার দেলাওয়ার হোসেন ৯৫ হাজার ৪৫০। ব্যবধান ১ লাখ ২৮ হাজারের বেশি। একটি আসনের হিসাব এখানেই মিটে যায়। কিন্তু এই উপনির্বাচনের ওপরে আরেকটি নির্বাচন চলছিল, ভোটব্যবস্থার ওপর আস্থার। সেই হিসাব অত সহজে মেলে না।

আসনটি শূন্য হয়েছিল একটি অস্বাভাবিক কারণে। এখানকার সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ২১ আগস্ট দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। সংবিধানের ৫০(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আসন শূন্য হয়। বিএনপি সেখানে প্রার্থী করে রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমীনকে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। লড়াইয়ে ছিলেন আরও তিনজন: খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলন আর বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী। সদর, রুহিয়া ও ভুল্লি নিয়ে গঠিত এ আসনে ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৪০ জন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের হিসাবে এখানে সংখ্যালঘু ভোটার ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি, জামায়াতের হিসাবে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই ভোটই দুই প্রধান দলের নজরে ছিল।

অভিযোগের সূচনা ভোটের অনেক আগে। ২৫ অক্টোবর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে জামায়াত নয় দফা লিখিত অভিযোগ দেয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল:

  • সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিএনপি প্রার্থীর বাসায় রাতের বৈঠকে গেছেন, তাঁর পক্ষে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার শেয়ার করেছেন।

  • মসজিদে প্রচারসভা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের আগে মাইক বাজানো হয়েছে, রঙিন প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে, সরকারি চিকিৎসক দিয়ে বিনা মূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প চলেছে।

  • চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে হিন্দু ভোটার, শিক্ষক আর সরকারি কর্মচারীদের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছে।

দলটি সেনা মোতায়েনের দাবিও জানায়।

দুই দিন আগে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। তাঁর দাবি, সরকার “১২ ফেব্রুয়ারির মতো ইঞ্জিনিয়ারিং” করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে নিজেই বলেছেন, এটা তাঁর পাওয়া “খবর”। প্রমাণ দেননি। সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার টানেন ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনের উদাহরণ। সেই উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন জোরদার হয়েছিল। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনটাকে মাগুরার নির্বাচনে রূপান্তরিত করবেন না।’

ভোটের আগের রাতে অভিযোগ এসেছে দুই দিক থেকেই। দেলাওয়ার হোসেন সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, ভোটার স্লিপের সঙ্গে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে, এমন তথ্য তাঁর কাছে আছে। কয়েক ঘণ্টা পর পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে ফয়সল আমীন অভিযোগ করেন, জামায়াতের লোকজন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও আদিবাসী ভোটারদের কেন্দ্রে না যেতে ভয় দেখাচ্ছেন। তাঁর দাবি, বিরিয়ানির প্যাকেটের সঙ্গে ভোটার স্লিপ বিলির সময় জামায়াতের এক কর্মী আটকও হয়েছেন। আজকের পত্রিকা স্পষ্ট লিখেছে, দুই পক্ষের কোনো অভিযোগই স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

ভোটের দিনের অভিযোগ সবচেয়ে গুরুতর। গোলাম পরওয়ার সন্ধ্যার সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন:

  • কয়েকটি কেন্দ্রে ব্যালট বইয়ের মুড়িতে আগাম সিল ও সই দেওয়া ছিল।

  • এক নারী কেন্দ্রে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে।

  • কয়েকটি কেন্দ্র থেকে পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে।

  • কর্মীদের মারধর করা হয়েছে।

  • কয়েকজন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা পরিচয়পত্র পরেননি।

সকালে ভোট দিয়েই দেলাওয়ার হোসেন অভিযোগ করেছিলেন, প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কার্ডে ছবি নেই, ফলে অন্য কেউ তাঁর জায়গায় বসতে পারে।

অভিযোগগুলো গুরুতর, কিন্তু উপস্থাপন দুর্বল। টিবিএসের প্রতিবেদন বলছে, জামায়াত কোনো কেন্দ্রের নাম, সংখ্যা বা আগাম সিল দেওয়া মুড়ির ছবি প্রকাশ করেনি। একমাত্র নির্দিষ্ট উদাহরণ সেই নারী ভোটার, তাঁর নামও জানানো হয়নি। আগাম সিল দেওয়া মুড়ি যদি সত্যিই থেকে থাকে, তবে তা ভোটের দিনের সবচেয়ে সহজে প্রমাণযোগ্য অনিয়ম। কাগজ থাকে, কেন্দ্রের নম্বর থাকে, প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সই থাকে। সেই কাগজ সামনে না আসায় অভিযোগটি এখনো অভিযোগই থেকে গেছে।

সরকারি পক্ষের বক্তব্যও একই রকম সাধারণ। রিটার্নিং কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম সকালেই জানান, ১৮৫টি কেন্দ্রে ভোট শান্তিপূর্ণ, কোনো অভিযোগ আসেনি। অথচ জামায়াত বলছে, তাদের অভিযোগ আগেই কমিশনে জমা আছে। ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ ভোট শেষে বলেন, ‘অবশ্যই সন্তুষ্ট, অবশ্যই সন্তুষ্ট।’ দুপুর দুইটা পর্যন্ত ভোট পড়েছিল ৪৮ শতাংশ, জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের হিসাবে বেলা তিনটায় ৫২ শতাংশ। আগাম সিল, ইউএনওর নিরপেক্ষতা বা এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে কমিশন তদন্ত করছে কি না, কোনো সংবাদমাধ্যমে সে তথ্য পাওয়া যায়নি। শান্তিপূর্ণ ভোট আর সুষ্ঠু ভোট এক জিনিস নয়। প্রথমটি সংঘাতের অনুপস্থিতি, দ্বিতীয়টি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা। কমিশন প্রথমটির সনদ দিয়েছে, দ্বিতীয়টির প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।

মাঠের চিত্র একপেশে ছিল না। প্রথম আলোর প্রতিবেদক দুপুর পর্যন্ত ১০টি কেন্দ্র ঘুরে বাংলাদেশ কংগ্রেসের ডাব প্রতীকের এজেন্ট পেয়েছেন প্রতিটি কেন্দ্রের প্রতিটি বুথে। অথচ এলাকায় ডাব প্রতীকের কোনো পোস্টার, ব্যানার বা মাইকিং চোখে পড়েনি। ১৮ জন এজেন্টের ৮ জন প্রার্থীর নামই বলতে পারেননি, ৬ জন ভুল নাম বলেছেন। বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগ, জামায়াত ডাব প্রতীকের প্রার্থীর সঙ্গে সমঝোতা করে এই এজেন্ট বসিয়েছে। এ অভিযোগও প্রমাণিত নয়। ডাব প্রতীকের প্রার্থী প্রশ্নের জবাব না দিয়েই ফোন কেটে দেন। ঢাকা ট্রিবিউনের খবর, ভোটের দিন লিফলেট বিলির দায়ে জামায়াতের এক ওয়ার্ড নেতাকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অর্থাৎ বিধি ভাঙার অভিযোগ শুধু এক পক্ষের দিকে নয়।

এই নির্বাচনী পর্ব জামায়াতের জন্য একটি কঠিন শিক্ষাও রেখে গেল। ভোটের আগে ১১ দল হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, ইঞ্জিনিয়ারিং হলে সরকারকে “মাগুরার পরিণতি” ভোগ করতে হবে। ভোটের রাতে সেই হুঁশিয়ারির জায়গায় এসেছে সংবাদ সম্মেলন আর তদন্তের দাবি। বিদ্রূপটা সবচেয়ে তীক্ষ্ণভাবে এসেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাবেক জিএস সালাউদ্দীন আম্মারের ফেসবুক পোস্টে। তিনি লিখেছেন, ‘ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচন সুষ্ঠু হবে মনে করা বিরোধী দলকে অভিনন্দন।’ পরের লাইনে খোঁচা: ‘নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে দেশ উল্টাইয়া ফালাইতে চাওয়া জামায়াত নেতাদের গুগলে সার্চ করেও পাইতেছিনা।’ বড় ব্যবধান কারচুপির প্রমাণ নয়, আবার সুষ্ঠুতার সনদও নয়। কিন্তু যে দল ভোটের আগে নিজের পর্যবেক্ষণ দল মাঠে নামিয়ে নয় দফা অভিযোগ গুছিয়েছিল, ভোটের দিন তারা কেন্দ্রভিত্তিক প্রমাণ সামনে আনতে পারেনি। এটা তাদের নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রশ্ন।

বিএনপির জন্যও এ জয় নিঃশর্ত নয়। ক্ষমতায় আসার পর এটি দলটির প্রথম বড় উপনির্বাচন, আর আসনটি গেল রাষ্ট্রপতির পরিবারের হাতেই। একই দলের প্রশাসন, একই পরিবারের প্রার্থী আর নির্বাচন কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে আগাম অভিযোগ। এমন পরিস্থিতিতে প্রমাণের দায় বিজয়ীর ঘাড়েও পড়ে। ১৯৯৪ সালের মাগুরা মনে করিয়ে দেয়, একটি উপনির্বাচন একটি আসনের চেয়ে বেশি কিছু বদলে দিতে পারে।

তাই ঠাকুরগাঁওয়ের রায় ব্যালট বাক্সে লেখা হয়ে গেলেও আস্থার রায় এখনো ঝুলে আছে। সেটি মেলাতে নাটকীয় কিছুর দরকার নেই। দরকার কয়েকটি স্পষ্ট পদক্ষেপ:

  • নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রকাশ করবে।

  • যেসব কেন্দ্রে আগাম সিলের অভিযোগ, সেখানকার ব্যালট বইয়ের মুড়ি পরীক্ষা করবে।

  • ইউএনওর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তের ফল জানাবে।

  • অভিযোগকারী জামায়াত কেন্দ্রের নাম, সময় আর কাগজসহ অভিযোগ লিখিত আকারে জমা দেবে।

দুই পক্ষ প্রমাণের মাঠে নামলেই বোঝা যাবে, ঠাকুরগাঁওয়ে আসলে কী হয়েছিল।

প্রতিবেদনটি আপনার কাছে কেমন লাগল?

আবু আনান

বিশেষ প্রতিবেদক

বিশেষ প্রতিবেদক

এই প্রতিবেদনে কোনো তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে সংশোধনী নীতি অনুযায়ী আমাদের জানান।

মন্তব্য

মন্তব্য দেখতে বা লিখতে চাপ দিন। মন্তব্য সম্পাদকীয় নীতিমালা মেনে প্রকাশ হয়।

মিহা স্পেশাল

আজ

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

পাঠের রং

এখন যা বেশি খোঁজা হচ্ছে

যেকোনো পাতায় / চাপলেই খোঁজ খুলবে। ফলাফলে বিভাগ, তারিখ ও ধরন দিয়ে ছাঁকতে পারবেন।