সিসাদূষণ রোধে খুলনায় মানববন্ধন, ১০ শিশুর ৪ জনের রক্তেই সিসা
আন্তর্জাতিক সিসাদূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার খুলনার শিববাড়ি মোড়ে মানববন্ধন ও র্যালি হয়েছে; দেশের আট বিভাগে চলছে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি। বিবিএসের এমআইসিএস ২০২৫ জরিপে ১২–৫৯ মাস বয়সী ৩৮.৩৪ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা নির্ধারিত সীমার বেশি। সরকারের ২০২৬–২০৩৫ জাতীয় কৌশলে শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ ও ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। বক্তারা ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ পরিবেশসম্মত করা ও আইনের কার্যকর প্রয়োগের দাবি জানান। #MeehaNews #LeadPollution #Khulna #ChildHealth #LeadFreeBangladesh

সিসাদূষণের উৎস, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রতিরোধের উপায় নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে খুলনার শিববাড়ি মোড়ে মানববন্ধন ও র্যালি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সিসাদূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় ইয়ুথনেট গ্লোবাল (YouthNet Global) ও পিওর আর্থ বাংলাদেশ (Pure Earth Bangladesh) এ কর্মসূচির আয়োজন করে। এতে খুলনার স্থানীয় প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ ও যুব সংগঠনের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও স্বেচ্ছাসেবীরা অংশ নেন।
সপ্তাহটি উপলক্ষে দেশের আট বিভাগে সপ্তাহব্যাপী জনসচেতনতা কর্মসূচি চলছে। পিওর আর্থ বাংলাদেশের সহযোগিতায় কর্মসূচি পরিচালনা করছে যুব সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবাল। সহ-আয়োজক হিসেবে আছে ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ, ইউক্যান ও আর্থ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন। ‘সিসাদূষণ প্রতিরোধে, আমরা আছি একসাথে’ প্রতিপাদ্যে র্যালি, মানববন্ধন ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। আয়োজকেরা জানান, শিক্ষার্থী, তরুণ, শিক্ষক, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সিসার স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দূষণ রোধে তরুণদের যুক্ত করাই এ আয়োজনের লক্ষ্য।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ অনুযায়ী, দেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৩৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার পরিমাণ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি। অর্থাৎ প্রতি ১০ শিশুর প্রায় ৪ জনের রক্তে অনিরাপদ মাত্রায় সিসা আছে। প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারীর রক্তেও সিসার মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে।
সিসার সংস্পর্শে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা, স্মরণশক্তি ও মনোযোগের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের হৃদ্রোগ ও কিডনির জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ সিসাদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। অনিরাপদ মাত্রায় সিসাযুক্ত রং, খেলনা, রান্নার বাসনপত্র ও প্রসাধনসামগ্রী থেকেও মানুষ এই বিষাক্ত ধাতুর সংস্পর্শে আসে।
সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকার ২০২৬–২০৩৫ মেয়াদের জাতীয় কৌশল ও বহুবর্ষমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এতে শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা ভিত্তি বছরের তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯৫ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
বক্তারা যা বললেন
আয়োজকদের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে পিওর আর্থ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাশ বলেন, “শিশুদের সিসার বিষক্রিয়া থেকে সুরক্ষিত রাখতে সিসার উৎস শনাক্ত ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিরাপদ ভোগ্যপণ্য নিশ্চিত করা, পরিবেশসম্মত ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে পিওর আর্থ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে যৌথভাবে সম্প্রসারিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা (ইপিআর) নির্দেশিকা প্রণয়নে কাজ করছে, যা লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির কার্যকর সংগ্রহ, ট্র্যাকিং ও পরিবেশসম্মত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়তা করবে।”
ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, “অপরিকল্পিত ও অনিরাপদ সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শুধু শ্রমিকদের নয়, আশপাশের পুরো জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও পরিবেশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।” ক্ষতিকর শিল্পপ্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা এবং নীতিগত পরিবর্তনের দাবি জোরদার করার ওপর জোর দেন তিনি।
খুলনার মানববন্ধনে সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক রমা রহমান খুলনায় সিসাদূষণের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন এবং দ্রুত সরকারি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। আরও বক্তব্য দেন বেসরকারি সংস্থা আইসিডির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আশিকুজ্জামান এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য আসাফুর রহমান কাজল।
আয়োজক সংগঠনের বিভাগীয় সহ-সমন্বয়কারী ফারহানা ইয়াসমিন আয়েশা মা ও শিশুদের সুরক্ষায় সিসার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও তরুণদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রতিরোধের কাজকে এগিয়ে নিতে পারে।” ইয়ুথনেট গ্লোবালের বিভাগীয় সমন্বয়কারী এস এম শাহিন সিরাজ বলেন, সিসাদূষণ প্রতিরোধে সচেতনতার পাশাপাশি নিরাপদ ভোগ্যপণ্য, পরিবেশসম্মত উপায়ে ব্যাটারি কারখানা পরিচালনা এবং আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন দরকার।
পুরোনো ও ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবেশসম্মত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, দূষিত স্থান শনাক্ত করে মাটি দূষণমুক্ত করা এবং ভোগ্যপণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বক্তারা সরকার, শিল্প খাত ও সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানান। ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইভানা হক ও আর্থ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের খুলনা জেলা সমন্বয়কারী মাহজাবিন খানসহ কয়েকজন তরুণ সংগঠকও বক্তব্য দেন। মানববন্ধন শেষে র্যালি ও লিফলেট বিতরণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়।





