প্রেম গহীন বন

যে-নদী ঘর কেড়ে নেয়, মানুষ তারই কিনারে আবার ঘর বাঁধে কেন?
প্রশ্নটা কয়রার গোবরা গ্রামে কেউ কাউকে করে না। উত্তর সবার জানা, আর জানা কথা মুখে আনে না কেউ। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডর এসে কলিম সরদারের ঘরের অর্ধেকটা নিয়ে গেল। মেরামত করতে না করতেই ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলা এসে ভাসিয়ে দিল সবটাই, আর বাঁধ ভেঙে ঢুকিয়ে দিল লোনা জল। সেই জল মাসের পর মাস উঠানে দাঁড়িয়ে রইল, ধানের কথা ভুলিয়ে দিল, শুধু চোখ জ্বালা করল। জ্বালা-ধরা সেই চোখ নিয়েই কলিম আবার খুঁটি পুঁতলেন, সেই বাঁধেরই গায়ে। বাঁধের গায়ে ঘর তুললে জোয়ারের রাতে বিছানায় শুয়ে নদীর নিশ্বাস গোনা যায়। সাত পুরুষ ধরে সরদার-বংশের কান ওই নিশ্বাসেই অভ্যস্ত। নদী নালিশ করে না, শুধু ভাঙে; ঘরও নালিশ করে না, শুধু ফেরে। ফেরার সেই জেদ ছেলের রক্তেও ছিল, কলিম শুধু সেটা দেখতে চাননি। তিনি দেখতে চাইতেন অন্য এক ছবি: গাঁয়ের কাঠমিস্ত্রির ছেলে সাদা শার্ট গায়ে অফিসের চেয়ারে বসে আছে, জামায় কাঠের গুঁড়ো নেই। সেই ছবির জন্য তিনি বছরের পর বছর কাঠ চিরেছেন, টাকা জমিয়েছেন, ছেলেকে এইচএসসি পাস করিয়েছেন। আর ছেলে পাস করেই গিয়ে বসল জেলেদের নৌকায়, যে-নৌকা যায় বাদায়। সুন্দরবনকে এ-অঞ্চলের মানুষ ওই নামেই ডাকে।
‘বাদায় যাবি তুই?’
‘মাছ ধরতি যাব, আব্বা।’
‘আমার ছেলে যাবে বাঘের পেটে, আর আমি বসে বসে কাঠ চিরব?’
বশির জবাব দেয় না। জবাবটা তখন নদী বেয়ে চলে যাওয়া বনে, বনের কালো রেখাটার ভেতরে। বাদার মানুষ বাঘের নাম মুখে আনে না, বলে ‘বড় মিয়া’—ভয়ও তো এক রকম আদব।
ওই নদীর ঢেউয়ের রেখার দিকেই রোজ তাকিয়ে থাকত ঘাটের এক মেয়ে। নাম রহিমা, সবাই ডাকে রুহি জেলে। তার বাবা মঈনুল ঢালী বাদায় গিয়ে আর ফেরেননি। লোকে বলে, বাঘে নিয়েছে—এমনভাবে নিয়েছে যে ফেরার একটা চিহ্নও রাখেনি। চিহ্ন না থাকলে বাকি থাকে গল্প, আর মঈনুলের গল্পগুলো ছিল হরিণের। বাদা থেকে ফিরে উঠানে বসে তিনি শোনাতেন, ভাটার কাদায় কেমন করে চিতল হরিণের দল নেমে আসে, কেমন করে তাদের চোখে জোছনা জমে।
‘আমার রাজকন্যার চোখও হরিণীর মতো,’ বলে তিনি মেয়ের চুলে হাত বোলাতেন।
‘আমারে বনে নে যাবা না, বাবা?’
‘বড় হও আগে। বাঘ বড় মানুষকে ভয় পায়, দেখলেই দৌড়ায়।’
‘তোমারে ধরে না বাঘে?’
মঈনুল একগাল হেসেছিলেন। হাসিটাই শেষ জবাব হয়ে রইল।
মা শাহনাজ বেগম স্বামীর শোকে এক বছর কারও সঙ্গে একটা কথা বলেননি; তারপর থেকে বিছানাই তাঁর সংসার। তখন রুহির বয়স নয় ছেড়ে দশে। সংসারের ঘানি এসে পড়ল সেই ছোট কাঁধে। বাবা ফিরে না আসার কিছুদিন পর সে স্কুলে গিয়েছিল, মাসখানেক। তারপর ব্যাগটা জায়গা ছেড়ে দিল জালকে। বাদার ভরসায় যেখানে পেট চালানোই দায়, সেখানে সঞ্চয়ের কথা তুললে লোকে হাসে। রুহিদের কোনো সঞ্চয় ছিল না।
জালটা ছিল মেয়েটার চেয়েও বড়। পাঁচ বছর আগে, তার বয়স যখন তেরো-চোদ্দো, বশির প্রথম দেখেছিল তাকে একা জাল টানতে। ঘাটের কাদায় আটকে যাওয়া জালের জট খুলে দিতে এগিয়েছিল সে।
‘বশির ভাই’—মেয়েটা বলেছিল, তার ডাকে ভাইয়ের সুর ছাড়া আর কিছু ছিল না। ও-ঘাটে ভাই ডাকার মতো আর কেউ ছিল না বলেই ডাকটা তার মনে রয়ে গেল।
ডাকটা আজও আসে। পাঁচ বর্ষা পেরিয়ে এসেছে সে ডাক। তার ডাক শুনলে বশিরের বুকের ভেতর এখন অন্য সুর বাজে। সুরের নাম সে নিজেও ঠিক জানে না। শুধু দেখে, জাল-টানা সেই মেয়েটা আর ছোট নেই; আঠারো পেরিয়েছে, হাতে কড়া, চোখে স্থির আলো। বশিরের বয়স তখন পঁচিশ।
বশিরের মা একদিন প্রস্তাব নিয়ে গেলেন শাহনাজ বেগমের কাছে। ফিরে এলেন খালি হাতে, একেবারে হতাশ মুখে।
‘বনে যায় যে-ছেলে, তার হাতে মেয়ে দিমু না,’ বলেছেন শাহনাজ, বিছানা থেকেই। ‘মঈনুলরে ফেরত দিতি পারবা তোমরা?’
কেউ পারে না। প্রস্তাব তাই ফিরে এল। বশির ফিরে গেল নিজের কাজে।
এভাবে কয়েক মাস গেল। হঠাৎ বাদায় রওনা দেওয়ার আগের এক সন্ধ্যায় ঘাটে দাঁড়িয়ে বলল, ‘রুহি, তুই আমারে বিয়ে করবি?’
রুহি জবাব না দিয়ে ছুটে পালাল। ছুটতে ছুটতে মনে পড়ল নিজের মুখের কথা: লোনা জল আর রোদে তামাটে হয়ে যাওয়া মুখ, যে-মুখে রাজকন্যার কিছু আর বাকি নেই। এই মুখে কী দেখল বশির ভাই?
সে-রাতে বশিরের আর বাদায় যাওয়া হলো না। ভোর হতেই সে নদীর পাড়ে গিয়ে বসে রইল, আর জাল কাঁধে রুহি এলে অসহায় গলায় আবার বলল, ‘বিয়ে করবি, রুহি?’
রুহি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে, ‘আমারে নিয়ে যাবা?’
‘কোথায়?’
‘সুন্দরবনে।’
‘তুই পাগলি নাকি? বনে বাঘ থাকে।’
রুহি কিছু বলে না। না-বলা কথাটা তার বুকের ভেতর জমতে থাকে, ধান-গোলার মতো। বাবা বলেছিলেন বড় হলে নিয়ে যাবেন; বাবা না পারলে বশির ভাই নিক, নইলে বিয়ে নয়। আরও একটা কথা সে কাউকে বলেনি: লোকে বলে বাঘ তার বাবাকে খেয়েছে, কিন্তু লাশ না পেলে মানুষ কি সত্যিই মারা যায়। সে দেখতে চায়, বনের ভেতরে কী আছে।
মরমী কবি রুমি লিখেছিলেন, নলখাগড়ার বন থেকে কেটে আনা বাঁশি আজীবন সেই বনের জন্য কাঁদে। রুহি রুমির নাম শোনেনি; শুনলে হয়তো বলত, ও বাঁশি আমিই।
বশির কিন্তু ভালোবাসাকে বাঘের মুখের এত কাছে নিতে পারে না। পারে না বলেই উত্তর দেয় না, আর উত্তর না পেয়ে মাস গড়ায়। মাস গড়াতে গড়াতে একদিন সন্ধ্যায় রুহি ঠিক করল, সে নিজেই বনে যাবে। ওই সন্ধ্যাতেই বশিরের নৌকা বাদার পথে ছাড়বে। চার হাত লম্বা, ঢাকনা-আঁটা কাঠের মাছের বাক্সটা তখন ফাঁকা, ফেরার পথের মাছের জন্য অপেক্ষায়। রুহি ঢুকে বসে রইল তার ভেতরে। বাক্সে নোনা মাছের পুরোনো গন্ধ, ভেজা কাঠের ঠান্ডা, আর বাইরে দাঁড়ের ছপছপ। ছপছপ বাড়তে বাড়তে নৌকা যখন নদীর মাঝখান দিয়ে চলতে লাগল, একসময় থামল বরফ নেওয়ার জন্য।
নওশের জেলে ঢাকনা তুলল—আর ভেতর থেকে একজোড়া চোখ তাকাতেই ‘ভূত!’ বলে এমন চেঁচিয়ে উঠল যে দাঁড় থেমে গেল। নওশের বশিরের আপন চাচা। চল্লিশ বছর বাদার জল ঘেঁটেও অন্ধকার বাক্সে ভূত দেখেনি কখনো। কিছুক্ষণ ঘোর না কাটতেই রুহিকে আবিষ্কার করল। ততক্ষণে মেয়েটা বাক্সের ওপর উঠে বসেছে।
সবার চোখ গিয়ে পড়ল বশিরের ওপর।
‘বশির, তুই আনছিস?’
‘আমি কিছু জানি না, চাচা।’
‘উনি জানে না,’ বলল রুহি, বাক্সের কিনারা থেকে নৌকার গলুইতে নামতে নামতে। ‘আমি নিজে আসিছি। বলিছিলাম নিতি, নেয়নি।’
কয়েকজন মাথা নাড়ল।
‘ফিরতি হবে। বাদায় নিজের জানের দায় নিজের; তার ওপর আরেকজনের?’
কেউ কেউ হেসে ফেলল, মেয়েটার সাহস দেখে। নওশের দড়ি তুলে নিল, দুই হাত বেঁধে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য।
‘হাত বাঁধবা?’
রুহি সোজা হয়ে দাঁড়াল। গলা কাঁপল না।
‘আমি চোর না। জেলে মঈনুল ঢালীর মেয়ে। ফিরায়ে নিলি নেও, বাড়ি গিয়ে আমি বিষ খাব—বশির ভাইরে বিয়ে করব না। বনে না নে গিলি কাউরেই না।’
কেউ উত্তর দিল না। জলের ছলাৎ শোনা গেল শুধু। বশির এই মেয়ের চোখ চেনে। ও-চোখ ভয় দেখায় না, সত্য বলে। সে এও বোঝে, দড়ি দিয়ে ফেরানো যায় নৌকা, মানুষের পণ নয়। কিন্তু বোঝা আর বলার ভেতরে বাঘ দাঁড়িয়ে আছে, আর সে-বাঘের নাম মুখে আনা যায় না।
বহরের মুরুব্বি আফছার মাঝি এতক্ষণ কথা বলেননি। মাথায় সাদা টুপি, হাতে তসবিহ, পঁচিশ বছর তিনি এ-নৌকাগুলোর মাথায়। হাত তুলে বললেন, ‘দড়ি রাখো।’
নওশের থামল।
‘মেয়ে, বল দেখি, কী চাস তুই?’
‘বনে যাতি চাই, চাচা। বাবারে খুঁজতি না—বাবা কোন বনে হারাল, সেই বনটা চোখে দেখতি।’
‘আর বশির যে তোরে বিয়ে করতি চায়?’
‘বনে নিলি করব। না নিলি না।’
আফছার মাঝি তসবিহের দানা গুনলেন কয়েকটা।
‘বশির, তুই কী চাস?’
‘ওরে বিয়ে করতি চাই। কিন্তু বনে নিতি পারব না।’
বশিরের গলায় ভালোবাসা হারানোর সুর।
‘বাঘ বাদায় আছে বলেই বাদার মানুষ হুঁশিয়ার,’ বললেন মুরুব্বি। ‘হুঁশিয়ার থাকলি বাদা সবাইরে জায়গা দেয়।’
তারপর গলা নামিয়ে বললেন, ‘কিন্তু একটা কথা, রুহি। এ-নৌকায় তুই থাকবি, বশিরও থাকবে। বিয়ে ছাড়া এক নৌকায় থাকা আল্লাহর বিধান নয়। বাদায় যেতি হলে বিয়ে করেই যেতি হবে।’
নৌকায় ফিসফাস উঠল।
‘মেয়ের মায়ের মত নাই যে, মুরুব্বি।’
‘ঘাটে ফিরে দরকার হয় রুহির মায়ের পায়ে পড়ব আমি,’ বললেন আফছার মাঝি। ‘ক্ষমা চাওয়ার দায় আমার। ঠেকানোর দায়ও আমার।’
রুহি অনেকক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
‘বিয়ে করতি আপত্তি নাই। ওয়াদা ঠিক থাকলি।’
‘ওয়াদা মুরুব্বির।’
নৌকা বাঁধা হলো এক নির্জন খালের মুখে। ছইয়ের নিচে হারিকেন জ্বলল। রুহির বাবা নেই, ভাই নেই; আফছার মাঝি নিলেন তার অভিভাবকের আসন। বশিরের পাশে বসলেন চাচা নওশের, ভূতের ধাক্কা তখনও পুরো কাটেনি। সাক্ষী হলো নৌকার দুজন জেলে। মোহর ধার্য হলো বশিরের সাধ্যমতো, ঘাটে ফিরে লিখিত হবে। তিনবার ‘কবুল’ বলার সময় বশিরের গলা কাঁপল, রুহির কাঁপল না।
বাইরে ভাটার টান, আর কোথাও একটা পাখি ডেকে উঠল, একবার।
‘বউরে আর ভূত বলব না,’ বলল নওশের, আর নৌকাজুড়ে হাসির ঢেউ উঠল।
তারপর বাদা। কথা রেখে সেবার রুহিকে নিয়েই নৌকা ঢুকল বনের গভীরে। এগারো দিন কাটল সেই জলের গোলকধাঁধায়। বনের রেখাটা, যেটা এতদিন ছিল নদীর ওপারের এক টান-টান দাগ, ধীরে ধীরে দেয়াল হয়ে উঠল। সুন্দরী গাছের ডালে ডালে জোছনা-ভাঙা আলো, কাদার ভেতর থেকে ছোট ছোট শ্বাসমূল কলমের মতো উঠে আছে, গোলপাতার ঝোপে ঝোপে নোনা হাওয়ার ফিসফিস। বাতাসে কাদা আর সুন্দরীর ঘ্রাণ, মুখে লবণ, কানে ডিঙির দাঁড়ের শব্দ। বাবার গল্প একটা একটা করে মিলে যেতে লাগল চোখের সামনে।
নতুন বিয়ে হয়েছে বলে কেউ তাদের কাজ করতে দিল না। বাকিরা ছোট ডিঙি নিয়ে খালে খালে মাছ আর কাঁকড়ার পিছু নিল। বশির বড় নৌকাতেই থেকে গেল, আর রুহি, যে-মেয়ে বছরের পর বছর জালের দড়িতে হাত ঘষে ঘষে হাত শক্ত করে ফেলেছে, চুলোর পাশে বসে রান্না চড়াল সে। বউ হিসেবে প্রথম রান্না, তাও বাদার মাছে। বাদায় বাড়ির রান্নার স্বাদ পেয়ে সবাই পুলকিত হলো। জেলেরা খেয়ে বলল, ‘বাদায় মাছ মেরে সেই মাছ এমন স্বাদ করে কখনো খায়নি।’
নবম দিনের ভাটায় নৌকা ভেড়ানো ছিল কাদাভরা এক খালের কিনারে। ওপারে ঘন গোলপাতার ঝোপ, কাদায় জোছনার মতো সাদা সাদা ছোপ। রুহি হাতা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল, এমন সময় ঝোপ নড়ল। এক চিতল হরিণ বেরিয়ে এল কাদায়, পা ফেলে ফেলে, মাথা তুলে। দুই চোখ সোজা তাকাল রুহির দিকে। বাবার সেই গল্প—আমার রাজকন্যার চোখও হরিণীর মতো—এক মুহূর্তের জন্য রুহির গলার ভেতর আটকে গেল।
তারপর ঝোপ আবার নড়ল। খালের ওপারে হলুদের ওপর কালো ডোরার একটা ঢেউ, তারপর কেবল শব্দ, ভেজা শব্দ, যে-শব্দ বাদার লোকে নাম না করে চেনে। দৃশ্য আর বেশি কিছু নয়, শব্দ আর ইঙ্গিতই যথেষ্ট। রুহির হাত থেকে খুন্তি পড়ে গেল। বশির ছুটে এসে তাকে ধরে ফেলল; মেয়েটার শরীর ঠান্ডা, চোখ খোলা, কিন্তু সে-চোখ কিছু দেখছে না।
‘বাবা…’
ঠোঁটে এইটুকুই।
বাদা যে তার বাবাকে ফিরিয়ে দেয়নি, সে-কথা এতদিন সে লোকের মুখে শুনেছিল; আজ শুনল নিজের চোখে, বনের নিজস্ব ভাষায়। বাঘ নিষ্ঠুর নয়, তার ক্ষুধা আছে। ওই ক্ষুধার সামনে মানুষ কেবল তাকিয়ে থাকতে পারে, অভিযোগ করতে পারে না। নদী যেমন অভিযোগ করে না, বন যেমন করে না।
আফছার মাঝি ডিঙি ফেরালেন, নৌকায় উঠেই হাঁক দিলেন, ‘নোঙর তোলো। বড় মিয়ার এলাকা এটা।’
বাঘের এলাকা ছেড়ে নৌকা সরে এল অন্য খালে; বনের রেখা ধীরে ধীরে পেছনে মিলিয়ে গেল। সে-রাতে রুহি কিছু খেল না। শুধু বশিরের কাঁধে মাথা রেখে অনেকক্ষণ বসে রইল।
‘বাবারে এখন চিনি,’ বলল শেষে। ‘ভয় পাইছি, কিন্তু হিংসা করি না।’
ঘাটে ফিরে আফছার মাঝি শাহনাজ বেগমের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়ালেন। কাজি ডেকে কাবিননামা লেখা হলো পরদিন; ক্ষমা চাওয়ার কাজটা হলো আগেই। শাহনাজ প্রথমে মুখ ফিরিয়ে রইলেন। মায়ের মত ছাড়া মেয়ের বিয়ে, এ-অভিমান সহজে যায় না। কিন্তু রুহি এসে বিছানার পাশে বসে মায়ের হাত ধরল।
‘তোর বাবাকে দেখলি?’ বললেন তিনি।
‘দেখলাম, মা। অভিমানে যায় নাই বাবা। বনের নিয়মে গেছে।’
শাহনাজ বেগম কেঁদে ফেললেন। যে-মানুষ এক বছর একটা শব্দ বলেননি, তিনি সেদিন আধঘণ্টা কাঁদলেন। কান্না থামলে বললেন, ‘বনে যে-পুরুষ যায়, তার বউ রাতে চালের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি থেকেছি। মেয়েরে এ-রাত দিতি পারব না।’
বশির মাথা নিচু করল। আর রুহি, যে-মেয়ে বনের নিয়ম মেনে নিয়েছে, জেদ মানল না।
‘তুমি গেলি আমিও যাব বনে,’ বলল সে।
এই দুই কথার মাঝখানে পড়ে বশির দেখল, তার সামনে রাস্তা একটাই। মাকে রাতের পর রাত চালের দিকে তাকানো থেকে বাঁচাতে হবে, আবার বউকে ঘাটে ফেলে যাওয়াও যাবে না। বাদার পেশা তাই বাধ্য হয়েই ছাড়ল সে।
সেই সপ্তাহেই সে দেখল, ঘাটে বাঁধা তার পুরোনো নৌকার তক্তায় ফাটল ধরেছে, আর কলিম সরদার দূর থেকে সেদিকেই তাকিয়ে আছেন। কিছু না বলে বাবা তাঁর পুরোনো রাঁদাটা বাড়িয়ে দিলেন।
‘রাঁদা টানবি কাঠের দিকে, নিজের দিকে নয়,’ বললেন শুধু।
পাঁচ-ছয় শো বছর আগে খান জাহান আলী যে-পথে বন কেটে বসতি গড়েছিলেন, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ আজও সেই পথের সাক্ষী। এতগুলো শতাব্দী ধরে এ-অঞ্চলের মানুষ বনের সঙ্গে দর-কষাকষি করছে: কতটুকু নেব, কতটুকু রেখে যাব। বশির সেই হিসাবের খাতায় নিজের নামের ঘরে ‘কম’ লিখল।
তারপর একদিন নওশের এল। নৌকার গলুই ফেটেছে, মুখে কাঁচুমাচু হাসি।
‘ভূত-ধরা মিস্ত্রি,’ বলল সে, ‘আমার গলুইটা দেখবা?’
হাসির রোল উঠল নদীচরে, হাসতে হাসতে বশিরও কাজে হাত দিল। সে-নৌকা শেষ হতে না হতেই আরেকটা এল, তারপর আরও। এখন দূর-দূরান্ত থেকেও টাকা আসে মোবাইলে বিকাশ-নগদে; ক্যাশআউট হয় মোড়ের বাদলের দোকানে। টিনের চালের গরম নদীপাড়ের ঘরগুলোতে খুব একটা লাগে না। তবে উপকূল এলাকার বিদ্যুৎ সমস্যা প্রকট। সাতটার পর তাই কুপি জ্বালানো হয়, ভোর অবধি। কখনো রাতে বিদ্যুৎ থাকলেও বাল্ব জ্বলে না জেলেদের ঘরে। কুপিই তাদের ভরসা।
ওই কুপির পাশে এখন চার প্রজন্মের সংসার। এক কোণে কলিম সরদার রাঁদার ধার পরখ করেন, আর এক কোণে বশিরের মা বড়ি শুকোন। জানালার ধারে চৌকিতে শাহনাজ বেগম বসেন, এখন মাঝে মাঝে হাসেন। সন্ধ্যায় বাঁধের ওপর বসে রুহি জাল সারাই করে। ওপারে চরে জেগে ওঠা বনকে কল্পনা করে সুন্দরবন।
বনের রেখাটা ধীরে ধীরে কালো হয়, আর সেই কালোর দিকে তাকালেই তার চোখ হরিণীর মতো স্থির হয়ে যায়। বশির পাশে এসে বসে, হাতে তখনও কাঠের গুঁড়ো।
‘কী দ্যাখো?’
‘কিছু না। ডাক শুনি।’
‘কার ডাক?’
‘জানি না। বাবার, না বনের।’
জালের গিঁটে দাঁত চেপে সে সুতো কাটে।
‘একদিন যাব। তোমারে সাথে নিয়ে।’
বশির জবাব দেয় না। অনেকক্ষণ পরে শুধু বলে, ‘নদী যদি আবার নেয় এই ঘর?’
‘নিলি নেবে। আমরা তো ফের ঘর বাঁধতি জানি।’
ওপারে বনের রেখা অন্ধকারে মিলিয়ে যায়; এপারে একটা কুপি জ্বলে ওঠে—ঘর-কেড়ে-নেওয়া নদীর কিনারে, আবারও।

