পাঁচ বছর বিছানায় সবুজ, এবার চাকায় ভর করে ঘরের বাইরে
লিচুশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে প্রায় পাঁচ বছর ধরে শয্যাশায়ী খুলনার দিঘলিয়ার সবুজ মিয়া। অভাবের কারণে তাঁর নয় বছরের বড় ছেলে পড়াশোনা ছেড়ে একটি পাটকলে কাজ করছে, সাপ্তাহিক মজুরি ১ হাজার ৩০০ টাকা। প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সবুজ মিয়াকে হুইলচেয়ার দিয়েছে খুলনা বন্ধুসভা।#Khulna #Bondhushava #Humanity #Bangladesh #MeehaNews

একসময় পরিবারের পাঁচজন মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে প্রতিদিন ছুটে চলতেন সবুজ মিয়া। দিনমজুরের কাজ করে যা আয় করতেন, তা দিয়েই চলত স্ত্রী ও তিন ছেলেকে নিয়ে তাঁর সংসার। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দেয় তাঁর জীবনের গল্প। পাঁচ বছর ধরে বিছানায় বন্দি সবুজের কাছে ঘরের চার দেয়ালই হয়ে ওঠে পৃথিবী। একদিকে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা, অন্যদিকে তিন সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার সংগ্রাম—সব মিলিয়ে পরিবারটির প্রতিটি দিন যেন বেঁচে থাকার এক কঠিন লড়াই।

এমনই এক অসহায় পরিবারের পাশে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে প্রথম আলো বন্ধুসভা, খুলনা। প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বন্ধুসভার জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ ঘোষিত ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সবুজ মিয়াকে একটি হুইলচেয়ার উপহার দিয়েছেন বন্ধুসভার বন্ধুরা। গতকাল শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে দিঘলিয়া উপজেলার পানিগাতী ইউনিয়নে সবুজ মিয়ার বাড়িতে গিয়ে তাঁর হাতে হুইলচেয়ারটি তুলে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের বন্দিজীবনে এই উপহার তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে ঘরের বাইরে নতুন করে পৃথিবীকে দেখার একটুখানি স্বপ্ন।
সবুজ মিয়া একসময় ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। পৈতৃক সূত্রে বসতভিটার সামান্য জায়গাটুকু ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই।
কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর আগে লিচুশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে ঘটে দুর্ঘটনা। গাছের উঁচু ডাল ভেঙে মাটিতে পড়ে মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত পান তিনি। সেই দুর্ঘটনার পর থেকেই শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন সবুজ।
স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আশায় মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পরিবারের সঞ্চয়, সহায়-সম্বল—যা ছিল, প্রায় সবই শেষ হয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষের আর্থিক সহযোগিতাও নিয়েছেন। কিন্তু অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন অবশ হয়ে পড়ে থাকায় তাঁর দুই পা-ই শুকিয়ে গেছে; পায়ের পাতাও বেঁকে গেছে। একসময় যে মানুষটি শ্রম দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন, আজ তাঁকেই অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে দিন কাটাতে হয়।

সবুজের জীবনের এই বিপর্যয় শুধু একজন মানুষের চলার পথ থামিয়ে দেয়নি, থামিয়ে দিয়েছে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও। তাঁর স্ত্রী অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়ে কোনোরকমে সংসার চালান। আর মাত্র নয় বছর বয়সী বড় ছেলেটি পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারের অভাব ঘোচাতে স্থানীয় একটি জুটমিলে শ্রমিকের সহকারী হিসেবে কাজ করে। সাপ্তাহিক মজুরি মাত্র ১ হাজার ৩০০ টাকা। যে বয়সে বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সেই তাকে কাঁধে নিতে হয়েছে পরিবারের দায়িত্বের ভার। দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা তার শৈশবকে ঠেলে দিয়েছে জীবিকার কঠিন পথে।
এই পরিবারটির কাছে প্রতিটি দিনই যেন নতুন করে টিকে থাকার পরীক্ষা। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে সবুজের জীবন থমকে আছে, আর অর্থকষ্টে তাঁর সন্তানের শৈশবও বঞ্চিত হচ্ছে স্বাভাবিক আনন্দ ও শিক্ষার অধিকার থেকে। এমন পরিস্থিতিতে সবুজ মিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছে খুলনা বন্ধুসভা। এই উপহার তাঁকে ঘরের চার দেয়ালের বাইরে যাওয়ার, প্রকৃতির আলো-বাতাস অনুভব করার এবং পরিবারের সঙ্গে কিছুটা স্বাভাবিক সময় কাটানোর সুযোগ করে দেবে। এটি তাঁর জন্য নতুন আশার দুয়ার খুলে দেওয়ার মতো।
হুইলচেয়ার পেয়ে আবেগাপ্লুত সবুজ মিয়া বলেন, “বন্ধুসভার এই উপহার পেয়ে আমার নিজের কাছে খুব ভালো লাগছে। হুইলচেয়ারের মাধ্যমে আমি ঘরের বাইরে প্রাকৃতিক পরিবেশে চলাফেরা করার সুযোগ পাব। অনেক দিন ধরে ঘরের মধ্যে পড়ে আছি। এখন বাইরে যেতে পারব—এটাই আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া।”

খুলনা বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক ফারজানা যুথি বলেন, “একটি ভালো কাজের মাধ্যমে একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরে আমরা গর্ববোধ করছি। আমরা চাই, সবুজ মিয়া হুইলচেয়ারের মাধ্যমে ঘরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পান, কিছুটা স্বস্তি ফিরে পান। আমাদের এই ছোট্ট উদ্যোগ যদি তাঁর জীবনে সামান্য আনন্দও এনে দিতে পারে, সেটিই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই ভালো কাজের প্রকৃত সার্থকতা।”
এই উদ্যোগে ফারজানা যুথির সঙ্গে অংশ নেন খুলনা বন্ধুসভার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহা. রহমাতুল্লাহ ও ইমন মিয়া, অর্থ সম্পাদক অনির্বাণ সরকারসহ বন্ধুসভার সদস্যরা।
একটি হুইলচেয়ার হয়তো সবুজ মিয়ার জীবনের সব দুঃখ ঘুচিয়ে দিতে পারবে না। তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন এখনো রয়ে গেছে, তাঁর পরিবারের আর্থিক সংকটও কাটেনি। তবু এই ছোট্ট উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়—মানুষের বিপদের দিনে আরেকজন মানুষ পাশে দাঁড়ালে আশার আলো নিভে যায় না। সবুজ মিয়ার ঘরের দরজা পেরিয়ে হুইলচেয়ারটি এখন তাঁর চলার সঙ্গী হবে।





