ককরোচ জনতা পার্টি: মিম থেকে রাজপথে, ভারতের রাজনীতিতে কী বদলাচ্ছে
ককরোচ জনতা পার্টি ১৬ মে ২০২৬ ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন উদ্যোগ হিসেবে শুরু হয়। প্রায় ৩৭ দিনের আন্দোলনের পর ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। ১০ অক্টোবর দলটির দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ। খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। বিরোধীরা অনেক বৈধ…

শনিবার সকাল প্রায় ৭টা ৪৮ মিনিটে একদল পুলিশ গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-র একটি আবাসিক এলাকায় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির বাড়িতে ঢোকে। নিউজ১৮-এর খবর অনুযায়ী, দরজা খুলে দেন তাঁর মা। কিছুক্ষণ পর রাঠিকে আটক করা হয়। হিন্দুস্তান টাইমসকে পুলিশ জানিয়েছে, যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে যোগ দিতে দিল্লি না যাওয়ার নির্দেশ তিনি মানেননি। যে বিক্ষোভে তিনি যাচ্ছিলেন, তার ডাক দিয়েছে এমন একটি দল, যার নামই একটি ব্যঙ্গ: ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
আগের দিন থেকেই দিল্লির চেহারা বদলে গিয়েছিল। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, ভারতীয় ন্যায়সংহিতার সঙ্গে চালু ফৌজদারি কার্যবিধি বিএনএসএসের ১৬৩ ধারার নিষেধাজ্ঞা বলবৎ আছে, তাই যন্তর মন্তরসহ কোথাও বিক্ষোভের অনুমতি নেই। সিজেপি আগেই পুলিশকে জানিয়েছিল, অনুমতি মেলেনি। প্রথম আলোর দিল্লি প্রতিনিধির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ভোর ৪টা থেকে ১০ ঘণ্টা নয়াদিল্লি, পুরোনো দিল্লি ও নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়, আর ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। মোতায়েনের সংখ্যায় প্রতিবেদনগুলো একমত নয়। কোনোটিতে ২০ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক সদস্যের কথা আছে, প্রথম আলোর হিসাবে দিল্লি পুলিশের ২০ হাজারের সঙ্গে আরও ২৩ হাজার আধাসামরিক সদস্য প্রস্তুত। আটক রাখতে একাধিক স্টেডিয়াম চিহ্নিত করা হয়েছিল। দিল্লি পুলিশ আন্দাজ করেছিল প্রায় সাত হাজার মানুষ আসবেন। সিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা অভিযোগ করেছেন, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় ১০ হাজার কর্মী ও সমর্থককে আটক করা হয়েছে। এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি। পুলিশ নিরাপত্তা-ব্যবস্থার পক্ষে আগের বিক্ষোভে পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি সম্পত্তির ক্ষতির অভিযোগের তদন্তের কথা বলেছে। নারী পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অশালীন আচরণের খবরের পর ‘পিঙ্ক ফোর্স’ মোতায়েনের কথাও জানা গেছে।
সিজেপির দাবি এবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। দলটি ভোটার তালিকার সংশোধন স্থগিত করার কথাও বলছে এবং কমিশনার নিয়োগে স্বচ্ছতা চায়। মাত্র পাঁচ মাস আগে ঠিক এই দলই ছিল একটি অনলাইন রসিকতা।
সেই রসিকতার জন্ম ১৫ মে ২০২৬। সুপ্রিম কোর্টে একটি অবমাননা-মামলা শোনার সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার তরুণদের কারও কারও সম্পর্কে ‘তেলাপোকা’ ও ‘সমাজের পরজীবী’ শব্দ ব্যবহার করেন। তিনি পরে ব্যাখ্যা দেন, তাঁর লক্ষ্য ছিল জাল ডিগ্রি নিয়ে আইন, গণমাধ্যম ও অন্যান্য পেশায় ঢুকে পড়া মানুষ, তরুণ সমাজ নয়। শব্দটি তত দিনে আটকে গেছে। পরদিন ১৬ মে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করা সাবেক আম আদমি পার্টির স্বেচ্ছাসেবী, রাজনৈতিক যোগাযোগকর্মী অভিজিৎ দিপকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেন। নামটি বিজেপির প্যারোডিও। সদস্য হওয়ার শর্ত ছিল বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা এবং পেশাদারি ঢঙে ক্ষোভ ঝাড়তে পারা। দলটির ঘোষিত ইশতেহারে আছে প্রধান বিচারপতিদের অবসরের পর রাজ্যসভার আসন না পাওয়া, কোনো বৈধ ভোট মুছে গেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে গ্রেপ্তার, সংসদে নারীদের ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব। ইন্ডিয়া টুডের বরাতে জানা যায়, কয়েক দিনের মধ্যে ইনস্টাগ্রামে অনুসারী এক কোটি ছাড়িয়ে বিজেপির অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টকেও ছাড়িয়ে যায়।
অনুসারীর সংখ্যা অবশ্য ভোট নয়। সমালোচকরা বিবিসি ও আল জাজিরায় বলেছেন, দিপকের আপ-অতীত দেখে এটি সুপ্যাকেজড ডিজিটাল প্রচারণা মনে হয়, স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ নয়। কোনো কোনো বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, এই বৃদ্ধি তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন নাকি সামাজিক মাধ্যমের বিবর্ধন। দিপকে বলেন, সিজেপি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের অংশ নয়, তরুণদের একটি মঞ্চ মাত্র।
রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এল দ্রুত। এক সপ্তাহ পেরোনোর আগেই, ২১ মে, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ভারতে সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করা হয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোয়েন্দা ব্যুরোর পরামর্শে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র যুক্তি দেখানো হয়েছিল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু নাম না করে এমন মানুষদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন, যাঁরা পাকিস্তান ও জর্জ সোরোসের ‘গ্যাং’-এর কাছ থেকে অনুসারী খোঁজেন। আরেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার দাবি করেন, সিজেপির ৪৯ শতাংশ অনুসারী পাকিস্তানের। দিপকের শেয়ার করা স্ক্রিন রেকর্ডিংয়ে ৯৪ শতাংশের বেশি দর্শক ভারতীয়, আর একটি স্বাধীন পর্যালোচনাতেও দর্শকের বড় অংশ ভারতীয় বলে দেখা গেছে। এই বিচার-পাল্টা বিচারে দাবিগুলো অপ্রমাণিত থেকে যায়। এর মধ্যে এলাহাবাদ হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে সিজেপির বিরুদ্ধে তদন্ত চেয়ে করা পিটিশন আদালত খারিজ করেছে, আর দলের নামে ছড়ানো একটি ভুয়া অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ক্ষতিকর বলে সতর্ক করেছে সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ট্রেসএক্স ল্যাবস।
জুন-জুলাইয়ে সিজেপি অনলাইন থেকে রাস্তায় নামে। দাবি ছিল নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও সিবিএসইর অন-স্ক্রিন মার্কিং বিতর্কে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। ২০ জুন সংসদ অভিমুখী মিছিল ও যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান শুরু হয়। প্রধান সরকারের পক্ষ থেকে সিজেপিকে ‘বিশৃঙ্খলকারীদের বি-টিম’ বলেছিলেন। ২৫ জুলাই তিনি পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য’ রক্ষা ও ‘জাতীয়তাবিরোধী শক্তি’ সুযোগ না পাওয়ার জন্য তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে আন্দোলনকারীরা এর ব্যাখ্যা নিজেদের মতো করেছেন। সরকার তিনটি মূল দাবি মানে: এফআইআর প্রত্যাহার, নিট ফাঁসের শিকার পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ ও মন্ত্রীর পদত্যাগ। সিজেপি প্রায় ৩৭ দিনের অবস্থান তুলে নেয়। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকার শুরুতে আন্দোলনের শক্তি বুঝতে ভুল করেছিল এবং পদত্যাগের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি সামলায়। একই বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, প্রধান সংসদে ফিরলে বিজেপির বেশ কয়েকজন সাংসদ তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। মোদির ক্ষমতায় আসার পর এটি দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগ, যা কোনো বড় বিতর্কের কারণে হয়েছে।
শিক্ষা থেকে ভোটার তালিকায় সরে আসা কাকতালীয় নয়। ভারতের নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) দেশব্যাপী চালুর ঘোষণা দেয়। কমিশনের বক্তব্য, মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিক জায়গায় নাম থাকা ও অযোগ্য ভোটার বাদ দেওয়াই লক্ষ্য। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের এ উদ্যোগে খসড়া তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ গেছে। কমিশনের তথ্যের বরাতে বিজেপি জানায়, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ আগের ঠিকানা ছেড়ে গেছেন, প্রায় তিন কোটির খোঁজ মেলেনি। কমিশন বলে, ১৩ কোটি খসড়া তালিকার হিসাব, বাদ পড়া প্রত্যেকে যোগ্য ভোটার নন, আর যাঁরা ভুলে বাদ পড়েছেন, তাঁরা প্রমাণসহ ফের নাম তুলতে পারবেন। কমিশন বিশেষ নাম তোলার উদ্যোগও ঘোষণা করেছে। বিরোধীরা বলছে, নির্বিচার বাদ এবং দীর্ঘ আপিল-প্রক্রিয়ার কারণে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে লাখ লাখ বৈধ ভোটার ভোট দিতে পারেননি। চলতি বছর পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। বিজেপি বলছে, তাদের জয়ের কারণ মোদির জনপ্রিয়তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।
সেপ্টেম্বরের শেষে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদন বিতর্কে নতুন মাত্রা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন সদস্যের কমিশনের দুই কমিশনার ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার সিইসিকে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। কমিশনের জবাব, ভেতরে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক, কোনো দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। বিজেপির বক্তব্য, বিরোধীরা বৈধ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে গণতন্ত্র দুর্বল করছে। কংগ্রেস, তৃণমূলসহ বিরোধী জোট ৬ অক্টোবর থেকে সিইসির পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বাড্রা দুই দিনে তিনবার আটক হন। সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ কমিশন, কেন্দ্র, জ্ঞানেশ কুমার ও আরও দুই কমিশনারকে নোটিশ দেয়। ফলে যে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য থেকে সিজেপির জন্ম, তাঁরই বেঞ্চে এখন নির্বাচন কমিশন জবাবদিহির মুখে।
এখানেই সিজেপির আগের দাবি বদলে যায়। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছিল একটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট দাবি, যার সঙ্গে দেশের ছাত্র-অভিভাবকের সরাসরি স্বার্থ জড়িত। এবার দাবি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের আস্থার প্রশ্ন, যে ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলো আগে থেকেই একই দাবিতে সক্রিয়। এতে সিজেপির ‘কোনো দলের অংশ নয়’ দাবির পরীক্ষা কঠিন হচ্ছে। তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও কংগ্রেসের শশী থারুর আগেই দলটির পক্ষে কথা বলেছেন, আর সিজেপির দাবি ও বিরোধী জোটের দাবি এখন এক জায়গায় মিলেছে। বিজেপির সমর্থকরা এটিকে বিরোধীদের আড়ালের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন, সিজেপির সমর্থকরা বলছেন একই দাবির পেছনে দাঁড়ানো মানেই আনুগত্য নয়। কোন ব্যাখ্যা সঠিক, তা এই মুহূর্তে সূত্র থেকে নির্ধারণ করা যায় না।
ভোটার তালিকার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ভারতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্নটি: কারা বাদ পড়ছেন। আন্দোলনকারীরা বলছেন, মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ভোটার তুলনামূলক বেশি বাদ পড়েছেন, কারণ এই জনগোষ্ঠীর বিজেপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা কম। এই দাবি প্রমাণিত নয়। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কমিশন বাদ পড়াদের সম্প্রদায়ভিত্তিক হিসাব দেয়নি বলে জানিয়েছে এশিয়ানেট বাংলা। তৃণমূল দাবি করেছে, প্রথম পর্যায়ে বাদ পড়া ৫৮ লাখের মধ্যে ৪৪ লাখ হিন্দু, ১৩ লাখ মুসলিম। বিজেপি এ নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছে। আল জাজিরা মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তর ২৪ পরগনায় মুসলিম ভোটারদের লক্ষ্য করার অভিযোগ রিপোর্ট করেছে। অর্থাৎ অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ দুদিকেই আছে, আর যাচাইযোগ্য তথ্য, অর্থাৎ বাদ পড়া নামের ধর্মভিত্তিক বিভাজন, প্রকাশিত নয়।
ভোটার তালিকার বাইরে বাস্তবে যা নথিভুক্ত, তা আরও স্পষ্ট। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরে ৯০ লাখের বেশি নাম বাদ গেছে এবং নতুন সরকারের ‘শনাক্ত করো, মুছে ফেলো, ফেরত পাঠাও’ নীতিতে বাংলাভাষী, মূলত মুসলিমদের ন্যায্য প্রক্রিয়া ছাড়া বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জুনে বলেন, প্রায় ৪ হাজার ৮০০ ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’কে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং প্রতিটি জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ খোলা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্ধৃত এক কর্মীর দাবি, আটক অনেকেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর আটক হয়েছেন। আসামে নিউ হিউম্যানিটারিয়ানের হিসাবে ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে অন্তত ৩৩টি উচ্ছেদ অভিযান নথিভুক্ত, যার অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাভাষী মুসলিম। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বারবার বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলেছেন বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও আউটলুক জানিয়েছে। সরকার ও বিজেপির বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের মতে, উচ্ছেদ বনভূমি ও সরকারি জমি পুনরুদ্ধারের অংশ, আর লক্ষ্য অবৈধ অভিবাসীদের বৈধ উপায়ে চিহ্নিত করা। বিজেপিঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম অর্গানাইজার জানুয়ারিতে সোনিতপুরের উচ্ছেদকে বনভূমি উদ্ধার বলেছে, আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদি বাসিন্দা মুসলিমরাও ক্ষতিগ্রস্ত বলে অন্য প্রতিবেদন আছে। আসামের উচ্ছেদে নিহতের দাবি বা ধর্মীয় বিদ্বেষের ব্যাপক প্রমাণ নিয়ে এই লেখা কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারে না; তবে সরকারি পদাধিকারীদের প্রকাশ্য বক্তব্য এবং নথিভুক্ত উচ্ছেদের সংখ্যা মিলিয়ে একটি প্যাটার্ন দৃশ্যমান, যা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নজরে আছে।
এই প্যাটার্ন সিজেপিকে কতটা ছুঁয়েছে? জুনে পুনের সমাবেশে দিপকে বলেছিলেন, হিন্দু-মুসলিম রাজনীতি আর চলবে না, হিন্দুস্তান টাইমসের শিরোনাম অনুযায়ী। লখনউয়ের শিক্ষার্থীরা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন, সরকারের উচিত ধর্ম নয়, তাঁদের সমস্যা নিয়ে কথা বলা। দলের সদস্যপদে ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গ বিবেচনা না করার কথা ঘোষণা আছে এবং মুখপাত্রদের একজনের নাম আফরিন নওয়াজ। কিন্তু আন্দোলনের মূল ইস্যু পরীক্ষা, চাকরি ও এখন ভোটার তালিকা। উচ্ছেদ বা পুশব্যাকের প্রশ্নে সিজেপির আলাদা কর্মসূচি আছে বলে কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। সংখ্যালঘুদের প্রশ্ন আন্দোলনে ঢুকেছে ভোটার তালিকার দরজা দিয়ে।
ডেস্কের ব্রিফে এসেছে চিকেনস নেক, অর্থাৎ শিলিগুড়ি করিডর। এ নিয়ে বাস্তবতা এই যে, পশ্চিমবঙ্গে ২০-২২ কিলোমিটার চওড়া এই সরু ভূখণ্ড উত্তর-পূর্ব ভারতের আট রাজ্যকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে জুড়ে রেখেছে। ভারত সীমান্ত নিরাপত্তায় জোর দিচ্ছে। ডিএনএ ও জি নিউজের প্রতিবেদনে করিডর এলাকায় সীমান্ত-বেড়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের কথা আছে। ২০২৫ সালে মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরে উত্তর-পূর্ব ভারতকে ‘স্থলবেষ্টিত’ বলা ও তিস্তা প্রকল্পে চীনকে আমন্ত্রণের পর ভারত বাংলাদেশের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়, আসামের মুখ্যমন্ত্রী একে উত্তর-পূর্বের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। কিন্তু সিজেপি, ভোটার তালিকা বা সংখ্যালঘু প্রশ্নের সঙ্গে চিকেনস নেকের সরাসরি যোগসূত্রের কোনো সূত্র আমি পাইনি। যা পাওয়া যায়, তা তিনটি আলাদা প্রবণতা: সীমান্ত-নিরাপত্তার আলোচনা, পশ্চিমবঙ্গে সীমান্ত ও অভিবাসন ঘিরে নতুন সরকারের কড়া নীতি, এবং সিজেপি-নেতৃত্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে আন্দোলন। এগুলো একই সুতোয় গাঁথা, এমন প্রমাণ নেই, আর তা ধরে নেওয়া হলে বিশ্লেষণ ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের দিকে গড়াবে।
ভারতের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সূত্রগুলো একমত নয়। সিঙ্গাপুরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সিজেপি কি শিক্ষা-সংস্কার বা যুব বেকারত্বের মতো বড় ইস্যুতে টিকে থাকার ক্ষমতা ও জনসমর্থন ধরে রাখতে পারবে, তা এখনো দেখার বিষয়। ইত্তেফাকের একটি প্রতিবেদনে বিজেপির ‘অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দোলন শেষ পর্যন্ত বড় রাজনৈতিক শক্তি হবে না, আর পেছনে বিদেশি হাত আছে। এই মূল্যায়নের উৎস প্রকাশ্য নয় এবং ‘বিদেশি হাত’-এর কোনো প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে ওয়েবসাইটগুলোয় শশী থারুরের মন্তব্য, বিরোধীর জন্য এটি তরুণ ক্ষোভকে নির্বাচনী রাজনীতিতে রূপ দেওয়ার সুযোগ। দিপকে নিজে আগেই বলেছিলেন, দল আপাতত নির্বাচনী রাজনীতিতে যাচ্ছে না, গণ-আন্দোলনই তাঁদের দরকার। আগামী বছর ভারতের অন্তত সাতটি রাজ্যে নির্বাচন, উত্তর প্রদেশও তার মধ্যে। রয়টার্স অনুযায়ী, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে সেখানে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ শতাংশ নাম বাদ গেছে। কাজেই আসন্ন নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনই সম্ভবত সিজেপি ও বিরোধী জোটের সবচেয়ে বড় অভিন্ন ইস্যু। ওয়্যারের ভারতীয় সাংবাদিকদের একটি লেখা প্রথম আলোয় অনূদিত হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে ২০২৩ সালের আইনে সিইসিসহ কমিশনারদের দাপ্তরিক সিদ্ধান্তের জন্য দায়মুক্তির বিধান আছে, এটিও বিতর্কের একটি দিক। অনুচ্ছেদটি মতামত-বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশে সিজেপিকে ঘিরে তুলনা শুরু হয়েছে প্রায় প্রথম দিন থেকে। ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থান, নেপালের জেন-জি আন্দোলন আর এখন ভারত, এ ধারা টেনে অনেকে লিখছেন। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক প্রথম আলোয় এক কলামে লিখেছেন, ‘রাজাকার’ আর ‘তেলাপোকা’, দুটি শব্দই অসতর্ক মন্তব্য থেকে আন্দোলন জাগাতে পারে, প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ বাংলাদেশের নিজের সমস্যায় শিক্ষা নেওয়া উচিত। এটি তাঁর মত। দিপকে নিজে এই তুলনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। পিটিআইকে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ও নেপালের আন্দোলন তাঁদের হেয় করতে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাঁরা আলাদা, আর ভারতের শিক্ষার্থীরা সহিংস নয়। তাঁর এই বক্তব্য ছিল নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিনের একটি মন্তব্যের জবাবে, যিনি বলেছিলেন বাংলাদেশের ২০২৪-এর আন্দোলনের পেছনে ‘জিহাদিরা’ ছিল। এটি তসলিমার নিজের দাবি, সূত্রে তার কোনো প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। এক দেশে সরকার পড়ে গেছে; জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে অভ্যুত্থান দমনের অভিযানে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। ভারতে সরকার টিকে আছে, একজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। সূত্র অনুযায়ী ‘বিপ্লব’-এর শব্দটি এখানে প্রযোজ্য নয়, আর সিজেপির নেতারা নিজেরাই সেই তুলনা প্রত্যাখ্যান করছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রশ্নে যে নথিভুক্ত সংযোগ আছে, তা হাসিনা। ১০ জুলাই রয়টার্সকে টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান; দিনক্ষণ বা আদালতের নাম জানাননি। তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অনুপস্থিতিতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় আছে, তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। হাসিনা বলেছেন, ফেরার বিষয়টি তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেননি। বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার ভারতকে চিঠি দিয়েছে। অক্টোবরের ৩ তারিখে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ফেরত পাঠানোর কোনো সময়সীমা কেউ দিতে পারবে না, প্রক্রিয়া আইনি ও সুসংগঠিত, আর ২০২৪-এ হাসিনাকে আশ্রয় না দিয়ে ভারতের উপায় ছিল না। আগস্টে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে হাসিনার বক্তব্যে ভারতের সমর্থন নেই। সিজেপি হাসিনা প্রসঙ্গে কোনো অবস্থান নিয়েছে কি না, তা আমি কোনো সূত্রে পাইনি।
ভারতের জনমত নিয়ে সর্বশেষ যাচাইযোগ্য তথ্য ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির। ইন্ডিয়া টুডে এনই-র ‘মুড অব দ্য নেশন’ জরিপ অনুযায়ী ৫০.২ শতাংশ ভারতীয় মনে করেন হাসিনার ভারত ছাড়া উচিত। এর মধ্যে ২১.১ শতাংশ বাংলাদেশে হস্তান্তরের পক্ষে, ২৯.১ শতাংশ তৃতীয় দেশে পাঠানোর পক্ষে। ৩৭.৬ শতাংশ বলেছেন, ভারতের বন্ধু হিসেবে তাঁকে আশ্রয় দেওয়াই উচিত। সীমান্তবর্তী উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোয় হস্তান্তরের সমর্থন বেশি ছিল। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম একই জরিপ উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ৫৫ শতাংশ ভারতীয় ফেরত চান আর মাত্র ১৬-১৭ শতাংশ চান হাসিনা ভারতে থাকুন। এই সংখ্যা ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত জরিপের সংখ্যার সঙ্গে মেলে না। ঢাকা ও দিল্লির এই ব্যাখ্যাভেদ নিজেই দেখায়, এ প্রশ্নে তথ্যও রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে যায়। ২০২৫-এর পর নতুন কোনো জরিপ সূত্রে মেলেনি।
এই সব সূত্র একসঙ্গে পড়লে যা পাওয়া যায়, তা কোনো একক পরিকল্পনা নয়। তরুণদের হতাশা (পরীক্ষা, চাকরি), প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকট (ভোটার তালিকা), রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ-প্রবণতা (ডিজিটাল নিষেধাজ্ঞা, নিষেধাজ্ঞা-আদেশ, বিপুল আটক), আর সীমান্ত ও অভিবাসন নিয়ে ক্রমশ কঠোর নীতি, এগুলো আলাদা ধারা, যেগুলো একই সময়ে এসে মিলেছে। ‘ভোট চুরি’ অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়, ‘বিদেশি হাত’-এর অভিযোগও তাই। দুই দাবিই আদালত ও স্বাধীন নিরীক্ষার অপেক্ষায়। ঝগড়া মেটানোর উপায় আছে: কমিশন বাদ পড়াদের কারণ ও সম্প্রদায়ভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করতে পারে, পুলিশ আটক ব্যক্তিদের তালিকা ও আটককেন্দ্রের অবস্থান জানাতে পারে, কমিশনারদের মতভেদ ও সিদ্ধান্তের নথি জনসমক্ষে আসতে পারে। অনুমতি দিয়েই কোনো সীমিত স্থানে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ব্যবস্থা করা যেত। যে দেশ ১০০ কোটি ভোটারের তালিকা যাচাই করতে পারে, সে কি নিজের যাচাই প্রক্রিয়া সবার সামনে যাচাইযোগ্য করতে পারবে না? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, ককরোচ জনতা পার্টি ভারতের রাজনীতিতে একটি মোড় হবে, নাকি আরেকটি ফেনা।




