ঢাকা–দিল্লি টানাপোড়েন: দুই বছরে যা বদলেছে, যা বদলায়নি
তিন বছর পর নয়াদিল্লিতে ৮ অক্টোবর যৌথ কার্যদলের বৈঠক শুরু হয়েছে। অথচ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকা রাজনৈতিক সদিচ্ছা চাইছে, আর ভারত বলছে অনুরোধটি আইনি পর্যালোচনায় আছে এবং কোনো সময়সীমা দেওয়া যাচ্ছে না। গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে, তিস্তা চুক্তি ২০১১ সাল থেকে অমীমাংসিত।…

শুষ্ক মৌসুমেই নদীর আসল চেহারা ধরা পড়ে। ভরা বর্ষায় সবটাই এক জলরাশি, পানি নামলে বোঝা যায় কোথায় স্রোত টিকে আছে আর কোথায় চর জেগেছে। ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক এখন তেমনই এক মৌসুমের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) তিন বছর পর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ–ভারত যৌথ কার্যদলের (জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ) দুই দিনের বৈঠক শুরু হয়েছে। আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়ার কথা স্থলবন্দরের বিধিনিষেধ, বাংলাদেশি পাটপণ্যে ভারতের নতুন শুল্ক আর ভারতীয় সুতা আমদানিতে বাংলাদেশের বাধা। অথচ কয়েক দিন আগে, ৪ অক্টোবর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্তদের ফেরাতে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও সমান জরুরি। এক টেবিলে বাণিজ্য, আরেক টেবিলে প্রত্যর্পণ। দুই দেশের কূটনীতি এখন দুই গতিতে চলছে।
অমীমাংসিত প্রশ্নের তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে সবগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে একটি বড় নকশার গল্প বানানো সহজ। সংগৃহীত তথ্য সে গল্পের পক্ষে কথা বলে না। যা নথিভুক্ত, তা অনেক বেশি জটিল। নদী, সীমান্ত ও বাণিজ্যের মতো পুরোনো কাঠামোগত সমস্যা আছে। তার ওপর ২০২৪ সালের আগস্টের পটপরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অগ্রাধিকারও বদলেছে। সব মিলিয়ে ছবিটি পরস্পরবিরোধী। কিছু দরজা খুলছে, কিছু বন্ধ থাকছে, আর কিছু প্রশ্নে দুই পক্ষের দেওয়া তথ্যই মেলে না।
সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন হাসিনার অবস্থান। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে আছেন। বাংলাদেশের আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। হাসিনা এই বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ঢাকার অবস্থান এখন প্রকাশ্য ও কঠোর। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ১৫ সেপ্টেম্বর বলেছেন, সম্পর্ক আরও ভালো করতে হলে ভারতকে হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দণ্ডপ্রাপ্ত সবাইকে ফেরত দিতে হবে। ২৯ সেপ্টেম্বর তিনি জানান, সরকার বিষয়টিকে দ্বিপক্ষীয় হিসেবে দেখছে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততা দরকার নেই। দিল্লির প্রকাশ্য অবস্থান অনেক সংযত। ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার ৩ অক্টোবর জানিয়েছেন, প্রত্যর্পণের অনুরোধ আইনি পর্যালোচনায় আছে এবং হাসিনার ফেরার কোনো সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয়। আউটলুক বাংলা কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে লিখেছে, ভারত ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে তারা হাসিনাকে ফেরত দেবে না, তিনি নিজে চাইলে দেশে যেতে পারেন। দুটি বক্তব্য এক নয়। একটি আনুষ্ঠানিক ও খোলা, অন্যটি নামহীন সূত্রনির্ভর। কোনটি বাস্তবতার কাছাকাছি, এখন তা যাচাই করা যাচ্ছে না। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কোন মর্যাদায় হাসিনাকে রেখেছে, সংগৃহীত তথ্যে তার স্পষ্ট ঘোষণাও মেলেনি।
হাসিনার প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে অস্বস্তি আরও বেশি। মানবজমিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের কূটনৈতিক সতর্কবার্তার পরও নয়াদিল্লিতে তাঁর একটি সংবাদ সম্মেলন হয়। ভারত পরে জানায়, আয়োজনের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল না এবং তারা অনুমোদনও দেয়নি। কিন্তু ভারতীয় কয়েকজন সাংবাদিক মনে করেন, সরকারের সায় ছাড়া রাজধানীতে এমন আয়োজন সম্ভব হতো না। ঢাকা বারবার ভারতকে অনুরোধ করেছে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত রাখতে। সম্পর্ক পুরোপুরি স্থবির, এমন দাবিও সব তথ্যের সঙ্গে মেলে না। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের সময় ভারত ৪৫ হাজার টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করেছে এবং ঢাকায় নতুন দূত নিয়োগ দিয়েছে। দূত দিনেশ ত্রিবেদীর পদমর্যাদা ক্যাবিনেট মন্ত্রীর সমান বলে প্রতিবেদনটি জানায়। দুই পক্ষের দাবিই সমান মানদণ্ডে দেখা দরকার। ঢাকার দাবি আদালতের রায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। হাসিনার দাবি, বিচার রাজনৈতিক, তাঁর নিজের অবস্থান। ভারত কোন যুক্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে, তা আইনি পর্যালোচনার ফল না আসা পর্যন্ত জানা যাবে না।
নদীর অচলাবস্থা আরও পুরোনো। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে নয়াদিল্লি ও ঢাকা তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। সেই বাধা এখনো কাটেনি। ১৯৯৬ সালে সই হওয়া ৩০ বছরের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। নবায়নের আলোচনা শুরুর আগেই ৩১ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে দাবি তুলেছে, রাজ্যের পানি, বন্দর ও শিল্প খাতের স্বার্থ যেন ক্ষুণ্ণ না হয়। ঢাকার দিক থেকে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ১২ আগস্ট বলেছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও গঙ্গা চুক্তি নবায়ন সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকার। নতুন চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে এবং যৌথ নদী কমিশন কাজ শুরু করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিস্রি ২০২৫ সালের অক্টোবরে বলেছিলেন, গঙ্গা চুক্তি এখনো বৈধ এবং আলোচনা যৌথ নদী কমিশনের কাঠামোতেই চলবে। ১৯৭২ সালে গঠিত এই কমিশনই দুই দেশের নদী-সংক্রান্ত আলোচনার প্রধান আনুষ্ঠানিক মঞ্চ।
এই অচলাবস্থার মাঝখানে ঢুকেছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার একটি মতামত নিবন্ধ অনুযায়ী, প্রকল্পে ১০২ কিলোমিটার নদীখনন ও ২০৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের কথা আছে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা, আর প্রথম পর্যায়ের জন্য চীনের কাছে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ চাওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরের পর সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন, যেকোনো মূল্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। ওই সফরে যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার একটি চুক্তি সই হয়েছে বলে দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তিও দরকার, আর ভারতের প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে বাংলাদেশকে কৌশলে এগোতে হবে । তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রশ্ন সরল। নদীতে পানি না থাকলে ব্যারেজ আর খননে কী লাভ। চীন–ভারত প্রতিযোগিতার তত্ত্বও আছে। তিস্তা সিকিম থেকে শিলিগুড়ি করিডোর হয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ২১ আগস্ট শিলিগুড়িতে বলেছেন, করিডোরের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং বেড়া দেওয়ার জন্য বিএসএফকে জমি দেওয়া হয়েছে। সংগৃহীত প্রতিবেদনে তিনি বাংলাদেশ বা চীনের নাম নিয়েছেন কি না, তা নেই। বাংলাদেশ–চীন তিস্তা সহযোগিতাকে দিল্লি নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে দেখছে বলে যে দাবি ইনকিলাবে এসেছে, তার উৎস ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, সরকারি বিবৃতি নয়। এই তথ্যগুলো থেকে যে ছবি দাঁড়ায়, তা কারও একক নকশা নয়। উজানের দেশে রাজ্য–কেন্দ্র রাজনীতি আর ভাটির দেশে বিকল্প অংশীদারের আগ্রহ পরস্পরকে ঠেলছে।
সীমান্তের পরিসংখ্যান সবচেয়ে নির্মম, আর সবচেয়ে বেশি সতর্কতা দাবি করে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ভারতীয় সীমান্তে ২২১ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ৪৮ জন। সংস্থাটি নিজেই বলেছে, সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ হিসাব নয়টি জাতীয় দৈনিক ও কয়েকটি অনলাইন পত্রিকার প্রতিবেদনের ওপর দাঁড়িয়ে। ২০২৫ সালে বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। আসকের এই তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম লিখেছে, তা গত পাঁচ বছরের সর্বোচ্চ। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মাসে, ১৭ ফেব্রুয়ারির পর, বিএসএফের গুলিতে কারও মৃত্যুর খবর আসেনি। কেউ কেউ এর কারণ হিসেবে ঢাকার কঠোর বার্তাকে দেখেছেন, যদিও এই বিশ্লেষণ কার্যকারণ প্রমাণ করে না। এপ্রিলে প্রথম আলোর একটি শিরোনাম জানায়, দুঃখ প্রকাশের একদিন পর পাটগ্রাম সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আসকের ছয় মাসের হিসাবে (জানুয়ারি–জুন ২০২৬) বিএসএফ-সংশ্লিষ্ট অন্তত ২১টি সহিংস ঘটনায় ১০ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। সাতজন গুলিতে, তিনজন নির্যাতনে, আর আহত ১০ জন। মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের হিসাবে একই সময়ে নিহত ৯ জন, আর সীমান্তে ১৭৩ জনকে ‘পুশ ইন’ করা হয়েছে। দুই সংস্থার সংখ্যায় সামান্য ফারাক স্বাভাবিক, কারণ দুটোই গণমাধ্যম-নির্ভর বেসরকারি গণনা। সংগৃহীত তথ্যে দুই দেশের কোনো যৌথ যাচাই-করা খতিয়ান পাওয়া যায়নি। সালাহউদ্দিন আহমেদ বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি হত্যাকে ‘সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন’ বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিহতদের পরিবারকে ভারত সরকারের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া নিয়েও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা নেই। ২০১১ সালে কাঁটাতারে ঝুলে থাকা কিশোরী ফেলানী খাতুনের মরদেহের ছবি এই ক্ষত চিরস্থায়ী করেছে। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় অভিযুক্ত বিএসএফ কনস্টেবল বিচারে দোষী সাব্যস্ত হননি। ভারত বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও হত্যা থামেনি, এই অভিযোগ ২০২১ সালের সংবাদমাধ্যমেও ছিল। বিএসএফ বা ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার ব্যাখ্যা সংগৃহীত সূত্রে মেলেনি। তাই চিত্রটি একপেশে থাকার ঝুঁকি আছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ও ঘটনার মাঝখানে কোনো স্বচ্ছ জবাবদিহি-ব্যবস্থা নেই, এটুকু সব তথ্য থেকেই বেরিয়ে আসে।
বিদ্যুৎ নির্ভরতার প্রশ্ন সবচেয়ে ধারালো রূপ নিয়েছে আদানি পাওয়ারের চুক্তিতে। ২০১৭ সালে সই হওয়া চুক্তি অনুযায়ী ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা কেন্দ্র থেকে ২৫ বছর ধরে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনার কথা। রয়টার্সের বরাতে বার্তাবাজার জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি পর্যালোচনা কমিটির ২০ জানুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোড্ডার বিদ্যুতের দাম ভারতের নিকটতম বেসরকারি প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। ভারত থেকে আমদানির চুক্তিগুলোর মধ্যে ব্যয়বৃদ্ধির হারও এখানে সবচেয়ে বেশি। আন্তর্জাতিক রীতির বাইরে গিয়ে ভারতীয় কর্পোরেট করের উপাদানও বাংলাদেশের ওপর চাপানো হয়েছে। প্রতিবেদনটি তখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। আদানি পাওয়ারের বক্তব্য, কমিটি তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেনি বা প্রতিবেদনের কপি দেয়নি, তাই তারা মন্তব্য করতে পারে না। তারা আরও জানিয়েছে, বড় অঙ্কের বকেয়া থাকা সত্ত্বেও সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে, যেখানে অন্য উৎপাদকেরা সরবরাহ কমিয়েছে বা বন্ধ করেছে। ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে সমালোচনার সূত্রপাত আরও আগে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিশ্লেষণে ১৬৩ পৃষ্ঠার চুক্তিপত্র তিন বিশেষজ্ঞকে দিয়ে পর্যালোচনা করানো হয়েছিল। জ্বালানি বিশ্লেষক টিম বাকলির হিসাবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও বছরে প্রায় সাড়ে ৪০০ মিলিয়ন ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে। আলোকিত বাংলাদেশের এক সম্পাদকীয় ২৫ বছরে এই চার্জ এক লাখ কোটি টাকার বেশি হবে বলে হিসাব দিয়েছে, যা সম্পাদকীয়ের নিজস্ব হিসাব, যাচাই করা সরকারি তথ্য নয়। সমালোচকেরা চুক্তিটিকে ‘অসম’ বলছেন। এই মূল্যায়ন তাঁদের, কোনো আদালত বা সালিশের রায় নয়। নির্বাচিত সরকারের বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ফেব্রুয়ারিতে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের রিপোর্ট বিস্তারিত পর্যালোচনা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক চুক্তিতে আইনি জটিলতা অনেক, তাই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত হবে না। আদানি জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে তখনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়নি। একই প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ বিভাগ-সূত্রের বরাতে শুল্ক ফাঁকির কথাও এসেছে। এটি অপ্রমাণিত দাবি, এতে কারও বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ নেই। জ্বালানি সংকটে ভারতের ডিজেল সহায়তা আর আদানির বকেয়া নিয়ে বিতর্ক পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, নির্ভরতা দুই দিকেই কাজ করে: একপক্ষের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, অন্যপক্ষের বাজার।
ট্রানজিট ও করিডোর নিয়ে সংগৃহীত তথ্য সবচেয়ে পাতলা, এবং সে কথা খোলাসা করাই ভালো। ঢাকা–দিল্লির মধ্যে নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক ট্রানজিট বা করিডোর চুক্তির খবর অনুসন্ধানে মেলেনি। যা পাওয়া গেছে, তা ছড়ানো ছিটানো। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত বাংলাদেশি তৈরি পোশাক তৃতীয় দেশে পাঠানোর জন্য ভারতের বিমানবন্দর ব্যবহারের যে পরিবহন সুবিধা চালু ছিল, তা বন্ধ করে দেয়। চট্টগ্রাম চেম্বার বন্দরকে আঞ্চলিক ট্রানজিট ও লজিস্টিকস কেন্দ্র করার প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে যাচ্ছে, আর শ্রমিক-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদের কথা আসছে। করিডোর শব্দটি বাংলাদেশে একাধিক অর্থে এসেছে। ২০২৫ সালে রাখাইনে ‘মানবিক করিডর’ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের দাবি উঠেছিল। ২১ জুলাই ইনকিলাবের একটি লেখায় যুক্তি দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে প্রায় সম্পূর্ণ ভারত দ্বারা বেষ্টিত বলে চীনের সঙ্গে করিডোর নিরাপত্তার ভারসাম্য বাড়াতে পারে। ওদিকে ভারত নিজের শিলিগুড়ি করিডোর আরও সুরক্ষিত করছে। দুই পক্ষই করিডোরকে প্রথমে নিরাপত্তার চোখে দেখে, বাণিজ্যের চোখে নয়। প্রস্তাব আছে, চুক্তি নেই। এই শূন্যতাই ভুল বোঝাবুঝির সবচেয়ে উর্বর জমি।
ভিসার ক্ষেত্রে ছবি এখন তুলনামূলক ইতিবাচক, যদিও পথটা বন্ধুর ছিল। ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদনে ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ভারত বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৬ লাখ ভিসা দিত। পরে ভিসা আবেদন কেন্দ্র ১৬টি থেকে ৫টিতে নেমে আসে, আর পর্যটন ভিসা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে। একই প্রতিবেদনে ভিসা এজেন্ট ও দালালদের পোর্টালে কৃত্রিম জট তৈরির অভিযোগ ছিল। ২০২৫ সালের শেষ দিকে পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ দেখা যায়। বাংলাদেশ কলকাতা, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ের উপদূতাবাস থেকে ভারতীয়দের পর্যটক ভিসা সীমিত করে। ভারত চিকিৎসা ও জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভিসা প্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ রাখে। ২০ ফেব্রুয়ারির দিকে বাংলাদেশ ভিসা কার্যক্রম আবার চালু করে। টিবিএস নিউজ বাংলা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে জানায়, এ পর্যন্ত ভারতীয়দের ১৩ হাজারের বেশি ভিসা দেওয়া হয়েছে। তখন বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা সেবা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের আগের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চালু ছিল। জুনের শেষে ভারত বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটক ভিসা আবার চালুর কথা জানায় । মানবজমিন লিখেছে, ওই ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচটি ভিসা আবেদন কেন্দ্রে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিকিৎসা ভিসার সীমাবদ্ধতায় অনেক রোগী পর্যটক ভিসা ব্যবহার করে ভারতের হাসপাতালে যান। বিধিনিষেধের সময় ভারতযাত্রীর সংখ্যা কমে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজারে নেমেছিল, যাঁদের বেশির ভাগ চিকিৎসা ভিসায় গেছেন। এই বিধিনিষেধ শিক্ষার্থী ও পর্যটন খাতে কতটা অর্থনৈতিক ক্ষতি করেছে, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান এই অনুসন্ধানে মেলেনি। তাই সে প্রশ্নে সংখ্যা বসানো অনুমান হয়ে যেত।
তথ্যযুদ্ধের প্রশ্ন নিয়ে কথা বলতে হলে আগে বলা দরকার, কারা কীভাবে গুনছে। বাংলাদেশভিত্তিক তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের হিসাবে ২০২৪ সালে ৩২টি ঘটনায় ভারতের ৭২টি সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ভুল তথ্য প্রচারিত হয়েছে। ভারতীয় অ্যাকাউন্ট ও পেজের ছড়ানো অপতথ্য অন্তত ২৫ কোটি বার দেখা হয়েছে। অন্তত ১৩টি ঘটনায় ভারত বা অন্য দেশের ঘটনাকে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক হামলা বলে চালানো হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে ২০টি ঘটনায় ২৩টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ৩৮টি অপতথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। গত মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ডিসমিসল্যাব জানিয়েছে, গুজরাটের একটি অপহরণের ভিডিও বাংলাদেশে হিন্দু মেয়েকে তুলে নেওয়ার দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে। ভিডিওটি প্রতিবেদন প্রকাশের আগে প্রায় ২ লাখ ৯৮ হাজার বার দেখা হয়েছে। ডিসমিসল্যাবের মে মাসের আরেক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের প্রচারে বিজেপি ‘পশ্চিম বাংলাদেশ’ বয়ান তৈরিতে বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও বাংলাদেশ-সংক্রান্ত অপতথ্য ব্যবহার করেছে। এটি একটি যাচাইকারী সংস্থার দাবি। এ প্রসঙ্গে বিজেপির পক্ষের বক্তব্য সংগৃহীত তথ্যে মেলেনি। ভারতীয় গণমাধ্যম নিজেও কিছু ভিডিও যাচাই করেছে। ইন্ডিয়া টুডের ফ্যাক্টচেকের কথা ডিসমিসল্যাবের অন্য একটি প্রতিবেদনে এসেছে। এখানে একটি ফাঁক স্পষ্ট বলা দরকার। বাংলাদেশের মূলধারা বা সামাজিক মাধ্যমে ভারত-সংক্রান্ত অপতথ্যের তুলনীয় কোনো সামষ্টিক পরিসংখ্যান অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। তাই এক পক্ষ বেশি অপতথ্য ছড়ায়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। বলা যায় শুধু এটুকু: যাচাইয়ের কাঠামো এখন বেশি তথ্য তৈরি করছে একটি দিকে। ‘বয়কট ইন্ডিয়া’ ক্যাম্পেইনের পরিধি বা মনস্তত্ত্ব নিয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য জরিপ বা গবেষণাও মেলেনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে, তবে সেটা মূলত সুতা ও কাঁচামালের কারণে। ভোক্তাপর্যায়ের বয়কটের প্রভাব এই সামষ্টিক সংখ্যায় ধরা পড়ে না। সে জন্য আলাদা তথ্য দরকার।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি তথ্যদূষণে জড়ানো প্রশ্ন, তাই সংখ্যাগুলো কে কীভাবে গুনেছে, তা না জানিয়ে কিছু বলা যায় না। ২০২৪ সালের ৪ থেকে ২০ আগস্টের ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ২ হাজার ১০টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অভিযোগ তোলে। পুলিশের অনুসন্ধানে উঠে আসে, এর মধ্যে ৯৮ শতাংশ ঘটনা রাজনৈতিক কারণে ঘটেছে, সাম্প্রদায়িক কারণে ঘটেছে সামান্য অংশ। ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংসদে আগস্ট-পরবর্তী সময়ে প্রায় ৩ হাজার ১০০ হামলার কথা বলেছেন বলে বিডি-ভয়েসের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। সংখ্যাটির মূল সূত্র আলাদাভাবে যাচাই করা যায়নি। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ঐক্য পরিষদের নথিভুক্তিতে ৪০টি ঘটনায় ৪৪ জন ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিহত হয়েছেন। সংগঠনটির দাবি, এর পাশাপাশি উপাসনালয় ও প্রতিমা ভাঙচুরের ১৫টি এবং জমি দখল বা দখল-চেষ্টার ১৫টি ঘটনা ঘটেছে, আর নিগ্রহের শিকারেরা অনেক ক্ষেত্রেই বিচার পাচ্ছেন না। এই সংখ্যা সংগঠনটির নিজস্ব গণনা। এখানে ‘নিহত সংখ্যালঘু’ আর ‘সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে হত্যা’ এক জিনিস নয়, আর বিতর্কের অনেকটাই এই পার্থক্যে। গত বছরের শেষ দিকে রাজবাড়ীর পাংশার একটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈরিতাকে উদ্বেগজনক বলেছিল। বাংলাদেশ সরকার বলেছিল, ওই ঘটনা সাম্প্রদায়িক নয়, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জের। একটি গণনা শিকারের পরিচয়ে, আরেকটি ঘটনার উদ্দেশ্যে। ফলে সংখ্যা মেলে না, মেলার কথাও নয়। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই প্রশ্ন কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তার কিছু ছবি আগের অনুচ্ছেদের অপতথ্য-প্রসঙ্গে এসেছে। কিন্তু সংখ্যালঘু হত্যা বা নির্যাতনকে অপতথ্যের কারণে অস্বীকার করার সুযোগও নেই। দুটো সত্য একসঙ্গে টিকে থাকে।
চীনের উপস্থিতি নিয়ে ভারতের উদ্বেগের নথিভুক্ত অংশ আসলে সীমিত, কিন্তু বাস্তব। ভারতীয় সংসদীয় কমিটি ঢাকা–ইসলামাবাদ সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস এবং অবকাঠামো, বন্দর ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের সুপারিশ, বাংলাদেশে কোনো বিদেশি শক্তির সামরিক ঘাঁটি যেন না বসে সে জন্য নজরদারি জোরদার করা এবং উন্নয়ন, সংযোগ ও বন্দর-সুবিধায় ঢাকাকে তুলনামূলক সুবিধা দেওয়া। এনডিটিভির বরাতে বাংলা ট্রিবিউন লিখেছে, লালমনিরহাটের পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি চীনের সহায়তায় চালুর সম্ভাবনায় ভারতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঘাঁটিটি শিলিগুড়ি করিডোর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে বলে ইনকিলাবের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বলেছে, এটি একটি সম্ভাব্য প্রকল্প মাত্র, যার উদ্দেশ্য প্রতিরক্ষা ও বেসামরিক অবকাঠামো শক্তিশালী করা। প্রস্তাবের হিসাবে চীন সবচেয়ে এগিয়ে। ২৫ জুন বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে চীনের ১১টি প্রতিষ্ঠান ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে, যার মধ্যে মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল ও লজিস্টিকস হাবে ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব আছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের হিসাবে ১৮০ দিনের পরিকল্পনার বিনিয়োগ-পাইপলাইন ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে চীন থেকে ৬০ কোটি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩০ কোটি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০ কোটি এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০ কোটি ডলার। পাইপলাইনের ৪০ কোটি ডলারের বেশি সিদ্ধান্ত বা বাস্তবায়ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রস্তাব আর প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ এক নয়। চীনা প্রস্তাবের সব অঙ্ক বাস্তবায়িত হওয়ার প্রমাণ নেই। সামরিক ঘাঁটির আশঙ্কার পক্ষে কোনো স্বাক্ষরিত সামরিক চুক্তির প্রমাণও সংগৃহীত তথ্যে নেই। নথিতে আছে বাণিজ্যিক ও অবকাঠামো প্রস্তাব, আর তাকে ঘিরে এক পক্ষের নিরাপত্তা-আশঙ্কা।
বাণিজ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট সংখ্যা মেলে, আর সেগুলো ‘বিধিনিষেধে বাণিজ্য থেমে গেছে’ ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি ১০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন থেকে ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি। ভারতে রপ্তানি ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়নের প্রায় সমান। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, প্রতিবেদনের সংখ্যা থেকে হিসাব। রপ্তানি আমদানির ছয় ভাগের এক ভাগেরও কম। চীনের পর ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। এই অচলাবস্থা পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের ফল। ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে এনবিআর স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি নিষিদ্ধ করে। ১৭ মে ভারত স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পাটজাত পণ্য ও আসবাবসহ কয়েকটি পণ্যের আমদানিতে বিধিনিষেধ দেয়। ২৭ জুনে বিধিনিষেধ বাড়ে, আগস্টে পাটপণ্যেও। এসব পণ্য এখন নির্দিষ্ট সমুদ্রবন্দর দিয়েই ঢুকতে পারে। ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান প্রথম আলোকে বলেছেন, জটিলতা মূলত রাজনৈতিক। বাংলাদেশ স্থলবন্দরে সুতা আমদানি বন্ধ করার পরই ভারত বিধিনিষেধ দিয়েছে। বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ২ লাখ ১ হাজার ৭৩৫ টন থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ লাখ ৩৬ হাজার ১৬৫ টনে নেমেছে। প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামালের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতে তাদের রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেছেন, সুতা আমদানি প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তাঁর দাবি, আগে এর বড় অংশ অনানুষ্ঠানিকভাবে স্থলপথে আসত, এখন সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে নথিভুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ পরিসংখ্যানের কিছুটা বৃদ্ধি বাস্তব বৃদ্ধি নয়, নথিভুক্তির পরিবর্তনও হতে পারে। পাটে শুল্কযুদ্ধ নতুন মোড় নিয়েছে। ২০১৭ সালে প্রথম অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসানোর পর মেয়াদ ২০২৩ সালে আরও পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছিল। ভারত ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশি পাটপণ্যে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে। চার দিনের মাথায় সাবসিডিবিরোধী (কাউন্টারভেইলিং) শুল্ক টনপ্রতি ১৪০ ডলারের সুপারিশও এসেছে। দুটো মিলিয়ে টনপ্রতি ৫৮৫ ডলার। গত অর্থবছরে ভারতে পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছিল ৮০ হাজার টন। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ১৮ আগস্ট ঢাকায় কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী কয়েক মাসে বিধিনিষেধ নিয়ে অগ্রগতি হতে পারে। এই সপ্তাহের যৌথ কার্যদলের বৈঠক সেই আশারই প্রথম পরীক্ষা।
সব মিলিয়ে নথিভুক্ত চিত্র কোনো গোপন নকশার নয়, জমে ওঠা অসমাধানের। সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ যেসব জায়গায়, সেখানেই কাঠামোগত অস্বচ্ছতা সবচেয়ে বেশি। সীমান্তে হত্যার কোনো যৌথ যাচাই-করা খতিয়ান নেই। আদানি চুক্তির পর্যালোচনা প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। হাসিনার প্রত্যর্পণের আইনি পর্যালোচনার মানদণ্ড ও সময়সীমা অজানা। তিস্তা ও গঙ্গার ক্ষেত্রে নদীর প্রবাহ-তথ্য ও আলোচনার অগ্রগতি জনসমক্ষে নেই। অপতথ্যের হিসাবের পদ্ধতি এক পক্ষের যাচাই-সংস্থার ওপর দাঁড়িয়ে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষের দাবিকেই চূড়ান্ত বলা সম্ভব নয়। দুই দেশের জন্য কাজে লাগার মতো মানদণ্ড তাই সহজ। যা যাচাই করা যায় তা প্রকাশ করতে হবে, যা দাবি তার পাশে যাচাইয়ের পথ খোলা রাখতে হবে, আর সময়সীমা ঘোষণা না করে কোনো সমাধানের কথা বলা যাবে না। যৌথ কার্যদলের বৈঠকের ফল এখনো অজানা। কিন্তু গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ ফুরানোর তারিখ, ১২ ডিসেম্বর, অজানা নয়।




