মেহেদি রাঙা শাড়ির আঁচল

১
ভাত খাচ্ছে নুরু। চিকন চিকন ফালি করা খেজুর পাতার পাটির উপর আয়েস করে বসেছে সে। গোলপাতায় ছাওয়া কঞ্চির বেড়ার দো-চালা ঘর। চালে কয়েকটি ফুটো। সেখান থেকে একগুচ্ছ আলোর ছটা এসে পড়েছে ভাতের থাল আর নুরুর রোদ-পোড়া তামাটে মুখে। তাতে অখ্যাত দরিদ্র এই কুঁড়েঘরটা স্বর্গীয় এক আলোকসভায় ভরে উঠেছে। হালকা বাতাসে চালের উপর সিরিশ গাছটার সাথে সাথে ভেতরের আলোকরশ্মিগুলোও এলোমেলো দুলছে। আলো-আঁধারি আর চিরচেনা সুখ-দুঃখ যেন এক বিস্ময়কর খেলায় মেতেছে একই সমতলে।
-’আর ইট্টু ঝোল দিত পারিস মজি, গলা যে আইটকে আইটকে আসে। পাতে একটা কাঁচা ঝাল ডলতে ডলতে বলে নুরু’।
কাঁচা মেঝেতে একটু পানি পড়ে কিছুটা জায়গা পিচ্ছিল হয়ে উঠেছে নুরুর বা’পাশটায়, ঠিক যেখানে পিঁড়ি পেতে বসে আছে মর্জিনা। হঠাৎ করে ‘মাগো’ বলে ঠিক ঐ জায়গাটাতে হাঁটু মুড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে সে। এক চামচ ঝোল আর কিছু বাগদা চিংড়ি ছড়িয়ে পড়ে সারা ঘরে। ফরাৎ শব্দ করে শাড়ির কিছু অংশ ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়ে কাঁচা হলুদ-রঙা মসৃণ হাঁটু। দৃষ্টিটা সেখানেই আটকে যায় নুরুর। সেলাইয়ের পর সেলাই দিতে দিতে শেষতক সেলাইয়ের ভারেই ছিঁড়ে হা হয়ে গেছে শাড়িটা। ঝাঁপসা আলোয় আরো কয়েকটি ছেঁড়া-তালি নজরে আসে তার। অন্য কোনো দিন যে দেখে না, তা নয়। কিন্তু আজকে কে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে প্রতিটি তালি, সেলাইয়ের প্রতিটি ফোড়গুলোও। এভাবে ছিঁড়তে ছিঁড়তে যদি সমস্ত শাড়িটাও নিঃশেষ হয়ে যায় তবুও কোনো টু শব্দ করবে না মর্জিনা। মুখ খুলে একটা শাড়ির আবদারও করবে না কোনো দিন। হিমালয়ের মতো বিশালদেহী এক ধৈর্য লুকিয়ে আছে ওর সারা দেহ-মন জুড়ে।
বার বছর দাম্পত্য জীবনে এমন কি দিয়েছে সে। রূপোর সেই কানের দুল দুটো ছাতা পড়ে কালচে হয়ে গেছে। সোনার নাকফুলটা তো নৌকা বানাতে যেয়ে বেচতে হয়েছিল বছর তিনেক আগে। আবেগ তাড়িত হয়ে পড়ে নুরু। সদ্য ভেজা মাটির মতো নরম হয়ে আসে তার মন। এবার মৌ বেচে নওয়াবেকির হাট থেকে একটা শাড়ি না কিনে বাড়ি ফিরবে না সে, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে।
তড়িঘড়ি করে ভাতের থাল রেখে বা’ হাত দিয়ে তুলতে যায় মর্জিনাকে। কিন্তু ততক্ষণে উঠে বসে কাপড়টা সামলে নেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাতে থাকে নুরুর দিকে। রোদ-পোড়া এই হাড় জিরজিরে মানুষটাকে সে এমন বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলতে চায় না। মর্জিনা সব বোঝে। বাঘ-কুমিরের মুখ থেকে মৌ, গোলপাতা ছিনিয়ে আনার পর বনদস্যুদের হিস্যা মিটিয়ে বড়সড় একটা অংশ যায় দাদনদার-মহাজনদের ভুঁড়িওয়ালা পেটে। বাকি যা থাকে তা দিয়ে কিইবা করার আছে নুরুর, ভাবতেই চোখ ভিজে আসে মর্জিনার। আবছা আলোতে তা হয়তো দেখতে পায় না নুরু। তাতে কি যায় আসে মর্জিনার। একজন মানুষ তাকে বড় ভালোবাসে, সব সময় তার পাশেই থাকে, একেবারেই খুব পাশে। এতেই তার ঢের তৃপ্তি, এতেই তার আনন্দ। যখন কলাতলার চর কিংবা অন্য কোথাও থাকে তখনও তাকে খুব দূর-দূর মনে হয় না। চোখের তারায় তারায় ভেসে ওঠে ওর রোদ-পোড়া মুখ। প্রতিটা শ্বাস-প্রশ্বাস এমনকি মৌচাক দেখে ‘আল্লা’ ‘আল্লা’ বলার আওয়াজটাও শুনে নিতে পারে দখিনা বাতাসে দু’কান পেতে। এসব নিয়ে বড় সুখেই থাকতে চায় মর্জিনা এই ভাঙা কুঁড়েঘরে।
প্রত্যন্ত এসব জীর্ণকুটির যেন আদম-ইভের এক-একটা স্বর্গনীড়। কংক্রিটের বেষ্টনীতে বন্দী শহুরে জীবন-যন্ত্রণার কোনো স্থান এখানে নেই। এ ঘর দুঃখ দেখেছে, ফোটা ফোটা কান্নার জল দেখেছে কিন্তু হাত তিনেক লম্বা শপিংয়ের লিস্ট কিংবা বিউটিপার্লারগামী কোনো শহুরে ক্লিওপেট্রা দেখেনি। দুই টাকার বাজার থেকে কেনা ছোট্ট কানের দুল এ ঘরে মহামূল্যবান কোহিনূর হয়ে ঢুকে পড়ে। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার বিস্তর গা-মাখামাখি চলে এখানে বারোটা মাস ধরে। যেভাবে একাধিক রং গলাগলি করে থাকে হাশেম খানের ক্যানভাসে। গোলপাতার চাল আর কঞ্চির বেড়ার ভাঁজে ভাঁজে হয়তো অসংখ্য ছিদ্র খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু সুখ-দুঃখগুলো কেন যে বের হয় না এসব ফুটো-ফাটা দিয়ে, আমি জানি না। পোষমানা প্রাণীর মতো সারাটা ঘর জুড়ে কেমন যেন ঘুরঘুর করে বেড়ায়।
– ‘দে গামছাটা দে বাতাস ভাল ঠিকতেছে নারে যত তাড়াতাড়ি ঘাটেত্তে লা ছাড়া যায় তত ভালো, বুইছিস।’
ব্যস্ত কণ্ঠে বলে ওঠে নুরু। ছেঁড়া গামছাটা বের করে কি মনে করে রেখে দেয় মর্জিনা।
-‘এট্টা সেলাই দেবারও যাগা নেই এতে। সব ফুটো ফুটো হুয়ি গেছে। আমার পুন্নো শাড়ির আজলাডা ছিড়ি দিতিছি এইডা মাজায় বাইন্দে ন্যাও। এবার মৌ বেচা টাকা দে’ এট্টা নতুন গামছা কিনি নেবা, বুইছাও।’
একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে গড়গড় করে কথাগুলো বলে যায় মর্জিনা। নুরু হাতে নেয় শাড়ির টুকরোটা। ছোট ছোট গোটা কয়েক ছেঁড়া-ফাটা চোখে পড়ে। ‘ঠিক আছে’ বলে কোমরে বেঁধে গোবরার ঘাটের দিকে দৌড়ায়, পিছনে ফিরে তাকাবার সময়টুকু আর হয় না। পিছন থেকে শুধু একটি সাবধানী আওয়াজ শুনতে পায়, ‘বাদা-বনে দিকি শুনি উঠো কিন্তু…। দোয়া ইউনুসটা পুড়ি নেবা লুকোয় উঠিপ্পার…।’ দৌড়ের গতি বেড়ে যায় নুরুর, সাবধানী কণ্ঠটাও ক্ষীণ হতে হতে এক সময় আর শোনা যায় না।
-
২
— ‘নে এট্টা কাড়ু ধরা নুরু, দেখি দু’এক্কান মৌচাক-টাক ভাঙা যায় কিনা।’ ডেরায় বসে নৌকার খোলে জমা হওয়া পানি সেচতে সেচতে বলে ওঠে মন্টু। নিস্তরঙ্গ নদীর বুকে সে পানি ঝপাত ঝপাত শব্দে এক সুরের মূর্ছনা তোলে নিঃসঙ্গ প্রকৃতির মায়াবী পর্দা জুড়ে। এই একটা ঝামেলা, ভাবে নুরু। চিকন লগি জোগাড় করো। তার মাথায় আধ-শুকনো খড় বাঁধো, তাতে আগুন লাগাও। আগুন জ্বালালেই কি শেষ। ধোঁয়া বের করতে হবে, কুচকুচে কালো ধোঁয়া। তারপর সেই কাড়ু দাঁতে কামড়ে ধরে বাঁদরের মতো ডালে ঝুলে ঝুলে চাকের মৌপোকা খেদানো কি এত সহজ কাজ। ধোঁয়ায় অতিষ্ঠ পোকারা আবার হুল মারবে নির্বিচারে। এসবের মধ্যে নিচে ধামাপেতেই তবে মৌ সংগ্রহ করা। হালকা একটা হাসির রেখা ফুটে ওঠে রোদ-চকচকে মুখে। এসব ঝক্কি-ঝামেলায় নুরুদের আনন্দ, এসবের মধ্যে মৌয়াল-বাওয়ালীদের জীবন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। আরো গোটা কয়েক টান মেরে পাতার বিড়িটা গোড়ালি দিয়ে পাড়া মেরে নিভিয়ে ফেলে নুরু। ধোঁয়াগুলো গোলার মতো ছুড়ে মারে শূন্যে। কাড়ুটাও প্রায় শেষ করে এনেছে সে। দা, ধামা আর ড্রাম নিয়ে প্রস্তুত অন্যান্যরা।
গ্রীষ্মের সূর্যটা আটঘাট বেঁধে নেমেছে নীল ছামিয়ানার নিচে। শান্ত প্রকৃতির সাথে এক মহাদ্বন্দ্বযুদ্ধে নেমেছে যেন। আগুনের হলকায় ঝলসে যাবার জোগাড় হয়েছে কলাতলার কচি-কচি পত্র-পল্লব। রোদের মধ্যে ফুলে ওঠা ঢেউয়ের চূড়োগুলো স্বর্ণমুকুট পরে মাথা ঠুকছে চরের বুকে। সপাৎ সপাৎ শব্দে লাল কাঁকড়ার স্বপ্ন-সৌধগুলো চূর্ণ করে দিচ্ছে একের পর এক।
দক্ষ মৌয়ালের মতো বা’ হাতে কাড়ু নিয়ে সতর্ক পায়ে আগাচ্ছে নুরু। ডান হাতের দা-টা সমানে সাফ করে চলেছে লতা-গুল্মের ঝাড়। ধামা ও ড্রাম নিয়ে সাথে আছে মন্টু ও অন্যান্যরা। শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি তুলে ছুটছে তারা বনের সবচেয়ে উঁচু দিকটায়।
৩
দখিনা মাতাল করা হাওয়াটা এখনও বয়ে চলেছে। নাম-না-জানা কত বুনো ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। কড়ই গাছের মগডালে কর্কশ রবে ডেকে চলেছে একজোড়া দাঁড়কাক। শেষ বিকেলের মিইয়ে পড়া রোদে মর্জিনার লম্বা লম্বা ছায়া শুকনো কলাপাতার মতো দুলে দুলে উঠছে। ঘর ঝাড় দেওয়ায় মন দিতে পারে না সে। আর আজ কত দিন হলো ও গেছে। এখনো ফেরার নাম নেই। একটা চালও নেই ঘরে। ধার-কর্জ করে আর ক’দিন বা চলা যায়। নিজে ঝাল-পানি খেয়ে থাকলেও অবুঝ তিনটি প্রাণী তো কোনো কথা শুনতে চায় না। মনটা খারাপ হয়ে আসে তার। ওর কোনো বিপদ হলো না তো? হঠাৎ চোখ আটকে যায় সেই ছেঁড়াটায়। এবার ছেঁড়াটা আর সেলাই করার চেষ্টা করেনি, কি ভেবে রেখে দিয়েছে সেভাবে। সেদিন ছেঁড়াটার দিকে নুরুর নিস্পলক চেয়ে থাকার মধ্যে হয়তো কোনো আশ্বাস খুঁজে পেয়েছিল ও। এ কয়দিনে ছেঁড়াটা বেশ বড়সড় হয়েছে। যেন ছোটখাট এক গোপন সুড়ঙ্গ। এর ভিতর দিয়ে সব দেখা যায়। নদী, খাল, বন-বাদাড় পেরিয়ে কলাতলার চর এমনকি একজন হাড় জিরজিরে মানুষও।
রাস্তার দিক থেকে একটা কোলাহল ভেসে আসে। উঠান ঝাড় দেওয়া রেখে কোমর সোজা করে মর্জিনা। মন্টু সর্দারের গলা শোনা যায়। মনটা আশায় ভরে ওঠে। আনন্দে ক্ষুধার যন্ত্রণাও ভুলে যায় সে। ওরা তাহলে এসেই পড়েছে। দো-বেড়ার দিকে পা বাড়ায় ধীরে ধীরে। বেড়াটার শেষ মাথায় আকস্মাৎ মন্টুর মুখোমুখি হয়ে যায়। ঘোমটা টানতে টানতেও শেষ পর্যন্ত আর টানে না। এমন তো হওয়ার কথা না। বাড়ি ঢোকার সময় ও-ই তো সবার আগে থাকে। এরকম পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য মন্টুরও পূর্বপ্রস্তুতি ছিল। তবুও কেমন যেন জিহ্বাটা আড়ষ্ট হয়ে আসে। রাজ্যের কৌতূহলভরা চোখের দিকে তাকিয়ে সব ভাষা হারিয়ে ফেলে সে।
— ‘কিচ্ছু আনতি পারিনি ভাবি, কিচ্ছু আনতি পারিনি— এইডা ছাড়া।’ হাত দুটো বাড়িয়ে দেয় মন্টু।
নুরু ফিরে আসেনি, নওয়াবেকির হাট থেকে আসেনি নতুন কোনো শাড়িও। মন্টুর দু’হাতের উপর শুধু নুরুর খুনরাঙা সেই শতছিন্ন শাড়ির আঁচলটা বৈধব্যের নিশান হয়ে দুলছে দখিনা বাতাসে।
বাঘে ধরা কত মানুষ তো ছাড়িয়ে এনেছে মন্টুরা, হোক মৃত কিংবা আধ-খাওয়া শরীর। কিন্তু এবার কিছুই করতে পারেনি তারা। দুই বাঘ বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে অল্প সময়ে সব সাবাড় করে দিয়েছে। এই রক্তাত শাড়ির আঁচল ছাড়া তেমন কিছু বাকি রাখেনি। লুঙ্গিটা টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল চারপাশে।
হঠাৎ সমস্ত আকাশ যেন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে মর্জিনার মাথার উপর। পায়ের তলা থেকে সমস্ত পৃথিবী যেন ছুটে চলেছে ক্ষুধার্ত কোনো কৃষ্ণগহ্বরের পেটে। আর বিশাল শূন্যে সে দাঁড়িয়ে থাকে একাকী। কোনো কথা বলতে পারে না। চোখের জলবাহী নালিগুলো যেন শুকিয়ে গেছে এই মুহূর্তে। যন্ত্রের মতো রক্তাত শাড়ির আঁচলটা দু’হাতে নিয়ে কচলায় কয়েকবার। ছোপ ছোপ জমাট রক্তে ফর্সা হাত দুটো হোলি উৎসবে মেতেছে বিয়ের দিনের সেই মেহেদি রাঙা হাতের মতো। বড় বু’ খয়ের দিয়ে মেহেদি বেটেছিল সেদিন শিল-পাটায় ফেলে। ‘দেখিস কি রঙ না হয় তোর সারা হাত-পা আর মন-পরান জুড়ে’ বলেছিল ঠোঁটের কোণায় বাঁকা বাঁকা হাসি টেনে। মর্জিনা ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে ঢলে পড়ে সদ্য ঝাড় দেওয়া উঠানে। মূর্ছা যায় সে।
সাদা বকের সারিগুলো কার্পাসের সুতোর মতো চিকন হতে হতে দিগন্তে মিশে যাচ্ছে। একঝাঁক গো-শালিক ডাকাডাকি শুরু করেছে তেঁতুল গাছটায়। ঝিঙে মাচায় উঠে ডেকে ডেকে দিনের সমাপ্তি ঘোষণা করে যাচ্ছে জরিনা দাদীর মোরগটা।
শুধু সমাপ্তি নেই মর্জিনার নিরলস ঘুমের। গোধূলির লালচে আভা তার হাতের টুকটুকে লাল খুন যেন আরো গাঢ় করে তুলেছে— ঠিক খয়ের মেশানো মেহেদির মতো। মোরগটা তখনও ডেকে চলেছে বিরতিহীনভাবে গলা বাগিয়ে।
