এলপিজি: সরকারি দাম ১,৮৩৭, বাজারে ২,৬০০—মাঝের ফাঁক কোথায়?
বিইআরসি অক্টোবরের জন্য ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১,৮৩৭ টাকা করেছে। রাজধানীর কয়েকটি বাজারে ৫ অক্টোবর বিক্রি হয়েছে ২,২০০ থেকে ২,৬০০ টাকায়। সরকার ও অপারেটররা আমদানি পর্যাপ্ত বলছেন। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) প্রতিবেদনে অভিযোগ আছে, পাঁচটি কোম্পানি ২২ সেপ্টেম্বর থেকে আমদানি করা…

সরকার ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ঠিক করেছে ১,৮৩৭ টাকা। সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর মোহাম্মদপুর, কারওয়ানবাজার, নিউমার্কেট ও হাজারীবাগে খোঁজ নিয়ে রাইজিংবিডি দেখেছে, একই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২,২০০ থেকে ২,৬০০ টাকায়। বাড়তি টাকার অঙ্ক তাহলে ৩৬৩ থেকে ৭৬৩। কোথাও কোথাও বাড়তি দাম দিয়েও গ্যাস মেলেনি।
এই টাকার হিসাব প্রকাশ্যে কেউ দিতে পারছেন না। ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি বিভাগের বৈঠকে আমদানিকারক ও অপারেটররা মন্ত্রীকে জানান, দেশে এলপিজির সংকট নেই। দুই দিন পর, ৩০ সেপ্টেম্বর, জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জেলা প্রশাসকদের বলেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে কি না, তা প্রমাণসহ জানাতে। ৪ অক্টোবর বিইআরসি দাম বাড়ায়। ৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, অনিয়ম ও অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে জরিমানা জোরদার করা হয়েছে।
একই সপ্তাহে “সংকট নেই” এবং “কৃত্রিম সংকট খুঁজে দেখো” দুটি বার্তাই সরকারের মুখ থেকে এসেছে। দুটি একসঙ্গে ঠিক হতে পারে, যদি গ্যাস দেশে থাকে কিন্তু ভোক্তার কাছে না পৌঁছায়। সমস্যা হলো, গ্যাস ঠিক কোথায় আটকে আছে, তা মাপার মতো প্রকাশ্য তথ্য নেই। ৩০ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের খবরে বিডিনিউজ জানিয়েছে, সে সময় দেশে মোট কত এলপিজি মজুত ছিল, সেই পরিমাণ মন্ত্রণালয় জানায়নি।
কাগজের হিসাবে সরবরাহ কম নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে মন্ত্রণালয় বলেছে, আগস্টে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এবং ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। এনএসআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী পুরো সেপ্টেম্বরে আমদানি প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন। অথচ ২৮ সেপ্টেম্বর ইত্তেফাকের একটি প্রতিবেদনে আমদানি ২৫ শতাংশ কমার কথা এসেছে। ওমেরা পেট্রোলিয়ামের প্রধান নির্বাহী তানজীম চৌধুরী ওই প্রতিবেদনে বলেছেন, সেপ্টেম্বরে তাঁরা প্রায় ৩০ হাজার টন এনেছেন। যুগান্তরের প্রতিবেদনে সংস্থাটির সেপ্টেম্বরের আমদানি ১৪ হাজার ৫০০ টন। তারিখের কারণে এই পার্থক্য হতে পারে, তবে প্রকাশিত তথ্য থেকে তা নিশ্চিত করা যায় না।
আমদানির এই হিসাব বোঝার জন্য বাজারের গড়ন জানা দরকার। সরকারি হিসাবে দেশে বছরে এলপিজির চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন। যুগান্তর লিখেছে, এর ৯৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ সরবরাহ করে বেসরকারি খাত, সরকারি খাতের ভাগ ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বিপিসির আওতাধীন এলপিজি গ্যাস লিমিটেড চাহিদার ২ শতাংশেরও কম জোগান দেয়, মজুতের সক্ষমতাও সামান্য। ফলে দাম, মজুত ও সরবরাহের প্রায় সবটাই বেসরকারি ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়িয়ে।
বেসরকারি খাতের ভেতরেও কেন্দ্রীভবন বেশি। জ্বালানি বিভাগের এক প্রতিবেদনের বরাতে যুগান্তর জানিয়েছে, ওমেরা পেট্রোলিয়াম, পেট্রোমেক্স, মেঘনা ও যমুনা স্পেসটেক—এই চার কোম্পানি বাজারের ৬৮ শতাংশ সরবরাহ করে। বিএম এনার্জির ভাগ ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আয়গ্যাজের ৭, ডেল্টার ৪, জেএমআই ও প্রিমিয়ামের ৩ করে। বিপিসির তথ্য উদ্ধৃত করে জাগো নিউজ লিখেছে, দেশে আমদানি ও বোতলজাতের অনুমোদন আছে ৩০টি প্রতিষ্ঠানের, আমদানি টার্মিনাল আছে ২৩টির। গত অর্থবছরে আমদানি করেছে ১৭টি প্রতিষ্ঠান, যাদের শীর্ষ ১০টি এনেছে মোট ১৭ লাখ ৬ হাজার ২০০ টনের মধ্যে ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩৫০ টন, অর্থাৎ প্রায় ৯০ শতাংশ। এই শতাংশ মিহা নিউজের হিসাব। চলতি সেপ্টেম্বরে যুগান্তরের তথ্যমতে মাত্র ১০টি কোম্পানি আমদানি করেছে।
কেন্দ্রীভূত বাজার মানেই সিন্ডিকেট নয়। অল্প কয়েকজন বিক্রেতা থাকলে তাঁরা সমঝোতা করে সরবরাহ আটকে রাখতে পারেন, আবার প্রত্যেকে আলাদাভাবে একই ব্যবসায়িক যুক্তিতে চললেও ফল একই দাঁড়াতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে সেটি আইনভঙ্গ, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বাজারকাঠামোর দুর্বলতা। প্রকাশিত তথ্য থেকে কোনটি ঘটছে, তা এখনো বলা যায় না।
দামের যুক্তি বুঝতে বিইআরসির সূত্র দেখা যায়। প্রতি মাসে সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস, জাহাজভাড়া, ব্যবসায়ীর প্রিমিয়াম ও ডলারের বিনিময় হার ধরে দাম নির্ধারণ হয়। রাইজিংবিডি জানিয়েছে, অক্টোবরের হিসাবে ধরা হয়েছে টনপ্রতি ২৫০ ডলার ফ্রেইট ও ট্রেডার প্রিমিয়াম এবং ডলারপ্রতি ১২৩ টাকা ১৮ পয়সা। এসআইবি নিউজের সূত্রে বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী প্রোপেনের সৌদি সিপি টনপ্রতি ৬৮০ ডলার, বিউটেনের ৭৩০ ডলার। পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার কমিশন ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৫০ ও ৪৫ টাকা।
২০২৬ সালের দামের গতি এক নজরে দেখা যেতে পারে। বছরের শুরুতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি দাম ছিল ১,৩০৬ টাকা। এপ্রিলে ৩৮৭ টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১,৭২৮ টাকা, মে মাসে আরও ২১২ টাকা বেড়ে ১,৯৪০, যা এ বছরের সর্বোচ্চ। জুনে ৫৫ টাকা কমে ১,৮৮৫, জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমে ১,৫২৮। আগস্টে ৭০ টাকা বেড়ে ১,৫৯৮ এবং সেপ্টেম্বরে ১৩ টাকা কমে ১,৫৮৫ টাকা। অক্টোবরে আবার ২৫২ টাকা বেড়ে ১,৮৩৭। বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী ১০ মাসে দাম বেড়েছে পাঁচবার, কমেছে চারবার, মোট বৃদ্ধি ৫৩১ টাকা বা প্রায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ।
এই ওঠানামার পেছনে বিশ্ববাজারের ধাক্কা আছে। যুগান্তর লিখেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর কিছুদিনের মধ্যে দেশে এলপিজি নিয়ে সংকট দেখা দেয়। বিইআরসি অক্টোবরের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক দাম, জাহাজভাড়া ও পরিবহনের ডিজেলের দাম বাড়ার কথা বলেছে। ২৫ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরের একটি প্রতিবেদনে আমদানিকারকদের বরাতে বলা হয়, প্রিমিয়াম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় অনেকে এলপিজি আনছেন না। ২৮ সেপ্টেম্বরের ইত্তেফাকের প্রতিবেদনেও ব্যবসায়ীদের একটি ভাষ্য আছে, লোকসান এড়াতে তাঁরা আমদানি সীমিত রেখেছেন।
এর বিপরীত ব্যাখ্যাটি এসেছে এনএসআইয়ের কাছ থেকে। ১ অক্টোবর জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া প্রতিবেদনের তথ্য প্রভাত নিউজ ও বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রকাশ করেছে। তাতে অভিযোগ, ২২ সেপ্টেম্বর থেকে আইগ্যাস, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি ও যমুনা আমদানি করা এলপিজি বাজারে ছাড়েনি। সংস্থার ভাষ্য, স্বাভাবিক সরবরাহের বদলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস মজুত রাখা হয়ে থাকতে পারে। অক্টোবর থেকে টনপ্রতি বাজার প্রিমিয়াম প্রায় ৬৪ ডলার বাড়ার সঙ্গে এই সময় মিলে যাওয়ায় বিষয়টি খতিয়ে দেখার অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের ভাষা লক্ষ করার মতো। এতে “হয়ে থাকতে পারে”, “খতিয়ে দেখা জরুরি” ও “তদন্ত প্রয়োজন” ধরনের কথা আছে। এটি একটি গোয়েন্দা সতর্কবার্তা, প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়। সংস্থাটি চেয়েছে, ২২ সেপ্টেম্বর থেকে আমদানিকারকদের মজুত, খালাস ও বাজারে ছাড়ার তারিখের তথ্য জরুরিভিত্তিতে নিরীক্ষা করা হোক। নামোল্লেখ করা পাঁচ কোম্পানির নিজস্ব বক্তব্য এই প্রতিবেদনের তথ্যসূত্রে পাওয়া যায়নি। অপারেটরদের সংগঠন লোয়াব বলেছে, সেপ্টেম্বরের আমদানি চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট এবং কৃত্রিম সংকটের সুযোগ নেই।
দুটি ব্যাখ্যা পরস্পরবিরোধী মনে হলেও একই কাঠামো থেকে জন্ম নিতে পারে। যে ব্যবস্থায় দাম মাসে একবার ঠিক হয়, সেখানে মাসের শেষ দিকে দুটি ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করে। দাম বাড়ার আগে ছাড়লে আমদানিকারকের লোকসান, আবার দাম কমে আসার আশঙ্কা থাকলে ছাড়ার তাড়া। কোনটি কখন ঘটছে, তা নির্ভর করে ব্যবসায়ীর অনুমানের ওপর। এটি মিহা নিউজের বিশ্লেষণ, কোনো সূত্রের দাবি নয়। এই যুক্তি যাচাই করতে হলে প্রতিটি আমদানিকারকের আমদানি, খালাস ও বিক্রির তারিখভিত্তিক হিসাব লাগবে। এনএসআই ঠিক সেই হিসাবই চেয়েছে।
বিইআরসিও মাঠ পর্যায়ের তথ্য চাইতে শুরু করেছে। বার্তা২৪-এর খবর অনুযায়ী, কমিশন ১২টি আমদানিকারকের কাছে সেপ্টেম্বরের আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়েছে, যাদের মধ্যে ইস্টকোস্ট গ্রুপ, বিএম এলপিজি, পেট্রোম্যাক্স ও যমুনা স্পেসটেক জেভি আছে। সেই তথ্যের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
সরবরাহ শৃঙ্খলের শেষ ধাপে এসে গল্পটি আরও ঘোলাটে। কারওয়ানবাজারের এক পাইকারি বিক্রেতা রাইজিংবিডিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ডিপোতে সরবরাহ না এলে সংকট হয়, আর দাম কমানো-বাড়ানো সরকারের হাতে। এক খুচরা বিক্রেতা জানিয়েছেন, কোম্পানি বা পরিবেশকের কাছ থেকে নির্ধারিত দামে গ্যাস না পেলে তাঁদের ক্রয়মূল্যই বেড়ে যায়, ফলে সরকারি দামে বিক্রি কঠিন। ঢাকার বাইরে টাঙ্গাইলে আজকের পত্রিকার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেএমআই কোম্পানি দুই মাস ধরে সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধ রেখেছে এবং ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২,১০০ টাকায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিক্রেতারা বলেছেন ১,৯০০ থেকে ২,০০০ টাকা। অর্থাৎ বাড়তি দামের অঙ্ক জেলাভেদে আলাদা, আর এর কোনো সরকারি জরিপ নেই।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেছেন, বাড়তি টাকা পরিবহন, সরবরাহ সংকট, ডিলার-খুচরা কমিশন নাকি অন্য অনিয়মের কারণে, তার স্বচ্ছ হিসাব এখন জরুরি। সংগঠনের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির দায় বিইআরসি এড়াতে পারে না, যদিও তাঁর যুক্তির পূর্ণ বিবরণ এই প্রতিবেদনে যাচাই করা যায়নি।
বেসরকারি খাত যদি সরবরাহে ব্যর্থ হয়, রাষ্ট্রীয় সংস্থার কাছে বিকল্প থাকার কথা। তেমন বিকল্প এখনো দাঁড়ায়নি। যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল থেকে ৩ জুলাইয়ের মধ্যে বিপিসি পাঁচ দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র ডেকেছে। বিপিসির এক কর্মকর্তার ভাষ্য, কয়েক দফায় অংশ নেওয়া কোম্পানিগুলো ফ্রেইট চার্জ চেয়েছে টনপ্রতি ২৭০ ডলার, অথচ বাজারদর তখন ২০০ ডলারের কম ছিল। ৩ জুলাইয়ের দরপত্র ৪ আগস্ট খোলা হয়, কিন্তু সাড়া মেলেনি। বিপিসির নতুন চেয়ারম্যান ড. রফিকুল ইসলাম বলেছেন, অস্বাভাবিক প্রিমিয়াম দাবির কারণেই কাউকে কাজ দেওয়া যায়নি।
এরপর সরাসরি ক্রয়ের পথে স্পিড মার্কেটিং করপোরেশন নামের একটি কোম্পানির ৫ হাজার টন এলপিজি সরবরাহের প্রস্তাব ক্রয় কমিটিতে অনুমোদিত হয়। প্রস্তাবে ফ্রেইট চার্জ ধরা হয়েছিল টনপ্রতি ৯৭ ডলার, কোম্পানিটি ২ সেপ্টেম্বর দুই কোটি টাকার পারফরম্যান্স গ্যারান্টিও দিয়েছিল। যুগান্তর জানাচ্ছে, এখনো এক কেজি গ্যাসও আসেনি। বেসরকারি কোম্পানিগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ফ্রেইট ১৫০ ডলারের বেশি। কোম্পানিটির বক্তব্য প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে নেই। কম দামের প্রস্তাব নেওয়ার কারণ এখনো অজানা, আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
লোয়াবের সহসভাপতি হুমায়ুন রশীদ উন্নয়ন সংবাদকে বলেছেন, বিপিসি যে দামে এলপিজি আনবে, তারা সেই দামেই কিনতে লিখিতভাবে রাজি হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বিপিসির কেনার পদ্ধতিটাই ঠিক নেই। বিপিসি বলছে, কোন বাজার থেকে আনা হবে, জাহাজ কোথায় নোঙর করবে ও মজুত কীভাবে হবে, তা নিয়ে সমীক্ষা চলছে। জানুয়ারিতে বিপিসিকে এলপিজি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে কোনো চালান আসেনি।
যুগান্তরের প্রতিবেদনে একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিপিসির এই ব্যর্থতাকে “পরিকল্পিত ব্যর্থতা” বলার কথা তুলেছেন, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সঙ্গে তুলনা করে। কোনো তথ্য বা নথি ছাড়া এক অজ্ঞাতনামা বিশেষজ্ঞের এ মন্তব্য একটি অনুমান। এই প্রতিবেদন থেকে বলা যায়, সরকারি সংস্থা দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করতে পারেনি। কেন পারেনি, সে প্রশ্ন তদন্তসাপেক্ষ। প্রশাসনিক অদক্ষতা, বাজারের প্রিমিয়াম নিয়ে দরকষাকষির সীমা, ক্রয়নীতির জটিলতা বা অন্য কোনো কারণ হতে পারে।
মাতারবাড়ীর জেটিতে মাসে অন্তত একটি বড় এলপিজি জাহাজ আনার পরিকল্পনা আছে, যুগান্তর লিখেছে। ১ সেপ্টেম্বর বিপিসি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে, যার আওতায় সিঙ্গাপুরের ডিএসবি জেটির সক্ষমতা নিয়ে সমীক্ষা চালাবে। মোংলায় ৮ হাজার ২০০ টন মজুতের ট্যাংক, টাঙ্গাইলে এবং চট্টগ্রামের দক্ষিণ কাট্টলীতে মজুত ও বোতলজাতকরণ প্ল্যান্টের পরিকল্পনাও আছে। এগুলোর কাজ এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলমের দাবি, সরকার মাত্র ৬০০ কোটি টাকা খরচ করলে মজুতের সক্ষমতা পেতে পারে। এ হিসাব উন্নয়ন সংবাদের প্রতিবেদনে তাঁর ভাষ্য হিসেবে এসেছে, স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি।
এবার সেই প্রশ্ন, যা এই প্রতিবেদনের ব্রিফে উঠে এসেছিল: সিন্ডিকেটে কি রাজনৈতিক দলের নেতারা জড়িত? এ বিষয়ে যে প্রতিবেদনগুলো পাওয়া গেছে, সেখানে এলপিজি আমদানি, বোতলজাত বা ডিলারশিপের সঙ্গে কোনো দলীয় নেতার নামধারী ও নথিভিত্তিক সংযোগ মেলেনি। এনএসআইয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদনের অংশে কোম্পানির নাম আছে, কোনো ব্যক্তি বা দলীয় পরিচয় নেই। যুগান্তরের প্রতিবেদনও আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অনুমান তুলেছে, রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে নয়।
রাজনৈতিক বক্তব্য অবশ্য আছে। ৪ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ার এলপিজির দাম বাড়ার পেছনে “সিন্ডিকেট ব্যবসা” ও “রাজনৈতিক স্বার্থ”-কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে ডেইলি স্টার বাংলা জানিয়েছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এর আগে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ে বলেছিলেন, ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা সিন্ডিকেট গড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, যদিও সে বক্তব্য এলপিজি-নির্দিষ্ট ছিল না। আমরা যে প্রতিবেদন দেখেছি তাতে নির্দিষ্ট কোনো নাম বা প্রমাণ উল্লেখ নেই। সরকারের দিকে খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম ৬ অক্টোবর বলেছেন, কোনো সরকারই সিন্ডিকেট চায় না। দুই দিকেই বক্তব্য আছে, নথি নেই।
এ প্রসঙ্গে একটি সতর্কতা দরকার। ৫ অক্টোবর রাজধানীতে চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপির একটি ওয়ার্ড কমিটির সভাপতিকে আটক করা হয়েছে, যা প্রথম আলো ও অন্য কয়েকটি সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেছে। অভিযোগগুলো পোশাক কারখানা, ফুটপাত, অ্যাম্বুলেন্স ও মাদক কারবারিদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া নিয়ে। এসব ঘটনার সঙ্গে এলপিজির যোগসূত্র নেই। দলীয় পরিচয়ে চাঁদাবাজি এবং আমদানি-পর্যায়ের বাজার নিয়ন্ত্রণ ভিন্ন সমস্যা, প্রমাণও ভিন্ন ধরনের লাগে। একটিকে অন্যটির সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করলে অনুসন্ধান দুর্বল হয়।
বর্তমান সংকট নতুন নয়, তাও রেকর্ড বলছে। টিবিএস বাংলার এক প্রতিবেদনে জানুয়ারির সংকটের সময় ১২ কেজির সিলিন্ডার ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকায় ওঠার কথা আছে। তখন ক্ষমতায় ছিল অন্তর্বর্তী সরকার। আমার সংবাদের ভাষ্য অনুযায়ী ১০ জানুয়ারি বিপিসি সরকারের কাছে জি-টু-জি ভিত্তিতে আমদানির অনুমতি চেয়েছিল। এপ্রিলে নির্বাচিত সরকারের জ্বালানিমন্ত্রী সংসদকে জানান, সরকার এলপিজি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং বিইআরসি-নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করতে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরকে নিবিড় তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছয় মাস পর আবার ২,০০০ টাকার ওপরে সিলিন্ডার, আবার জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ।
অর্থাৎ ক্ষমতার হাতবদলের আগে-পরে একই ছক ফিরে আসছে। এই ধারাবাহিকতা কোনো একটি দল বা সরকারের দিকে আঙুল তোলার প্রমাণ নয়। বরং ইঙ্গিত করে কাঠামোগত দুর্বলতার দিকে: আমদানি-মজুত-বিতরণ প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি, রাষ্ট্রের নিজস্ব সক্ষমতা নেই, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে স্টক ও ছাড়ের তথ্য প্রায় রিয়েল-টাইমে নেই। অভিযান ও জরিমানার ঘোষণা দিলেও বার্তা২৪ জানিয়েছে, বাজারে তার প্রভাব দৃশ্যমান নয়।
আঞ্চলিক তুলনাও বাংলাদেশের ভোক্তার অবস্থান বোঝায়। রাইজিংবিডির আনুমানিক হিসাবে ১২ কেজি সমতুল্য এলপিজির দাম ভারতে প্রায় ১,০৩০ টাকা, নেপালে ১,৪০০ থেকে ১,৪৫০, পাকিস্তানে ১,৪৮০ থেকে ১,৫০০ এবং শ্রীলঙ্কায় ১,৬০০ থেকে ১,৬৫০ টাকা। সূত্রের পদ্ধতি স্পষ্ট নয়, কর ও ভর্তুকির পার্থক্যও আছে। বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেছেন, দাম বেশি হওয়ার পেছনে শুধু বিশ্ববাজার দায়ী নয়, আমদানি-পর্যায়ের শুল্ক-কর, পরিবহন-বিতরণ খরচ ও বাজার ব্যবস্থাপনাও ভূমিকা রাখে।
সমাধানের তালিকায় আলোচনায় এসেছে কয়েকটি দিক। প্রথমটি তথ্যের স্বচ্ছতা: আমদানিকারকভিত্তিক মাসিক আমদানি, খালাস, মজুত ও বাজারে ছাড়ার হিসাব প্রকাশ্যে আনা এবং এনএসআইয়ের চাওয়া নিরীক্ষার ফল জানানো। এ তথ্য ছাড়া “সংকট নেই” ও “কৃত্রিম সংকট” দুই দাবির কোনোটিই মাপা যাবে না। দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা: বিপিসির কেনাকাটার প্রক্রিয়া সংশোধন, লোয়াবের কেনার প্রতিশ্রুতি যাচাই, মজুত ট্যাংক ও টার্মিনালের কাজ সময়সীমা বেঁধে এগিয়ে নেওয়া।
তৃতীয়টি দামের কাঠামো। মাসে একবার ঠিক হওয়া দাম এবং আমদানিকারকদের ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান কীভাবে তৈরি হয়, তা বিইআরসিকে প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করতে হবে। চতুর্থটি প্রয়োগ: মোবাইল কোর্ট ও ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের তদারকি আছে, কিন্তু লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে মূলত যুগান্তর ও আজকের পত্রিকার সম্পাদকীয়তে। সম্পাদকীয় মতামত প্রমাণ নয়। যে কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রমাণ মিলবে, তার ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অনুমানের ভিত্তিতে নয়।
পঞ্চমটি প্রতিযোগিতা: ২৩টি কোম্পানির টার্মিনাল থাকলেও সেপ্টেম্বরে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি। বাকিরা কেন করেনি—এলসি, ডলার, প্রিমিয়াম নাকি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত—তার উত্তর পেলে বাজারে নতুন আমদানিকারকের জায়গা বাড়ানো যাবে।
এই মুহূর্তে মিহা নিউজের হাতে প্রমাণিত তথ্য তিনটি। সরকারি দাম ও বাজারদরের ব্যবধান আছে। বাজার অল্প কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত। রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিপিসি সাত মাসেও কোনো আমদানি চালান আনতে পারেনি। অন্য সব দাবি, যেমন পাঁচ কোম্পানির মজুতের অভিযোগ, বিপিসির “পরিকল্পিত ব্যর্থতা” কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের সংশ্লিষ্টতা, এখনো যাচাইয়ের অপেক্ষায়। যে তথ্য প্রকাশ্যে এলে এই অপেক্ষা ফুরোতে পারে, তা সরকারের হাতেই আছে।




