মূল কনটেন্টে যান
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার ১২ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ৩০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
অনুসন্ধানী ও সর্বশেষ বাংলা সংবাদ
সর্বশেষ

সংবিধান সংস্কার: ৭০ অনুচ্ছেদ থেকে জুলাই সনদ, এখন কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয় এবং অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে সংবিধান সংস্কার কমিশন সুপারিশ দেয়। জুলাই জাতীয় সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে; এর মধ্যে ৪৭টি বাস্তবায়নে সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের গণভোটে সাংবিধানিক সংস্কার…

সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভা
সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেনছবি: সংসদ সচিবালয়ের সৌজন্যে

ঢাকার রাজপথে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় ‘নতুন বাংলাদেশ’ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনের যে দাবি সামনে এসেছিল, তার একটি বড় অংশ পরে এসে ঠাঁই পেয়েছে সংবিধান ও রাষ্ট্র সংস্কারের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায়। আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিঘাতের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করে। এর মধ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। কমিশন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যে সুপারিশ দেয়, তাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য, সংসদীয় কাঠামো, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও মেয়াদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং মৌলিক অধিকারের মতো বিষয়কে একসঙ্গে আলোচনায় আনা হয়।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা বিষয়গুলোর একটি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। প্রচলিত আলোচনায় অনেক সময় বলা হয়, এর ফলে সংসদ সদস্যরা দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারেন না। আইনি ভাষায় বিষয়টি আরও নির্দিষ্ট: দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে অনুচ্ছেদ ৭০ একদিকে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার সাংবিধানিক ব্যবস্থা, অন্যদিকে সংসদ সদস্যের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর সংসদীয় নজরদারি কতটা সম্ভব—সেই প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়নের সময় বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল অন্যতম বড় রাজনৈতিক লক্ষ্য। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দলীয় আনুগত্য, সংসদের কার্যকর জবাবদিহিতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক বাড়তে থাকে। এই আলোচনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনও গুরুত্বপূর্ণ। Special Powers Act, 1974 সরকারকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রতিরোধমূলক আটকসহ বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছিল; পরবর্তী সময়ে আইনটির বিভিন্ন বিধান সংশোধিত হয়েছে।

তবে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে শুধু ৭০ অনুচ্ছেদ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা হয়েছিল; পরবর্তী সামরিক শাসন ও বিভিন্ন সাংবিধানিক পরিবর্তনও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ককে বদলে দেয়। ফলে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নটি শুধু একটি অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রশ্ন নয়; বরং নির্বাহী বিভাগ, সংসদ, রাষ্ট্রপতি, বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হবে—তার প্রশ্ন।

এখানে মূল লেখার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন। সংবিধানের ৪৮ ও ৪৯ অনুচ্ছেদকে জরুরি ক্ষমতার বিধান হিসেবে বর্ণনা করা সঠিক নয়। ৪৮ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির পদ ও দায়িত্বের কাঠামো এবং ৪৯ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা নিয়ে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার সাংবিধানিক কাঠামো রয়েছে ১৪১ক থেকে ১৪১গ অনুচ্ছেদে। ১৪১গ জরুরি অবস্থার সময়ে নির্দিষ্ট মৌলিক অধিকার বলবৎ করার জন্য আদালতে যাওয়ার অধিকার স্থগিত করার বিধানও নির্ধারণ করে।

সংবিধানের মৌলিক অধিকার নিয়েও একইভাবে সরলীকরণ এড়ানো জরুরি। বাংলাদেশে বাক্‌ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা ৩৯ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত। গৃহ ও যোগাযোগের গোপনীয়তাও ৪৩ অনুচ্ছেদের অধীনে সুরক্ষিত। ফলে ‘প্রাইভেসি অধিকার বাংলাদেশে নেই’ বলা সঠিক হবে না; বরং প্রশ্ন হচ্ছে—ডিজিটাল তথ্য, ব্যক্তিগত ডেটা, অনলাইন যোগাযোগ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির যুগে বর্তমান সাংবিধানিক সুরক্ষা যথেষ্ট কি না। তথ্য অধিকারও আলাদা আইনের মাধ্যমে স্বীকৃত।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর এই পুরোনো বিতর্ক নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশন শুধু ৭০ অনুচ্ছেদ নয়, রাষ্ট্রের মূলনীতি, সংসদের কাঠামো, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিয়েও পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়। কমিশন একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ এবং ক্ষমতার অধিকতর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মতো বিষয় সামনে আনে।

৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও কমিশনের সুপারিশ ছিল সরাসরি বাতিলের একমাত্র প্রস্তাব নয়। কমিশনের নথিতে বিভিন্ন মত উঠে আসে—কেউ বর্তমান বিধান অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে, কেউ অর্থবিল, অনাস্থা প্রস্তাব ও সংবিধান সংশোধনের মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল রেখে অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে। অর্থাৎ বিতর্কটি ‘৭০ থাকবে কি থাকবে না’—এই দ্বিমাত্রিক প্রশ্নের চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম।

সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি আর কমিশনের সুপারিশে আটকে থাকেনি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৫ সালের জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করে। সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, এর মধ্যে ৪৭টি বাস্তবায়নে সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন এবং বাকি ৩৭টি আইন, অধ্যাদেশ, বিধি বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রাষ্ট্রের মূলনীতি, নাগরিকত্ব, সাংবিধানিক সংশোধনের পদ্ধতি, জরুরি ক্ষমতা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো রয়েছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব থাকলেও ২০২৬ সালের গণভোটের প্রশ্নে ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে জনগণের সম্মতি চাওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের গেজেট অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত ওই গণভোটে বৈধ ভোটের ৬৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ পড়ে। ফলে সংস্কার-প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে নতুন একটি অধ্যায় তৈরি হলেও, ভোটের ফলের পর ঠিক কীভাবে এসব পরিবর্তন বিদ্যমান সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে বাস্তবায়িত হবে—সে প্রশ্নটি থেকেই গেছে।

এই জায়গাতেই ‘সংবিধান পুনর্লিখন’ বনাম ‘সংবিধান সংশোধন’ বিতর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পুরো সংবিধান নতুন করে লেখা হলে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, ভাষা, নাগরিকত্ব, রাষ্ট্রের মূলনীতি, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং অধিকার কাঠামো একসঙ্গে পুনর্বিন্যাসের সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে বিদ্যমান সংবিধান সংশোধনের পথে গেলে ধারাবাহিকতা ও আইনগত স্থিতিশীলতা বজায় থাকে, কিন্তু পুরোনো কাঠামোর সীমাবদ্ধতাও অনেক ক্ষেত্রে বহাল থাকতে পারে।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশে রাষ্ট্রের মূলনীতিতেও বড় পরিবর্তনের চিন্তা ছিল। কমিশন সমতা, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্রকে নতুনভাবে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে সংসদের কাঠামো পুনর্বিন্যাস এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঠেকাতে নতুন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাবও আসে।

এ ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রশ্ন শুধু কোন ধারা বদলাবে তা নয়; কে পরিবর্তন করবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় করবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের জুলাই জাতীয় সনদ তৈরির প্রক্রিয়ায় ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং বিভিন্ন বিষয়ে দলগুলোর ভিন্নমতও নথিভুক্ত হয়েছে। চূড়ান্ত সনদে ৮৪টি সংস্কার পয়েন্ট থাকলেও সব বিষয়ে পূর্ণ রাজনৈতিক ঐকমত্য ছিল না; একাধিক প্রস্তাবে দলগুলো ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। অর্থাৎ ঐকমত্যের কাঠামোটিও একরৈখিক ছিল না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাস্তবায়নের সাংবিধানিক প্রশ্ন। ২০২৬ সালে নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজনৈতিক দল ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে আলোচনা শেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। সরকারের অবস্থান হলো, জুলাই সনদের যেসব বিষয় বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন, সেগুলো সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংশোধনের মাধ্যমেই করা হবে।

এখানেই রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সাংবিধানিক তত্ত্বের সংঘাত দেখা দেয়। জুলাই সনদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার কি নিজে থেকেই সাংবিধানিক শক্তি অর্জন করতে পারে, নাকি প্রতিটি পরিবর্তনের জন্য বিদ্যমান সংবিধানের নির্ধারিত সংশোধনী-পদ্ধতি অনুসরণ করতেই হবে—এই প্রশ্নে বিতর্ক রয়েছে। আইনমন্ত্রীসহ সরকারের পক্ষ থেকে সংসদীয় সাংবিধানিক সংশোধনের পথের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে জুলাই সনদ প্রণয়নের সময় এর সাংবিধানিক ও আইনি মর্যাদা কী হবে, তা নিয়েও আলাদা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল।

বাংলাদেশের সংস্কার-আলোচনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তবে কোনো দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করা বাস্তবসম্মত নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ১৯৯৬ সালের সংবিধান তৈরির প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সমঝোতা, সাংবিধানিক পরিষদ, আদালতের পর্যালোচনা এবং ব্যাপক জনসম্পৃক্ততার সমন্বয়। প্রক্রিয়াটিতে ১৭ লাখের বেশি জনমত জমা পড়েছিল বলে দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস বিষয়ক নথিতে উল্লেখ আছে। প্রথম খসড়া সাংবিধানিক আদালতের পরীক্ষায় টেকেনি; সংশোধনের পর নতুন খসড়া অনুমোদিত হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার আরেকটি শিক্ষা হলো, সাংবিধানিক পরিবর্তনকে অতীতের রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা যায়। ১৯৯৫ সালের আইনের ভিত্তিতে গঠিত ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন (Truth and Reconciliation Commission) মানবাধিকার লঙ্ঘনের অতীতকে প্রকাশ, ক্ষতিপূরণ ও জাতীয় পুনর্মিলনের একটি প্রক্রিয়ার অংশ ছিল। তবে কমিশনের সুপারিশ সরাসরি ১৯৯৬ সালের সংবিধানে ঢুকে যায়—এমন সরলীকরণ ঠিক হবে না; এটি ছিল বৃহত্তর রাজনৈতিক রূপান্তর ও পুনর্মিলন প্রক্রিয়ার একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান।

তিউনিসিয়ার ২০১৪ সালের সংবিধানও বাংলাদেশের জন্য একটি তুলনামূলক উদাহরণ হতে পারে। সেখানে ২০১১ সালে নির্বাচিত গণপরিষদ দীর্ঘ সময় ধরে সংবিধান প্রণয়নের কাজ করে। রাজনৈতিক সংকট ও মতবিরোধের মধ্যেও পরবর্তী পর্যায়ে জাতীয় সংলাপ ও সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৪ সালের সংবিধান গণপরিষদে ২১৭ সদস্যের মধ্যে ২০০ ভোটে অনুমোদিত হয়। তবে তিউনিসিয়ার অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে একটি সতর্কবার্তাও দেয়—সামাজিক অংশগ্রহণ যত বিস্তৃত হবে, সাংবিধানিক নথির জাতীয় মালিকানাবোধও তত শক্তিশালী হতে পারে; অংশগ্রহণ সীমিত হলে উল্টোভাবে প্রক্রিয়াটি কয়েকটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠতে পারে।

নেপালের ২০১৫ সালের সংবিধানে তথ্যের অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মৌলিক অধিকার হিসেবে পৃথকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২৭ অনুচ্ছেদে তথ্যের অধিকার এবং ২৮ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে তথ্য অধিকার আইন এবং সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে যোগাযোগের গোপনীয়তার সুরক্ষা থাকলেও ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত তথ্য, ডেটা সুরক্ষা ও অনলাইন যোগাযোগের নিরাপত্তাকে সাংবিধানিক কাঠামোয় কতটা স্পষ্ট করা হবে—সেই প্রশ্নটি নতুনভাবে সামনে এসেছে।

তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শুধু সফলতার গল্প নেওয়া যথেষ্ট নয়। সংবিধান প্রণয়ন বা সংশোধনে সময় কমিয়ে আনলে রাজনৈতিক সমঝোতা দুর্বল হতে পারে; আবার প্রক্রিয়া অযথা দীর্ঘ হলে সংস্কারের রাজনৈতিক গতি হারাতে পারে। বাংলাদেশে এই দ্বৈত ঝুঁকি আরও বড়, কারণ সংস্কারের প্রশ্নটি একই সঙ্গে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, ১৬ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নতুন নির্বাচিত সংসদের সাংবিধানিক বৈধতার সঙ্গে যুক্ত।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো ক্ষমতার ভারসাম্য। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা পুনর্বিন্যাস, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ-পদ্ধতিতে পরিবর্তন—এসব প্রস্তাব আলাদাভাবে দেখলে বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু একসঙ্গে দেখলে এগুলোর কেন্দ্রীয় প্রশ্ন একটি: রাষ্ট্রক্ষমতা কি একটি ব্যক্তি বা একটি রাজনৈতিক দলের হাতে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হবে, নাকি সংসদ, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রপতি, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি হবে? সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশে এই ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির লক্ষ্য স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

এখানে ৭০ অনুচ্ছেদ সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক হলেও একমাত্র সমস্যা নয়। একটি সংসদ সদস্য যদি দলীয় সিদ্ধান্তের বিপরীতে ভোট দেওয়ার কারণে আসন হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে সংসদীয় কমিটি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করবে, বিরোধী দল কীভাবে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে এবং ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে ভিন্নমত কীভাবে প্রকাশ পাবে—এসবও একই কাঠামোর প্রশ্ন। আবার ৭০ দুর্বল করার ফলে রাজনৈতিক দলগুলো সংসদে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে না পারলে সরকার অস্থিতিশীল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে কি না, সেটিও সংস্কারের বিপরীত যুক্তি। তাই পরিবর্তনের লক্ষ্য হতে হবে শুধু দলীয় নিয়ন্ত্রণ কমানো নয়; একই সঙ্গে সরকার পরিচালনার স্থিতিশীলতা ও সংসদীয় জবাবদিহিতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।

একইভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু বিচারকদের প্রশাসনিক স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়। নিয়োগ, পদোন্নতি, বাজেট, মামলা ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রেও কেবল সংবিধানে ‘স্বাধীন’ শব্দটি থাকলেই স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না; নিয়োগ পদ্ধতি, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতার কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ।

নাগরিক অধিকার প্রশ্নটিও একইভাবে বিস্তৃত। বাক্‌স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সমাবেশের অধিকার, তথ্যের অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা—এসব অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এসব অধিকারের ওপর রাষ্ট্রের আরোপিত সীমাবদ্ধতা কতটা যুক্তিসংগত ও আনুপাতিক হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধান ইতিমধ্যে বাক্‌স্বাধীনতা ও যোগাযোগের গোপনীয়তার সুরক্ষা দেয়; নতুন সংস্কারের প্রশ্ন হলো সেই অধিকারগুলোকে আধুনিক রাষ্ট্র ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতার সঙ্গে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়।

সবচেয়ে বড় বাস্তব বাধা রাজনৈতিক আস্থা। সংস্কারের প্রতিটি প্রশ্নে যদি রাজনৈতিক দলগুলো ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সুবিধা-অসুবিধার হিসাবেই অবস্থান নেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক সমঝোতা কঠিন হবে। আবার রাজনৈতিক সমঝোতার নামে যদি নাগরিক সমাজ, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ সীমিত থাকে, তাহলে নতুন কাঠামোর গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

বাংলাদেশ এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যেখানে ‘নতুন সংবিধান’ একটি রাজনৈতিক স্লোগান থেকে বাস্তব আইনগত প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই জাতীয় সনদ ৮৪টি সংস্কারের একটি রাজনৈতিক কাঠামো দিয়েছে, ২০২৬ সালের গণভোটে সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৈধ ভোট পড়েছে এবং এখন সংসদীয় কমিটি তার বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণ করছে। কিন্তু ভোটের সমর্থন, রাজনৈতিক সনদ ও সাংবিধানিক বৈধতা—এই তিনটি একই বিষয় নয়। প্রত্যেকটির নিজস্ব আইনগত ভিত্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আছে।

সুতরাং বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্ন শুধু ১৯৭২ সালের সংবিধান বদলানো হবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কী বদলানো হবে, কেন বদলানো হবে, কোন প্রতিষ্ঠানকে কতটা ক্ষমতা দেওয়া হবে, নাগরিকের কোন অধিকার কতটা সুরক্ষিত হবে এবং সেই পরিবর্তনের পেছনে কতটা রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐকমত্য থাকবে। ৭০ অনুচ্ছেদ থেকে শুরু করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশন, সংসদের কাঠামো, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং নাগরিক অধিকার—সবকিছুকে একটি সমন্বিত রাষ্ট্রকাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

সংবিধান একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-আইনি চুক্তি। তাই সেটি সংশোধন বা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে দ্রুততার চেয়ে টেকসই সমঝোতা, রাজনৈতিক সুবিধার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য এবং দলীয় স্বার্থের চেয়ে নাগরিক অধিকারের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেওয়া কতটা সম্ভব হবে—সেখানেই বাংলাদেশের সংস্কার-প্রক্রিয়ার প্রকৃত পরীক্ষা। দক্ষিণ আফ্রিকা ও তিউনিসিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, বড় সাংবিধানিক পরিবর্তন কেবল একটি খসড়া লিখে শেষ হয় না; আলোচনার টেবিলে মতবিরোধকে জায়গা দিতে হয়, প্রয়োজনে খসড়া সংশোধন করতে হয়, এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে সেই কাঠামোর বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পথটি সম্ভবত সরল হবে না। জুলাই সনদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, গণভোটের ফল, সংসদের সংশোধনী প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের ভিন্নমত—সবকিছুকে একই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। সেই কাজ যত বেশি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও আইনসম্মত হবে, নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর প্রতি আস্থার সম্ভাবনাও তত বাড়বে। আর যদি সংস্কারের লক্ষ্য শুধু ক্ষমতার একটি কেন্দ্র বদলে আরেকটি কেন্দ্র তৈরি করা হয়, তাহলে সংবিধানের ভাষা বদলালেও রাষ্ট্রের পুরোনো সমস্যাগুলো থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

প্রতিবেদনটি আপনার কাছে কেমন লাগল?

আবু আনান

বিশেষ প্রতিবেদক

বিশেষ প্রতিবেদক

এই প্রতিবেদনে কোনো তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে সংশোধনী নীতি অনুযায়ী আমাদের জানান।

মন্তব্য

মন্তব্য দেখতে বা লিখতে চাপ দিন। মন্তব্য সম্পাদকীয় নীতিমালা মেনে প্রকাশ হয়।

সারাংশ

সংবিধান সংস্কার: ৭০ অনুচ্ছেদ থেকে জুলাই সনদ, এখন কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয় এবং অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে সংবিধান সংস্কার কমিশন সুপারিশ দেয়।
জুলাই জাতীয় সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে; এর মধ্যে ৪৭টি বাস্তবায়নে সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৬ সালের গণভোটে সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ৬৮.৫৯ শতাংশ বৈধ ভোট পড়ে।
বর্তমানে সংসদের বিশেষ কমিটি রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়ে জুলাই সনদের সাংবিধানিক অংশ বাস্তবায়নের পথ তৈরি করছে।

#ConstitutionReform #JulyCharter #Article70 #Bangladesh #MeehaNews

আজ

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ৩০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি

পাঠের রং

এখন যা বেশি খোঁজা হচ্ছে

যেকোনো পাতায় / চাপলেই খোঁজ খুলবে। ফলাফলে বিভাগ, তারিখ ও ধরন দিয়ে ছাঁকতে পারবেন।