পৃথিবীতে প্রতি মুহূর্তে কোনো না কোনো ঘটনা ঘটছে। তবে সব ঘটনা সমভাবে গণমাধ্যমে গুরুত্ব পায় না। মিডিয়ার কল্যাণে অনেক ছোট ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, আবার অনেক বড় ঘটনা গুরুত্বহীন হয়ে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান-আমেরিকা সংঘাত, মক্কা চুক্তি, হরমুজ প্রণালি অবরোধ এবং বাব-এল-মান্দেবের কাছে হুতিদের উত্থানের ভিড়ে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই আড়ালে চলে গেছে। ভেনিজুয়েলা তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
মধ্যযুগে রাজা-বাদশাহদের যুদ্ধে বিজয়ীরা পরাজিতকে যেভাবে বন্দী করে নিয়ে যেত, ঠিক একই কায়দায় ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ক্যারাকাসে সামরিক অভিযান চালিয়ে আটক করে যুক্তরাষ্ট্র। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নির্বাচিত ও জনসমর্থিত রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে ক্ষমতাচ্যুত করাকে নয়া সাম্রাজ্যবাদেরই পদধ্বনি বলা যায়। তবে ভেনিজুয়েলাকে কেন বেছে নেওয়া হলো, তার জবাব মেলে অভিযানের আগে-পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজের বক্তব্যেই।
মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য আর কখনো প্রশ্নের মুখে পড়বে না। সম্প্রতি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনেও তাঁর বক্তব্যে একই সাম্রাজ্যবাদী সুর ফিরে আসে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো হুমকিকে আর শিকড় গাড়তে দেওয়া হবে না, আর প্রয়োজনে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় “অতুলনীয় সামরিক শক্তি” ব্যবহারেও পিছপা হবে না যুক্তরাষ্ট্র।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তার মহাদেশীয় প্রতিবেশীদের ওপর কেবল অর্থনৈতিক চাপ নয়, সামরিক হস্তক্ষেপও চালিয়ে আসছে। এই দীর্ঘ তালিকায় সবচেয়ে কাছাকাছি দৃষ্টান্ত ১৯৮৯ সালে পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগার গ্রেপ্তার।
ভেনিজুয়েলা দখলের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যতটা রাজনৈতিক ভিন্নমত ও নিরাপত্তার কথা বলছে, তার চেয়ে ঢের গুরুত্বপূর্ণ হলো পুঁজির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। অর্থের অবাধ প্রবাহ ছাড়া পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না; তা ছাড়া এই ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়বে। মার্ক্সীয় অর্থনীতি ও ইতিহাস বিশ্লেষণ অনুযায়ী পুঁজিবাদ কেবল সাম্রাজ্যবাদকে রক্ষাই করে না, বরং সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিবাদেরই স্বাভাবিক পরিণতি—এক অর্থে “পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর”। যুক্তরাষ্ট্র তাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতেই ভেনিজুয়েলায় হস্তক্ষেপ করেছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।
যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে কানাডা থেকে—দৈনিক প্রায় ৩৮ লাখ ব্যারেল। এরপর মেক্সিকো থেকে ৪ লাখ ৫৭ হাজার, সৌদি আরব থেকে ২ লাখ ৭৫ হাজার এবং ভেনেজুয়েলা থেকে ২ লাখ ২৮ হাজার ব্যারেল আমদানি হয়। অর্থাৎ সৌদি আরব ও ভেনেজুয়েলা থেকে আমদানির পরিমাণে খুব বেশি ফারাক নেই, যেখানে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির হার মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ায় এই ঘাটতি ভেনিজুয়েলা থেকেই পূরণ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে—আর মাদুরো-উত্তর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই তার প্রথম প্রমাণ মিলেছে। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ইতিমধ্যে দেশটির তেলক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার দিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন—যা পুঁজির স্বার্থেই এই হস্তক্ষেপের তত্ত্বকে আরও জোরালো সমর্থন জোগায়।
ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের জেরে ২০২৫ সালের ২২ জুন মার্কিন বাহিনী ইরানের ফোর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়, যার ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফায় ইরানে হামলা চালায়—বিশ্লেষকদের ধারণা, এই দ্বিতীয় হামলার আগেই নিজেদের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ভেনিজুয়েলায় অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ ভেনিজুয়েলা দখল ছিল আসন্ন ইরান-হামলার জ্বালানি-প্রস্তুতিরই অংশ।
প্রতিবেশী কানাডার সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে—দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্যে চলছে বাণিজ্য যুদ্ধ, সঙ্গে আছে ভূখণ্ড নিয়ে জটিলতাও। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের শঙ্কাও খতিয়ে দেখতে হচ্ছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নেওয়ার পর কোনো রাখঢাক ছাড়াই ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মেক্সিকোর সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত বিরোধের ইতিহাস পুরোনো। মেক্সিকোর অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড টেক্সাসকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোয় আগ্রাসন চালায় এবং ১৮৪৭ সালে রাজধানী মেক্সিকো সিটি দখল করে নেয়। ১৮৪৮ সালের একটি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটলেও মেক্সিকো তাদের মোট ভূখণ্ডের ৫৫ শতাংশ ছাড়তে বাধ্য হয়—বর্তমান ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা, উটাহসহ অ্যারিজোনা, নিউ মেক্সিকো, কলোরাডো ও ওয়াইওমিংয়ের একাংশ এই ভূখণ্ডেরই অংশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন ট্রাম্প, যেখানে আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড, কানাডা, মেক্সিকোসহ মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলকে মার্কিন পতাকায় ঢেকে পুরো ভূখণ্ডকে ‘যুক্তরাষ্ট্র’ হিসেবে দেখানো হয়। আধা-স্বায়ত্তশাসিত ড্যানিশ ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ নিয়ে এমনিতেই উত্তেজনা চলছিল; গ্রিনল্যান্ডের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই বিতর্কিত মানচিত্র প্রকাশ করেন তিনি।
১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক মতবিরোধের জেরে কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে দীর্ঘদিনের বৈরিতা চলে আসছে। ১৯৬২ সালে কিউবায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনকে কেন্দ্র করে দুই পরাশক্তির মধ্যে সরাসরি পারমাণবিক যুদ্ধের উপক্রম হয়েছিল। জন এফ কেনেডির শাসনামলে কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক আরও খারাপ হয়, আর কিউবার কমিউনিস্টপন্থী অবস্থানের কারণে সেই সম্পর্ক আর স্বাভাবিক হয়নি। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবরোধের প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষকের আশঙ্কা, অদূর ভবিষ্যতে কিউবাকেও ভেনিজুয়েলার মতো পরিণতি বরণ করতে হতে পারে—ছলে-বলে-কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে পদানত করার সর্বোচ্চ চেষ্টাই চালাচ্ছে বলে ধারণা তাঁদের।
২০১৪ সালে নিরাপত্তার অজুহাতে কৃষ্ণ সাগরের তীরে ইউক্রেনের বন্দর নগরী ক্রিমিয়া দখল করে নেয় রাশিয়া, এরপর এক বিতর্কিত গণভোটের মধ্য দিয়ে তা নিজ ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করে। সেই থেকে রাশিয়া ক্রমাগত ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে—ধীরে ধীরে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশ সামরিক শক্তি প্রয়োগে দখল করে নিচ্ছে তারা।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো যেভাবে সরাসরি ভূখণ্ড দখল করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল, এখন সেভাবে সম্প্রসারণ আর সম্ভব নয়—ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ থেকে ইতিমধ্যে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি গুটিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তার বদলে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—দুই পরাশক্তিই এখন নিজ নিজ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে কক্ষপথে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। রাশিয়া যেমন ইউক্রেন দখলের চেষ্টা করছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও ভেনিজুয়েলা দিয়ে শুরু করে কিউবা ও ডেনমার্কের ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ডের দিকে দৃষ্টি দিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই “মাৎস্যন্যায়” পরিস্থিতি থেকে সামরিক শক্তিতে দুর্বল ছোট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের কীভাবে রক্ষা করবে, তা এখন একটি জরুরি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দুর্বল ও ছোট রাষ্ট্রগুলোর বৃহৎ শক্তির অধীনস্থ হয়ে পড়ার শঙ্কা নতুন করে দেখা দিয়েছে।
সাম্রাজ্যবাদ সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি নিজের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠাতেও সচেষ্ট থাকে—অন্য জাতির ওপর শাসন ও শোষণের বোঝা চাপিয়ে দেয়। তবে আজকের সাম্রাজ্যবাদ আর কেবল ভূখণ্ড বিস্তারের জন্য পরিচালিত হয় না; এর নতুন রূপ হলো অর্থনৈতিক ফায়দা আদায়—জ্বালানি, খনিজ সম্পদ আর বাজারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই যেখানে মূল লক্ষ্য। মাদুরো থেকে গ্রিনল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্যাটার্নই বলে দেয়, পতাকা না পাল্টেও সাম্রাজ্য কীভাবে আজও সম্প্রসারিত হতে পারে।
লেখক: কলামিস্ট ও সংবাদ বিশ্লেষক
expertdu88@gmail.com













মন্তব্য করুন