ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিটি অধ্যায়ে বাংলাদেশে একটি প্রশ্ন নতুন করে ফিরে আসে—চাঁদাবাজি ও দখলদারির যে সংস্কৃতি বারবার আলোচনায় আসে, তার সঙ্গে ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতা ঠিক কতটা? ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)—তিনটি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেই গণমাধ্যমে বিচ্ছিন্নভাবে চাঁদাবাজি, দখল বা সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। এই প্রতিবেদনে আমরা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ ও পুলিশ সদর দপ্তরের নিজস্ব তথ্য পর্যালোচনা করে দেখার চেষ্টা করেছি, এই অভিযোগের বাস্তব চিত্রটি ঠিক কেমন।
একটি বিষয় সূচনাতেই স্পষ্ট করে নেওয়া জরুরি—এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত প্রতিটি ঘটনা অভিযোগ, আদালতে প্রমাণিত অপরাধ নয়। বাংলাদেশে কোনো সরকারি সংস্থা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান দলভিত্তিকভাবে অপরাধের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না বলে আমরা নিজস্ব সংবাদ-অনুসন্ধানের ভিত্তিতে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, যার পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা প্রতিবেদনের শেষাংশে স্পষ্ট করা হয়েছে।
প্রেক্ষাপট: ক্ষমতা কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশ পরিচালিত হয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। এরপর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), আর ১৭ ফেব্রুয়ারি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। বিরোধী দলের আসনে বসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যার আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পান, আর তরুণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সংসদে জায়গা করে নেয়, দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম হন বিরোধী দলের চিফ হুইপ।
এই দ্রুত ক্ষমতা কাঠামো বদলের প্রতিটি ধাপেই মাঠপর্যায়ে স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আর এই প্রতিযোগিতার সঙ্গেই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে গেছে চাঁদাবাজি-দখলের অভিযোগগুলো।
জাতীয় অপরাধচিত্র: পরিসংখ্যান যা বলছে
দলীয় সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নে যাওয়ার আগে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বোঝা জরুরি। পুলিশ সদর দপ্তরের নিজস্ব অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) সারা দেশে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ১ হাজার ১৪২টি, আর খুন-অপহরণ-ডাকাতি-ছিনতাই-নারী-শিশু নির্যাতনসহ পাঁচ ধরনের গুরুতর অপরাধে মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ২২১টি—অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১১০টি মামলা এবং প্রায় ১০টি করে হত্যাকাণ্ড। পরবর্তী প্রতিবেদনে জানুয়ারি-জুন সময়ের জন্য এই সংখ্যা দাঁড়ায় দৈনিক গড়ে ১১ খুনে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) ত্রৈমাসিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনেও একই ধরনের প্রবণতা ধরা পড়ে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ—তিন মাসেই রাজনৈতিক ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ৩৬ জন নিহত ও চার হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, একই সময়ে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬৭০ জন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) পর্যবেক্ষণেও মে-জুন সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব ভায়োলেন্সে “উল্লেখযোগ্য অবনতি” শনাক্ত হয়েছে।
সবচেয়ে স্পষ্ট তুলনামূলক চিত্রটি পাওয়া যায় মব সহিংসতার হিসাবে। এইচআরএসএসের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুনে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে সংঘটিত মব সহিংসতার ঘটনা ছিল ২৬১টি, যাতে নিহত হন ১৩৩ জন ও আহত হন ২৫৬ জন। ঠিক আগের বছরের একই সময়ে (জানুয়ারি-জুন ২০২৫) এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৪১টি ঘটনা, ৬৭ জন নিহত ও ১১৯ জন আহত—অর্থাৎ ঘটনা ও প্রাণহানি উভয় সূচকেই প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি।

সরকারি বয়ান বনাম মাঠের বাস্তবতা
এই পরিসংখ্যানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে সরকারের নিজস্ব ভাষ্য। গত ৩ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, ২০২৫ সালের তুলনায় বর্তমানে খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, অস্ত্র মামলা ও নারী নির্যাতনের মতো প্রধান অপরাধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই উন্নতির দিকে যাচ্ছে।
এই দুই বয়ানের মধ্যে সুস্পষ্ট ফারাক তৈরি হয়েছে—একদিকে পুলিশেরই অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যান ও স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন বলছে সহিংসতা বেড়েছে, অন্যদিকে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দাবি করা হচ্ছে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অপরাধীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শৈথিল্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতারও সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর পরামর্শ, দেশে এখন একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকায় অপরাধ দমনে পুলিশকে আরও দৃঢ়, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।
দলীয় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ: সংবাদ-অনুসন্ধানে যা মিলেছে
জাতীয় পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে যখন নির্দিষ্টভাবে দল-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ অনুসন্ধান করা হয়, তখন একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন চোখে পড়ে। নিচে প্রতিটি দল সম্পর্কে যা পাওয়া গেছে, তা তুলে ধরা হলো—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মূল সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে যাতে পাঠক নিজে যাচাই করে দেখতে পারেন।
বিএনপি: ছাত্রদল-যুবদল ঘিরে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ
সংখ্যার বিচারে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠন ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি সংবাদমাধ্যমে এসেছে। প্রথম আলোর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে, যাদের মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দও রয়েছেন। বরগুনার আমতলী, রাজশাহীর তানোর, সিরাজগঞ্জ, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ-জাজিরা, গাজীপুর, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, রাজশাহী পলিটেকনিক ও নবাবগঞ্জ—এই তালিকা শুধু আমাদের অনুসন্ধানেই উঠে আসা বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার নাম, যেখানে চাঁদা দাবি, জমি বা স্থাপনা দখল কিংবা প্রতিবাদকারীকে মারধরের অভিযোগে মামলা, গ্রেপ্তার বা দলীয় বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অভিযোগগুলো দলের শীর্ষ নেতৃত্বও প্রকাশ্যে অস্বীকার করেননি। যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি-দখলের অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও সাংবাদিক সম্মেলনে স্পষ্ট করে বলেছেন, দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ চাঁদাবাজি বা দখলদারিত্বে জড়িত হলে তাদের বিরুদ্ধে বিএনপি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান অবশ্য পাল্টা দাবি করেছেন, প্রকৃতপক্ষে অন্য একটি পক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজি-দখলবাজি চালিয়ে দোষ বিএনপির ওপর চাপাচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী: বিচ্ছিন্ন কিন্তু বাস্তব অভিযোগ
জামায়াতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও সেগুলো নিছক গুজব নয়। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জাইকার অর্থায়নে পরিচালিত একটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ প্রকল্পে চাঁদাবাজি, হামলা ও কাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগে স্থানীয় জামায়াত নেতা তথা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলামকে আদালত কারাগারে পাঠিয়েছেন। যশোরের মনিরামপুরে নদী খননের মাটি নিলামের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষ ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে জামায়াতের নিজস্ব তদন্ত কমিটিই তিন স্থানীয় নেতার পদ স্থগিত করেছে—অর্থাৎ দলটি নিজেই অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি প্রক্রিয়া চালিয়েছে এসব ক্ষেত্রে।
তবে জামায়াতের বিরুদ্ধে বেশিরভাগ অভিযোগ এসেছে প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে সরাসরি বক্তব্য আকারে—যেমন রিজভীর মন্তব্য, জামায়াতে ইসলামীতে অনেক “গুপ্ত চাঁদাবাজ” আশ্রয় নিয়েছে, বা “হাদিয়ার আড়ালে চাঁদাবাজি”র অভিযোগ। পাল্টা জবাবে জামায়াতের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছে, গুলিস্তান এলাকায় বিএনপির “সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ গ্রুপ” দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি চালিয়ে আসছে এবং সেই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মিছিল করতে গিয়েই জামায়াত নেতাকর্মীরা হামলার শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ এখানে অভিযোগের একটি বড় অংশ পারস্পরিক রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের রূপ নিয়েছে, যা প্রমাণসাপেক্ষ তদন্তের চেয়ে রাজনৈতিক বাগযুদ্ধের অংশ বলে মনে হয়েছে আমাদের পর্যালোচনায়।
এনসিপি: অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভুক্তভোগী হওয়ার দ্বৈত চিত্র
এনসিপির ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। দলটির বিরুদ্ধে সরাসরি বহিরাগতদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ তুলনামূলক কম পাওয়া গেলেও দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ঘিরে সহিংসতার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় পদ দেওয়ার নামে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং দলীয় কোন্দলের জেরে দুই পক্ষের অন্তত ৭ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যাতে পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। একজন ব্যক্তি এনসিপি নেতা পরিচয়ে বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি করার অভিযোগে গ্রামবাসীর হাতে গণধোলাইয়ের শিকার হয়েছেন বলেও প্রতিবেদন পাওয়া গেছে।
তবে এনসিপি সম্পর্কিত সংবাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দলটিকে অভিযুক্ত নয়, বরং আক্রান্ত পক্ষ হিসেবে তুলে ধরে। হবিগঞ্জে ছাত্রদলের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ একাধিক নেতাকর্মী আহত হওয়ার ঘটনা, নেত্রকোনায় এনসিপি নেতাকে মারধরের অভিযোগ, আর গোপালগঞ্জে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুসারী সন্দেহে একদল ব্যক্তির হাতে এনসিপির গাড়িবহরে হামলার ঘটনা—এসবই দেখায়, এনসিপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংঘাতের সিংহভাগই হয় দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নয়তো অন্য পক্ষের আক্রমণের শিকার হওয়া থেকে উদ্ভূত।
চার্ট: সংবাদ-অনুসন্ধানের নমুনাভিত্তিক তুলনা
নিচের চার্টে আমাদের নিজস্ব অনুসন্ধানে পাওয়া প্রতিনিধিত্বমূলক ঘটনার সংখ্যা তুলে ধরা হলো। এটি কোনো সম্পূর্ণ বা দাপ্তরিক ডেটাবেজ নয়—নির্দিষ্ট কি-ওয়ার্ড দিয়ে অনলাইন সংবাদ অনুসন্ধান করে যেসব স্বতন্ত্র ঘটনা পাওয়া গেছে, তারই একটি নমুনাচিত্র। চাঁদাবাজি বা সংঘর্ষে কোনো দলের নাম আসা মানেই তা আদালতে প্রমাণিত অপরাধ নয়—তাই প্রতিটি সংখ্যাকেই “অভিযোগ” হিসেবে পড়তে হবে।

চার্টে স্পষ্ট, চাঁদাবাজি-দখল সংক্রান্ত অভিযোগে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর নাম আসার হার অন্য দুই দলের তুলনায় অনেক বেশি—যা স্বাভাবিকভাবেই বোধগম্য, কারণ কেন্দ্র থেকে স্থানীয় প্রশাসন পর্যন্ত ক্ষমতার কাঠামোতে দলটির উপস্থিতি সবচেয়ে ব্যাপক। বিপরীতে সংঘর্ষ-সহিংসতার তালিকায় এনসিপির সংখ্যা তুলনামূলক বেশি, যার একটি বড় কারণ দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নবগঠিত সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সাংগঠনিক সংঘাত।
সোশ্যাল মিডিয়া ও জনমত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই অভিযোগগুলো নিয়ে আলোচনা মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত। একটি অংশ—বিশেষত সাধারণ ব্যবহারকারী ও ভুক্তভোগীরা—প্রতিটি ঘটনার স্থানীয় প্রতিবেদন শেয়ার করে “৫ আগস্টের আগে-পরে কিছুই বদলায়নি” জাতীয় হতাশা প্রকাশ করছেন। অন্য অংশ, বিশেষত দলীয় সমর্থকরা, প্রতিটি অভিযোগকে প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী “ক্ষমতার শূন্যতা পূরণের প্রতিযোগিতা” তত্ত্বই এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক—অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট দলের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে এসব অপরাধের সরাসরি সম্পর্কের চেয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রতিযোগিতাই মূল চালিকাশক্তি।
প্রতিটি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই–তা বিএনপির রিজভী, জামায়াতের নেতারা, কিংবা এনসিপির নেতারা–প্রকাশ্যে এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন, যা থেকে বোঝা যায় সমস্যাটি দলগুলোও নিজেরাই স্বীকার করছে, অস্বীকার করছে না।
পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা: স্বচ্ছতার স্বার্থে
এই প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ সততার সঙ্গে উপস্থাপনের স্বার্থে কয়েকটি সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করা জরুরি:
- এটি কোনো সরকারি, আদালত-নিশ্চিত বা পুলিশি তদন্ত-ভিত্তিক পরিসংখ্যান নয়। বাংলাদেশে দলভিত্তিক অপরাধের কোনো আনুষ্ঠানিক ডেটাবেজ প্রকাশিত হয় না।
- সংখ্যাগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরিচালিত সীমিত অনলাইন অনুসন্ধান থেকে পাওয়া, যা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার সামগ্রিক চিত্রের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক নমুনা মাত্র, সম্পূর্ণ তালিকা নয়।
- যে দলের সাংগঠনিক উপস্থিতি ও ক্ষমতা কাঠামোতে প্রভাব যত বেশি, স্বাভাবিকভাবেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগও তত বেশি সংবাদ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে—এটি কার্যকারণ সম্পর্ক নয়, বরং ক্ষমতার পরিধির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্বাভাবিক প্রবণতা।
- “অভিযোগ” শব্দটি এই প্রতিবেদনে সর্বত্র ব্যবহৃত হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে—কোনো ব্যক্তি বা দলকে দোষী সাব্যস্ত করা এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য নয়, বরং সংবাদমাধ্যমে প্রতিফলিত জনআলোচনার একটি বস্তুনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরাই লক্ষ্য।
পর্যবেক্ষণ ও উপসংহার
সব সূত্র পর্যালোচনা করে যে চিত্র উঠে আসে তা হলো—বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রতিটি অধ্যায়েই ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি-দখলের অভিযোগ বাড়ার একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, যা এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। জাতীয় পর্যায়ে অপরাধ পরিসংখ্যান ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য একই দিকে ইঙ্গিত করছে—সামগ্রিক সহিংসতা ও অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্য এই চিত্রের বিপরীত দাবি করছে। সংবাদমাধ্যম-ভিত্তিক অনুসন্ধানে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি-দখলের অভিযোগের সংখ্যাগত প্রাধান্য স্পষ্ট, আর তা দলটির শীর্ষ নেতৃত্বও অস্বীকার করছে না। জামায়াত ও এনসিপির বিরুদ্ধেও অভিযোগ আছে, তবে তার প্রকৃতি ও মাত্রা ভিন্ন—জামায়াতের ক্ষেত্রে তা মূলত বিচ্ছিন্ন ও রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে জড়ানো, আর এনসিপির ক্ষেত্রে তা অনেকাংশে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অন্য পক্ষের আক্রমণের শিকার হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ মোটাদাগে তিনটি জায়গায় কেন্দ্রীভূত—দলীয় পরিচয় যাচাই না করে অভিযুক্ত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া সমানভাবে প্রয়োগ করা, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি প্রক্রিয়া (যেমন জামায়াতের পদ স্থগিতাদেশের নজির) আরও নিয়মিত ও স্বচ্ছ করা, এবং সরকারের পক্ষ থেকে প্রকৃত পরিসংখ্যান প্রকাশে স্বচ্ছতা বজায় রাখা যাতে সরকারি বয়ান ও মাঠ-বাস্তবতার মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতার ফারাক তৈরি না হয়।










এটাই বাংলাদেশ 😪😪