প্রধান কন্টেন্টে যান
শনি ৩ অক্টোবর ২৬
হেডলাইন
বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন
বাঙালি সংস্কৃতি / ক্যাম্পাস স্মৃতি

এবার আর ঘুম ভাঙতে চাইব না

মোট শেয়ারমোঃ: 2

এবার আর ঘুম ভাঙতে চাইব না
পুরোনো স্কুলবেঞ্চ ও শৈশবের বন্ধুত্বের স্মৃতিচারণমূলক চিঠি

প্রিয় রিয়াজুল,

কেমন আছিস? প্রশ্নটা লিখেই থেমে গেলাম। কারণ বয়স যত বাড়ছে, তত বুঝছি— “ভালো আছি” মানুষ সবচেয়ে বেশি বলে তখনই, যখন ভেতরে সবচেয়ে বেশি ভাঙা থাকে।

আমাদের বয়সে এসে মানুষ “ভালো আছি” বলতে শেখে, ভালো থাকতে নয়।

গতকাল রাতে তুই এসেছিলি। দরজায় কড়া নাড়িসনি। স্বপ্নে কেউ দরজায় কড়া নাড়ে না, স্বপ্ন নিজেই তো একটা খোলা দরজা।

আমরা আবার হাইস্কুলে ফিরে গিয়েছিলাম। যেন কিছুই বদলায়নি। মাজহারুলও ছিল। অনেকদিন পর আবার তিনজন একসঙ্গে হাঁটছিলাম। রাস্তার ধুলো আগের মতোই ছিল, শুধু বয়সটা আগের জায়গায় ছিল না।

সকালবেলা জানালার পাশে বসে তোর ফোন নম্বরটা মনে করার চেষ্টা করছিলাম। আশ্চর্য! নম্বরটা মনে পড়ল না। অথচ ফোনটা হাতে নিলেই হাজার নম্বর, হাজার নোটিফিকেশন—শুধু তোরটাই নেই। যন্ত্র সব মনে রাখে, শুধু যেটা সবচেয়ে জরুরি, সেটাই রাখে না। অথচ মনে আছে, কোন বেঞ্চে তুই বসতিস। মনে আছে, স্কুল ছুটির পর কে আগে মাঠে নামত। মনে আছে, কৃষাণুকে আমরা ‘কেষ্ট’ বলে ডাকতাম, স্বাগতের খাতা দেখে নিজের লেখা মিলিয়ে নিতাম।

শুধু একটা জিনিসই মনে নেই। আমরা শেষ কবে বন্ধু ছিলাম।

তোর সঙ্গে গল্প করতে করতে কত নাম ফিরে এলো—সঞ্জয়, হানিফা, শিমুল, শিল্পী, আলীম, ফারহানা, ডানো, বপি, বিকাশ স্যার, পীযূষ স্যার… মনে হচ্ছিল, আমরা যেন আবার সেই বেঞ্চে বসে আছি।

ভাবতে অবাক লাগে, একসময় একটা দিনও যেত না তোকে না দেখে। এখন একটা বছর কেটে যায়, তবু দেখা হয় না। আজকাল আমরা সবাই “কানেক্টেড”, স্ক্রিনে শত বন্ধু, অথচ বুকপকেটে একজনও নেই। মনে হয়, ঘুমই বুঝি পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে দূরত্বের কোনো ভিসা লাগে না।

বয়স বাড়লে বোধহয় এমনই হয়—বাস্তবে যাদের কাছে পাওয়া যায় না, তারা স্বপ্নে এসে গল্প করে।

কামালের কথা উঠতেই আমরা চুপ করে গেলাম। যে ছেলেটাকে দেখে মনে হতো, মেধারও একটা সুন্দর পরিণতি আছে, আজ সে একটি ব্রেন টিউমারের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। তারপর গাজীর কথা, যাকে আমরা হাসতে হাসতে ‘পাজি’ বলে ডাকতাম, সেই আজ তুরস্কের আকাশের নিচে নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে।

বন্ধু, জীবনটা সত্যিই অদ্ভুত। স্কুলের বেঞ্চে বসে আমরা অনেক অঙ্ক কষেছি, কিন্তু জীবনের এই হিসাবটা কেউ শেখায়নি।

বন্ধু, একটা কথা বুঝতে আমার অনেক বছর লেগেছে। মানুষ আসলে বন্ধু হারায় না। হারায় সেই সময়টাকে, হারায় সেই বয়সটাকে, যে বয়সে বন্ধুদের কোনো পরিচয় ছিল না। কেউ অফিসার ছিল না, কেউ প্রবাসী ছিল না, কেউ সফল ছিল না, কেউ ব্যর্থও ছিল না।

একটা কথা রাখবি?

যদি কোনোদিন সত্যিই দেশে ফিরিস, স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াব। ভেতরে ঢুকব না। কোনো কথা বলব না। কিছু জায়গায় শুধু দাঁড়ালেই বোঝা যায়—আমাদের ভেতরে এখনো কয়েকটা কিশোর বেঁচে আছে।

ভালো থাকিস।

আর কোনোদিন যদি আবার স্বপ্নে দেখা হয়, আমাকে ডেকে দিস। আমি এবার আর ঘুম ভাঙতে চাইব না।

ইতি, তোরই—
মাসুম

মোট শেয়ারমোঃ: 2

পোস্টটি কেমন লাগলো?

মন্তব্য করুন

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো * দ্বারা চিহ্নিত।

সাম্প্রতিক খবর

সর্বাধিক পঠিত