অপরাধের নতুন মানচিত্র: কিশোর গ্যাং থেকে সাইবার ফাঁদ, বিচারহীনতার বৃত্তে বাংলাদেশ
কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার দীর্ঘদিনের অভিযোগ আছে, আর আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী ক্ষমতা বদলের পর নতুন মদদদাতাদের উত্থানের অভিযোগও উঠছে বিভিন্ন পক্ষের বিরুদ্ধে। কক্সবাজার-টেকনাফ করিডোর দিয়ে ইয়াবা পাচার অব্যাহত থাকার পাশাপাশি অভিজাত মহলে ‘আইস’ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন মামলায় সাজার হার অত্যন্ত কম এবং বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভুক্তভোগীরা কার্যত ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত থাকছেন। আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী থানায় হামলা ও অস্ত্র লুটের ঘটনার পর পুলিশি উপস্থিতিতে যে ধস নামে, তা অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে একাধিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। #CrimeInBangladesh #KishorGang #LawAndOrder #CyberCrime #MeehaNews

রাত এগারোটার পর ঢাকার অনেক মহল্লায় এখন একটি অলিখিত নিয়ম চলে: মোবাইল ফোন পকেটে রাখুন, রিকশায় ব্যাগ কোলের ভেতরে চেপে ধরুন, গলির মুখে জটলা দেখলে পথ ঘুরিয়ে নিন। এই নিয়ম কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপনে লেখা নেই। তবু নাগরিকেরা এখন এভাবেই নিজেদের নিরাপত্তার হিসাব কষেন। ছিনতাই, ডাকাতি, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, গণপিটুনি, চাঁদাবাজি আর অনলাইন প্রতারণার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই থাকে। এর ফলে মানুষের অভিজ্ঞতায় অপরাধ আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, একটি পরিবেশে পরিণত হয়েছে।
এই পরিবেশ কতটা পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে আর কতটা আতঙ্কের প্রতিফলন, সেই প্রশ্ন দিয়েই বিশ্লেষণ শুরু করা দরকার। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর নিয়মিত মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। তবে এগুলো মূলত থানায় রেকর্ড হওয়া মামলার হিসাব, ঘটে যাওয়া সব অপরাধের নয়। ছিনতাইয়ের শিকার অনেকে থানায় যান না। গেলেও অনেক সময় মামলার বদলে সাধারণ ডায়েরি নিয়ে ফিরতে হয়, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে মামলার সংখ্যা বাড়লে তা অপরাধ বৃদ্ধি নাকি মামলা গ্রহণে সক্রিয়তার ফল, আর কমলে তা উন্নতি নাকি মামলা না নেওয়ার প্রবণতা, তা আলাদা করা কঠিন। তবু পুলিশের নিজস্ব তথ্য নিয়ে প্রথম সারির একাধিক জাতীয় দৈনিকের বিশ্লেষণে একটি প্রবণতা মোটামুটি স্পষ্ট।
২০১৯ সালের জুন মাসে বরগুনার একটি কলেজ ভবনের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার যে ভিডিও সারা দেশ দেখেছিল, তাতে তাঁর স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে হত্যাকারীদের হাত থেকে স্বামীকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা করতে দেখা যায়। হামলাকারীদের নেতৃত্বে ছিল স্থানীয় কিশোর গ্যাং ‘বন্ড গ্রুপ’-এর প্রধান নয়ন বন্ড, যে পরে এক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। ঘটনাটি একক কোনো বিচ্যুতি ছিল না—বরং এটি ছিল একটি প্যাটার্নের দৃশ্যমান বিস্ফোরণ, যা তার আগে থেকেই দেশের শহর ও মফস্বলে নীরবে বিস্তার লাভ করছিল। ছয় বছর পরও সেই প্যাটার্নের মূল কাঠামো—কিশোর অপরাধীদের নেটওয়ার্ক, তাদের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছায়া, আর বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি—প্রায় অক্ষতই রয়ে গেছে, শুধু মুখগুলো আর রাজনৈতিক পরিচয় বদলেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ একাধিক সময়ে সংবাদ সম্মেলনে উত্তরার ‘ডিসকো বয়েজ’, ‘নাইন স্টার গ্রুপ’, মিরপুরের ‘বন্ড গ্রুপ’-এর মতো একাধিক কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব স্বীকার করেছে। এই গ্রুপগুলোর নামকরণেই একধরনের শহুরে উপসংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট—ইংরেজি নাম, সিনেমাটিক পরিচিতি, সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্য দাপট প্রদর্শন। কিন্তু নামের আড়ালে বাস্তবতা অনেক রূঢ়: এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার, ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলা, মাদক বিক্রির নেটওয়ার্ক সামলানো এবং প্রয়োজনে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য ভাড়ায় খাটা—এটাই তাদের নিত্যকার রুটিন। এই কিশোরদের বেশিরভাগই নিজে থেকে সংগঠিত হয়নি; মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক ও অপরাধ-গবেষকদের একাধিক প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে যে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ‘বড় ভাই’রাই এদের টাকা, মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল আর সামাজিক সুরক্ষা দিয়ে পুষে রাখেন—বিনিময়ে এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা আর প্রতিপক্ষকে দমিয়ে রাখার কাজে তাদের ব্যবহার করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে এই পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ মূলত ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের স্থানীয় নেতৃত্বের দিকেই বেশি উঠেছে, যা একাধিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে নথিভুক্ত হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর এই পৃষ্ঠপোষকতার কাঠামোতে বড় ধরনের ভাঙন ধরে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই বছরের অক্টোবরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, যা পুরোনো পৃষ্ঠপোষকতার একটি বড় অংশকে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈধতাহীন করে দেয়। কিন্তু শূন্যস্থান পূরণ হতে সময় লাগেনি। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, সমকালসহ একাধিক গণমাধ্যমের পরবর্তী মাসগুলোর প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির ছাত্রদল ও যুবদলের স্থানীয় নেতৃত্বের একাংশ, কোথাও কোথাও জামায়াত-শিবির এবং নতুন গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সংশ্লিষ্ট কিছু স্থানীয় নেতাও বাজার কমিটি, পরিবহন স্ট্যান্ড ও নির্মাণসামগ্রীর সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে নতুন করে দখলবাজিতে জড়িয়েছেন। এই অভিযোগগুলোর কোনোটিই এখনো আদালতে প্রমাণিত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি, এবং এগুলোকে ‘অভিযোগ’ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন—তবে প্যাটার্নটি গুরুত্বপূর্ণ: ক্ষমতার হাতবদল হলেও স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের কাঠামো অক্ষুণ্ণ থেকে যাচ্ছে, কেবল দখলদারের রাজনৈতিক পরিচয় বদলাচ্ছে।
এই কিশোর গ্যাং ও মাস্তান-নির্ভর চাঁদাবাজির রুটিনটি আসলে বেশ যান্ত্রিক। দোকানি বা ফুটপাতের হকারের কাছে মাসিক ‘টোকেন’ বা নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়; নির্মাণকাজ শুরুর আগেই ইট-বালু-রডবাহী ট্রাক থামিয়ে ‘লাইনম্যান’-এর নামে অর্থ আদায় করা হয়; বাসস্ট্যান্ডে প্রতিটি গাড়ি থেকে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা তোলা দীর্ঘদিনের চর্চা। যে ব্যবসায়ী প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন, তাঁকে হয় মারধরের শিকার হতে হয়, নয়তো মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি শুনতে হয়—এই বাস্তবতা ঢাকার কাওরান বাজার থেকে চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার পর্যন্ত কমবেশি একই রকম বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নগর জীবনের এই আতঙ্কের দ্বিতীয় স্তরটি সড়কে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে ছিনতাইয়ের প্রবণতা আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সময়ে স্পষ্টভাবে বেড়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সংগঠনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে; মোবাইল ফোন বা ব্যাগ ছিনতাইয়ের মুহূর্ত সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত। মিহা নিউজের অনুসন্ধানে সাম্প্রতিক কয়েক মাসের শীর্ষ বাংলা সংবাদমাধ্যমের অনলাইন প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, ঢাকা-টাঙ্গাইল-বগুড়া মহাসড়কের এলেঙ্গা অংশ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা-ফেনী অংশ বারবার ছিনতাই ও ডাকাতির ঝুঁকিপূর্ণ স্পট হিসেবে উঠে এসেছে—এই তালিকাটি সম্পূর্ণ বা দাপ্তরিক কোনো ডেটাবেজ নয়, বরং সার্চের ভিত্তিতে পাওয়া একটি নমুনামাত্র। ঈদযাত্রার সময় এই প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়, যখন মহাসড়কে যানজটে আটকে থাকা বাস ও প্রাইভেট গাড়িতে সংঘবদ্ধ দল হামলা চালায়। হাইওয়ে পুলিশের জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি দীর্ঘদিনের অভিযোগ—বহু ফাঁড়িতে পর্যাপ্ত সিসিটিভি, রাতের আলো বা টহল গাড়ি নেই বলে বিভিন্ন সময়ে পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলো অভিযোগ তুলেছে। ‘অজ্ঞান পার্টি’ ও ‘মলম পার্টি’র মতো পুরোনো কৌশলও নতুন মোড়কে ফিরে এসেছে, বিশেষত দূরপাল্লার বাসে অপরিচিত যাত্রীর দেওয়া পানীয় বা খাবার খেয়ে অজ্ঞান হয়ে সর্বস্ব হারানোর অভিযোগ এখনো নিয়মিত থানায় জমা পড়ে।
মহাসড়কের এই নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক, কারণ একই করিডোরগুলো মাদক বহনেও ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে মাদক পাচারের সবচেয়ে আলোচিত প্রবেশপথ কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত, যেখান দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ঢোকে বলে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি)-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বহুবার উল্লেখ হয়েছে। ২০১৮-১৯ সালে টেকনাফে সরকারের ‘আত্মসমর্পণ’ কর্মসূচির আওতায় ১০২ জন কথিত ইয়াবা ব্যবসায়ী র্যাব ও পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন—এই তালিকায় স্থানীয় রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন। সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে, যদিও এই অভিযোগ এখনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্তে রূপ নেয়নি এবং এটিকে অভিযোগ হিসেবেই গণ্য করা দরকার। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোতে প্রতি বছর কোটির বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ হওয়ার তথ্য নিয়মিতভাবে উঠে আসে, যা থেকে বোঝা যায় প্রকৃত সরবরাহের পরিমাণ জব্দ হওয়া অংশের তুলনায় বহুগুণ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা।
গত কয়েক বছরে এই চিত্রে একটি নতুন স্তর যুক্ত হয়েছে—‘আইস’ বা ক্রিস্টাল মেথামফেটামিন, যা মূলত শহুরে অভিজাত ও মধ্যবিত্ত তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে বলে মাদকবিরোধী অভিযানে যুক্ত কর্মকর্তাদের একাধিক বিবৃতিতে উঠে এসেছে। ইয়াবার তুলনায় আইস পাচারের রুট ভিন্ন—সীমান্ত পথের বদলে এয়ার কার্গো, কুরিয়ার সার্ভিস ও আন্তর্জাতিক ডাকব্যবস্থা ব্যবহার করে এটি দেশে ঢোকার অভিযোগ উঠেছে, যা প্রচলিত সীমান্তনির্ভর নজরদারি কাঠামোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি ফেনসিডিলের মতো পুরোনো মাদক এখনো ভারত সীমান্তবর্তী জেলাগুলো দিয়ে এবং গাঁজা পার্বত্য ও সীমান্ত এলাকা দিয়ে নিয়মিত পাচার হয় বলে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) বিভিন্ন সময়ের জব্দ প্রতিবেদনে উঠে আসে। মাদক ব্যবসার অর্থ স্থানীয় হুন্ডি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাচার হয়ে জমি, যানবাহন ও স্থানীয় ব্যবসায় বিনিয়োগ হওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিনের; বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) এ ধরনের সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে, যদিও সামগ্রিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার মতো বড় সাফল্যের নজির বিরল।
সড়ক আর সীমান্তের অপরাধের পাশাপাশি এখন একটি অদৃশ্য সীমান্তও তৈরি হয়েছে—মোবাইল স্ক্রিন আর ইন্টারনেট সংযোগের ভেতরে। ২০২১ সালে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ ও ধামাকা শপিংয়ের মতো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহকের শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশে ডিজিটাল প্রতারণার স্কেল প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে সামনে আনে। এরপর ২০২৩-২৪ সালে এমটিএফই নামের একটি ভুয়া ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগ প্রকল্পে সারা দেশের হাজারো মানুষের অর্থ হারানোর অভিযোগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত চালায় এবং একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে—ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, প্রচলিত ব্যাংকিং খাতের বাইরে অনলাইন বিনিয়োগের নামে প্রতারণার বাজার কতটা দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এর পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নামে ভুয়া ভিডিও ছড়ানো এবং সাধারণ নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ বাড়ছে বলে সাইবার নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া মামলার ধরন বিশ্লেষণ করে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে ২০২৩ সালে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হলেও মতপ্রকাশ দমনে আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ রয়ে গেছে, যা প্রকৃত সাইবার অপরাধীদের চিহ্নিত করার কাজকে জটিল করে তুলেছে বলে মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা একাধিকবার মন্তব্য করেছেন। এর বাইরে বিকাশ-নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সেজে ফোন করে ‘আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’ বলে ওটিপি হাতিয়ে নেওয়ার প্রতারণা এখনো সবচেয়ে সাধারণ ও ব্যাপক প্রতারণার ধরন, যার শিকার সবচেয়ে বেশি হন প্রযুক্তিতে স্বল্প অভিজ্ঞ প্রবীণ ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী।
এই প্রযুক্তি-নির্ভর অপরাধের ছায়ায় যে পুরোনো সহিংসতা এখনো সবচেয়ে বেশি মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করছে, তা হলো নারী ও শিশু নির্যাতন। ২০১৯ সালে ফেনীর সোনাগাজী মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রত্যাহার না করায় পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা এবং তার দ্রুত বিচারে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড—বিরল দ্রুততায় সম্পন্ন একটি রায়—এই ইস্যুতে বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েছিল। কিন্তু এই মামলাটি নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নারীর প্রতি সহিংসতাবিষয়ক জরিপে উঠে এসেছিল, দেশের বিবাহিত নারীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) প্রতি বছর ধর্ষণ, যৌতুকজনিত হত্যা ও পারিবারিক সহিংসতার যে হিসাব প্রকাশ করে, তাতে প্রতিবছর গড়ে হাজারের বেশি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়—যদিও প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে ঢের বেশি হওয়ার কথা বলেন নারী অধিকারকর্মীরা, কারণ সামাজিক লজ্জা ও পারিবারিক চাপে অধিকাংশ ঘটনাই থানা পর্যন্ত পৌঁছায় না। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ধর্ষণ মামলায় শাস্তি হওয়ার হার অত্যন্ত কম—কোনো কোনো হিসাবে তা মাত্র তিন শতাংশের কাছাকাছি, যদিও এই সংখ্যা কোনো একক দাপ্তরিক উৎসের নয় বরং আইনি গবেষকদের বিভিন্ন সময়ের পর্যবেক্ষণের সমষ্টি। সাক্ষী সুরক্ষার অনুপস্থিতি, গ্রামীণ পর্যায়ে মামলার আগেই ‘সালিশ’-এর মাধ্যমে আপস করানোর সামাজিক চাপ, এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দুর্বল সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের অভিযোগ—এই তিনটি কারণ একসঙ্গে মিলে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে কার্যত দূরে সরিয়ে রাখে।
সহিংসতার এই চিত্রে আরেকটি উপাদান হলো অস্ত্র—যা কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তার থেকে রাজনৈতিক সংঘাত পর্যন্ত প্রায় সব ধরনের অপরাধেই এখন উপস্থিত। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম পথ দিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ঢোকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের, আর দেশের অভ্যন্তরেও কিছু জেলায় দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘ওয়ান শুটার’ পিস্তলের কুটির-শিল্প গড়ে ওঠার তথ্য বিভিন্ন সময়ে পুলিশের অভিযানে উঠে এসেছে। নির্বাচনের আগে বা রাজনৈতিক কোন্দলের মৌসুমে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান বাড়ানো হলেও তা মূলত মৌসুমি তৎপরতা, বছরজুড়ে ধারাবাহিক নজরদারির নজির কম বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ। এই অস্ত্র সংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়াবহ এবং সবচেয়ে বেশি নথিভুক্ত দৃষ্টান্ত সম্ভবত ২০২০ সালে কক্সবাজারে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানকে পুলিশের ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার ঘটনা, যার বিচারে ২০২২ সালে ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ একাধিক পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড হয়। মামলাটি প্রমাণ করে দেয়, মাদকবিরোধী অভিযানের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে, এবং একই বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র কেন র্যাব ও এর কয়েকজন সাবেক-বর্তমান কর্মকর্তার ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তারও একটি ব্যাখ্যা দেয়।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজির জাল পরিবহন, ফুটপাত ও নির্মাণ খাতেই সবচেয়ে ঘন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় বছরে শত শত কোটি টাকার অবৈধ আদায়ের চিত্র তুলে ধরেছিল, যেখানে বাস-ট্রাক মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের একাংশের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশের অভিযোগ উঠে এসেছিল। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের প্রতিটি অধ্যায়ে এই চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ হাতবদল হয়েছে, কিন্তু কাঠামোটি কখনো ভাঙেনি। আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সময়ে কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় ক্ষমতাসীন জোটের অভ্যন্তরীণ উপদলের মধ্যে বাজার ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ঘিরে সংঘর্ষের একাধিক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে, যা দেখিয়ে দেয় রাজনৈতিক সহিংসতার উৎস কেবল দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের লড়াই।
এই পুরো চিত্রের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট। থানায় মামলা করতে যাওয়া ভুক্তভোগীদের বহু অভিজ্ঞতায় বারবার উঠে আসে এজাহার নেওয়ার বদলে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করিয়ে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ, বিশেষত প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকলে। দৃশ্যমান টহল পুলিশের উপস্থিতি অনেক এলাকায় কার্যত অনুপস্থিত বলে বাসিন্দারা নিয়মিত অভিযোগ করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পরপরই দেশজুড়ে শতাধিক থানায় হামলা, অস্ত্র লুট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, যার পর কয়েক সপ্তাহ পুলিশ সদস্যরা আতঙ্কে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেছেন—রয়টার্স, বিবিসি বাংলা ও দেশীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে নথিভুক্ত এই ঘটনা দেশের পুলিশি কাঠামোকে কার্যত সাময়িকভাবে অচল করে দিয়েছিল, এবং সেই শূন্যতা পূরণে সেনাবাহিনীকে সহায়ক ভূমিকায় নামানো হয়। এই ধসের রেশ কাটিয়ে পুলিশ পুরোপুরি স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে সময় নিয়েছে, আর ঠিক এই সময়টাতেই দেশজুড়ে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বৃদ্ধির খবর বেশি এসেছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিরোধমূলক গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি—অর্থাৎ অপরাধ ঘটার আগেই তা ঠেকানোর সক্ষমতা—এই প্রাতিষ্ঠানিক সংকটেরই একটি উপসর্গ, বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যর্থতা নয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচারব্যবস্থার জট। আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি, যার একটি বড় অংশ ফৌজদারি মামলা। দুর্বল অভিযোগপত্র, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে পেশাদার অপরাধীরা বারবার জামিনে মুক্তি পেয়ে একই অপরাধে ফিরে আসার নজির ভূরি ভূরি। কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ বন্দি রাখা হচ্ছে বহু বছর ধরে, এবং সংশোধনের বদলে এই ভিড়াক্রান্ত কারাগারকেই অভিজ্ঞ অপরাধীদের কাছ থেকে নতুন কৌশল শেখার জায়গা বলে বর্ণনা করেছেন একাধিক অপরাধ-গবেষক ও সাবেক কারা কর্মকর্তা। ফলে সংশোধনাগার তার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে বাস্তবে একধরনের নেটওয়ার্কিং কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে।
এই সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতাবোধ এখন একটি সামাজিক লক্ষণেই পরিণত হয়েছে। বিচার না পাওয়ার হতাশা থেকে আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্দেহভাজন চোর বা অপরাধীকে গণপিটুনিতে হত্যার একাধিক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে—যা রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটেরই একটি সহিংস প্রকাশ। কোথাও কোথাও বাসিন্দারা নিজেরাই রাতে পাহারার দল গঠন করেছেন, যা একদিকে সামাজিক সংহতির নিদর্শন, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতি অনাস্থারও প্রতিফলন। পুলিশ ও সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিশ্রুতি এসেছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বদলাতে যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ও ধারাবাহিকতা দরকার, তার সঙ্গে এই প্রতিশ্রুতির দূরত্ব এখনো বিস্তর।
এই পুরো অনুসন্ধানে যে প্যাটার্নটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হলো—বাংলাদেশের অপরাধচিত্র কোনো একক ষড়যন্ত্র বা কোনো একটি দলের পরিকল্পিত প্রকল্প নয়। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা, যেখানে দুর্বল থানা-পুলিশি ব্যবস্থা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, কারাগারের ব্যর্থতা এবং স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি একে অপরকে পুষ্ট করে। ক্ষমতার হাতবদল অপরাধের কাঠামো ভাঙে না, কেবল তার নিয়ন্ত্রক বদলায়—এই সত্যটি আওয়ামী লীগ আমলের চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক থেকে আগস্ট-পরবর্তী নতুন দখলবাজির অভিযোগ পর্যন্ত সমানভাবে প্রযোজ্য, এবং কোনো একটি রাজনৈতিক পক্ষকে এককভাবে দায়ী করে বাকিদের দায়মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। সমাধানের পথ তাই কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির পতন বা উত্থানে নিহিত নয়—বরং এজাহার গ্রহণের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা, তদন্তের মান বাড়ানো, সাক্ষী সুরক্ষা আইন কার্যকর করা, বিচারকাজে গতি আনতে বিচারক ও আদালতের সংখ্যা বাড়ানো এবং পুলিশি জবাবদিহিতাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারেই। যতদিন এই প্রক্রিয়াগত সংস্কার বাস্তবে রূপ না নেয়, ততদিন অপরাধের মুখগুলো বদলাবে, কিন্তু ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা একই থেকে যাবে।





