মাল্টিপ্লেক্সের অন্ধকার হলে বসে থাকা একজন দর্শক যখন পর্দায় দাড়িওয়ালা, টুপি-পাঞ্জাবি পরা একটি চরিত্রকে দেখেন, তখন গল্প এগোনোর আগেই তাঁর মস্তিষ্ক প্রায় নিশ্চিতভাবে একটি পূর্বানুমান তৈরি করে ফেলে—এই লোকটি হয় ভিলেন, নয়তো অন্তত সন্দেহভাজন কেউ। এই প্রতিক্রিয়া আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। বিগত দুই দশকে পরিচালিত একাধিক বৃহৎ পরিসরের একাডেমিক গবেষণা প্রমাণ করেছে, বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই চলচ্চিত্রশিল্প—হলিউড ও বলিউড—উভয় ক্ষেত্রেই মুসলিম চরিত্রায়নে একটি সুনির্দিষ্ট, পরিমাপযোগ্য ও পুনরাবৃত্তিমূলক প্যাটার্ন বিদ্যমান। একই সঙ্গে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা পাঠ্যক্রমে মুসলিম সভ্যতার ঐতিহাসিক অবদান নিয়ে যে নীরবতা বা সংক্ষিপ্তকরণ লক্ষ করা যায়, তা নিয়েও শিক্ষাবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। এই প্রতিবেদনে আমরা কোনো একক “পরিকল্পনা”র দাবি না করে, বরং যেসব স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও তথ্যভিত্তিক সংস্থা এই প্যাটার্নগুলো নথিভুক্ত করেছে, তাদের উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখব বিষয়টি ঠিক কতটা গভীর ও ব্যাপক।
হলিউডের পর্দায় মুসলিম: জ্যাক শাহীনের দীর্ঘ অনুসন্ধান
মুসলিম ও আরব চরিত্রায়ন নিয়ে সবচেয়ে পুরোনো ও পদ্ধতিগত গবেষণাটি করেছিলেন মার্কিন গণমাধ্যম-বিশ্লেষক জ্যাক জি. শাহীন। তাঁর Reel Bad Arabs: How Hollywood Vilifies a People গ্রন্থে তিনি প্রায় ১২০০টি হলিউড চলচ্চিত্র পর্যালোচনা করেন। তাঁর নিজের ভাষায়, এর মধ্যে মাত্র তিন ডজনের মতো (প্রায় ৩৬টি) চলচ্চিত্রে আরব বা মুসলিম চরিত্রের ভারসাম্যপূর্ণ বা ইতিবাচক উপস্থাপন খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। বাকি প্রায় সবগুলোতেই আরবদের হয় সন্ত্রাসী, নয়তো রহস্যময়-সন্দেহজনক শেখ, অথবা এমন মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে যাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। শাহীনের এই গবেষণা পরবর্তী দুই দশকে মিডিয়া স্টাডিজে একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
USC অ্যানেনবার্গের “মিসিং অ্যান্ড ম্যালাইনড”: সংখ্যায় যা বলছে
শাহীনের গবেষণার প্রায় দুই দশক পর, ২০২১ সালে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (USC) অ্যানেনবার্গ ইনক্লুশন ইনিশিয়েটিভ একটি অত্যন্ত বিস্তারিত ও পরিমাণগত গবেষণা প্রকাশ করে, যার শিরোনাম Missing & Maligned: The Reality of Muslims in Popular Global Movies। অস্কারমনোনীত অভিনেতা রিজ আহমেদ, ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও পিলার্স ফান্ডের সহযোগিতায় পরিচালিত এই গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ২০১৭-২০১৯ সালের ২০০টি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণার ফলাফল রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো:
- বিশ্লেষিত প্রায় ৯ হাজার সংলাপ-চরিত্রের মধ্যে মুসলিম চরিত্র ছিল ২ শতাংশেরও কম।
- মাত্র ৬টি চলচ্চিত্রে কোনো মুসলিম চরিত্র সহ-প্রধান ভূমিকায় ছিল, আর তার মধ্যে মাত্র একজন ছিলেন নারী।
- কোনো অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রে একজনও মুসলিম চরিত্র পাওয়া যায়নি।
- মোট বিশ্লেষিত চলচ্চিত্রের মাত্র ৯.৫ শতাংশে (অর্থাৎ প্রায় প্রতি ১০টির ১টিতে) কোনো সংলাপযুক্ত মুসলিম চরিত্রই ছিল না বললেই চলে।
- যেসব মুসলিম চরিত্র দেখানো হয়েছে, তাদের প্রায় ৪০ শতাংশকে সহিংসতার হোতা এবং ৫৪ শতাংশের বেশিকে সহিংসতার শিকার হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
গবেষণাটির সহ-উদ্যোক্তা রিজ আহমেদ এই ফলাফল প্রকাশের সময় বলেছিলেন, পর্দায় মুসলিমদের উপস্থাপনের ধরনই নির্ধারণ করে দেয় কোন নীতি প্রণীত হবে, কোন মানুষ প্রাণ হারাবে, আর কোন দেশ আক্রান্ত হবে—তথ্য মিথ্যা বলে না। তিনি আরও বলেন, এই সময়ের ভুল-উপস্থাপনার দিকে ভবিষ্যতে মানুষ সেই লজ্জা ও অনুশোচনার দৃষ্টিতে তাকাবে, যেভাবে আজ মিনস্ট্রেলসি (বর্ণবাদী অনুকরণ-থিয়েটার) যুগকে দেখা হয়।
এই গবেষণার প্রতিক্রিয়ায় পিলার্স ফান্ডের নেতৃত্বে গঠিত হয় The Blueprint for Muslim Inclusion—একটি জোট, যার লক্ষ্য বিনোদন শিল্পে মুসলিম কণ্ঠস্বর বৃদ্ধি করা।
রিজ টেস্ট: বেকডেল টেস্টের আদলে একটি মানদণ্ড
নারী চরিত্রায়নের মান যাচাইয়ে ব্যবহৃত বিখ্যাত ‘বেকডেল টেস্ট’-এর আদলে ২০১৮ সালে শাফ চৌধুরী, ইসোবেল ইঙ্গহাম-ব্যারো ও ড. সাদিয়া হাবিব তৈরি করেন ‘রিজ টেস্ট’। রিজ আহমেদের ২০১৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেওয়া একটি ভাষণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি এই টেস্টে পাঁচটি মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়। কোনো চলচ্চিত্র বা টিভি অনুষ্ঠানে শনাক্তযোগ্য মুসলিম চরিত্র থাকলে দেখা হয়—
১. চরিত্রটি কি সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কথা বলছে, বা তার শিকার/হোতা কি না ২. চরিত্রটি কি অযৌক্তিকভাবে ক্রুদ্ধ ৩. চরিত্রটি কি কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সেকেলে বা আধুনিকতা-বিরোধী হিসেবে দেখানো হয়েছে ৪. চরিত্রটি কি পশ্চিমা জীবনধারার জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপিত ৫. পুরুষ চরিত্র হলে সে কি নারীবিদ্বেষী, আর নারী চরিত্র হলে সে কি পুরুষ দ্বারা নিপীড়িত হিসেবে দেখানো হয়েছে
এই পাঁচটির যেকোনো একটির উত্তর হ্যাঁ হলেই সেই চলচ্চিত্র বা অনুষ্ঠান পরীক্ষায় ‘ফেল’ করে। লন্ডনের বার্কবেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে চৌধুরী জানান, শনাক্তযোগ্য মুসলিম চরিত্রসহ ৮৬৫টি চলচ্চিত্র পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তার মধ্যে ৮৭ শতাংশই এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৮ সালের বিবিসি নাটক Bodyguard প্রথম পর্বের সূচনার মাত্র ১২ মিনিটের মধ্যেই পাঁচটি মানদণ্ডেই ব্যর্থ হয় বলে চৌধুরী উল্লেখ করেন।
তবে ভারসাম্যের স্বার্থে বলা দরকার, রিজ টেস্ট নিজেই এমন কিছু চলচ্চিত্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে যেগুলো এই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়েছে—যেমন মালয়ালম ভাষার চলচ্চিত্র Virus, যা মুসলিম চরিত্রকে জটিলতা ও মর্যাদাসহ উপস্থাপন করেছে বলে প্রশংসিত হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যাটি প্রযুক্তিগতভাবে অনিবার্য কোনো বিষয় নয়—বরং শিল্পগত পছন্দ ও অভ্যাসের প্রশ্ন, যা বদলানো সম্ভব বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
বলিউড ও দক্ষিণ এশীয় চিত্রায়ন: দাড়ি-টুপির প্রতীকী ব্যবহার
দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপটে, বিশেষত বলিউডে, এই প্রবণতা আরও সুনির্দিষ্টভাবে নথিভুক্ত হয়েছে। Framing Analysis of Indian Muslims in Bollywood Movies শীর্ষক একটি একাডেমিক গবেষণায় (পাকিস্তানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যম গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত) পরিমাণগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বলিউড চলচ্চিত্রে মুসলিম চরিত্রের ৭৫.৬ শতাংশ স্টেরিওটাইপ নেতিবাচক, আর মাত্র ১২.১ শতাংশ ইতিবাচক।
একাধিক গবেষণাপত্রে লক্ষ করা গেছে, দাড়ি ও টুপি—এই দুটি সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় প্রতীক বলিউডে বারবার ব্যবহৃত হয়েছে চরিত্রকে হয় সামন্ত জমিদার, নয়তো গ্যাংস্টার বা ভিলেন হিসেবে বোঝাতে। সাউথ এশিয়া জার্নাল-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, Padmaavat চলচ্চিত্রে আলাউদ্দিন খিলজিকে একজন বর্বর ভিলেন হিসেবে, Tanhaji চলচ্চিত্রে উদয়ভানকে দমনমূলক দৃশ্যকল্পের মধ্য দিয়ে চিত্রায়িত করা হয়েছে, যেখানে হিন্দু চরিত্রদের বীরত্ব ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। Kabul Express, Baby, New York, Sarfarosh-এর মতো চলচ্চিত্রে মুসলিম চরিত্র বারবার সন্ত্রাসী হিসেবে হাজির হয়েছে বলে গবেষণাপত্রগুলো নির্দেশ করছে।

একই গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে—ভারতের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ (ICHR) মধ্যযুগীয় ভারতীয় রাজবংশ নিয়ে আয়োজিত একটি প্রদর্শনী থেকে মুসলিম শাসকদের বাদ দিয়েছিল, এই যুক্তিতে যে ইসলামি শাসকরা “ভারতীয় সভ্যতা ধ্বংস করেছিল”। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এবং বলিউডের চরিত্রায়ন একে অপরকে শক্তিশালী করছে—পর্দায় যে বিকৃতি দেখা যাচ্ছে, তা ইতিহাস চর্চার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার প্রশ্ন: ইসলামি স্বর্ণযুগ কোথায়
সিনেমার বাইরে গিয়ে যদি শিক্ষাক্ষেত্রের দিকে তাকানো যায়, সেখানেও একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘদিনের একাডেমিক আলোচনা রয়েছে। অষ্টম থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত ‘ইসলামি স্বর্ণযুগে’ গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন ও আলোকবিজ্ঞানে মুসলিম পণ্ডিতদের অবদান বিশাল—আল-খারিজমি (যাঁর নাম থেকে ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটি এসেছে), ইবনে আল-হাইছাম (আধুনিক পরীক্ষণ-ভিত্তিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অন্যতম পথিকৃৎ), ইবনে সিনা (যাঁর The Canon of Medicine গ্রন্থ ছয় শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য ছিল)—এমন বহু নাম এই যুগের সাক্ষী।

Muslim Heritage গবেষণা সংস্থায় প্রকাশিত “Memory and Erasure in the Story of the West” শীর্ষক একটি প্রবন্ধে একজন ইতিহাসবিদ প্রশ্ন তোলেন—৫০০ বছর আগে যে অ্যাভিসেনা (ইবনে সিনা), অ্যাভেরোজ (ইবনে রুশদ), রেজেস (আর-রাজি), আল-খারিজমি বা আল-হাজেনের (ইবনে আল-হাইছাম) নাম প্রতিটি শিক্ষিত ইউরোপীয়ের কাছে প্লেটো-অ্যারিস্টটলের মতোই পরিচিত ছিল, আজ কেন তা জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত কোর্স করতে হয়? তাঁর পর্যবেক্ষণ, পশ্চিমা সভ্যতাকে এথেন্স-রোম থেকে সরাসরি বর্তমান পর্যন্ত এক ধারাবাহিক প্রবাহ হিসেবে সরলীকৃত করে উপস্থাপনের প্রবণতাই এই বিস্মৃতির কারণ।
একই ধরনের পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায় বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও। ResearchGate-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র উল্লেখ করে, ইবনে আল-হাইছাম আধুনিক পরীক্ষণ-ভিত্তিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের অনেক আগেই প্রণয়ন করলেও, বহু পাঠ্যবইয়ে এই পদ্ধতিকে কোনো নির্দিষ্ট উদ্ভাবকের নাম ছাড়াই শুধু “ধাপগুলোর একটি সেট” হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

যুক্তরাজ্যের প্রেক্ষাপটে আরও সুনির্দিষ্ট একটি তথ্য পাওয়া যায়—দেশটির জাতীয় পাঠ্যক্রমের কী-স্টেজ-২ পর্যায়ে ইসলামি স্বর্ণযুগকে এখনো “নন-স্ট্যাটিউটরি” (অর্থাৎ পড়ানো বাধ্যতামূলক নয়) হিসেবে চিহ্নিত করা আছে। একজন শিক্ষাবিদ এই প্রেক্ষাপটে মন্তব্য করেছেন, ঔপনিবেশিক যুগের প্রভাবেই ইতিহাস ও ভূগোলের পাঠ্যক্রম মূলত পশ্চিমা কৃতিত্বকেন্দ্রিক থেকে গেছে, আর গ্লোবাল সাউথের অবদানকে গৌণ করে দেখানো হয়।
স্প্রিঙ্গার নেচার প্রকাশিত একটি গবেষণায় নরওয়ের মুসলিম পটভূমির শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, পাঠ্যক্রমে ইসলামি স্বর্ণযুগের অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিপরীতে, যখন শিক্ষার্থীদের ইবনে আল-হাইছাম বা আল-খারিজমির মতো ব্যক্তিত্বদের অবদান সম্পর্কে জানানো হয়, তখন তাদের মধ্যে গর্ব ও অনুপ্রেরণার অনুভূতি তৈরি হতে দেখা গেছে বলে গবেষণাটি জানাচ্ছে।
জনমত জরিপে এর প্রতিফলন
চিত্রায়ন ও পাঠ্যক্রমের এই প্যাটার্ন নিছক একাডেমিক আলোচনার বিষয় নয়—এর বাস্তব সামাজিক প্রতিফলন পাওয়া যায় জনমত জরিপেও। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম নির্ভরযোগ্য জরিপ সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২২ সালের এক জরিপে দেখা যায়, মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মাত্র ১৭ শতাংশ মুসলিমদের প্রতি অনুকূল মনোভাব পোষণ করেন, বিপরীতে ২২ শতাংশের মনোভাব প্রতিকূল, আর বাকি ৫৯ শতাংশ হয় নিরপেক্ষ, নয়তো “যথেষ্ট জানেন না” বলে জানিয়েছেন। ২০১৭ সালের একটি পৃথক জরিপে ব্যবহৃত “ফিলিং থার্মোমিটার” পদ্ধতিতে (০ থেকে ১০০ স্কেলে) মুসলিমদের প্রতি গড় মনোভাবের স্কোর ছিল মাত্র ৪৮—যা নাস্তিকদের প্রতি মনোভাবের প্রায় কাছাকাছি এবং অন্য অধিকাংশ ধর্মীয় গোষ্ঠীর তুলনায় কম।
আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ২০২৫ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে ৭৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন মুসলিমরা যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত কিছুটা বৈষম্যের শিকার হন—যদিও এই হার ২০১৭ সালের ৮৭ শতাংশ থেকে কমেছে। মুসলিম আমেরিকানদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে পরিচালিত ২০১৭ সালের একটি বিস্তারিত পিউ জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৪৮ শতাংশ মুসলিম আমেরিকান গত এক বছরে অন্তত একবার বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন, আর ৭৫ শতাংশ মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়া ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। তবে একই জরিপে ৯২ শতাংশ মুসলিম আমেরিকান নিজেদের আমেরিকান পরিচয়ে গর্বিত বলেও জানিয়েছেন—যা দেখায়, বৈষম্যের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা নিজেদের এই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই দেখেন।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো, গণমাধ্যম ও পাঠ্যক্রমে যে চিত্র বারবার দেখানো হয়, জনমত জরিপের এই ফলাফল অনেকাংশে তারই প্রতিফলন। মিডিয়া স্টাডিজের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘কালটিভেশন থিওরি’—অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট চিত্র বারবার দেখানো হলে তা দর্শকের বাস্তবতা-উপলব্ধিকে প্রভাবিত করতে শুরু করে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও জনআলোচনা
রিজ আহমেদের ২০১৭ সালের ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ভাষণটি এই আলোচনায় একটি মোড়-ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ভাষণে তিনি বলেছিলেন, মানুষ পর্দায় নিজেকে দেখতে চায়—এটাই তাদের বার্তা দেয় যে তারা সমাজের অংশ। কিন্তু মুসলিমদের ক্ষেত্রে জাতীয় বয়ানটি অত্যন্ত হতাশাজনক, আর প্রতিনিধিত্বের এই ঘাটতিই উগ্রপন্থীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
এই বক্তব্যের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে #RizTest, #MissingAndMaligned-এর মতো হ্যাশট্যাগে আলোচনা নিয়মিত ফিরে এসেছে, বিশেষত কোনো নতুন চলচ্চিত্র বা সিরিজ মুক্তির পর মুসলিম দর্শকেরা নিজেদের চরিত্রায়ন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। The Conversation, Vice, NPR-এর মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গবেষণাগুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে, যা মূলধারার সাংবাদিকতায়ও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার প্রবণতা নির্দেশ করে।
তবে আলোচনা কেবল সমালোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি—বাস্তব পরিবর্তনের উদাহরণও তৈরি হয়েছে। Ms. Marvel (২০২২) ও Ramy-র মতো সাম্প্রতিক প্রযোজনাগুলো মুসলিম তরুণ প্রজন্মের জটিল, বহুমাত্রিক পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছে বলে সমালোচকেরা প্রশংসা করেছেন। বলিউডেও কিছু চলচ্চিত্র গতানুগতিক ছক ভাঙার চেষ্টা করেছে, যদিও গবেষকদের মতে তা এখনো ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়।
ভারসাম্যপূর্ণ প্রেক্ষাপট: এটি কি ইচ্ছাকৃত ষড়যন্ত্র, নাকি কাঠামোগত সমস্যা
এই পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত প্রশ্ন উত্থাপন করা জরুরি—এই প্যাটার্নগুলো কি কোনো একক, সমন্বিত পরিকল্পনার ফসল, নাকি কাঠামোগত ও ঐতিহাসিক কারণে তৈরি হওয়া পক্ষপাত? গবেষকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিকেই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করেন। সাহিত্য সমালোচক এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর Orientalism (১৯৭৮) গ্রন্থে যে তাত্ত্বিক কাঠামো দিয়েছিলেন, তাতে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ঔপনিবেশিক যুগ থেকে পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ড প্রাচ্যকে (বিশেষত মুসলিম বিশ্বকে) ‘অপর’ বা ‘রহস্যময়-বিপজ্জনক’ হিসেবে নির্মাণ করে এসেছে—যা কোনো একক ষড়যন্ত্র নয়, বরং শতাব্দীব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক অভ্যাসের ফসল। ৯/১১-উত্তর “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”-এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে বলে একাধিক গবেষণাপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
তবে এটাও উল্লেখ করা জরুরি, চলচ্চিত্র শিল্পে ব্যবসায়িক চাপ, দ্রুত-গল্প-বলার প্রবণতা এবং প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক নির্মাতা অজান্তেই গতানুগতিক ছক অনুসরণ করেন—যা ইচ্ছাকৃত বিদ্বেষের চেয়ে সৃজনশীল আলস্য বা গবেষণার ঘাটতির ফল বলেও অনেক সমালোচক মনে করেন। সাউথ এশিয়া জার্নাল-এর প্রতিবেদনেও এই ভুল-উপস্থাপনাকে “অনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অলস” বলে অভিহিত করা হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় সমস্যাটির সমাধান সম্ভব যদি শিল্প ও শিক্ষা—উভয় ক্ষেত্রেই সচেতন প্রচেষ্টা নেওয়া হয়।
পর্যবেক্ষণ ও উপসংহার
সব মিলিয়ে যে চিত্র উঠে আসে তা হলো—মুসলিম চরিত্রায়ন নিয়ে যে উদ্বেগ দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে বিদ্যমান, তা নিছক অনুভূতিনির্ভর অভিযোগ নয়। জ্যাক শাহীনের প্রায় দুই দশক আগের গবেষণা থেকে শুরু করে USC অ্যানেনবার্গের সাম্প্রতিক পরিমাণগত উপাত্ত, রিজ টেস্টের ৮৭ শতাংশ ব্যর্থতার হার, বলিউডের ৭৫.৬ শতাংশ নেতিবাচক চরিত্রায়নের পরিসংখ্যান—প্রতিটি স্বাধীন গবেষণাই একই দিকে ইঙ্গিত করছে। একই সঙ্গে শিক্ষা পাঠ্যক্রমে ইসলামি সভ্যতার বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক অবদানের সংক্ষিপ্তকরণও নথিভুক্ত একটি বাস্তবতা, যা যুক্তরাজ্যের জাতীয় পাঠ্যক্রম নীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞান পাঠ্যবই পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই প্যাটার্নকে কোনো একক গোপন “মেগা পরিকল্পনা” হিসেবে না দেখে বরং ঔপনিবেশিক ইতিহাস, ৯/১১-উত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, শিল্পের ব্যবসায়িক প্রণোদনা এবং শিক্ষা-নীতিনির্ধারণী কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি পক্ষপাতের সম্মিলিত ফসল হিসেবে বোঝাই বেশি যুক্তিসংগত—এমনটাই বলছে অধিকাংশ একাডেমিক সূত্র। তবে এই পার্থক্য উপলব্ধি করার অর্থ সমস্যাকে লঘু করে দেখা নয়; বরং এটি সমাধানের পথও দেখায়—রিজ টেস্টের মতো মানদণ্ড ব্যবহার করে শিল্পকে জবাবদিহির আওতায় আনা, এবং পাঠ্যক্রম সংস্কারের মাধ্যমে ইতিহাসের অসম্পূর্ণ বয়ানকে সম্পূর্ণ করার প্রচেষ্টা—উভয়ই ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়েছে, আর গবেষকদের মতে এই ধারাবাহিক জবাবদিহিমূলক চাপই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারে।











মন্তব্য করুন