মঈনউদ্দীন মুনাওয়ার
“রাজায় রাজার যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়” প্রবাদটি চিরন্তন সত্য বললে ভুল হবে না। পৃথিবীতে উলুখাগড়াদের জীবনই জয় পরাজয়ের নির্ণায়ক। মূলত তাদের রক্ত দ্বারা ইতিহাস রচিত হয়। আজকের ঘটনাবলী আগামীকাল ইতিহাস হয়ে মহাকালের চিরস্থায়ী অংশে পরিণত হচ্ছে। তবে ইতিহাস বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা না। এ এক ধারাবাহিক ও প্রবাহমান বিষয়বস্তু। ইতিহাসকে একটা জাতির স্মৃতি ভান্ডার শিক্ষা গ্রহণের কেন্দ্র ও বীরত্ব সংরক্ষণের সূতিকাগার বললেও অতিরঞ্জিত হবে না। ইতিহাস সর্বদায় বহু দিগন্ত প্রসারিত এবং মহাসমুদ্রের মত ব্যাপক বিস্তৃত। সুতরাং ইতিহাস মানে শুধু রাজা-বাদশাদের উত্থান-পতনের কাহিনী নয়। কিংবা শুধু রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ নয় বরং দেশ-জাতির সুসময় ও দুঃসময়ের কান্ডারী, জ্ঞানী -গুণী,সমাজসংস্কারক, বুদ্ধিজীবীদের জীবনধারা ও গৌরবময় কীর্তিগাথা এই ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে অন্তর্ভুক্ত। নির্দ্বিধায় বলা যায়, রাজনীতি , সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং ঐতিহ্য ইতিহাসের ব্যাপকতায় আবদ্ধ।
মার্ক্স ও তাঁর সহযোগী ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস তাঁদের বিখ্যাত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো গ্রন্থে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, “আজ পর্যন্ত মানব সমাজের যত ইতিহাস, তা মূলত শ্রেণি সংগ্রামেরই ইতিহাস”। মার্ক্সের এই ইতিহাস দর্শনকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বলা হয়। তাঁর মতে, কোনো অলৌকিক শক্তি বা বিমূর্ত চিন্তাভাবনা ইতিহাস তৈরি করে না; বরং মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই এবং অর্থনৈতিক উৎপাদন পদ্ধতিই ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে নিখুঁত মনের ঐতিহাসিক হিসেবে স্বীকৃত ইবনে খালদুনের মতে – ইতিহাস হলো ‘সামাজিক বিবর্তন ও সভ্যতার বিজ্ঞান’। ইতিহাসের সবচেয়ে আধুনিক ও বৈপ্লবিক সংজ্ঞা দিয়েছেন ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত ‘আল-মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে। তিনি ইতিহাসকে দু’টি ভাগে ভাগ করেছেন। এক:বাহ্যিক ইতিহাস–যা কেবল অতীত যুগের ঘটনা, রাজবংশের পরিবর্তন এবং যুদ্ধের বিবরণ দেয়। ইতিহাসের বিপুল ভান্ডারে হয়তো ঘটনার তালিকা বলাটা সমীচীন। যেগুলো কেন্দ্রীয় চরিত্র হচ্ছে রাজা-বাদশা ও রাষ্ট্রপ্রধানদের ব্যক্তিত্ব অথবা কতিপয় খ্যাতনামা ব্যক্তিদের জীবন কাহিনী ও স্মৃতি কথা। দুই: অভ্যন্তরীণ ইতিহাস –এটিই আসল ইতিহাস। তাঁর দর্শনে, “ইতিহাস হলো মানব সমাজ ও বিশ্ব সভ্যতার বিবরণ। এটি সমাজের প্রকৃতি, মানুষের স্বভাব, গোত্রীয় সংহতি এবং সভ্যতার উত্থান, পতন ও রূপান্তরের কার্যকারণ অনুসন্ধানের বিজ্ঞান”। ইবনে খালদুনের মতে, ইতিহাস কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি সমাজ ও রাজনীতির কিছু অমোঘ নিয়মের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়ে। আর ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো ইতিহাস কোন দিনই সর্বাংশে নিরপেক্ষ না। বিজয়ীরা তাদের গৌরব, বীরত্বপূর্ণ বিজয়ের ইতিহাস নিজেদের স্বহস্তে রচনা করেন। যেখানে পরাজিতদের কুলজি থাকে তবে পৃথিবীর তুলনায় কবরের মতো ছোট্ট। এমনকি বিজয়ী দলের সবার অবদানের ন্যূনতম স্বীকৃতিও ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়না। মূলত এখানেই একটা দেশ জাতির দ্বন্দ্ব অতল গহবরে নিমজ্জিত।
১৭৮৯ সালে বাস্তিল দুর্গ পতনের মধ্য দিয়ে ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়। স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের অমরবাণী সামনে রেখে ফরাসি বিপ্লবে অংশ নিয়েছিল সেদেশের সবশ্রেণির মানুষ। কিন্তু যাদের রক্ত বিসর্জনের মাধ্যমে বিপ্লব সাধিত হয়, ইতিহাসে তাদের নাম অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিপ্লবোত্তর ক্ষমতা চলে যায় কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে। এটা নির্মম বাস্তবতা, এই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের রক্ত পদদলিত করে ক্ষমতার মসনদে আরোহন করে। জনগণকে বোকা বানিয়ে, কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে; তাদের রক্তের সাথে নিষ্ঠুর প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে পুরনো বন্দোবস্ত পুনরায় বলবৎ করে। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব সংঘটিত হয়। যার মাধ্যমে শত শত বছরের পুরনো জার শাষণের অবসান ঘটে। মার্ক্সের মৃত্যুর মাত্র ৩৪ বছর পরেই ভ্লাদিমির ইলিচ লেলিনের নেতৃত্বে ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় প্রথম এই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটে। গঠিত হয় প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়ন। বলশেভিক বিপ্লব এবং এর পরবর্তী গৃহযুদ্ধে প্রায় ৭০ লাখ থেকে এক কোটি ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। তবে বিপ্লবের পরে বলশেভিক লাল ফৌজ ও রাজতন্ত্রের পক্ষে শ্বেতাঙ্গ ফৌজের মধ্যে ১৯১৭ থেকে ১৯২২ সালে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সিংহভাগ মানুষের মৃত্যু জন্য সরাসরি দায়ী। বিশ্বের অন্যতম এই রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পরই প্রকৃতপক্ষে ১৯২২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়। বাস্তব সত্য যে, পরাজিত শ্বেতাঙ্গ ফৌজ ইতিহাসের কোণাকাঞ্চিতে স্থান পাবে না এটা স্বাভাবিক নিয়তি। কিন্তু যাদের রক্তের বিনিময়ে এবং জীবনের মূল্য চুকিয়ে এই বিপ্লব সাধিত হয়েছিল তাদেরকেও বিপ্লবোত্তর সরকারের অংশ হতে পারেনি। এমনকি ইতিহাসে সোনালী পাতায় তাদের নাম নিশানাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঘুরেফিরে ক্ষমতা আবারো সেই সুবিধাভোগীদের হস্তগত হয়।ফলে ফিরে আসে সেই জরাজীর্ণ পুরাতন বন্দোবস্ত।আর বলশেভিকদের ক্ষমতা গ্রহণ এবং পুরাতন বন্দোবস্ত ফিরে আসায় জর্জ অরওয়েল তাদের সমালোচনায় রচনা করেন বিশ্ববিখ্যাত ‘এনিম্যাল ফার্ম’ উপন্যাস।
ভারতীয় উপমহাদেশে ফ্রান্স ও রাশিয়ার মতো, আমরা একইরকম দৃশ্য দেখি। নির্দয় শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকেই বিশেষ করে বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে চলে স্থানীয় প্রতিরোধ আন্দোলন ও কৃষক বিদ্রোহ। ১৭৬০ থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে ও মাত্রায় এসব আন্দোলন চলতে থাকে। ঔপনিবেশিক ভূমি ব্যবস্থা, ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ, জোর করে ধানের জমিতে নীল চাষে কৃষকদের বাধ্য করা- এসবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এই আন্দোলনসমূহের উদ্দেশ্য হলেও সামগ্রিকভাবে এগুলো সবই ছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনগুলোর মধ্যে ফকির সন্ন্যাসী আন্দোলন , চাকমা বিদ্রোহ , তিতুমীরের আন্দোলন , ফরায়েজি আন্দোলন , সিপাহী বিদ্রোহ , নীল বিদ্রোহ , খিলাফত আন্দোলন , অসহযোগ আন্দোলন এবং ভারত ছাড় আন্দোলন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।অবশেষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় যারা এ উপমহাদেশের স্বাধীনতার জন্য অকাতরে জীবন দিয়েছিল ব্রিটিশরা তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। তারা ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে তাদের মস্তিষ্কপ্রসূত, ভাবাদর্শে অনুরক্ত চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী, পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের হাতে । ফলে সাধারণ মানুষ- যারা প্রকৃত যোদ্ধা তাদের ভাগ্যে কোন পরিবর্তন আসেনি। এমনকি ভাগ্যহত মানুষ তাদের জীবন বিসর্জনের কোনো স্বীকৃতিও পায়নি।
ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পরে ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তানের জন্ম হয়। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রে ভাষা নিয়ে প্রথমে বিতর্ক শুরু হয়। এরপর ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধিকার আন্দোলন শুরু হয়। ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ এবং ধর্ষিত মা-বোনের আত্মত্যাগের মাধ্যমে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। স্মর্তব্য ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের আজও পর্যন্ত কোন সঠিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়নি। অর্থাৎ যাদের জীবন ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে এদেশ স্বাধীন হলো তাদের ইতিহাসের পাতায় ঠাই হলো না। সখেদে বলা যায়,ক্ষমতালোভী স্বার্থান্বেষী মহলের বৃহস্পতি তুঙ্গে উঠেছিল। ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে দল-মত, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, ছাত্র এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সম্মিলিত অবদান ছিল। তবে যাদের রক্তে এই আন্দোলন বেগবান হয় সেই আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের মধ্যে নূর হোসেন এবং ডাক্তার মিলন ব্যতীত ইতিহাসে আর কেউ থিতু হতে পারেনি। অথচ ছাত্রনেতা জিহাদ,নুরুল হুদা এবং সুলতান সহ অগণিত ছাত্র জনতা রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল। পরিতাপের বিষয় ইতিহাস তাদের বেমালুম ভুলে গেছে । গণঅভ্যুত্থান উত্তর রাষ্ট্র গঠনে তাদের ন্যূনতম ভূমিকা ছিল না।
১৯৭১-২০২৪ সাল, অর্ধ শতাব্দী অতিক্রম করে আরো একটি গণঅভ্যুত্থান সাধিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে এবং ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে রাজনীতিবিদদের অবদান সর্বসাকুল্যে একই।বস্তুত সময় আর চরিত্র বদল হয়েছে মাত্র। কিন্তু পটে আঁকা দৃশ্য একইভাবে অঙ্কিত। ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পরে ক্ষমতা তাদেরই হস্তগত হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানে (২/৩ জন বাদে) যাদের দূরতম সম্পর্ক ছিল না । ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পরে রাজনীতিবিদরা গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহনকারীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা তোয়াক্কা না করে দেশের প্রতিষ্ঠিত সুবিধাভোগীদের সুবিধা রক্ষার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। পৃথিবীতে যত আন্দোলন, সংগ্রাম, বিপ্লব এবং গণঅভ্যুত্থান হয়েছে তাতে সমাজের বা ওই রাষ্ট্রের অভিজাত শ্রেণীর অংশগ্রহণ খুবই কম। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে কয়জন রাজনীতিবিদ বা অভিজাত শ্রেণির মানুষ সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো, বর্তমানে তা গবেষণার দাবি রাখে। ২০২৪ সালের চিত্রও ভিন্ন কিছু নয়।
তবে এরপরেও মানুষ কেন লড়াই করে? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ মনে হলেও আসলে জটিল। মানুষের আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে তার নিজের ভেতরের আত্মপরিচয় ও উদ্দেশ্যবোধে। মানুষ তখনই সবচাইতে বড় হয়ে ওঠে যখন সে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এমন কিছু জন্য লড়াই করে যার ফল সে নিজে চোখে দেখে যেতে পারেনা। ডঃ আকবর আলি খান পরার্থপরতার অর্থনীতি গ্রন্থে একই কথার প্রতিধ্বনি করেছেন।তিনি বলেন- “যারা বীজ বপন করে তারা সবসময় ফল ভোগ করতে পারেনা। কাজেই ফল ভোগ করা বড় কথা নয়, গাছ লাগানোই হলো পবিত্র দায়িত্ব”।
একটা দেশ ও জাতি গঠনে বৃহৎ স্বার্থে অনুভূতির অন্তর্নিহিত ঐক্য খুবই জরুরি। অনুভূতির অন্তর্নিহিত ঐক্য হলো সমস্ত মানুষের আবেগ,চেতনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার একটি মৌলিক যোগসূত্র, যার মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি আনন্দ, বেদনা, ও ভালোবাসার অভিজ্ঞতা এক ও অভিন্নভাবে অনুভব করে। এটি আত্মিক সংযোগের সেই অদৃশ্য শক্তি, যা সমস্ত সংকীর্ণতা,সাম্প্রদায়িকতা, জাতি বর্ণ নির্বিশেষে বিভেদ ভুলে মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে এবং সমগ্র মানবজাতির পারস্পরিক সমবেদনাকে জাগ্রত করে তোলে। এ আত্মিক সংযোগ যতদিন শাসক ও জনগণের মাঝে সমভাবে জাগ্রত না হবে ততদিন পর্যন্ত এদেশে শান্তির আশা করা পাগলের কল্পনা বিলাসের মতোই বিবেচিত হবে। উপরোক্ত প্রতিপাদ্যের সারবত্তা হলো এদেশের জনগণ চায় ঐতিহাসিক স্বীকৃতি এবং মুক্তি। আর সেই মুক্তি ও স্বীকৃতি কি সুদূরপরাহত থেকে যাবে?
লেখক: কলামিস্ট ও সংবাদ বিশ্লেষক
expertdu88@gmail.com










মন্তব্য করুন