পল্লিকবি জসীমউদ্দীন তাঁর ‘কবর’ কবিতায় যে প্রশ্নটি রেখে গিয়েছিলেন—স্মৃতি কত দ্রুত মাটির নিচে চাপা পড়ে, আর নামফলক কতটা ঠুনকো আশ্রয়—ঠিক সেই প্রশ্নই যেন নতুন করে ফিরে এলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের ফটকে। একটি নাম লেখা হলো রাতের আঁধারে ক্রেন দিয়ে, ন’মাস পর সেই নামই আবার মুছে ফেলা হলো প্রকাশ্য দিনের আলোয়। মাঝখানে রয়ে গেল একটি তরুণের রক্ত, একটি প্রজন্মের ক্ষোভ, আর একটি জাতির অমীমাংসিত স্মৃতি-রাজনীতি।
ফটকে যা ঘটল বুধবার দুপুরে
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুর দুইটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রধান ফটকে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা নামফলক মুছে ফেলার কাজ শুরু করে হল প্রশাসন। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই সেখানে পুনরায় বসানো হবে ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নামফলক। হলের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জোবান আলী সংবাদমাধ্যমকে জানান, নাম নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছিল, তা এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ইসরাফিল রতন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামটি শিক্ষার্থীরা নিজেরাই লিখেছিলেন, কিন্তু প্রশাসনের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন তাতে ছিল না। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানান, সাম্প্রতিক সিনেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব স্থাপনার নাম আগের অবস্থায় রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে, আর সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই এই পদক্ষেপ।

ন’মাসের ইতিহাস: একটি গুলি থেকে একটি নামফলক পর্যন্ত
এই নামফলকের গল্প শুরু হয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি রাজধানীর পল্টন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন, পরে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের একাংশ ১৯ ডিসেম্বর রাতে হলের ফটকে ব্যানার টাঙিয়ে প্রথম দাবি তোলেন, আর ২০ ডিসেম্বর রাতে ক্রেন ব্যবহার করে স্থায়ী নামফলক থেকে ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ নাম সরিয়ে বসানো হয় ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’। হল সংসদের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে আনুষ্ঠানিক দাবিও জানানো হয়।
২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ সিন্ডিকেট শেখ পরিবারের নামে থাকা পাঁচটি স্থাপনার নাম পরিবর্তনের সুপারিশ করে, যার মধ্যে এই হলের নাম ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ করার প্রস্তাবও ছিল। কিন্তু ২৯ জুনের বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এই প্রস্তাবে চূড়ান্ত অনুমোদন না দিয়ে বিষয়টি আবার সিন্ডিকেটে পাঠানোর কথা জানান—আর সেই অনিশ্চয়তার জের ধরেই তিন মাস পর এখন নামফলক আবার মুজিবের নামে ফিরছে।
প্রতিক্রিয়ার ঝড়: ক্যাম্পাস থেকে সংসদ পর্যন্ত
ডাকসু ভিপির ক্ষোভ
২৯ জুনের সিনেট অধিবেশনেই এই অনিশ্চয়তার প্রথম বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সিদ্ধান্ত না হওয়ায় ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদসহ ডাকসুর একটি প্রতিনিধিদল ওয়াকআউট করেন। পরে ব্রিফিংয়ে সাদিক কায়েম বলেন, ফ্যাসিবাদের আইকনদের প্রতি কেন এত দরদ, আবু সাঈদ-মুগ্ধ-ওয়াসিমরা কি এ জন্যই জীবন দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী শিক্ষার্থীদের মানসিক উত্তরণের জন্য এই সিদ্ধান্ত জরুরি ছিল, আর দীর্ঘসূত্রতাকে তিনি ‘নাটক’ বলে অভিহিত করে এর অবসান দাবি করেন।
ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিক্রিয়া
শহীদ হাদির নিজের সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল জাবের মন্তব্য করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ মুজিবুর রহমানের নামে কোনো হল থাকা উচিত নয়, কারণ আন্দোলনের মূল স্লোগানই ছিল মুজিববাদবিরোধী অবস্থানের প্রতিফলন। সংগঠনের সদস্যসচিব ফাতিমা তাসনীম জুমা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, হাদির নামে হল করা কিংবা তা মুছে ফেলা—কোনোটিই তাঁদের সংগঠনের সিদ্ধান্তে হয়নি, সিদ্ধান্তগুলো কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের পর্যায়েই নেওয়া হয়েছে।
হাসনাতের পুরোনো শ্রদ্ধার্ঘ্য নতুন প্রাসঙ্গিকতা পেল
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ আজকের ঘটনায় সরাসরি প্রতিক্রিয়া না দিলেও, চলতি বছরের মার্চে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে হাদিকে স্মরণ করে লেখা তাঁর আবেগঘন পোস্টটি আজ নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সেই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, বাংলাদেশ তাঁকে মিস করছে, তাঁর কণ্ঠ ছাড়া সংসদ অসম্পূর্ণ মনে হয়। এনসিপির অন্দরে হাদি যে এখনো একটি সংবেদনশীল আবেগের নাম, তা এই পোস্টের পুনরাবৃত্ত শেয়ার থেকেই স্পষ্ট।
বিএনপির ভেতরে ভিন্ন সুর
তবে প্রতিক্রিয়া কেবল এক পক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। বিএনপি নেতা ও গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান আগেই এক ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তুলেছিলেন, শিবির কি শেখ মুজিবের স্থলে ওসমান হাদিকে জাতির পিতার আসনে বসাতে চায়। তিনি আরও প্রশ্ন রাখেন, যাঁরা এখন নাম পরিবর্তনের আন্দোলনে যুক্ত, তাঁরা অতীতে কোন আদর্শিক অবস্থান থেকে যুক্ত ছিলেন। রাশেদ খানের এই মন্তব্য দেখিয়ে দেয়, জুলাই-পরবর্তী জোটবদ্ধ শক্তিগুলোর মধ্যেও প্রতীকী প্রশ্নে সন্দেহ ও দূরত্ব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে অবশ্য আজকের নির্দিষ্ট এই ঘটনা নিয়ে এখনো আলাদা কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
উল্টো স্রোতের কণ্ঠস্বর
সব প্রতিক্রিয়া অবশ্য নাম-পুনঃস্থাপনের বিপক্ষে নয়। আওয়ামী লীগ-ঘেঁষা অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে এই সিদ্ধান্তকে ‘ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে উদযাপনের সুরে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে হাদি ও তাঁর সহযোদ্ধাদের প্রতি অবমাননাকর ভাষাও ব্যবহৃত হয়েছে। সুস্থ সাংবাদিকতার মানদণ্ডে এ ধরনের ভাষা বিশ্লেষণযোগ্য হলেও উদ্ধৃতিযোগ্য নয়—তবে এর অস্তিত্ব প্রমাণ করে, একটি নামফলক ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শিবিরগুলো কতটা বিপরীতমুখী বয়ান তৈরি করে ফেলেছে।

জুলাই আন্দোলনের বর্তমান অবস্থা: প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন বনাম প্রতীকী অস্থিরতা
বড় পরিসরে দেখলে, জুলাই অভ্যুত্থান প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একেবারে অরক্ষিত নয়। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকার ও ২৬টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ, যেখানে ৮০টির বেশি সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত। সম্প্রতি উদ্বোধন হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরও। কিন্তু এই প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতির সঙ্গে ক্যাম্পাস পর্যায়ের বাস্তবতা মেলে না। একটি হলের নামফলক নিয়ে ন’মাসে চারবার সিদ্ধান্ত বদল, সিনেট-সিন্ডিকেটের মধ্যে বল ঠেলাঠেলি এবং অবশেষে প্রশাসনিক আদেশে রাতারাতি পুরোনো নামে প্রত্যাবর্তন—এই পুরো প্রক্রিয়া প্রমাণ করে, জুলাইয়ের প্রতীকী মীমাংসা এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে রূপ নেয়নি।
বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশ
এখানেই প্রশ্ন ওঠা উচিত—সমস্যাটা আসলে কোথায়? সমস্যা কোনো একটি নামে নয়, সমস্যা সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতিতে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনার নাম যদি রাতের অন্ধকারে ক্রেন দিয়ে বদলানো যায়, আর প্রশাসনিক আদেশে তা আবার দিনের আলোয় মুছে ফেলা যায়—তাহলে ভবিষ্যতে যে পক্ষই ক্ষমতা বা প্রভাবের কাছাকাছি থাকুক, একই পদ্ধতিতে আবার নাম বদলে ফেলার প্রলোভন তৈরি হবে। এই চক্র থামাতে হলে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও অরাজনৈতিক একটি নামকরণ-নীতি—যেখানে সিন্ডিকেট, সিনেট ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের মতামত একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে চূড়ান্ত হবে, এবং সেই সিদ্ধান্ত কোনো পরবর্তী প্রশাসনের খেয়ালে বদলে যাবে না।
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রতিটি পক্ষের প্রতি বিনীত আহ্বান থাকবে এই জায়গাতেই—প্রতীকী লড়াই দিয়ে সেই আন্দোলনের নৈতিক পুঁজি ক্ষয় করা ঠিক হবে না। নামফলক যতই গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হোক, তা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিচার ও জবাবদিহির মূল এজেন্ডাকে ছাপিয়ে যেতে দেওয়া বিপজ্জনক। সতর্কবার্তা স্পষ্ট—যদি প্রতিটি ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসের দেয়াল-ফটকে কেবল নাম বদলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে, তাহলে তা আন্দোলনের প্রকৃত অর্জন—প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহি—থেকে জনমনোযোগ সরিয়ে একটি অন্তহীন প্রতীকী লড়াইয়ে রূপ নেবে, যার শেষ ফল হবে কেবল ক্লান্তি আর অবিশ্বাস। জসীমউদ্দীনের কবরের সেই নীরব মাটির মতোই, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মনে রাখে কাজকে, নামফলকের কালিকে নয়।









মন্তব্য করুন