একনজরে
- মার্চ ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা — মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২.২৬%
- বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এই হার ৩২.৬%, দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংক খাতের গড় (৭.৯%) থেকে চার গুণেরও বেশি
- যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের (৩৭.৩৫%) পরই খেলাপি ঋণের হারে বিশ্বে দ্বিতীয় বাংলাদেশ
- ব্যাংক খাতের মূলধন-ঝুঁকি-সম্পদ অনুপাত (সিআরএআর) ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২.৬%
- আইএমএফ তদন্ত করছে বছরের পর বছর ধরে খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য আড়াল করার অভিযোগ নিয়ে
- একক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী হিসেবে এস আলম গ্রুপ ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে-বেনামে ঋণ ১ লাখ ৫ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে
দেশের ব্যাংকিং খাত একটি নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বহু বছর ধরে যতটা প্রকাশ করা হয়েছিল, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত সম্পদমান পর্যালোচনায় (Asset Quality Review) বছরের পর বছর ধরে আড়াল করে রাখা খেলাপি ঋণ একে একে প্রকাশ্যে আসছে।
মোট চিত্র: বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের হার
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে তফসিলি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে একই সময়ের জন্য এই হার দেখানো হয়েছে ৩২.৬ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংক খাতের গড় খেলাপি ঋণের হার ৭.৯ শতাংশের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণের এই হার দিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে — শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের (৩৭.৩৫%) পরই। একই প্রতিবেদনে আরও উদ্বেগজনক তথ্য: মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৫টি ব্যাংকেই কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে মোট খেলাপি ঋণের ৮৫ শতাংশের বেশি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে — ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে দেশের সামগ্রিক ব্যাংক খাতের মূলধন-ঝুঁকি-ভিত্তিক-সম্পদ অনুপাত (CRAR) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশে। অর্থাৎ হিসাব করলে, ব্যাংক খাতের সমন্বিত মূলধন এখন প্রকৃতপক্ষে শূন্যের নিচে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জঁ পেসমে এই প্রকল্প ঘোষণার সময় বলেন, দুর্বল কর্পোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব বিস্তার (রেগুলেটরি ক্যাপচার), এবং সংশ্লিষ্ট-পক্ষ ঋণদান (related-party lending) — এই তিনটি কারণেই ব্যাংক খাত এই সংকটে পড়েছে।
সময়ের সাথে চিত্র: কীভাবে বাড়ল এই সংকট
| সময়কাল | মোট খেলাপি ঋণ | হার |
|---|---|---|
| ২০০৯ | ২২,৪৮১ কোটি টাকা | — |
| জুন ২০২২ | ১,২৫,২৫৭ কোটি টাকা | ৮.৯৬% |
| জুন ২০২৩ | — | ১০.১১% |
| জুন ২০২৪ | ২,১১,৩৯১ কোটি টাকা | — |
| ডিসেম্বর ২০২৪ | ৩,৪৬,৫৪৭ কোটি টাকা | ২০.২৫% |
| সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ৬,৪৪,৫১৫ কোটি টাকা | ৩৫.৭৩% |
| ডিসেম্বর ২০২৫ | ৫,৫৭,২১৬ কোটি টাকা | ৩০.৬০% |
| মার্চ ২০২৬ | ৫,৮৮,৭০৪ কোটি টাকা | ৩২.২৬% |
উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, বণিক বার্তা-র প্রতিবেদন থেকে সংকলিত। ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেদনে মার্চ ২০২৬-এর হিসাবে সামান্য পার্থক্য দেখা গেছে (একটি সূত্রে ৫,৬৪,১০৬ কোটি টাকা) — সম্ভবত পরিমাপের সময়সীমা বা ব্যাংকভুক্তির পার্থক্যের কারণে।
২০০৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ১৩ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল প্রায় ৫.৬ গুণ। কিন্তু ২০২৩ থেকে ২০২৫ — মাত্র দুই বছরে তা বেড়েছে সাড়ে তিন গুণেরও বেশি। এই আকস্মিক লাফের পেছনের কারণ শুধু নতুন করে ঋণ খেলাপি হওয়া নয় — বরং বহু বছর ধরে আড়াল করে রাখা পুরনো খেলাপি ঋণ হিসাবের খাতায় উঠে আসা।
আড়াল থেকে প্রকাশ্যে: আইএমএফের তদন্ত
গণমাধ্যম সংস্থা ইউএনবি-র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বছরের পর বছর ধরে খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য আড়াল করার অভিযোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তে নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ইউএনবিকে জানান, সরকার পরিবর্তনের পর প্রকৃত চিত্র ধীরে ধীরে প্রকাশ পাওয়ায় আইএমএফ জানতে চাইছে — এই তথ্য এত দিন কীভাবে আড়াল করা হলো, এটা ইচ্ছাকৃত কারসাজি নাকি ব্যাংক পরিদর্শনে চরম গাফিলতি।
আইএমএফের ৪৭০ কোটি (৪.৭ বিলিয়ন) ডলারের ঋণ কর্মসূচির একটি শর্ত ছিল — রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ২০২৬ সালের মধ্যে ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। বাস্তবে ঘটেছে উল্টো — হার নেমে আসার বদলে বহুগুণ বেড়ে প্রকাশ্যে এসেছে, যা এই শর্তের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এই আকস্মিক উন্মোচনের প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যাও আছে। ২০২৫ সালে কেপিএমজি ও ইওয়াই-এর মতো আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিচালিত ব্যাপক সম্পদমান পর্যালোচনার (Asset Quality Review) মাধ্যমে বহু বছর ধরে পুনঃতফসিলের আড়ালে লুকানো খেলাপি ঋণ উন্মোচিত হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আন্তর্জাতিক বাসেল-৩ মানদণ্ড অনুসরণ করে মাত্র ৩ মাস কিস্তি বকেয়া থাকলেই ঋণকে “নিম্নমান” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করছে, যেখানে আগে অনেক বেশি নমনীয় মানদণ্ড প্রয়োগ হতো।
ব্যাংকভিত্তিক চিত্র: রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক — দেশে ৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আরও ৩টি বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক মিলিয়ে মোট ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সক্রিয়, যেগুলো দেশের প্রায় ৬৫% সরকারি আমানত পরিচালনা করে। এই ৯টি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণ পৌনে দুই লাখ কোটি টাকার বেশি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় আছে জনতা ব্যাংক — মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত এই ব্যাংকের প্রায় ৭০ শতাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে গেছে।
বেসরকারি ও শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক — বাংলাদেশ ব্যাংকের মঙ্গলবার প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের ১০টি ব্যাংক থেকে বিতরণ করা ঋণের প্রায় অর্ধেকই এখন ঝুঁকিভিত্তিক — ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে এই হার ৪৭.৭৫ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে ছিল ৪২.৯৬ শতাংশ। প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট ব্যাংকের নাম উল্লেখ না থাকলেও, একাধিক সূত্র নির্দিষ্টভাবে ইসলামী ব্যাংক পিএলসিকে চিহ্নিত করেছে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কেন্দ্র হিসেবে।
দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংকের ৯২,১১৫ কোটি টাকা বা ৪৯.৩৪ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। ধারাবাহিক মুনাফা করা সত্ত্বেও এই বোঝার কারণে ব্যাংকটি ২০২৪ ও ২০২৫ — টানা দুই বছর শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি, এবং পুঁজিবাজারে সাধারণ ক্যাটাগরি থেকে নেমে গেছে দুর্বলতম ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে ইসলামী ব্যাংকের পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে এবং তারল্য সংকট মোকাবিলায় আরও ২,৫০০ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে।
সংকট সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নজিরবিহীন এক পদক্ষেপ নিয়েছে — “ব্যাংক রেজোলিউশন স্কিম ২০২৫”-এর আওতায় সংকটাপন্ন পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক (এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক) একীভূত করে গঠন করা হয়েছে নতুন প্রতিষ্ঠান “সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি”। আমানতকারীদের ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত ইন্স্যুরেন্স ট্রাস্ট ফান্ডের অধীনে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে, আর এর বেশি অঙ্কের জন্য প্রান্তিকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা উত্তোলনের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭টি বেসরকারি ব্যাংক নিজেদের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে রাখতে পেরেছে — এই তালিকায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে তুলনামূলক নতুন সিটিজেনস ব্যাংক, মাত্র ১.৭৪% খেলাপি হার নিয়ে, আর তালিকার সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে যমুনা ব্যাংক, ৯.৬% হার নিয়ে। বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম — মাত্র ২,৯৫২ কোটি টাকা, যা প্রমাণ করে সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পার্থক্যটা কতটা গভীর।
কেস স্টাডি: এস আলম গ্রুপ — একক গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় ভূমিকা
দেশের ব্যাংক খাতের এই সংকটে সবচেয়ে বড় একক নাম চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ। দ্য ডেইলি স্টারের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যাদের ঋণের সিংহভাগ নেওয়া হয়েছে ইসলামী ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে। এর মধ্যে রয়েছে:
- এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস — ৫,৭১৩ কোটি টাকা মোট ঋণের মধ্যে ৩,৪২০ কোটি টাকা খেলাপি
- গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন — ২,৬৫৪ কোটি টাকা খেলাপি
- এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি — ২,১৬০ কোটি টাকা খেলাপি
- ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ — ১,৪০৬ কোটি টাকা খেলাপি
- সোনালী ট্রেডার্স — ১,০৪২ কোটি টাকা খেলাপি
দ্য ডেইলি স্টার বাংলার আরেকটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ২০১৭ সাল থেকে সর্বমোট ছয়টি ব্যাংক থেকে ৯৫,৩৩১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যার ৭৯ শতাংশই একা ইসলামী ব্যাংক থেকে। ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, শুধু ইসলামী ব্যাংক থেকেই এস আলম গ্রুপ একাই প্রায় ৭০,০০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) এক প্রতিবেদনে গ্রুপটির নামে-বেনামে নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা।
নেত্র নিউজের হাতে আসা বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে উঠে আসে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্তই এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একক-গ্রাহক ঋণসীমার চেয়ে ১৫,৪০৮ কোটি টাকা বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছিল — অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সীমা লঙ্ঘন করেই এই ঋণ বিতরণ হয়েছে। জবাবে ইসলামী ব্যাংক নেত্র নিউজকে জানায়, প্রায় ৪০ বছরের ব্যবসায়িক সম্পর্কে এই প্রতিষ্ঠানগুলো কখনো খেলাপি হয়নি — যদিও ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি ব্যাংকটি অস্বীকার করেনি।
আদায়ের চেষ্টাও থমকে আছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক এস আলমের কাছ থেকে ১০,৫৩৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায় করতে চাইলেও হুমকি ও মামলার কারণে তা করতে পারছে না। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু চট্টগ্রামেই এক বছরে ৭৩,১০১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে, যার ৮৬ শতাংশই এস আলম গ্রুপ সম্পর্কিত। এছাড়া গ্রুপটির বিরুদ্ধে ১০,০০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের দায়ে সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশও এসেছে আদালত থেকে — যার মধ্যে রয়েছে এস আলম সিমেন্ট, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল ও সোনালী কার্ডো লজিস্টিকের সম্পদ।
ব্যবসা ঋণ বনাম সাধারণ (ভোক্তা) ঋণ
ব্যবসায়িক ও শিল্প ঋণের খেলাপির হার সাধারণ ভোক্তা ঋণের তুলনায় বহুগুণ বেশি — এবং সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুও এখানেই। বণিক বার্তার একটি বিশ্লেষণে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকই উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে কেন্দ্রীভূত — যার মধ্যে শীর্ষে আছে চামড়া, তৈরি পোশাক, বস্ত্র এবং জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা শিল্প। একই প্রতিবেদনে ভোক্তা ঋণের খেলাপির হার দেখানো হয়েছে মাত্র ২.৪১ শতাংশ — শিল্প খাতের তুলনায় অনেক কম।
বাণিজ্য অর্থায়নে (ট্রেড ফাইন্যান্স) পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে বাণিজ্যিক ঋণের গড়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই খেলাপি, আর উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোতে এই হার ৮০ শতাংশেরও বেশি। সেমিনারের বক্তারা সতর্ক করেন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে প্রতিবছর বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে, যা দেশের রিজার্ভ ও বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আরেকটি উদ্বেগের জায়গা ছোট ঋণে দ্রুত বেড়ে চলা খেলাপির প্রবণতা। জাগো নিউজ২৪-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ কোটি টাকার কম অঙ্কের সিএমএসএমই, কৃষি, ব্যক্তিগত ও আবাসন ঋণে খেলাপির হার প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে ভোক্তা ঋণের হার তুলনামূলক কম, প্রায় ৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এই ছোট-ঋণ শ্রেণির খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৪ লাখ — জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পারিবারিক ঋণের চাপ এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার আয় কমে যাওয়াকে এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আদায়ের হার: প্রকৃত উন্নতি নাকি হিসাবের কারসাজি?
ডিসেম্বর ২০২৫ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের হার সেপ্টেম্বরের ৩৫.৭৩% থেকে কমে ৩০.৬০%-এ নেমেছিল — কিন্তু দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দেয়, এই উন্নতি প্রকৃত আদায়ের ফল নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নীতিগত সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ব্যাপক হারে ঋণ পুনঃতফসিল করার কারণেই এই হ্রাস দেখা গেছে। মাত্র তিন মাস পরই, মার্চ ২০২৬ প্রান্তিকে সেই “উন্নতি” উবে গিয়ে হার আবার ৩২.২৬ শতাংশে উঠে আসে — অর্থাৎ প্রকৃত সমস্যা সমাধান না করে শুধু হিসাবের খাতা সাময়িকভাবে পরিষ্কার দেখানো হয়েছিল।
প্রকৃত নগদ আদায়ের চিত্র আরও স্পষ্ট হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব লক্ষ্যমাত্রা থেকে — কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিটি ব্যাংককে “বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি” (এডিআর) পদ্ধতির মাধ্যমে চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে খেলাপি ঋণের মাত্র ১ শতাংশ নগদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছে। এত নিচু একটা লক্ষ্যমাত্রা নিজেই বলে দেয়, প্রকৃত আদায় কতটা কঠিন। পাশাপাশি, খেলাপি ঋণগ্রহীতারা মাত্র ২ শতাংশ জমা দিয়েই ঋণ পুনঃতফসিল করে “নিয়মিত” গ্রাহক হিসেবে দেখাতে পারছেন, আর নতুন নীতিতে পুনঃতফসিলের মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর এবং সর্বোচ্চ দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড পর্যন্ত রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা
সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ধাপে ধাপে খেলাপি ঋণ কমানোর একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে — চলতি বছরের শেষে হার ৩২.২৬% থেকে নামিয়ে ২০ শতাংশে এবং ২০২৭ সালের শেষে ১০ শতাংশে আনার লক্ষ্য। আইএমএফ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য ১০ শতাংশের নিচে ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য ৫ শতাংশের নিচে নামানোর বাঁধাধরা সময়সীমাও (জুন ২০২৬) বেঁধে দেওয়া হয়েছে। যেসব ব্যাংক ও পরিচালক এই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের সিদ্ধান্তও বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আন্তর্জাতিক সহায়তাও আসছে। ২৪ জুন ২০২৬-এ বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালনা পর্ষদ বাংলাদেশের ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। এই “ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট টু” আমানত সুরক্ষা তহবিল শক্তিশালীকরণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংক পুনর্গঠন কাঠামো তৈরি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কারে ব্যবহৃত হবে।
জাতীয় সংসদেও বিষয়টি উঠে এসেছে। গত ৬ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে জানান, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। তিনি আরও জানান, বর্তমান সংসদ সদস্য ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১১১ কোটি ১৭ লাখ টাকারও বেশি (১১,১১৭.৩১ কোটি টাকা), যার মধ্যে ৩,৩৩০.০৮ কোটি টাকা আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে।
উপসংহার
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ সংকট এখন আর নিছক পরিসংখ্যানের বিষয় নয় — এটি একটি কাঠামোগত সংকট, যার শিকড় তিন দশকের সুশাসনের ঘাটতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক শিথিলতায় প্রোথিত। এস আলম গ্রুপের মতো একক গোষ্ঠীর হাতে একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া, নিয়ন্ত্রক সীমা লঙ্ঘন করে ঋণ বিতরণ, এবং বছরের পর বছর প্রকৃত তথ্য আড়াল করে রাখার প্রবণতা — এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে এমন এক সংকট, যেখানে দেশের ব্যাংক খাতের সম্মিলিত মূলধনই এখন কাগজে-কলমে ঋণাত্মক। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সহায়তায় সংস্কারের যে রোডম্যাপ শুরু হয়েছে, তার সাফল্য নির্ভর করছে প্রকৃত আদায় ও জবাবদিহিতার ওপর — শুধু পুনঃতফসিলের হিসাবি কারসাজিতে নয়।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলা ট্রিবিউন, বণিক বার্তা, জাগো নিউজ২৪, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণ, নেত্র নিউজ, ইউএনবি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম), জাতীয় সংসদ কার্যবিবরণী।
প্রতিবেদনটি একাধিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উৎসের প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করে প্রস্তুত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন সূত্রে উপাত্তে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে, যা প্রতিবেদনে যথাসম্ভব উল্লেখ করা হয়েছে।










মন্তব্য করুন