সুযোগসন্ধানী চীন সম্পর্কে সতর্কতা
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া সাম্প্রতিক সময়ে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে—আর এই ফাঁককেই কাজে লাগিয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে চীন, এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা সচিব গিলবার্তো তেওদোরো। সিউলে অনুষ্ঠিত বার্ষিক নিরাপত্তা ফোরাম “সিউল ডিফেন্স ডায়ালগ”-এর ফাঁকে সোমবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেকোনো ফাঁক কাজে লাগাতে চীন সবসময়ই তৎপর থাকে।
তবে তেওদোরো একই সঙ্গে জানান, ফিলিপাইনের প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি অপরিবর্তিত থাকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট আশ্বাস পেয়েছে ম্যানিলা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে বিভ্রান্তিকর বয়ান ছড়ানোর জন্যও চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন তিনি।
কেন কমল যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার মহড়া
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে বার্ষিক যৌথ যুদ্ধ মহড়ার পরিধি ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া, মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও সীমিত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন “উলচি ফ্রিডম শিল্ড” মহড়া নির্ধারিত সময়ের ছয় দিন আগেই শেষ হয়ে যায়। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে নিজের “চমৎকার সম্পর্কের” কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের একটি কারণ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে যোগ দিতে সিউলের অস্বীকৃতির কথাও উল্লেখ করেন।
গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয় জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ চলাচল স্বাধীনতা কার্যক্রমে “অবদান” রাখার বিষয়টি বিবেচনা করছে তারা। পরে অবশ্য স্পষ্ট করা হয়, এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি—কারণ এ ধরনের যেকোনো সামরিক মোতায়েনের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত, মন্ত্রিসভার প্রস্তাব এবং জাতীয় সংসদের সম্মতি প্রয়োজন।
ট্রাম্প-কিম বৈঠক নিয়ে জল্পনা, উত্তর কোরিয়ার অস্বীকৃতি
চলতি বছরের শেষদিকে কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে পরে কিমের বোন কিম ইয়ো জং এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর ভাইয়ের কোনো ধরনের চলমান যোগাযোগের কথা অস্বীকার করেন। দুই নেতার মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন এখনো পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি “শত্রুভাবাপন্ন” নীতি অব্যাহত রেখেছে বলে দাবি করেন তিনি।
জেজু দ্বীপের কাছে ত্রিপক্ষীয় মহড়া
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই সোমবার থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের পূর্ব ও দক্ষিণ জলসীমায় পাঁচ দিনের ত্রিপক্ষীয় সামরিক মহড়া শুরু করছে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর ভাষ্যমতে, “ফ্রিডম এজ” নামের এই মহড়া প্রকৃতিগতভাবে প্রতিরক্ষামূলক এবং এর লক্ষ্য উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি মোকাবিলা করে আঞ্চলিক শান্তি-স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তবে উত্তর কোরিয়া বরাবরই এ ধরনের ত্রিপক্ষীয় মহড়াকে “বেপরোয়া শক্তি প্রদর্শন” বলে সমালোচনা করে আসছে এবং দাবি করেছে, এর পেছনে চীনকে ঘিরে ফেলা ও রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।
দক্ষিণ চীন সাগরে আগে থেকেই উত্তপ্ত ফিলিপাইন-চীন সম্পর্ক
তেওদোরোর এই সতর্কবার্তা নতুন কোনো প্রেক্ষাপট থেকে আসেনি। চলতি বছরের জুলাইয়ে এক সপ্তাহের মধ্যেই স্কারবরো শোল ও সেকেন্ড থমাস শোল ঘিরে তিনবার সংঘর্ষে জড়ায় ফিলিপাইন ও চীনের জাহাজ, যার জেরে যুক্তরাষ্ট্র-ফিলিপাইন-জাপানের যৌথ নৌ মহড়া আয়োজন করতে হয়। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতের রায় সত্ত্বেও দক্ষিণ চীন সাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে নিজেদের দাবি অব্যাহত রেখেছে বেইজিং, যে রায়ে ফিলিপাইনের সমুদ্র-অধিকারকে সমর্থন জানানো হয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে গত ২৫ আগস্ট প্রতিরক্ষা বাজেট ২৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে কংগ্রেসের কাছে যান তেওদোরো, বিশেষভাবে ড্রোন ও মনুষ্যবিহীন নৌযান বহর শক্তিশালী করার জন্য। নিজে থেকেই তিনি আগে জানিয়েছিলেন, দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে চীনের সঙ্গে ফিলিপাইনের এই দ্বন্দ্ব একটি “দীর্ঘমেয়াদি লড়াই”।
পর্যবেক্ষণ
সব মিলিয়ে একটি জটিল আঞ্চলিক ছবি ফুটে উঠছে—মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘায়িত যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা-কাঠামোতেও, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া মৈত্রীর ঐতিহ্যবাহী কাঠামোয় নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে। ঠিক এমন এক মুহূর্তে ফিলিপাইনের সতর্কবার্তা দেখাচ্ছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতিটি অংশই পরস্পরের সঙ্গে সুতোয় বাঁধা—উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন মনোযোগ কমলে তার আঁচ গিয়ে পড়তে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ চীন সাগরের নিরাপত্তা সমীকরণেও।















মন্তব্য করুন