আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মানুষটি বলছেন, তিনি অসুস্থ। হৃদযন্ত্রে ব্লক আছে। আর যে অভিযোগে তাঁকে বছরের পর বছর ধরে ডাকা হচ্ছে “আয়নাঘরের জনক”, “গুম-খুনের মাস্টারমাইন্ড”—সেসবের কোনোটির সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক নেই বলে দাবি তাঁর। অথচ ঠিক তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং খোদ বাংলাদেশ সরকার গঠিত একটি তদন্ত কমিশনের নথি—যেখানে তাঁর নাম বারবার ফিরে এসেছে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়ের একটির সঙ্গে জড়িয়ে। ইনি সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শতাধিক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মামলায় একমাত্র আসামি। তাঁর মামলার সমান্তরালে চলছে আরও একটি রূপান্তর—যে বাহিনীতে তিনি একসময় দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) নিজেই এখন বিলুপ্তির পথে। দুটি ঘটনাপ্রবাহ একসঙ্গে পর্যালোচনা করলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর দুই দশকের একটি অধ্যায়ের সম্পূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে।
কে এই জিয়াউল আহসান
১৯৯১ সালের ২১ জুন সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া জিয়াউল আহসান বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ২৪তম লং কোর্সের একজন গ্র্যাজুয়েট। কমান্ডো ও স্কাইডাইভার হিসেবে প্রশিক্ষিত এই কর্মকর্তা কর্মজীবনে একাধারে দায়িত্ব পালন করেছেন র্যাব, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং সবশেষে জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (এনটিএমসি)।
র্যাবে তিনি ছিলেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং একটি সময় গোয়েন্দা শাখার পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালের এপ্রিলে র্যাব ছেড়ে তিনি ডিজিএফআইয়ের উপ-মহাপরিচালক (ডিডিজি) হন, এরপর বদলি হন এনএসআইতে অভ্যন্তরীণ বিষয়ক পরিচালক হিসেবে। ২০২২ সালে তিনি মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি পেয়ে একই সঙ্গে এনটিএমসির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পান—রাষ্ট্রীয় টেলিযোগাযোগ নজরদারির শীর্ষ পদ। এই পদে থাকাকালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য “হুমকি” বিবেচিত ব্যক্তিদের স্পর্শকাতর ফোনকল রেকর্ড তাঁর নির্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হতো বলে অভিযোগ আছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জিয়াউল আহসানকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে আটক করা হয়। ৭ আগস্ট রাতে নিজ বাসা থেকে ডিজিএফআইয়ের একটি দল তাঁকে নিয়ে যায় বলে নিজেই আদালতে জানিয়েছেন তিনি। পরে ১৬ আগস্ট ঢাকা কলেজের সামনে এক শিক্ষার্থী ও এক হকার নিহতের মামলায় ইন্ধনদাতা হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়; সিএমএম আদালত তাঁর আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
গুম তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধান: নথিতে যা আছে
২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার একটি স্বাধীন ‘গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশন’ গঠন করে, যার নেতৃত্বে আছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। কমিশনের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন, সাজ্জাদ হোসেন ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাবিলা ইদ্রিস। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে সংঘটিত গুমের ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব পায় এই কমিশন।
২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রকাশিত কমিশনের প্রথম অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন—”Unfolding the Truth” শিরোনামে—একটি নিয়মতান্ত্রিক তিন-স্তরের গুম প্রক্রিয়ার বিবরণ দেয়। ওই প্রতিবেদনেই সরাসরি নাম আসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক, এনটিএমসির সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ও মো. হারুন-অর-রশীদের। কমিশন তখন পর্যন্ত ১,৬৭৬টি অভিযোগ নথিভুক্ত করেছিল, যার মধ্যে ৭৫৮টি যাচাই সম্পন্ন হয়েছিল—আর মোট গুমের সংখ্যা ৩,৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে কমিশনের আশঙ্কা প্রকাশ পায়।
২০২৫ সালের জুন নাগাদ এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। কমিশন তত দিনে মোট ১,৮৫০টি অভিযোগ পেয়েছে, যার মধ্যে ১,৩৫০টি যাচাই করা হয়েছে এবং ৩৪৫ জনের এখনো কোনো হদিস মেলেনি। কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দেড় দশকে আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরে গুমের ঘটনাকে অপরাধ নয় বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার স্বার্থে “স্বাভাবিক কার্যপ্রণালি” হিসেবে মেনে নেওয়ার একটি সাংস্কৃতিক প্রবণতা গড়ে উঠেছিল।
একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রথম আলোর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—কমিশনের নথিতে দেখা যায়, র্যাবের এক কর্মকর্তা নিয়মিতভাবে মাছ উপহার পাঠাতেন তৎকালীন র্যাব গোয়েন্দা শাখার পরিচালক জিয়াউল আহসানের কাছে, যিনি পরবর্তীতে এনটিএমসির মহাপরিচালক হন এবং এখন কারাগারে আছেন। প্রতিবেদনটিতে অবশ্য এটাও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে কমিশনের নথিতে ওই নির্দিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার সংযোগ পাওয়া যায়নি—যা দেখায়, কমিশন প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণের স্তর অনুযায়ী সতর্কতার সঙ্গে পার্থক্য করছে, সবাইকেই এক কাতারে ফেলছে না।
কমিশন তার প্রতিবেদনে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশও করে। কমিশনের তদন্তকালে র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক আয়নাঘরের অস্তিত্ব স্বীকার করেন এবং বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চান, একই সঙ্গে জানান, বাহিনী রাখা বা বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত সরকারের, আর সেই সিদ্ধান্ত তাঁরা মেনে নেবেন।
আয়নাঘর: ‘আয়নার ঘর’ যেখানে আয়না ছিল না
‘আয়নাঘর’ নামটি প্রথম ব্যাপক পরিচিতি পায় সুইডেনভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজের একটি হুইসেলব্লোয়ার-ভিত্তিক প্রতিবেদনে, যেখানে গুমের শিকার দুজন ভুক্তভোগী—গাজীপুরের কাপাসিয়ার শেখ মোহাম্মদ সেলিম এবং সেনাবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন বীরপ্রতীক হাসিনুর রহমান—নিজেদের নাম প্রকাশ করে জানান, ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই গোপন বন্দিশালায় তাঁদের আটকে রাখা হয়েছিল। প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ—জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক তৎকালীন হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলের বাংলাদেশ সফরের ঠিক প্রাক্কালে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের প্রায়ই ডিজিএফআই সদর দপ্তরের ভেতরে অবস্থিত কুখ্যাত আয়নাঘরে অথবা র্যাব পরিচালিত অনুরূপ গোপন স্থাপনায় আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হতো। কেউ কেউ সপ্তাহ বা মাসের পর মাস নিখোঁজ থাকার পর মিথ্যা মামলায় আদালতে হাজির করা হতো, আবার কাউকে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয় বা বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। কমিশন যখন ডিজিএফআই ও র্যাব পরিচালিত গোপন বন্দিশালাগুলো পরিদর্শন করে, তখন প্রমাণ ধ্বংস বা গোপন করার সাম্প্রতিক প্রচেষ্টার আলামত খুঁজে পায়—ছোট কক্ষ বড় করতে দেয়াল ভাঙা, ভুক্তভোগীদের খোদাই করা নাম মুছতে নতুন রং, এমনকি র্যাব-১ এর একটি স্থাপনায় এত ছোট কক্ষের প্রবেশপথ ইটে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল যে সেখানে শোয়াও সম্ভব ছিল না।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, কমিশন ও নিরাপত্তা বাহিনীর অনুসন্ধান অনুযায়ী দেশজুড়ে এমন গোপন বন্দিশালার সংখ্যা কয়েকশ—সম্ভবত ৭০০ থেকে ৮০০টি—যার মধ্যে অনেকগুলো শুধু ঢাকায় নয়, দূরবর্তী এলাকাতেও ছড়িয়ে আছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সরাসরি অভিযোগ
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ৫০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন “After the Monsoon Revolution: A Roadmap to Lasting Security Sector Reform in Bangladesh”-এ স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়, “হাসিনা, পাশাপাশি শীর্ষ কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গুমের তদারকিতে জড়িত ছিলেন।” প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, গুমের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা নিজেরাই হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের ঊর্ধ্বতন সদস্যরা এসব ব্যক্তির অজ্ঞাতবাসে আটকে রাখার বিষয়ে অবগত ছিলেন।
এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন—এইচআরডব্লিউর এই প্রতিবেদন একটি মানবাধিকার সংস্থার তদন্তভিত্তিক অভিযোগ, আদালতের রায় নয়। তবে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন, দেশীয় কমিশন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা—এই তিন স্বতন্ত্র সূত্র থেকে একই নামগুলো বারবার উঠে আসা তদন্তের গুরুত্ব ও নির্ভরযোগ্যতার একটি জোরালো ইঙ্গিত দেয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার: এখন পর্যন্ত যা ঘটেছে
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৪ সালের নভেম্বরে, যখন তাঁকে প্রথমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। ওই শুনানিতে তিনি দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন এসেছে। আদালতে তিনি দাবি করেন, “আমি আয়নাঘরে কখনো চাকরি করিনি। আমি টেকনিক্যাল দায়িত্বে ছিলাম।”
২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার (ক্রসফায়ার) অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাঁকে ফের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় তিনিই একমাত্র আসামি।
মামলাটির অগ্রগতি নিয়ে ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, জিয়াউল আহসানের আইনজীবীরা নানা কৌশলে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করার চেষ্টা করছেন—শুধু সময় চেয়ে যাচ্ছেন বারবার, যা ভালো লক্ষণ নয় বলে সতর্ক করেন তিনি। ভবিষ্যতে এ ধরনের কালক্ষেপণের চেষ্টা হলে আরও কঠোরভাবে আপত্তি জানানো হবে বলেও জানান প্রসিকিউশন পক্ষ।
সবশেষ অগ্রগতি এসেছে চলতি সপ্তাহেই—২ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণে দশম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন আব্বাস মল্লিক নামের একজন। এই মামলার পাশাপাশি, একই ধরনের গুম-হত্যা সংক্রান্ত আরও অন্তত তিনটি মামলার রায় চলতি বছরের মধ্যেই আসতে পারে বলে বিচার-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যার দুটিতে সহ-আসামি হিসেবে আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও।
জিয়াউল আহসানের নিজের বক্তব্য
সব অভিযোগ থেকেই শুরু থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে রেখেছেন জিয়াউল আহসান। আদালতে তিনি দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট রাতে ডিজিএফআইয়ের একটি দল তাঁকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং পরবর্তী আট দিন তাঁকে নিজেকেই আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়। তাঁর ভাষায়, “যেসব ব্যক্তি আয়নাঘর থেকে বের হয়ে আসছে, তাদের কেউ বলুক আমি তাদের সেখানে রেখেছি। যেভাবে আমাকে নিয়ে দোষারোপ করা হচ্ছে, সেটা সঠিক নয়।” ইসরায়েলি নজরদারি সফটওয়্যার পেগাসাস প্রসঙ্গে আদালতের প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, পেগাসাস বলে আদৌ কিছুর অস্তিত্ব নেই এবং তিনি কারও মোবাইল ট্র্যাক করেননি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত বিষয় স্পষ্ট করা দরকার—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিচারপ্রক্রিয়া এখনো চলমান, সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে আছে, কোনো চূড়ান্ত রায় আসেনি। অর্থাৎ আইনি দৃষ্টিতে তিনি এখনো অভিযুক্ত, দোষী সাব্যস্ত নন। উইকিপিডিয়ার ইংরেজি সংস্করণে উল্লেখ আছে, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা এবং চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম দাবি করেছেন, শেখ হাসিনার নির্দেশে কর্মজীবনে তিনি মোট ১,০৩০ জন গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করেছেন—এই নির্দিষ্ট সংখ্যাটি একটি প্রকাশিত অভিযোগ হিসেবে উল্লেখযোগ্য হলেও, এটি এখনো আদালতে প্রমাণিত কোনো তথ্য নয়, বরং প্রসিকিউশন পক্ষের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
র্যাবের ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ড: সংখ্যায় যা বলছে
জিয়াউল আহসানের মামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি র্যাবের দুই দশকের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ডের অংশ। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বাহিনীর নিজস্ব মহাপরিচালকই ২০১০ সালের মার্চে স্বীকার করেছিলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে তত দিন পর্যন্ত ৬২২ জন ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়েছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ র্যাবকে বর্ণনা করেছে একটি “ডেথ স্কোয়াড” হিসেবে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নথি অনুযায়ী, বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে ২০০৯ সাল থেকে অন্তত ৬০০টি জোরপূর্বক গুম এবং ২০১৮ সাল থেকে প্রায় ৬০০টি বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ আছে র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে, পাশাপাশি নির্যাতনের একাধিক অভিযোগও রয়েছে। কোনো কোনো মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে মোট বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়ে যায়।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি আইনের আওতায় র্যাবকে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবং এর সাতজন বর্তমান-সাবেক কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে—যাঁদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, খান মোহাম্মদ আজাদ, তোফায়েল মোস্তফা সরওয়ার, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও মোহাম্মদ আনোয়ার লতিফ খান। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট পৃথকভাবে বেনজীর আহমেদ ও লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারি করে—নির্দিষ্টভাবে ২০১৮ সালের মে মাসে টেকনাফ পৌর কাউন্সিলর একরামুল হকের বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে।
তবে এই নিষেধাজ্ঞার একটি ইতিবাচক পরিণতিও নথিভুক্ত হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০২৩-এ উল্লেখ করা হয়, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনা নাটকীয়ভাবে কমে যায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নূর খান তখন বেনারনিউজকে বলেছিলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে বহু মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, কারণ অস্ত্র বা মাদক উদ্ধারের অজুহাতে “ক্রসফায়ারে” মৃত্যুর গতানুগতিক বয়ান প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
র্যাব বিলুপ্তি: দুই বছরের টানাপোড়েনের পর সিদ্ধান্ত
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ার পর জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে সরাসরি র্যাব ও এনটিএমসি বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়। একই প্রতিবেদনে বিজিবি ও ডিজিএফআইয়ের কার্যক্রম সীমিত করা, আনসার-ভিডিপিকে বেসামরিকীকরণ এবং পুলিশি নির্যাতন তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠনেরও সুপারিশ করা হয়।
তবে এই সুপারিশের পরও দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর সিদ্ধান্তহীনতা চলে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ গণমাধ্যমকে বলেন, বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা আছে, তবে সরকার চাইলে বিলুপ্তি ঘটাতে পারে। মে মাসে বাংলা ট্রিবিউনের একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, তখনো সরকারিভাবে কোনো বিলুপ্তির ঘোষণা আসেনি; বরং কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় ছিল। কমিশনের জ্যেষ্ঠ সদস্য নূর খান লিটন তখন মন্তব্য করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মূলত পুলিশেরই হওয়া উচিত; সরকার র্যাব বহাল রাখতে চাইলে অন্তত এটিকে একটি পেশাদার, পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ ইউনিটে রূপান্তর করা উচিত।
অবশেষে ২০২৬ সালের ৬-৭ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জনমত যাচাইয়ের জন্য “স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬”-এর একটি খসড়া প্রকাশ করে, যাতে র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশ বাহিনীর অধীনে নতুন এই ইউনিট গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়। ১৭ আগস্ট মন্ত্রিসভা এই খসড়া আইনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে। নতুন বিধিমালা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত র্যাব-সংক্রান্ত বিদ্যমান বিভাগীয় কার্যধারা প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ বহাল থাকবে বলে জানানো হয়।
সবশেষ অগ্রগতি হিসেবে সংসদে “আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬”-এর পাশাপাশি এসআরবি সংক্রান্ত বিল উত্থাপিত হয়েছে সম্প্রতি, যা এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পরীক্ষাধীন। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নীতিগতভাবে র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাব সমর্থন করলেও নতুন সংস্থা গঠনের বিষয়ে আরও গভীর চিন্তাভাবনা ও সর্বসম্মতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন—বিরোধী দলের একাংশের অভিযোগ, নতুন মোড়কে আসলে র্যাবকেই পুনর্গঠন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
খসড়া আইনে একটি লক্ষণীয় দিক হলো—নতুন বিধান অনুযায়ী সামরিক ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে সদস্য নেওয়ার সুযোগ এখনো বহাল রাখা হয়েছে, যা মানবাধিকারকর্মীদের কারও কারও কাছে সম্পূর্ণ বেসামরিকীকরণের সুপারিশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও জনমত
জিয়াউল আহসানের ট্রাইব্যুনালের প্রতিটি শুনানি এবং র্যাব বিলুপ্তি সংক্রান্ত প্রতিটি অগ্রগতির খবর বাংলাদেশের অনলাইন পরিসরে নিয়মিতভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এই আলোচনার একটি বড় অংশ আসে গুমের শিকার পরিবারগুলোর কাছ থেকে, যাঁদের অনেকে বছরের পর বছর ধরে প্রিয়জনের ভাগ্য সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত তথ্য ছাড়াই অপেক্ষা করছেন—হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪ সালের আগস্টে কিছু ভুক্তভোগী মুক্তি পেলেও, বহু পরিবার এখনো সত্য জানার অপেক্ষায়।
বিচার-সংশ্লিষ্ট মহল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে একটি সাধারণ উদ্বেগ হলো বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা—চিফ প্রসিকিউটরের নিজের বক্তব্যেই যার ইঙ্গিত মেলে। অন্যদিকে র্যাব বিলুপ্তি নিয়ে জনমত বিভক্ত—একাংশ মনে করে এটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জবাবদিহির একটি পদক্ষেপ, আরেকাংশ (বিশেষত আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ) প্রশ্ন তুলছেন, নতুন এসআরবি কাঠামোতে পুরোনো সংস্কৃতি ও কর্মীবাহিনীই যদি বহাল থাকে, তবে নাম বদলে প্রকৃত জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত হবে।
পর্যবেক্ষণ
সব তথ্য-প্রমাণ একত্রে পর্যালোচনা করলে একটি জটিল কিন্তু স্পষ্ট চিত্র দাঁড়ায়। জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগের উৎস বিচ্ছিন্ন কোনো একটি সূত্র নয়—জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং সরকার গঠিত একটি স্বাধীন কমিশন, এই তিনটি ভিন্ন ভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত পরস্পর নিরপেক্ষভাবে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। তবে ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কাউকে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না—আর জিয়াউল আহসান নিজে গোড়া থেকেই প্রতিটি অভিযোগ দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকার করে আসছেন।
সমান্তরালে চলা র্যাব বিলুপ্তি প্রক্রিয়া দেখাচ্ছে, ব্যক্তি পর্যায়ের জবাবদিহির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চাকাও ধীরে হলেও সচল। তবে জাতিসংঘের মূল সুপারিশ ছিল সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ও বেসামরিকীকরণ, আর বাস্তবে যা ঘটছে তা অনেকটাই পুনর্গঠন ও নবরূপায়ণ—নতুন আইনে সামরিক সদস্য নেওয়ার সুযোগ এখনো খোলা রাখা হয়েছে। ফলে প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—নাম ও কাঠামো বদলালেই কি জবাবদিহির সংস্কৃতি বদলাবে, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতাই শেষ পর্যন্ত পুরোনো প্রবণতাগুলো নতুন মোড়কে টিকিয়ে রাখবে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আগামী দিনে এসআরবি আইনের প্রকৃত বাস্তবায়ন এবং জিয়াউল আহসানসহ সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর চূড়ান্ত পরিণতির ওপর।
বিঃদ্রঃ এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগসমূহের মধ্যে যেগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন, তা এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।









মন্তব্য করুন