সূচনা
“বাংলাদেশ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে দ্রুততম বর্ধনশীল স্টার্টআপ অর্থনীতিগুলোর একটি, ৫ম স্থানে, ২০২৬ সালে ৫৬.৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে”—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ঘুরে বেড়ানো এই দাবিটি অবশ্যই আকর্ষণীয় এবং জাতীয় গর্বের খোরাক জোগানোর মতো। কিন্তু একজন অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের কাজ হলো আকর্ষণীয় দাবিকে যাচাই করা, শুধু প্রচার করা নয়। মিহা নিউজের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই দাবির একটি অংশ—৫৬.৫% প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানটি—সত্যিই নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাইযোগ্য। কিন্তু “এশিয়া-প্যাসিফিকে ৫ম স্থান” অংশটি মূল উৎস প্রতিবেদনের সঙ্গে মেলে না। নিচে বিস্তারিত পোস্টমর্টেম।
প্রেক্ষাপট: দাবিটি এল কোথা থেকে
সংখ্যাটির উৎস খুঁজে বের করা কঠিন হয়নি। ইসরায়েলভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টার্টআপব্লিঙ্ক প্রতিবছর ১০০-র বেশি দেশ ও দেড় হাজারের বেশি শহরের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম নিয়ে “গ্লোবাল স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ইনডেক্স” প্রকাশ করে। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ইকোসিস্টেমের প্রবৃদ্ধির হার হিসেবে ৫৬.৫% উল্লেখ আছে—এপ্রিল ২০২৫ থেকে এপ্রিল ২০২৬ সময়কালের জন্য। এই সংখ্যাটি সঠিক।
যেখানে দাবি ও বাস্তবতা আলাদা হয়ে যায়
সমস্যা শুরু হয় “৫ম স্থান” ও “এশিয়া-প্যাসিফিক” অংশে। স্টার্টআপব্লিঙ্কের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থান হলো:
- বৈশ্বিকভাবে ৭৭তম (মোট ১০০+ দেশের মধ্যে)
- দক্ষিণ এশিয়ায় ৪র্থ—ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার পেছনে
দক্ষিণ এশিয়া (৮টি দেশ) আর এশিয়া-প্যাসিফিক (পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ওশেনিয়াসহ কয়েক ডজন দেশ)—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আঞ্চলিক শ্রেণিবিন্যাস। স্টার্টআপব্লিঙ্কের নিজস্ব বিশ্লেষণেই এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে সিঙ্গাপুর (বৈশ্বিক ৪র্থ) ও অস্ট্রেলিয়া (বৈশ্বিক ৯ম)-এর কথা বলা হয়েছে—বাংলাদেশের নাম এই তালিকায় নেই।
আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, স্টার্টআপব্লিঙ্কের নিজস্ব “২০২৬ সালের দ্রুততম বর্ধনশীল দেশ” তালিকায় (যা আঞ্চলিক নয়, সম্পূর্ণ বৈশ্বিক) শীর্ষে আছে উজবেকিস্তান (২২৭.৩% প্রবৃদ্ধি), এরপর সৌদি আরব (৯৭.০%), মলদোভা (৯১.৯%)—আর দশম স্থানে থাকা থাইল্যান্ডের প্রবৃদ্ধিও ৬২.৬%, যা বাংলাদেশের ৫৬.৫%-এর চেয়ে বেশি। অর্থাৎ বৈশ্বিক শীর্ষ দশ দ্রুততম বর্ধনশীল ইকোসিস্টেমের তালিকাতেও বাংলাদেশের জায়গা হয়নি।
সংক্ষেপে: ৫৬.৫% প্রবৃদ্ধির সংখ্যাটি সত্য ও উল্লেখযোগ্য একটি অর্জন, কিন্তু “এশিয়া-প্যাসিফিকে ৫ম স্থান” দাবিটি কোনো যাচাইযোগ্য সূত্রে খুঁজে পাওয়া যায়নি—সম্ভবত এটি “দক্ষিণ এশিয়ায় ৪র্থ” তথ্যের সঙ্গে বিভ্রান্তি থেকে তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
ইতিহাস যা বলছে: ধীরে হলেও প্রকৃত অগ্রগতি
দাবিতে অতিরঞ্জন থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা প্রকৃতপক্ষেই ইতিবাচক। স্টার্টআপব্লিঙ্কের পুরোনো প্রতিবেদনগুলো ঘেঁটে দেখা যায়:
| বছর | বৈশ্বিক অবস্থান |
|---|---|
| ২০২২ | ৯৩তম |
| সাম্প্রতিক বছর (নির্দিষ্ট বছর অনুল্লেখিত প্রতিবেদনে) | ৭৯তম |
| ২০২৬ | ৭৭তম |
অর্থাৎ চার বছরে বাংলাদেশ ১৬ ধাপ এগিয়েছে—এটি প্রকৃতপক্ষে একটি স্থিতিশীল, ধারাবাহিক অগ্রগতি, যদিও তা “শীর্ষ পাঁচে” পৌঁছানোর মতো নাটকীয় নয়।
সংখ্যার পেছনের সংখ্যা: ইকোসিস্টেমের প্রকৃত চিত্র
গবেষণা প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসল পার্টনার্সের বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ফান্ডিং ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী:
- দেশে বর্তমানে ১,২০০-র বেশি সক্রিয় স্টার্টআপ, প্রতিবছর যুক্ত হচ্ছে ২০০-র বেশি নতুন উদ্যোগ
- ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০০টি চুক্তিতে ১৫১টি স্বতন্ত্র স্টার্টআপ মিলিয়ে ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এসেছে
- খাতটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে বলে দাবি করা হয়েছে
স্টার্টআপ বাংলাদেশ (সরকারি উদ্যোগ)-এর নিজস্ব “ইয়ার ইন রিভিউ ২০২৫” প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ১২টি চুক্তিতে ১২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এসেছে—আগের বছর (২০২৪) যা ছিল মাত্র ৪২ মিলিয়ন ডলার। সংখ্যায় এটি বড় লাফ মনে হলেও, প্রতিবেদনটি নিজেই সতর্ক করে বলেছে, এই প্রবৃদ্ধি মূলত হাতে গোনা কয়েকটি বড় চুক্তির ওপর নির্ভরশীল, বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পরিমিত ও সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণও একই সতর্কবার্তা দিচ্ছে। প্রযুক্তি খাতের একজন ইউরোপীয় বিশ্লেষক সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছেন, স্টার্টআপের সংখ্যা কোনো সুস্থ বিনিয়োগ-প্রবাহের প্রতিশব্দ নয়, আর বিনিয়োগ-প্রবাহও কোনো টেকসই কোম্পানি-নির্মাণ ব্যবস্থার সমার্থক নয়। প্রাথমিক পর্যায়ের (সিড ও প্রি-সিড) বিনিয়োগই এখনো বাংলাদেশের বেশিরভাগ চুক্তির প্রধান অংশ দখল করে আছে, যা দেখায় যে অংশগ্রহণ বাড়লেও দেরিতে-পর্যায়ের (লেট-স্টেজ) মূলধন এখনো সীমিত।
খাতভিত্তিক চিত্র
ফিনটেক এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ টানছে, এরপরে রয়েছে ই-কমার্স ও রিটেইল, সফটওয়্যার এবং লজিস্টিকস-মোবিলিটি খাত। স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, শিক্ষাপ্রযুক্তি ও জলবায়ু-কেন্দ্রিক উদ্যোগও ধীরে ধীরে গতি পাচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশীয় লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান শপআপ ও সৌদি আরবভিত্তিক সারির একীভূতকরণে গঠিত হয়েছে নতুন প্রতিষ্ঠান সিল্ক গ্রুপ (SILQ Group)—যা আঞ্চলিক একত্রীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে দেশের ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামোরও বড় ভূমিকা আছে। ২০২৪ সাল নাগাদ দেশে মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) হিসাব সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ২৩ কোটি ৮০ লাখ—দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি (একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের কারণে)। ২০২৪ সালে এমএফএসের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ১৭ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, আগের বছরের তুলনায় যা ২৮.৪২% বেশি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ২.১৯% হলেও, বাংলাদেশ বিশ্বের দৈনিক মোবাইল মানি লেনদেনের প্রায় ৮.৬১% সম্পন্ন করে—যা দেশের ডিজিটাল লেনদেন-নির্ভরতার গভীরতা স্পষ্ট করে।
সামষ্টিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপট: প্রবৃদ্ধির বিপরীতে সতর্কবার্তা
তবে স্টার্টআপ খাতের এই আশাব্যঞ্জক পরিসংখ্যানকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে, দুর্বল রাজস্ব আদায় ও জ্বালানি সংকট এখনো দেশের শিল্পোৎপাদনে বাধা তৈরি করছে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমও ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো ছাড়া সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন।
এই সামষ্টিক প্রতিকূলতার মধ্যেই স্টার্টআপ খাতের প্রবৃদ্ধি ঘটছে—যা একদিকে খাতটির স্থিতিস্থাপকতার প্রমাণ, অন্যদিকে এই প্রশ্নও তোলে যে সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হলে প্রবৃদ্ধির গতি আরও কতটা বাড়তে পারত।
জনমত ও বিশ্লেষক-মহলের প্রতিক্রিয়া
উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি-বিশ্লেষক মহলে এই প্রবৃদ্ধির খবর সাধারণভাবে ইতিবাচকভাবে গৃহীত হলেও, একটি স্পষ্ট সতর্কতার সুরও লক্ষণীয়। ইকোসিস্টেম-সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ হলো, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (স্টার্টআপব্লিঙ্ক বনাম লাইটক্যাসল) সক্রিয় স্টার্টআপের সংখ্যায় নিজেই বড় ফারাক আছে (৬৭৭ বনাম ১,২০০+)—যা প্রমাণ করে “সক্রিয় স্টার্টআপ”-এর সংজ্ঞা নিয়ে খাতেই ঐকমত্য নেই। বিশ্লেষকরা তাই পাঠক ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, যেকোনো একক পরিসংখ্যানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে তার পদ্ধতিগত ভিত্তি (মেথডোলজি) যাচাই করে নেওয়ার জন্য।
থিংক-ট্যাংক পর্যবেক্ষণ ও উপসংহার
সব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে বলা যায়, বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম প্রকৃতপক্ষেই একটি ইতিবাচক ধারায় আছে—৫৬.৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং (৯৩তম থেকে ৭৭তম), বিনিয়োগের তিনগুণ বৃদ্ধি (২০২৪-২৫) এবং একটি পরিণত হতে থাকা ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামো—এসবই বাস্তব ও ইতিবাচক সংকেত।
তবে “এশিয়া-প্যাসিফিকে ৫ম স্থান”-এর মতো দাবি ছড়িয়ে পড়া দেখায়, ইতিবাচক পরিসংখ্যানকেও কীভাবে সহজেই অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা সম্ভব—আর প্রকৃত অর্জনকে (৭৭তম থেকে উন্নতি, প্রকৃতপক্ষেই একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য) সেই অতিরঞ্জনের ছায়ায় ঢাকা পড়তে দেওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এখন সংখ্যা বাড়ানো নয়—বরং সেই প্রবৃদ্ধিকে প্রাথমিক পর্যায়ের বিনিয়োগ-নির্ভরতা থেকে বের করে টেকসই, দেরিতে-পর্যায়ের পুঁজি ও প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতার দিকে নিয়ে যাওয়া।














মন্তব্য করুন