২৪ ঘণ্টা, ছয় এআই এজেন্ট, পাঁচ কাজ: কে পাস, কে ফেল
মার্কিন প্রযুক্তি সাময়িকী ওয়্যার্ডের এক প্রতিবেদক ২৪ ঘণ্টায় ছয়টি এআই এজেন্টকে পাঁচ ধরনের কাজ দিয়ে পরীক্ষা করেছেন: মেটার মিউজ, ওপেনএআইয়ের ডটস, ইনস্টিংক্ট, অ্যানথ্রপিকের ক্লড ডুয়েট, গুগলের জেমিনি স্পার্ক আর এক্সএআইয়ের গ্রক বট। মোট নম্বরে সবার ওপরে ওপেনএআইয়ের ডটস (২৫-এ ২০), দ্বিতীয় বিনা মূল্যের মেটা মিউজ (১৮)। রুটিনের সংঘাত ধরার পরীক্ষায় ছয়টির মধ্যে মাত্র দুটি এজেন্ট আগেভাগে সতর্ক করতে পেরেছে। প্রতিবেদকের সতর্কতা, ব্যক্তিগত ইমেইল, ক্যালেন্ডার বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এজেন্টকে প্রবেশাধিকার দেওয়ার আগে গোপনীয়তার ঝুঁকি ভেবে নিতে হবে।#AIAgents #OpenAI #MetaAI #TechReview #MeehaNews

রাত তখন গভীর। ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটি আইফোনে একে একে ছয়টি অ্যাপ সাজিয়ে নিলেন মার্কিন প্রযুক্তি সাময়িকী ওয়্যার্ডের (WIRED) সফটওয়্যার প্রতিবেদক। পরের ২৪ ঘণ্টা ছয়টি ‘ডিজিটাল সহকারী’ তাঁর হয়ে খবর খুঁজবে, দুপুরের খাবার বাছবে, রুটিনের গোলমাল ধরবে, বিদেশভ্রমণের পরিকল্পনা করবে, এমনকি মাঝরাতের অনিদ্রায় সঙ্গও দেবে।
অথচ এক বছর আগেও এই প্রতিবেদকই সহকর্মীদের কাছে অভিযোগ করতেন, এআই এজেন্ট কোনো কাজেরই না। এখন তিনি মানছেন, ভুল এখনো হয়, তবে কাজ শেষ করা আর ব্রাউজার চালানোয় এজেন্টগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
কোনটি আসলে কাজের? জানতে হলে আগে বুঝে নেওয়া দরকার এজেন্ট জিনিসটা কী।
এআই এজেন্ট আসলে কী
সাধারণ চ্যাটবট (chatbot) প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়, ব্যস। এআই এজেন্ট (AI agent) এক ধাপ এগিয়ে। এটি অনেকটা এমন এক সহকারীকে খুদে বার্তা পাঠানোর মতো, যে নিজে থেকেই কাজ করে দেয়:
- জরুরি ইমেইল চোখ এড়িয়ে গেছে কি না, খুঁজে দেখে।
- উড়োজাহাজের টিকিটের ছাড়ের দিকে নজর রাখে।
- কেনাকাটার সিদ্ধান্তে সাহায্য করে।
বড় পার্থক্য হলো, এজেন্ট অপেক্ষা করে বসে থাকে না। সাহায্যের সুযোগ দেখলে নিজেই আগে বার্তা পাঠায়। বেশির ভাগ কাজ সে করে নিজস্ব ভার্চুয়াল ব্রাউজার (virtual browser) দিয়ে, অর্থাৎ ইন্টারনেটে ঢোকার জন্য তার নিজের আলাদা একটি কম্পিউটার।
মাঠে ছয় প্রতিযোগী
| এজেন্ট | প্রতিষ্ঠান | মাসিক খরচ (ওয়্যার্ডের তথ্য) | কীভাবে ব্যবহার |
|---|---|---|---|
| মিউজ (Muse) | মেটা | বিনা মূল্যে | আলাদা অ্যাপ |
| ইনস্টিংক্ট (Instinct) | — | বিনা মূল্যে, তবে আমন্ত্রণ কোড লাগে | খুদে বার্তায় |
| ডটস (Dots) | ওপেনএআই | ১০০ ডলার | চ্যাটজিপিটির ভেতরে |
| জেমিনি স্পার্ক (Gemini Spark) | গুগল | ২০ ডলার, বেটা সংস্করণ | জেমিনি অ্যাপে |
| গ্রক বট (Grok Bot) | এক্সএআই | ৩০ ডলার | আলাদা অ্যাপ |
| ক্লড ডুয়েট (Claude Duet) | অ্যানথ্রপিক | ২০ ডলার, অপেক্ষমাণ তালিকায় নাম লেখাতে হয় | আলাদা অ্যাপ |
মিউজ সেপ্টেম্বরে মুক্তির পর থেকে স্মার্টফোন অ্যাপ ডাউনলোডের তালিকায় শীর্ষে। ক্লড ডুয়েট সবচেয়ে নতুন, পরীক্ষার আগের রাতেই গবেষণামূলক প্রিভিউ (research preview) হিসেবে এসেছে। চলতি বছর এজেন্ট-জোয়ারের সূচনা যে ওপেনক্ল (OpenClaw) দিয়ে, সেটি তালিকায় নেই। প্রতিবেদকের মতে, সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য এটি চালু করা বেশ ঝামেলার।
পরীক্ষার নিয়ম
প্রতিবেদক পাঁচটি সাধারণ কাজ ঠিক করেন। প্রতিটিতে ১ থেকে ৫ নম্বর, শেষে যোগফল। এজেন্টদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জিমেইল (Gmail) আর গুগল ক্যালেন্ডারে।
কাজ ১: সকালের সংবাদ-প্রস্তাব
প্রতিবেদকের নির্দেশ ছিল, আধা ঘণ্টা গভীর অনুসন্ধান করে সাপ্তাহিক সম্পাদকীয় বৈঠকের জন্য একটি প্রতিবেদনের আইডিয়া আর শিরোনাম তৈরি করতে হবে। পুরো সময় নিয়ে খুঁজেছে শুধু মিউজ আর ডটস, বাকিরা কয়েক মিনিটেই উত্তর দিয়ে দেয়।
তবে সেরা আইডিয়া দিয়েছে জেমিনি স্পার্ক (৫)। তার প্রস্তাব ছিল, ওয়ালমার্ট যখন তৃতীয় পক্ষের এজেন্টের জন্য কেনাকাটার দরজা খুলছে, অ্যামাজন তখন মিউজকে আটকে দিচ্ছে। এরপর ক্লড ডুয়েট (৪), মিউজ (৩), ডটস (২)। গ্রক বট আর ইনস্টিংক্ট পায় ১। প্রতিবেদকের অভিজ্ঞতা, বৈঠকে আইডিয়াগুলো শুনে সহকর্মীরা হাই তুলছিলেন।
কাজ ২: দুপুরের খাবার অর্ডার
শর্ত ছিল কয়েকটি: অফিসের কাছের ভিয়েতনামি রেস্তোরাঁ, নিজের জন্য মাংসের পদ ও কড়া কফি, আর নিরামিষাশী (vegan) বসের জন্য আলাদা খাবার।
সেরা ডটস (৫)। রেস্তোরাঁর নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে এমন কার্ট সাজিয়েছে যে প্রতিবেদক সেটিই অর্ডার করেন। মিউজ আর গ্রক বট পায় ৪, ক্লড ডুয়েট ৩, ইনস্টিংক্ট ২। ব্যর্থ জেমিনি স্পার্ক (১)। বসের জন্য রেখেছিল মাত্র একটি স্প্রিং রোল, খাবারের চেয়ে নাশতাই বেশি।
কাজ ৩: রুটিনের সংঘাত ধরা
এটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। ক্যালেন্ডারে দুপুর দুইটায় একটি ‘অপরিবর্তনযোগ্য’ বৈঠক রাখা হয়। আর ইমেইলে লেখা থাকে, ঠিক দুইটায় হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া মাকে ফোন করতে হবে।
দুটি মিলিয়ে আগেভাগে সতর্ক করতে পেরেছে মাত্র দুটি এজেন্ট:
- ডটস (৫): সংঘাত ধরেই বিকল্প সময়ও সুপারিশ করেছে।
- ক্লড ডুয়েট (৪): কয়েক ঘণ্টা আগেই সতর্ক করেছে, তবে বিকল্প দেয়নি।
- গ্রক বট, ইনস্টিংক্ট, মিউজ (২): ঘটনার পর ভুল মেনে নিয়েছে, ভবিষ্যতে ইমেইল আর ক্যালেন্ডার মিলিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
- জেমিনি স্পার্ক (১): সংঘাত ধরতে পারেনি, ভবিষ্যতের সমাধানও দেয়নি।
কাজ ৪: দুই সপ্তাহের চীন ভ্রমণ পরিকল্পনা
শর্ত ছিল ইতিহাস আর বড় শহরের মিশেল, তবে চারটির বেশি হোটেল নয়। মজার ব্যাপার, ছয়টি এজেন্টই প্রায় একই পথ বেছে নিয়েছে: বেইজিং, সিয়ান, চেংদু, সাংহাই। প্রতিবেদকের আশঙ্কা, সবাই এজেন্টের পরামর্শে চললে পর্যটকেরা দল বেঁধে একই জায়গা, একই দোকানে ভিড় করবেন।
সবচেয়ে গোছানো, টেবিলসহ পরিকল্পনা দিয়েছে মিউজ (৫)। ডটস (৪) ভালো করলেও তাদের খসড়া দাঁড়িয়েছে ২৪ পৃষ্ঠার। গ্রক বট পায় ৪। জেমিনি স্পার্ক, ইনস্টিংক্ট আর ক্লড ডুয়েট ৩।
কাজ ৫: মাঝরাতের অনিদ্রা
শেষ পরীক্ষা ছিল একেবারে খোলামেলা। ঘুম আসছে না, এখন কী করা যায়? এখানে মানুষের মতো কোমলতা আর পরিস্থিতিবোধই আসল।
সেরা গ্রক বট (৫)। প্রস্তাব দিয়েছে মায়ের খোঁজ নেওয়ার রিমাইন্ডার সকালে রেখে দেওয়ার, যাতে আপাতত চিন্তাটা মাথা থেকে নামানো যায়। ডটস, ইনস্টিংক্ট আর মিউজ পায় ৪। পিছিয়ে জেমিনি স্পার্ক আর ক্লড ডুয়েট (২)। জেমিনি অনিদ্রাকে ক্যালেন্ডারের ফাঁকা সকালের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। ক্লড ডুয়েট মাঝরাতে মনে করিয়েছে দুপুরের খাবার আর অফিসের কাজের অসমাপ্ত হিসাব।
চূড়ান্ত স্কোরকার্ড
| এজেন্ট | সংবাদ-প্রস্তাব | খাবার | সংঘাত | ভ্রমণ | অনিদ্রা | মোট (২৫) |
|---|---|---|---|---|---|---|
| ডটস | ২ | ৫ | ৫ | ৪ | ৪ | ২০ |
| মিউজ | ৩ | ৪ | ২ | ৫ | ৪ | ১৮ |
| গ্রক বট | ১ | ৪ | ২ | ৪ | ৫ | ১৬ |
| ক্লড ডুয়েট | ৪ | ৩ | ৪ | ৩ | ২ | ১৬ |
| জেমিনি স্পার্ক | ৫ | ১ | ১ | ৩ | ২ | ১২ |
| ইনস্টিংক্ট | ১ | ২ | ২ | ৩ | ৪ | ১২ |
প্রতিবেদকের রায়:
- সেরা সামগ্রিকভাবে, ওপেনএআই ডটস: তবে মাসে ১০০ ডলার। তাঁর পরামর্শ, বিনা মূল্যে বা ২০ ডলারের প্যাকেজে না আসা পর্যন্ত বেশির ভাগ মানুষের অপেক্ষা করাই ভালো।
- সবচেয়ে সহজলভ্য, মেটা মিউজ: বিনা মূল্যে, চালু করাও সবচেয়ে সহজ। তবে অতীতে ব্যবহারকারীর তথ্য সামলানো নিয়ে মেটার রেকর্ডের কারণে প্রতিবেদকের উদ্বেগ রয়ে গেছে।
- সেরা ইন্টারফেস, ক্লড ডুয়েট: নম্বরে মাঝামাঝি, তবে অ্যাপটি ব্যবহার আর চলমান কাজের খোঁজ রাখায় সবচেয়ে সহজ।
- সবচেয়ে বিরক্তিকর, ইনস্টিংক্ট: শুধু খুদে বার্তায় চলে, তাই এজেন্ট কী করছে তা থেকে দূরে থাকার অনুভূতি। ভুল ধরিয়ে দিলে উত্তরে মুখ বাঁকানো ইমোজিও পাঠায়।
নিজে শুরু করতে চাইলে: পাঁচ ধাপ
এই পরীক্ষা থেকে নিজের জন্য এজেন্ট বাছাইয়ের একটা রূপরেখা পাওয়া যায়।
- আগে প্রাপ্যতা দেখুন। অনেক এজেন্ট এখনো নির্দিষ্ট দেশে সীমাবদ্ধ। যেমন ক্লড ডুয়েটের প্রিভিউ আপাতত শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টের জন্য, ডটসও চালু হয়েছে নির্বাচিত বাজারে। বাংলাদেশ থেকে ব্যবহার করা যাবে কি না, অ্যাপ স্টোর বা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে মিলিয়ে নিন।
- বিনা মূল্যেরটি দিয়ে শুরু করুন। হাতেখড়ির জন্য বিনা মূল্যের এজেন্টই যথেষ্ট। অর্থ খরচের আগে বুঝে নিন, আপনার দৈনন্দিন কাজে আসলে কোনটি লাগছে।
- কম অনুমতি দিন। শুরুতে শুধু ক্যালেন্ডার বা একটি ইমেইল অ্যাকাউন্ট যুক্ত করুন। ব্যাংক, অফিসের চ্যাট বা পাসওয়ার্ড ম্যানেজার এখনই নয়। ওয়্যার্ড এক এক্স ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার কথা লিখেছে: ব্যাংক আর অফিসের স্ল্যাক যুক্ত করার পর এজেন্ট সহকর্মীদের সামনেই তাঁর অ্যাকাউন্টের টাকার অঙ্ক প্রকাশ করে দেয়।
- ছোট কাজ দিয়ে পরীক্ষা করুন। দিনের রুটিন মিলিয়ে দেখা, ইমেইলের সারসংক্ষেপ, কেনাকাটার কার্ট সাজানো, এমন কাজ দিয়ে শুরু করুন, যেখানে ভুল হলে ক্ষতি কম।
- চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিজের হাতে রাখুন। টাকা খরচ, বার্তা পাঠানো বা ভ্রমণের বুকিংয়ের মতো কাজে অনুমোদন ছাড়া এজেন্টকে এগোতে দেবেন না। ভ্রমণ পরিকল্পনা অন্য উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। ওয়্যার্ড মনে করিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় চ্যাটবটের পরিকল্পনায় কঠিন হাইকিংয়ে যাওয়া একটি দলকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে উদ্ধার করতে হয়েছিল।
এক বছরে এআই এজেন্ট অকেজো থেকে কাজের হয়ে উঠেছে, এটা স্পষ্ট। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার এই পরীক্ষা এটাও দেখিয়েছে, সবচেয়ে ভালো এজেন্টও পাঁচটি কাজের সব কটিতে সমান ভালো নয়। আপাতত এজেন্ট সহকারী, সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানুষ এখনো আপনিই।





