প্রধান কন্টেন্টে যান
শুক্র ২ October ২৬
হেডলাইন
বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন
বিশ্ব রাজনীতি / বিশ্ব রাজনীতি

মধ্যপ্রাচ্যে কি ফুরাচ্ছে মার্কিন আধিপত্যের যুগ?

মোট শেয়ারমোঃ: 0

মধ্যপ্রাচ্যে কি ফুরাচ্ছে মার্কিন আধিপত্যের যুগ?

একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন


প্রশ্নটা কী

গত কয়েক মাসে একের পর এক আন্তর্জাতিক সাময়িকী ও থিংক ট্যাংকের প্রতিবেদনে একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে: মধ্যপ্রাচ্যে ৩৫ বছরের মার্কিন আধিপত্যের যুগ কি সত্যিই শেষ হয়ে যাচ্ছে? সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পররাষ্ট্রনীতি সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্স যুক্তি দিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যুদ্ধ ১৯৯১ সালে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক নিরাপত্তা-কাঠামোকে কার্যত ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু এই দাবি কতটা প্রমাণনির্ভর, আর বাস্তবে মাটিতে কী ঘটছে—তা যাচাই করতে একাধিক সূত্র ঘেঁটে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

যে যুদ্ধ ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন, এর পর ক্ষমতায় আসেন তাঁর পুত্র মোজতবা খামেনি। এরপর থেকে প্রায় ছয় মাস ধরে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ত্রিমুখী সংঘাত চলছে, যার সবশেষ অধ্যায় হলো গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা এবং তার জবাবে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলা। এই দীর্ঘায়িত সংঘাতেই মূলত “মার্কিন আধিপত্যের অবসান” তত্ত্বের জন্ম।

প্রমাণ যা সমর্থন জোগাচ্ছে

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: উপসাগরীয় দেশগুলোর ঝুঁকি বিভাজন

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিমুখী ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার স্থায়িত্ব নিয়ে ক্রমবর্ধমান সংশয়ের প্রেক্ষাপটেই এই চুক্তি হয়েছে। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার ঝুড়িতে একাধিক ডিম রাখার কৌশল নিচ্ছে—শুধু ওয়াশিংটনের ভরসায় বসে না থেকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গেও সরাসরি প্রতিরক্ষা বোঝাপড়া করছে।

যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সামরিক উপস্থিতি কমানোর পরিকল্পনা করছে

গত ১৮ আগস্ট দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একাধিক সূত্রের বরাতে দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে কয়েক মাসের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর যুক্তরাষ্ট্র নিজেই অঞ্চলটিতে সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতায় বিদেশি শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ দ্রুত কমছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চল থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে। একই সঙ্গে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায়ও আপত্তি নেই বলে জানিয়েছে।

উপসাগরীয় নেতাদের প্রস্তুতি

দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা-কাঠামো এখন আর কেবল যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নয়। উপসাগরীয় দেশগুলো এমন এক পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে ওয়াশিংটন হয়তো পাশে নাও থাকতে পারে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরই এই মানসিকতার পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রমাণ যা সতর্কতা তৈরি করছে: ‘অবসান’ তত্ত্বের বিপরীত যুক্তি

তবে এই একই সময়ে এমন প্রমাণও মিলছে, যা “মার্কিন আধিপত্যের সম্পূর্ণ অবসান” তত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

প্রথমত, সৌদি আরব এখনো দ্বিমুখী কৌশলে হাঁটছে। গত ২ আগস্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনে সৌদি আরব সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় এখনো রিয়াদের যথেষ্ট আগ্রহ ও প্রবেশাধিকার রয়েছে। বিশ্লেষকদের ভাষ্যে, সৌদি নেতৃত্ব চাইছে পরিস্থিতির আরও অবনতি নয়, বরং উত্তেজনা প্রশমন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির জন্যও সৌদি আরবের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামো এখনো অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ও কার্যকর। কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি এখনো সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) ফরওয়ার্ড সদর দপ্তর, যেখানে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আল-দাফরা বিমানঘাঁটি ও বাহরাইনে নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তরও সক্রিয় রয়েছে। এই অবকাঠামো রাতারাতি অকার্যকর হয়ে পড়েনি।

তৃতীয়ত, বিশ্লেষকদের মধ্যেই দ্বিমত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে। একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দুই ধরনের যুক্তি—যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এই উপস্থিতি মূলত জ্বালানি প্রবাহ সুরক্ষা, মিত্রদের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার জন্য; সমালোচকদের মতে এটি নিছক প্রতিরক্ষা নয়, বরং অঞ্চলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কৌশলগত ভারসাম্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বজায় রাখার হাতিয়ার। এই দ্বিমত থেকেই বোঝা যায়, “আধিপত্যের অবসান” প্রশ্নে বিশ্লেষক মহলেই ঐকমত্য নেই।

তাহলে প্রকৃত চিত্রটা কী

এই দুই ধরনের প্রমাণ মিলিয়ে যে চিত্র উঠে আসে, তা এক কথায় “অবসান” নয়, বরং “পুনর্বিন্যাস”। উপসাগরীয় দেশগুলো একচেটিয়া মার্কিননির্ভরতা থেকে সরে এসে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান জোটের মতো বিকল্প নিরাপত্তা বলয় তৈরি করছে—এটি বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্র নিজেও সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পর উপস্থিতি পুনর্বিন্যাসের কথা ভাবছে বলে বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু একই সময়ে সৌদি আরবের মতো মূল মিত্র দেশ এখনো ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে, মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখনো সক্রিয়, আর পারমাণবিক সহযোগিতার মতো দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বও এখনো টেবিলে আছে।

ফরেন অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষণে ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের সঙ্গে তুলনা টানা হয়েছে—সেই সংকট ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা করলেও প্রকৃত প্রভাব বছরের পর বছর ধরে ধীরে প্রকাশ পেয়েছিল। একই যুক্তি এখানেও প্রযোজ্য হতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন: বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে সন্দেহ নেই, তবে তার পূর্ণাঙ্গ প্রভাব বোঝা যেতে এখনো বছরের পর বছর সময় লাগতে পারে।

উপসংহার

সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন “আধিপত্যের অবসান” ঘটেছে বলে দাবি করা এখনই হয়তো তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্ত হবে। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়—৩৫ বছরের পুরোনো নিরাপত্তা-কাঠামোর প্রতি আঞ্চলিক দেশগুলোর আস্থায় বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য ফাটল ধরেছে, আর সেই ফাটলের প্রমাণ মিলছে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা পর্যন্ত একাধিক সুনির্দিষ্ট ঘটনায়। আগামী কয়েক মাস-বছরে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হবে, নাকি সাময়িক টালমাটালের পর পুরোনো কাঠামোই টিকে যাবে—তা এখনো অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়েই আছে।

মোট শেয়ারমোঃ: 0

পোস্টটি কেমন লাগলো?

মন্তব্য করুন (2)

একটি মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো * দ্বারা চিহ্নিত।

সম্পর্কিত খবর

সাম্প্রতিক খবর

নেতানিয়াহুর ৮ ঘণ্টার সফর, ট্রাম্পহীন সাক্ষাৎ—পশ্চিমারা কি সত্যিই পতন চায়?

নেতানিয়াহুর ৮ ঘণ্টার সফর, ট্রাম্পহীন সাক্ষাৎ—পশ্চিমারা কি সত্যিই পতন চায়?

১৭ মিনিট আগে
বন্ধ দরজা আর একটি ‘না’: স্বরা ভাস্করের সেই রাতের গল্প

বন্ধ দরজা আর একটি ‘না’: স্বরা ভাস্করের সেই রাতের গল্প

৩৫ মিনিট আগে
সাদের অনুরোধে বদলে গেল এলেনার গল্প: আগে ইন্দোনেশিয়া, এখন নেপাল

সাদের অনুরোধে বদলে গেল এলেনার গল্প: আগে ইন্দোনেশিয়া, এখন নেপাল

৪৫ মিনিট আগে
ময়মনসিংহে বাসচাপায় নিহত ৭, একই পরিবারের ৪ জন

ময়মনসিংহে বাসচাপায় নিহত ৭, একই পরিবারের ৪ জন

৫৫ মিনিট আগে
সুইচ আমাদের হাতে, বিদ্যুৎ কার হাতে?

সুইচ আমাদের হাতে, বিদ্যুৎ কার হাতে?

৫ ঘণ্টা আগে
নামফলকে লেখা হলো, মুছে গেল, আবার ফিরল—ঢাবির এক হল, দুই নাম আর অভ্যুত্থানের অসমাপ্ত প্রশ্ন

নামফলকে লেখা হলো, মুছে গেল, আবার ফিরল—ঢাবির এক হল, দুই নাম আর অভ্যুত্থানের অসমাপ্ত প্রশ্ন

১ দিন আগে
গোল নয় গোলপাতা: সুন্দরবনের সবুজ আচ্ছাদন, যার আড়ালে লুকিয়ে বাঘের নিঃশ্বাস

গোল নয় গোলপাতা: সুন্দরবনের সবুজ আচ্ছাদন, যার আড়ালে লুকিয়ে বাঘের নিঃশ্বাস

৪ দিন আগে
মেহেরুনকে নিয়ে ‘উধাও’ আইএইচটি শিক্ষক অসীম কুমার

মেহেরুনকে নিয়ে ‘উধাও’ আইএইচটি শিক্ষক অসীম কুমার

২ সপ্তাহ আগে

সর্বাধিক পঠিত