আন্তর্জাতিক ডেস্ক ঢাকা, ৩১ আগস্ট ২০২৬
একই সঙ্গে চীন ও পাকিস্তান—দুই দেশের সঙ্গেই প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ক্রমশ গভীর করছে বাংলাদেশ। যুদ্ধবিমান কেনা থেকে শুরু করে দেশের ভেতরে সামরিক ড্রোন কারখানা স্থাপন—একাধিক উদ্যোগ মিলিয়ে চলতি বছরে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে এটিই সবচেয়ে বড় পুনর্বিন্যাস বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চীনা যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্তের পথে
চীনের তৈরি জে-১০সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। এই ক্রয়ের খসড়া প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ মিললে দ্রুতই এই কেনাকাটা সম্পন্ন হবে, নইলে তা গড়াবে পরের অর্থবছরে। প্রস্তাবিত প্যাকেজে যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি রয়েছে চীনা অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি পরিবহন হেলিকপ্টার ও ড্রোনও। এর আগে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০টি জে-১০ কেনার একটি প্রাথমিক পরিকল্পনার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২২০ কোটি ডলার, যাতে খুচরা যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ ও বিমা খরচও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
চেংদু জে-১০সি যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ এই জে-১০সিই একটি একক ইঞ্জিনের ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, যা আকাশযুদ্ধের পাশাপাশি স্থল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ও নজরদারির কাজেও ব্যবহারযোগ্য। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে পাকিস্তানের ব্যবহৃত জে-১০সিই ও পিএল-১৫ দূরপাল্লার আকাশযুদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্রের কথিত সাফল্য বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে জাহেদুর রহমান ইঙ্গিত দিয়েছেন—যদিও ওই সংঘাতে প্রকৃত ফলাফল নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের বক্তব্যে যথেষ্ট গরমিল রয়েছে।
দেশের মাটিতেই সামরিক ড্রোন কারখানা
শুধু যুদ্ধবিমান কেনাই নয়, নিজস্ব মাটিতে সামরিক ড্রোন (ইউএভি) উৎপাদনের সক্ষমতাও তৈরি করছে বাংলাদেশ। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিইটিসি ইন্টারন্যাশনালের প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকার-থেকে-সরকার (জি২জি) চুক্তির আওতায় বগুড়ায় একটি ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপন করছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। প্রযুক্তি হস্তান্তরের এই প্রকল্প প্রস্তাব ইতিমধ্যে অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি বিমান ওভারহলিং কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবও দিয়েছে চীন।
কারখানাটি ভারত সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে বাড়তি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে রয়টার্সের একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই সুযোগে ঢাকায় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে চীন—দেশটির রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন নিয়মিত বাংলাদেশি রাজনীতিক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, যেখানে অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে বহু বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রসঙ্গও উঠে আসছে।
পাকিস্তানের সঙ্গেও বাড়ছে সামরিক যোগাযোগ
চীনের পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্ক গভীর হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমানবাহিনী প্রধানদের মধ্যে বৈঠকে চীন-পাকিস্তানের যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনাসহ প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মহাকাশ-প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিছক সমরাস্ত্র সংগ্রহ নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন ও আঞ্চলিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশও। তুলনামূলক কম খরচে আধুনিক সক্ষমতা মিললেও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও বৈদেশিক সম্পর্কের জটিলতাও মাথায় রাখতে হচ্ছে ঢাকাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা তৎপরতা
বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে স্পষ্টত উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, চীনা সমরাস্ত্রের বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বাংলাদেশকে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। বিনিয়োগ পরিবেশ ও রোহিঙ্গা সহায়তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ে ‘কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা সংলাপ’ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে ‘কৌশলগত সংলাপ’ শিগগিরই শুরুর বিষয়ে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের সুযোগে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে চীন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশে বেইজিংয়ের প্রভাব ঠেকাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে যুদ্ধবিমান ও ড্রোন কারখানার মতো প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তগুলো এখন নিছক সামরিক আধুনিকায়নের সীমা ছাড়িয়ে চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত ঘিরে বাংলাদেশের বৃহত্তর কূটনৈতিক ভারসাম্যের কৌশলেরই অংশ হয়ে উঠেছে।















মন্তব্য করুন