আন্তর্জাতিক ডেস্ক, সিনিয়র সম্পাদক ঢাকা, ৩১ আগস্ট ২০২৬
জর্ডানে অবস্থিত দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে সমন্বিত হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। রোববার (৩০ আগস্ট) রাতে ইরানের লারাক দ্বীপে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে সোমবার এই পাল্টা হামলা চালানো হয় বলে দাবি করেছে বাহিনীটি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজের বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
কী দাবি করছে আইআরজিসি
আইআরজিসির ভাষ্যমতে, জর্ডানের কিং হুসেইন ও আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানা হয়েছে, যেখানে ধ্বংস করা হয়েছে “প্রযুক্তিগত ও রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো” এবং যেসব স্থানে “শত্রুর যুদ্ধবিমান” মোতায়েন ছিল। বাহিনীটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, হরমুজ প্রণালির ওপর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করার যে কোনো চেষ্টা আগ্রাসন বা অপরাধ দিয়ে থামানো যাবে না, বরং প্রতিটি হামলারই আরও ভয়াবহ জবাব দেওয়া হবে।
দাবি ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক
তবে আইআরজিসির “ভারী ক্ষয়ক্ষতি” ঘটানোর দাবির বিপরীতে মাঠের প্রতিবেদনগুলো ভিন্ন চিত্র দিচ্ছে। জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্রের সবক’টিই তারা প্রতিহত করেছে—এমনটাই প্রচার করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ছোড়া প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্রই আকাশপথে প্রতিহত করা হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, তেহরানের প্রচারিত “ভারী ক্ষতি”র বিবরণ এবং ওয়াশিংটনের দাবি করা “প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত”—এই দুই বয়ানের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক থেকে যাচ্ছে, যা যাচাই করার মতো স্বাধীন সূত্র এখনো সীমিত।
যেভাবে শুরু: লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা
এই সংঘাতের সূত্রপাত রোববার, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত ইরানের লারাক দ্বীপে আইআরজিসির দুটি রকেট লঞ্চার লক্ষ্য করে হামলা চালায়। সেন্টকমের বিবৃতি অনুযায়ী, আইআরজিসির একটি মাইন-স্থাপনকারী বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি তৈরি করছিল বলে সন্দেহ হওয়ায় প্রতিরোধমূলক ও নির্ভুল এই হামলা চালানো হয়। (এখানে স্পষ্ট করা দরকার—হামলাটি ছিল প্রণালিতে পানির নিচে মাইন পাতার প্রস্তুতি নেওয়া ইরানি বাহিনীর বিরুদ্ধে, কোনো মার্কিন জাহাজের ওপর ইরানি হামলা প্রতিহত করতে নয়, যেমনটা কোনো কোনো প্রতিবেদনে বিভ্রান্তিকরভাবে এসেছে।)
আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে, রোববারের এই হামলায় তাদের কয়েকজন যোদ্ধা ও বেসামরিক বাসিন্দা হতাহত হয়েছেন। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের অনানুষ্ঠানিক হিসাবে, হামলায় অন্তত দুজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবির বরাতে জানা গেছে, দায়ীদের “উপযুক্ত জবাব” দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আইআরজিসি।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: ছয় মাসের যুদ্ধ ও নতুন সর্বোচ্চ নেতা
সোমবারের এই হামলা-পাল্টাহামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের সবশেষ অধ্যায় এটি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন; একই হামলায় প্রাণ হারান তাঁর স্ত্রী, মা ও এক বোনও। এর কিছুদিন পর, গত মার্চে আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয় এবং আইআরজিসিসহ সশস্ত্র বাহিনী তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। বাবার চেয়েও কট্টরপন্থী বলে পরিচিত ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি ঐতিহ্যগতভাবে জনসমক্ষে খুব কম উপস্থিত হতেন, আর এখনো তাঁকে নিয়মিত প্রকাশ্যে দেখা যায় না—ফলে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর প্রকৃত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও নেতৃত্বের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গণমাধ্যমে জল্পনা অব্যাহত রয়েছে।
এই দীর্ঘায়িত যুদ্ধের মধ্যেই ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক চাপে পড়েছে। মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে দেশটি ধুঁকছে বলে সপ্তাহান্তে স্বীকার করেছেন খোদ মোজতবা খামেনি। এরই মধ্যে ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ পালন উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তেহরান। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে গত সপ্তাহে গড়ে দৈনিক প্রায় ৬৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে বলে তেল ট্যাংকার পর্যবেক্ষক সংস্থা ট্যাংকারট্র্যাকার্সের তথ্যে উঠে এসেছে—যা দেখাচ্ছে, প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ ঠিক কতটা অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ দুই পক্ষের কাছে।
এখন কী
জর্ডানভিত্তিক এই হামলা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের একটি মিত্র দেশের ভূখণ্ডে আঘাত হানার ঘটনা হওয়ায় ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়ার দিকেই এখন সবচেয়ে বেশি নজর সবার। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালি ঘিরে পাল্টাপাল্টি এই সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে, আর মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও থেকেই যাচ্ছে।















মন্তব্য করুন