বৈরুত/দক্ষিণ লেবানন, ২২ আগস্ট ২০২৬ (শনিবার)
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি কাঠামো বলবৎ থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননে ফের ব্যাপক গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। শনিবার ভোররাতে তায়ার (টায়ার) জেলার আল-মানসুরি, বাইত আল-সাইয়াদ ও মাজদাল জৌনসহ একাধিক শহর-গ্রামে ভারী কামানের গোলা ও বিমান হামলা চালানো হয়, যাতে এলাকাগুলোর ব্যাপক অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছে লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ)।
এনএনএর বরাত দিয়ে আল-জাজিরা জানিয়েছে, একই রাতে নাবাতিয়েহ প্রদেশের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ আলি আল-তাহের পাহাড়চূড়ায়ও দুই দফা বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি যুদ্ধবিমান। এ ছাড়া দেইর সিরিয়ান, দোহা কাফর রুম্মান এলাকা এবং আল-মানসুরির আশপাশেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। হাদ্দাথা, বাইত ইয়াহুন ও আইতা আল-জাবাল গ্রামেও একই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের তথ্য দিয়েছে সংস্থাটি, পাশাপাশি নিকটবর্তী উপত্যকাগুলো লক্ষ্য করে মেশিনগানের গুলিবর্ষণেরও খবর মিলেছে। দক্ষিণ লেবাননের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলীয় শহর-গ্রামের আকাশে সারা রাত ধরে ইসরাইলি ড্রোন উড্ডয়নের কথাও জানিয়েছে এনএনএ।
তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলায় কোনো হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি। তবে এনএনএর ভাষ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে অক্ষত অবস্থায় নেই কোনো ঘরবাড়িই।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: প্রেসিডেন্ট আউন-মেলোনির ফোনালাপ
হামলার প্রেক্ষাপটেই শুক্রবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা। আলোচনায় উঠে আসে ইসরাইলি আগ্রাসনের ধারাবাহিকতা এবং লেবানন-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল আলোচনায় সম্মত হওয়া কাঠামো চুক্তি বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গ।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে আল-জাজিরা জানিয়েছে, চলতি বছরের ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক সংঘাতে ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৪ হাজার ৩৪৮ জন নিহত ও ১২ হাজার ৩০০-র বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। আর ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া বৃহত্তর সংঘাতের হিসাবে এ পর্যন্ত অন্তত ৮ হাজার ৯১৫ জন নিহত ও ৩০ হাজার ৫৪০-র বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও কেন অব্যাহত হামলা
চলতি বছরের ২ মার্চ হিজবুল্লাহর রকেট হামলার জবাবে লেবাননের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরাইল। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১৬ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা দ্রুতই ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে ৪ জুন ও ২৬ জুন—দুই দফায় নতুন করে যুদ্ধবিরতি ও কাঠামো চুক্তি সম্পাদিত হয় ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায়। ২৬ জুনের কাঠামো চুক্তি অনুযায়ী, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার বিনিময়ে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের একটি পরিকল্পনা নির্ধারিত হয়। তবে চুক্তি সত্ত্বেও দুই দেশ প্রযুক্তিগতভাবে এখনও যুদ্ধাবস্থাতেই রয়েছে।
এই কাঠামোর আওতায় যুদ্ধবিরতি “মোটামুটি বহাল” থাকলেও ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে রেখেছে এবং পর্যায়ক্রমে বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা। জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী বাহিনী ইউনিফিল ইতিমধ্যে ইসরাইলের পক্ষ থেকে ১০ হাজারের বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে সাড়ে সাত হাজারের বেশি আকাশসীমা লঙ্ঘন ও আড়াই হাজারের বেশি স্থল লঙ্ঘন।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার ধারাবাহিকতা
গত দুই সপ্তাহে দক্ষিণ লেবাননে সংঘর্ষ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত ১৫ আগস্ট যুদ্ধবিরতি-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে, যেখানে আনসার ও দেইর আজ-জাহরানি গ্রামে ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত ও ১৯ জন আহত হন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আনসারে নিহত সাতজনের মধ্যে তিনটি শিশু ও দুই নারী ছিলেন। ইসরাইলি বাহিনীর দাবি, আলি আল-তাহের পাহাড়চূড়ায় হিজবুল্লাহর হামলায় তিনজন ইসরাইলি সেনা গুরুতর আহত হওয়ার প্রতিক্রিয়াতেই এই পাল্টা হামলা চালানো হয়। পরে ইসরাইল স্বীকার করে, হামলায় বেসামরিক ব্যক্তিরাও নিহত হয়েছেন, তবে হিজবুল্লাহই ইচ্ছাকৃতভাবে সামরিক স্থাপনায় নারী-শিশুদের অবস্থান করিয়েছিল বলে অভিযোগ তোলে তারা।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম ইসরাইলি এই ভাষ্য প্রত্যাখ্যান করে ১৫ আগস্টের উত্তেজনাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক আখ্যা দেন এবং বলেন, লেবাননের ভূখণ্ডে সামরিক অবকাঠামো (যদি থেকেও থাকে) মোকাবিলার দায়িত্ব একচেটিয়াভাবে লেবাননের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তথা সেনাবাহিনীর, ইসরাইলের নয়। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে জানায়, ইসরাইলি হামলার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে, পাশাপাশি লেবানন সরকারকে ইসরাইলের সঙ্গে চলমান আলোচনা বন্ধ করারও আহ্বান জানায় সংগঠনটি।
এরপর থেকে গত এক সপ্তাহে একাধিকবার মাজদাল জৌন, আল-মানসুরি, আলি আল-তাহের পাহাড়, দাবশা এলাকা, নাবাতিয়েহ আল-ফাওকা ও কেফর রুম্মানে বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণের খবর দিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, যার মধ্যে রয়েছে আনাদোলু এজেন্সি, আরব নিউজ (আশারক আল-আওসাত), মিডল ইস্ট মনিটর ও শাফাক নিউজ। আগস্টের শুরুতে মাজদাল জৌনে পুঁতে রাখা বিস্ফোরকে দুই ইসরাইলি সেনা নিহত ও চারজন আহত হওয়ার ঘটনার জেরে ইসরাইল নতুন করে অভিযান জোরদার করে বলে জানিয়েছে শাফাক নিউজ।
রোম আলোচনা ও হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণ বিতর্ক
এই সহিংসতার মধ্যেই ৪ আগস্ট থেকে রোমে লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে নতুন দফা আলোচনা শুরু হয়েছে, যেখানে লেবাননের প্রতিনিধিদল মূলত ইসরাইলি হামলা বন্ধ এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে জোর দিচ্ছে। তবে হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাঈম কাসেম লেবানন কর্তৃপক্ষকে এই আলোচনা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এতে কেবল লেবাননের পক্ষ থেকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালের আগস্টে লেবানন সরকার হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে সেনাবাহিনীকে পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দিলেও হিজবুল্লাহ তা ‘গুরুতর পাপ’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিল, আর ইসরাইলি প্রতিরোধের অস্ত্র ত্যাগ করাকে দুর্বল করে ফেলার শামিল বলে অভিহিত করেছিল সংগঠনটি।
আঞ্চলিক ঝুঁকি: ইরানের হুঁশিয়ারি
দক্ষিণ লেবাননের উত্তেজনা এখন কেবল দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে সীমাবদ্ধ নেই। লেবাননের আল-জাদিদ টেলিভিশনের বরাতে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আলি আল-তাহের এলাকায় ইসরাইলি হামলা হলে তা সরাসরি ইরানকে সংঘাতের বৃত্তে টেনে আনতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে বার্তা দিয়েছে তেহরান। বিশ্লেষকদের মতে, আলি আল-তাহের পাহাড়চূড়া তাই কেবল স্থানীয় সংঘর্ষের কেন্দ্র নয়, বরং তা যেকোনো মুহূর্তে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারে এমন একটি স্পর্শকাতর বিন্দু হয়ে উঠেছে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: ধ্বংসের হিসাব
জাতিসংঘ সমর্থিত পরিসংখ্যান ও বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা এই সংঘাতে লেবাননে ৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নিহত হয়েছেন ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-নভেম্বরে, যখন ইসরাইলি সরিয়ে যাওয়ার সতর্কবার্তার মুখে ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। ওই সময়ের তীব্র লড়াইয়ে হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের প্রধান হাসান নাসরুল্লাহসহ সংগঠনটির বেশিরভাগ শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব নিহত হন, যা সংগঠনটির সামরিক সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দেয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে লেবাননের প্রয়োজন প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার।
ডেস্কের পর্যবেক্ষণ
সব সূত্র মিলিয়ে যে চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো—আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি বলবৎ থাকলেও বাস্তবে দক্ষিণ লেবাননে প্রায় প্রতি রাতেই কোনো না কোনো মাত্রার ইসরাইলি সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইলের যুক্তি, হিজবুল্লাহর অবশিষ্ট সামরিক অবকাঠামো ও সদস্যদের লক্ষ্য করেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে, আর যতক্ষণ না হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্র হচ্ছে ততক্ষণ সেনা প্রত্যাহারও হবে না। বিপরীতে লেবানন সরকার ও হিজবুল্লাহ উভয়ের অবস্থান হলো, এই হামলা যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং তা স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর মাঝে হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্নে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং আলি আল-তাহেরকে ঘিরে ইরানের সরাসরি হুঁশিয়ারি—এই দুটি বিষয় সংকটকে নিছক দ্বিপক্ষীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে আঞ্চলিক অস্থিরতার নতুন সম্ভাব্য কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।












মন্তব্য করুন