মূল কনটেন্টে যান
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার ১২ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ৩০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
অনুসন্ধানী ও সর্বশেষ বাংলা সংবাদ
সর্বশেষ
ইবনে মাহবুব সিনিয়র লেখক

লোডশেডিংয়ের দেশে সৌর শক্তির সম্ভাবনা

লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিলের দুর্ভোগের মধ্যে লেখক সৌর বিদ্যুৎকে বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন। রুফটপ সোলার, সোলার হোম সিস্টেম, ভাসমান প্রকল্প ও সৌরচালিত সেচ পাম্পের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে; চীন, জার্মানি, জাপান ও মরক্কোর অভিজ্ঞতা থেকে শেখার পরামর্শও আছে। জমির সংকট, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা, যন্ত্রাংশের দাম, দুর্নীতি…

উপ-সম্পাদকীয়প্রকাশ: ৪ মিনিটে পড়ুন
বাড়ির ছাদে স্থাপিত সৌর প্যানেল
ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ চাহিদার একাংশ মেটানো সম্ভব

গভীর রাত। ঘুমে বিভোর শহর-গ্রাম। হঠাৎ লোডশেডিং। গরমে সবাই ঘেমে-নেয়ে একাকার। অন্ধকারে ঢুলু ঢুলু চোখে হাতপাখা চালিয়ে ক্লান্ত অনেকের শরীর। এ দৃশ্য দেশের নিয়মিত চিত্র। গ্রামে কিছুটা নির্মল বাতাস মিললেও কংক্রিটের শহরে লোডশেডিংয়ের রাত দুঃস্বপ্নের মতো। এর মধ্যে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল দুর্ভোগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তীব্র লোডশেডিং আর ক্রমবর্ধমান মিটার চার্জ বলে দিচ্ছে, বিদ্যুতের বিকল্প উৎস এখন আশু প্রয়োজন। সেদিক বিবেচনায় সৌর বিদ্যুতের তুলনা নেই।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গ্যাস, কয়লা, জ্বালানি তেল, জলবিদ্যুৎ এবং আমদানি-নির্ভর বিদ্যুতের মাধ্যমে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শেষ হয়েছে, তবে কারিগরি জটিলতায় এখনো জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হয়নি। এসব উৎসের অনেকটাই ব্যয়বহুল এবং পরিবেশ সুরক্ষায় অনুপযোগী। অন্যদিকে সূর্যের আলো অফুরন্ত শক্তির আধার। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় বছরে প্রচুর সূর্যালোক পাওয়া যায়। এই আলো থেকে সৌর বিদ্যুৎকে এগিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবে এবং পরিবেশ সুরক্ষায়ও অবদান রাখতে পারবে।

দেশে কিছু উদ্যোগ ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসার লক্ষ্য রয়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে এই হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও ঠিক করা হয়েছে। বাড়ি, কারখানা, বাণিজ্যিক ভবন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল বসানোর (রুফটপ সোলার) জন্য উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। সোলার হোম সিস্টেমও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত ও বিদ্যুৎবিহীন অঞ্চলের মানুষকে সৌর বিদ্যুতের আওতায় আনতে এই পদ্ধতি ব্যবহার হয়।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হরেক রকম জলাশয় আছে। এগুলো কাজে লাগিয়ে ভাসমান সৌর বিদ্যুৎ (ফ্লোটিং সোলার) প্রকল্প নিয়েও গবেষণা চলছে। জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশ বাড়াতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় আকারের সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর অন্যতম চীন। বড় সৌর পার্ক এবং সৌর প্যানেল ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে তাদের কাছ থেকে শেখা যেতে পারে। শিল্প কারখানা, বাড়ি ও অফিসের ছাদকে কাজে লাগিয়ে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে জার্মানি সুখ্যাতি অর্জন করেছে। তৃণমূল পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও তাদের জুড়ি মেলা ভার। জমির স্বল্পতা বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। সেদিক বিবেচনায় জাপান আমাদের জন্য বড় শিক্ষা হতে পারে, কারণ রুফটপ ও ভাসমান স্থাপনায় সৌর বিদ্যুতের ব্যবহারে তারা সুনাম কুড়িয়েছে। উষর কিংবা কম উৎপাদনশীল জমি ব্যবহার করে সৌর বিদ্যুৎ উন্নয়নে মরক্কোও আমাদের জন্য উৎকৃষ্ট মডেল।

সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও বেসরকারি উদ্যোগ সৌর বিদ্যুৎ প্রসারে শক্তিশালী সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। বাড়ির ছাদে কিংবা ঘরের চালে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব। ছোট পরিবারের জন্য সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, চার্জ কন্ট্রোলার ইত্যাদি মিলিয়ে ৩০-৩৫ হাজার টাকার মধ্যে কেনা যাচ্ছে। মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুলসহ ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন করলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ অনেকটা কমবে।

কৃষিতেও বিদ্যুতের চাহিদা কম নয়। দেশের মোট উৎপাদিত খুচরা বিদ্যুতের প্রায় ২ দশমিক ৮১ শতাংশ ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজ ও সেচ পাম্পে। বোরো ও শুষ্ক মৌসুমে সেচের কারণে গ্রিড বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। ২০২৫ সালের সেচ মৌসুমে এই অতিরিক্ত সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। দেশে বিদ্যুৎচালিত অনুমোদিত সেচ সংযোগ প্রায় ৪ দশমিক ৯৮ লাখ। অথচ সংখ্যার বিচারে প্রায় ৮০ শতাংশ সেচযন্ত্র এখনো ডিজেলচালিত, যা ফসল উৎপাদনের ব্যয় বাড়াচ্ছে। দেশের কৃষি উৎপাদন খরচের প্রায় ৪৩ শতাংশ ব্যয় হয় শুধু সেচে। ডিজেল ও গ্রিড বিদ্যুতের উচ্চ খরচের কারণে সরকার সেচ খাতে সৌর বিদ্যুতের সম্প্রসারণ করছে। ইতিমধ্যে ৪ থেকে ৫ হাজার সৌরচালিত সেচ পাম্প চালু আছে, যা থেকে প্রায় ৬৫-৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে এবং গ্রিডের ওপর চাপ কমাচ্ছে। কৃষকেরা সৌরচালিত পাম্প ব্যবহার করলে জ্বালানি খরচ কমবে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকিও অনেক কমে যাবে।

নতুন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্যও সৌর বিদ্যুৎ নতুন দিগন্তের দ্বার খুলেছে। সোলার প্যানেল স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যাটারি, ইনভার্টারের মতো যন্ত্রাংশ নিয়ে ব্যবসা তাঁদের জন্য সম্ভাবনাময়। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কর্মসংস্থান, দুই ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হবে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ৫৩৯ গিগাওয়াট (GW) নতুন সৌর বিদ্যুৎ সক্ষমতা স্থাপিত হয়েছে, যা এক বছরে সর্বোচ্চ বৃদ্ধির অন্যতম রেকর্ড। তাদের আরেক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে নতুন যুক্ত হওয়া নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতার তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি ছিল সৌর বিদ্যুৎ। সংস্থাটির ২০২৪ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪-২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে মোট প্রায় ৪,৬০০ গিগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ আসবে সৌর ফটোভোলটাইক (পিভি) থেকে। এসব পরিসংখ্যান বলছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে সৌর বিদ্যুৎ স্থায়ী জায়গা করে নেবে। সারা বিশ্বে যখন সৌর বিদ্যুৎ জ্বালানি সংকট মোকাবিলার উদীয়মান সম্ভাবনা হিসেবে জানান দিচ্ছে, তখন আমাদের মতো দেশের ঢিলেমি কাম্য নয়।

বাংলাদেশ ছোট দেশ, তার ওপর শত সমস্যাও বিদ্যমান। সৌর বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভূমির সংকট, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা, যন্ত্রাংশের উচ্চ মূল্য, দুর্নীতি ও ঘন জনবসতির মতো সমস্যা সৌর বিদ্যুতের উন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু এসব প্রতিবন্ধকতা অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে না। ফ্রেডরিক ডগলাসের ভাষায়, “সংগ্রাম না থাকলে অগ্রগতি নেই”। যেকোনো কিছুর অগ্রগতিতে চেষ্টা-সংগ্রাম পূর্বশর্ত।

সৌর বিদ্যুতের প্রসারে আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। প্রতিদিন সূর্যের আলো যেন আমাদের কানে কানে বলে যায়, আমাকে আর কতদিন তোমরা অবহেলা করবে? সৌর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একদিকে যেমন আমরা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারি, তেমনি পেতে পারি কার্বনমুক্ত, পরিবেশবান্ধব নতুন বাংলাদেশ। তাই আর অবহেলা, অসচেতনতা নয়। আজকের ছোট ছোট পদক্ষেপই পারে আগামী দিনের জ্বালানি-স্বনির্ভর, টেকসই ও দূষণমুক্ত দেশ গড়তে।

এই লেখার মতামত লেখকের নিজস্ব। এটি মিহা নিউজের সম্পাদকীয় অবস্থানের প্রতিফলন নয়।

লেখাটির সঙ্গে আপনি কতটা একমত?

ইবনে মাহবুব

সিনিয়র লেখক

এই প্রতিবেদনে কোনো তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে সংশোধনী নীতি অনুযায়ী আমাদের জানান।

মন্তব্য (১)

মতামতের জবাবে মতামত দিন, সম্মান রেখে।

সারাংশ

লোডশেডিংয়ের দেশে সৌর শক্তির সম্ভাবনা

লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিলের দুর্ভোগের মধ্যে লেখক সৌর বিদ্যুৎকে বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন।
রুফটপ সোলার, সোলার হোম সিস্টেম, ভাসমান প্রকল্প ও সৌরচালিত সেচ পাম্পের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে; চীন, জার্মানি, জাপান ও মরক্কোর অভিজ্ঞতা থেকে শেখার পরামর্শও আছে।
জমির সংকট, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা, যন্ত্রাংশের দাম, দুর্নীতি ও ঘন জনবসতিকে প্রধান বাধা বলা হয়েছে।
সবার সম্মিলিত উদ্যোগে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন লেখক।

#MeehaNews #SolarEnergy #Bangladesh #LoadShedding #RenewableEnergy

আজ

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ৩০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি

পাঠের রং

এখন যা বেশি খোঁজা হচ্ছে

যেকোনো পাতায় / চাপলেই খোঁজ খুলবে। ফলাফলে বিভাগ, তারিখ ও ধরন দিয়ে ছাঁকতে পারবেন।