-
ইতিহাসের কিছু উপাদান থাকে লুকিয়ে, অন্ধকারে মুখ থুবড়ে। ইতিহাসের এই লুপ্ত উপাদান কালের মাটি খুঁড়ে বের করতে হয়। নব আবিষ্কৃত ইতিহাসও অনেক সময় অপাংক্তেয় হয়ে উঠতে পারে যথাযথ পরিবেশনার অভাবে। এই ব্যাপারটি আরো সত্য হয়ে ওঠে ‘আমেরিকা আবিষ্কারে মুসলমান’ কথাটি বললে। মুসলিম স্পেনের পতন, স্পেন থেকে সম্পূর্ন রূপে মুসলমানদের নিশ্চিহ্নকরন, আধুনিক আবিষ্কার ও ইউরোপীয়দের সাগর জয়- এসব কারনে আমেরিকা আবিষ্কারের সঠিক ইতিহাসটা অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে যুগের পর যুগ। গত এক শতাব্দী ধরে এ নিয়ে শুরু হয়েছে অল্পবিস্তার গবেষণা, ইতিহাস অনুসন্ধান। ব্যারি ফেল, আলেকজান্ডার উথেনিউ, আইভান ভন সার্টিমো, ইউসুফ ম্রুয়েহ, আব্দুররাজ্জাক আল মাহির, ইয়াহিয়া জেঘুডি প্রমুখ ইতিহাস বেত্তারা আমেরিকা আবিষ্কারে মুসলমানদের অবদান প্রমাণিত করতে পারলেও আপামর মুসলিম বিশ্বের দারে দারে এই সত্য পৌঁছেছে অনেক পরে, তায়েপ এরদোগানের সাহসী বক্তব্যের মাধ্যমে। আমেরিকা আবিষ্কার নিয়ে ঐতিহাসিকদের লেখা গুলো বাংলাভাষাভাষী দের কাছে উপস্থাপনা করতে এই ঐতিহাসিক পরিবেশনা- ‘আমেরিকা আবিষ্কারে মুসলমান’। -অনুবাদক
(১৯৯৬ সাল ছিল মুসলমানদের আমেরিকা আবিষ্কারের এক সহস্রাব্দ উদযাপনের বছর। (৯৯৬-১৯৯৬) এ উপলক্ষ্যে গঠন করা হয় প্রস্তুতিমূলক আন্তর্জাতিক উদযাপন কমিটি। প্রবন্ধটি এই কমিটির সৌজন্যে প্রকাশিত।)
কলম্বাসের কমপক্ষে ৫শ’ বছর পূর্বে মুসলমানরা মুসলিম স্পেন ও উত্তর আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে- এর পক্ষে দলীল দস্তাবেজ বেশুমার। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি একটু স্পষ্ট হয়, দশ শতকের মাঝামাঝিতে উমাইয়া খলিফা তৃতীয় আব্দুর রহমানের (৯২৯-৯৬১) সময় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কয়েকজন মুসলমান নাবিক স্পেনের দেলবা বন্দর (প্যালোস) থেকে কুয়াশা ঘেরা এক অন্ধকার মহাসাগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। অনেকদিন পর বিস্ময়কর এক রহস্যময় দ্বীপ দেশ থেকে তারা অনেক মূল্যবান সম্পদ নিয়ে দেশে ফেরে। এর পাশাপাশি মুসলিম বংশোদ্ভূত নাবিকদের সাথে নিয়ে কলম্বাস ও পরবর্তী স্প্যানিশ অভিযাত্রীদের নতুন পৃথিবী অভিযানের প্রমানও যথেষ্ঠ পরিমাণে রয়েছে। স্প্যানিশ নিপীড়ন আইন (ইনকুইজিশন) চালু হওয়ার অল্প কিছুদিন পূর্বে ১৪৯২ সালে খ্রিস্টানদের নিকট মুসলিম স্পেনের শেষ দুর্গ গ্রানাডার পতন হয়। এই ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে অধিকাংশ অ-খ্রিস্টানরা স্পেন থেকে পলায়ন করেছিল, নতুবা ক্যাথোলিক ধর্ম গ্রহণ করেছিল। ১৫৫০ সালের পূর্বেও স্পেনে মুসলমানদের অস্তিত্ব ছিল- কমপক্ষে দু’টি দলিল এমন প্রমান দিচ্ছে। ১৫৩৯ সাল নাগাদ স্পেন রাজ পঞ্চম চার্লস পুড়িয়ে মারা মুসলমানদের প্রপৌত্র, পরবর্তী বংশধরদের ওয়েস্ট ইন্ডিজ গমনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করে। ডিক্রীটি ১৫৪৩ সালের দিকে সংশোধন করে নিষেধাজ্ঞার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়া হয়। সাগর পারের সকল স্প্যানিশ ভূখন্ড থেকে মুসলিম উচ্ছেদের ব্যাপারে জারী করা হতে থাকে একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা। আমেরিকায় মুসলিম আগমনের এরকম অনেক প্রমাণাদি বিদ্যমান রয়েছে। নিম্নের আলোচনায় তারই একটি সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করা হবে।
ঐতিহাসিক প্রমাণাদিঃ
১- মুসলিম ঐতিহাসিক ও ভূগোলবেত্তা আবুল হাসান আলী ইবনে আল হুসাইন আল মাসুদি (জীবনকাল ৮৭১-৯৫৭ সাল) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মুরুজ-আজ-জাহাব ওয়া মায়াদিনুল জাওহারে’ (স্বর্নভূমি অ রত্ন খনি) মুসলমানদের আমেরিকা আবিষ্কারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি লেখেন, মুসলিম স্পেনের খলিফা আবদুল্লাহ ইবনে মোহাম্মদের (শাসনকাল ৮৮৮-৯১২ সাল) সময় মুসলিম নাবিক খাসখাস ইবনে সাইদ ইবনে আসওয়াদ ৮৮৯ সালের দিকে কর্ডোবার দেলবা বা প্যালস বন্দর থেকে আটলান্টিকের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। আটলান্টিক পার হয়ে তিনি এক অজানা দেশে যেয়ে পৌঁছান, যেটাকে তিনি নিজ ভাষায় ‘আরদে মাজহুলা’ বলেছেন। সেখান থেকে অকল্পনীয় মূল্যবান সম্পদ নিয়ে তিনি দেশে ফেরেন। আল মাসুদি তার নিজ হাতে আঁকা মানচিত্রে কুয়াশা ঘেরা অন্ধকারাচ্ছান্ন মহাসাগরের একটা বিশাল এলাকাকে আরদে মাজহুলা (আমেরিকা) বলে উল্লেখ করেছেন।

২- অন্য একজন মুসলিম ঐতিহাসিক আবু বকর ইবনে উমার আল গুতিয়্যা আরেকটি ঘটনার ইঙ্গিত দেন। স্পেনীয় মুসলিম খলিফা দ্বিতীয় হিসামের শাসনামলে (৯৭৬-১০০৯ সাল) ৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারীতে অন্য একজন মুসলিম নাবিক ইবনে ফারুখ গ্রানাডার কাদেশ থেকে আটলান্টিকের দিকে যাত্রা শুরু করেন। পতিমধ্যে তিনি গান্ডো নামক একটি দ্বীপে (গ্রেট ক্যানারী দ্বীপপুঞ্জ) অবতারন করে সেখানকার রাজা গুয়ানারিগার সাথে সাক্ষাৎ করেন। এখান থেকে আরো পশ্চিমে তিনি ক্যাপারিয়া ও প্লুইটানা নামক আরো দুটি দ্বীপ দেখতে পান। ওই সালের মে মাসের দিকে তিনি স্পেনে ফিরে আসেন।
৩- কলম্বাস স্পেনের প্যালোস বন্দর (দেলবা) থেকে গোমেরা বা ক্যানারী দ্বীপ পুঞ্জের দিকে নৌযাত্রা শুরু করেন। আরবিতে গোমেরা অর্থ হল ছোট্ট মশাল। সেখানে তিনি বিট্রিজ বোবাদিল্লা নাম্নী দ্বীপের প্রধান ক্যাপ্টেনের কন্যার প্রেমে পড়েন। এখান উলেখ্য যে, বোবাদিল্লা স্পেনে মুসলিমদের একটি পারিবারিক নাম, যা আরবী আবু আবদিল্লা’র অপভ্রংশ। তা সত্বেও বোবাদিল্লা গোত্রটির কথা সহজে এড়িয়ে যাওয়া চলেনা। অন্য একজন রয়্যাল কমিশনার বোবাদিল্লা ফ্রান্সিসকোর নাম পাওয়া যায়, যাকে কলম্বাস শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় সান্তা ডোমিনিগো থেকে স্পেনে নিয়ে আসেন ১৫০০ সালের নভেম্বরের দিকে। এই বোবাদিল্লা পরিবারটি সেভিলের আব্বাদিদ রাজবংশের (১০৩১-১০৯১) সাথে অত্যান্ত ঘনিষ্ঠ সুত্রে আবদ্ধ। ১২ অক্টোবর ১৪৯২ সালে কলম্বাস বাহামার একটি ছোট্ট দ্বীপে অবতরণ করেন। স্থানীয় রেডইন্ডিয়ানরা একে বলত গুয়ানহানী। কলম্বাস এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন সান স্যালভেদর। পশ্চিম আফ্রিকার মান্দিকান ও আরবী ভাষার মিশ্র রূপ হল গুয়ানহানী। গুয়ানা বা ইখওয়ানা অর্থ হল ভ্রাতৃগণ। আর হানি একটি আরবী নাম। গুয়ানহানীর এখন সম্মিলিত অর্থ দাঁড়ায় হানী ভ্রাতৃগণ। কলম্বাস পুত্র ফার্দিনান্দ কলম্বাস বলেন, তার পিতা হন্ডুরাসে কৃষ্ণাঙ্গ লোকের দেখা পেয়েছেন। ‘কেপ গ্রাসিওস অ্যা ডাওস থেকে আরো পূর্বে পন্টি কাভিনাস এলাকায় যেসব লোক বাস করত, তাদের গায়ের রঙ একেবারই কালো’। একই সময় ওই এলাকায় আলমামি নামের একটা মুসলিম আদিবাসি গোত্র বাস করত। মান্দিকান ভাষায় আলমামী শব্দটি আরবী আল ইমামী বা আল ইমামু এর পরিবর্তিত রূপ। এটা একটা পদ মর্যাদা বিশেষ। যিনি নামায পড়ান তাকে এই পদমর্যাদায় ভূষিত করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে সম্প্রদায়ের নেতা, কখনো বা ইমামী মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যকে বুঝায়।

৪- হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বখ্যাত আমেরিকান ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্বিক লেউ ওয়েইনার তার ‘আফ্রিকা অ্যান্ড দ্য ডিসকভারি অব আমেরিকা’ (১৯২০) গ্রন্থে উল্লেখ করেন, কলম্বাসও আমেরিকায় মান্দিকানদের উপস্থিতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। পশ্চিম আফ্রিকার মান্দিকান মুসলিমরা ক্যারিবিয়া, দক্ষিণ, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি তারা কানাডায় ইরোকুইজ ও আলগোনাকুইন ইন্ডিয়ানদের মধ্যে আন্তবিবাহের মাধ্যমে স্থানীয়দের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করে।
খ. ভৌগলিক অভিযানঃ
১- বিখ্যাত মুসলিম ভূগোলবেত্তা ও ঐতিহাসিক আল শারিফ আল ইদ্রিসি তার সমুদ্রাভিজান সম্পর্কিত গ্রন্থ ‘নুজহাতুল মুশতাক ফি ইখতিরাকিল আফাক’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, উত্তর আফ্রিকার একদল নাবিক বর্তমান পর্তুগালের লিসবন বন্দর থেকে কুয়াশাচ্ছান্ন এক অজানা সাগরের (আটলান্টিক মহাসাগর) উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। অজানা এই সাগরের ব্যপ্তি কতটুক সেটাই পরিমাপ করার জন্য এই অভিযান চালানো হয়। তারা শেষ পর্যন্ত এমন এক দ্বীপে পৌঁছে, যেখানে অধিবাসীরা কৃষি কাজ জানত। এমনকি অভিযানের চতুর্থ দিনে আরবী ভাষাভাষী একজন ব্যক্তির সাক্ষাৎও মেলে তাদের সাথে।
২-মুসলিম অভিযাত্রীদের আটলান্টিক পাড়ি দেয়ার পক্ষে দলিল প্রমান দিতে অনেক মুসলিম গ্রন্থে শেখ যাইনুদ্দীন আলী বিন ফাজলুল মাজেনদারানীর অজানা সাগরের ভ্রমনবৃত্তান্তকে রেফারেন্স হিশেবে উপস্থাপন করা হয়। মরক্কোর ষষ্ঠ ম্যারিনিড রাজবংশের রাজা আবু ইয়াকুব সিদি ইউসুফের (শাসন কাল ১২৮৬-১৩০৭ খৃষ্টাব্দ) আমলে ১২৯১ সালের দিকে তিনি দক্ষিণ মরক্কোর তারিফা থেকে রওনা হয়ে ক্যারিবিয়া সাগরের সবুজ দ্বীপে পৌঁছান। পরবর্তী মুসলিম ঐতিহাসিক ও পণ্ডিতরা তার এই আটলান্টিক ভ্রমণের বর্ননা সযত্নে উল্লেখ করেছেন।
৩-অন্যদিকে মালি সুলতানের অজানা সাগর পাড়ি দেয়ার তথ্য উল্লেখ করেন ঐতিহাসিক শিহাবুদ্দীন আবুল আব্বাস আহমাদ বিন ফাজলুল উমারি(১৩০০-১৩৮৪ খ্রিষ্টাব্দ)। ‘মাসালিকুল আবসার ফি মামালিকুল আমসার’ নামক গ্রন্থে তিনি এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
৪- সুলতান মানসা মুসা (শাসন কাল ১৩১২-১৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন পশ্চীম আফ্রিকার বিখ্যাত মান্দিকান সম্রাট। ১৩২৪ সালে সাগর পথে হজ্জ যাত্রায় তিনি কায়রোয় অবতরণ করেন। সেখানকার মামলুক সুলতান আন নাসির নাসির উদ্দীন তৃতীয় মোহাম্মদের দরবারের উপস্থিত পণ্ডিতদের সামনে আটলান্টিক অভিযান সম্পর্কে এক চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তার ভাই সুলতান আবু বকরী (১২৮৫-১৩১২ খ্রিষ্টাব্দ) দুই দুই বার আটলান্টিকের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। সুলতান আবু বকরী ১৩১১ সালের দিকে যখন তার দ্বিতীয় সমুদ্রাভিযান থেকে আর টিম্বাকটুতে ফিরে আসেন নি, তখন তিনি (মানসা মুসা) মালি সম্রাজ্যের সুলতান হন।
৫-কলম্বাস সহ প্রথমদিকের স্প্যানিশ ও পর্তূগীজ নাবিকরা আটলান্টিক পাড়ি দিতে গিয়ে মুসলমানদের ভৌগলিক ও সমূদ্রজ্ঞানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে মুসলিম ব্যবসায়ীদের তৈরি মানচিত্র গুলো এর মধ্যে অন্যতম। এশিয়া ও আফ্রিকার তথ্য সম্বলিত আল মাসুদির মানচিত্রটির কথা না বললেই নয়। তিনি তার বিখ্যাত ‘আখবারুজ্জামান’ বা পৃথিবীর কথা নামক গ্রন্থে এই মূল্যবান মানচিত্রটি সন্নিবেশ করেন। বস্তুত, আটলান্টিক মহাসাগরে কলম্বাসের প্রথম সমূদ্র যাত্রায় মুসলিম বংশোদ্ভূত দুজন সহোদর নাবিক তার সাথে ছিল। একজন পিন্টা জাহাজের ক্যাপ্টেন মার্টিন অ্যালোণসো পিনজোন। অন্যজন তারই সহোদর ভিনসেন্ট ইয়ানেজ পিনজোন নিনা জাহাজের ক্যাপ্টেন। তারা দুজন একাধারে সম্পদশালী এবং সমূদ্র যাত্রার জন্য জাহাজ সাজাতে ওস্তাদ। কলম্বাসের আমেরিকা অভিযানের অগ্রগামী জাহাজ সান্তা মারিয়া তারাই সাগর যাত্রার জন্য প্রস্তুত করেন। বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই তারা এই সহযোগীতা করেছিল। পিনজোন পরিবারটি মরক্কোর ম্যারিনিড রাজবংশের (১১৯৬-১৪৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) সুলতান তৃতীয় আবুযায়ান মোহাম্মদের (শাসন কাল ১৩৬২-১৩৬৬ খ্রিষ্টাব্দ) সাথে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে আবদ্ধ।
গ. আরবী লিপিঃ
১-মানসা মুসার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী মান্দিকান নাবিকরা মিসিসিপি ও অন্যান্য নদীপথের মধ্য দিয়ে গোটা উত্তর আমেরিকা চষে বেড়িয়েছে। নৃবিজ্ঞানীরা এটা প্রমান করতে সক্ষম হয়েছেন। ফোর কর্নার ও অ্যারিজোনার বিভিন্ন শিলালিপি সাক্ষ্য দিচ্ছে, তারা উত্তর আমেরিকায় হাতিও নিয়ে যায়।
২- কলম্বাস তার এক লেখায় স্বীকার করেন, ১৪৯২ সালের ২১ অক্টোবর সোমবার যখন তার জাহাজ কিউবার উত্তর-পশ্চিম উপকূলের জিবারার দিকে যাচ্ছিল, তখন সুন্দর একটি পাহাড়ের চুড়ায় একটি মসজিদ দেখতে পান। কুরআনের আয়াত খচিত ধ্বংস প্রায় মসজিদ ও মিনারের অস্তিত্ব কিউবা ছাড়াও টেক্সাস, নেভাডা ও মেক্সিকোতেও পাওয়া গিয়েছে।
৩- কলম্বাসের দ্বিতীয় অভিযাত্রায় হাইতির এস্প্যানিওলার রেডইন্ডিয়ানরা তাকে এই দ্বীপে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের অস্তিত্বের কথা জানায়। কলম্বাসের আগেই তাদের অস্তিত্ব এখানে ছিল। প্রমান স্বরূপ তারা তাকে আফ্রিকান মুসলমানদের একটি বর্শা উপহার দেয়। এই হাতিয়ারের শীর্ষ ভাগ একধরনে হলুদ ধাতু দ্বারা তৈরি, যা স্থানীয় ইন্ডিয়ানদের কাছে গুয়ানিন নামে পরিচিত। ‘গুয়ানিন’ শব্দটি পশ্চিম আফ্রিকার ভাষা থেকে এসেছে। অর্থ, স্বর্নখাদ। গুয়ানিন বিস্ময়করভাবে আরবী শব্দ ‘গিনা’র সাথে সম্পর্কিত। গিনা অর্থ সম্পদ বা প্রতিপত্তি। কলম্বাস গুয়ানিন স্পেনে নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। তিনি পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারেন, এতে ৫৬.২৫% সোনা, ১৮.৭৫% রূপা ও ২৫% তামা রয়েছে। ঠিক একই ধরনের অনুপাত আফ্রিকার গিনিতে উৎপাদিত ধাতুতেও পাওয়া যায়।
৪-১৪৯৮ সালে কলম্বাস তার তৃতীয় সামুদ্রিক যাত্রায় বর্তমান ত্রিনিদাদে অবতরণ করেন। এরপর তিনি দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ তার দৃষ্টিগোচর হয়। তার নাবিকরা এই মহাদেশের উপকূলে আদিবাসী অ্যামেরিকানদের ব্যবহৃত রঙিন রুমাল পড়ে থাকতে দেখেন। সমান্তরালভাবে বোনা এই সুতি রুমাল গিনিতে ব্যবহৃত মহিলাদের রঙিন স্কার্ফের সাথে মিলে যায়। রঙ, ধরন ও কাজ সব দিক বিবেচনায় দু এলাকার রুমালের সাথে বিশেষ মিল আছে। কলম্বাস এটাকে আলমায়জার বলে উল্লেখ করেছেন। আল মায়জার একটি আরবী শব্দ, যার অর্থ ওড়না ও স্কার্ট জাতীয় পোশাক। মুর বা স্প্যানিশ মুসলমানরা যা পশ্চিম আফ্রিকা (গিনি)থেকে মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগালে আমদানী করে। এই অভিযানে কলম্বাস আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করে রীতিমত বিস্মিত হয়েছেন। এখানকার বিবাহিত মহিলারা একধরনের সুতি পাজামা জাতীয় পোশাক পরিধান করে। আর তাদের শালীনতার চর্চা তার বিস্ময়ের কারন। অন্য একজন স্প্যানিশ বিজেতা হারনান কোর্টে আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের পোশাকের বর্ননা দিতে গিয়ে বলেন, সেখানকার পরে লম্বা ঘোমটা জাতীয় কাপড়। আর পুরুষেরা পরে গাউন। স্প্যানিশ মুসলমানদের পর্দায় যেরকম রেখাচিত্র আঁকা থাকত, এই গাউনেও সে রকম চিত্র পাওয়া যায়। কলম্বাসের ছেলে ফার্দিনান্দ কলম্বাসও একই তথ্য দিয়েছেন। দক্ষিণ স্পেনের গ্রানাডার মুসলমানরা যেরকম গাউন ও শাল ব্যবহার করত, সেই রকম পোশাকও আদিবাসী ইন্ডিয়ানরা পরতো। এমনকি উত্তর আফ্রিকায় ব্যবহৃত শিশুদের দোলনার সাথেও আদিবাসীদের দোলনার বিশেষ মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
৫-কলম্বাসের আগে আমেরিকায় উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে মুসলমানদের আগমন সম্পর্কে সবচে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণাদি উপস্থান করেছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ ব্যারি ফিল। ১৯৮০ সালে তার প্রকাশিত ‘সাগা আমেরিকা’ গ্রন্থে আমেরিকায় কলম্বাস পূর্ব মুসলিম অস্তিত্বের নৃতাত্ত্বিক প্রমানাদি উপস্থাপন করেন। ফিল কয়েকটি মুসলিম স্কুল আবিষ্কার করেন। ভ্যালি অব ফায়ার, অ্যালান স্প্রিং, লোগো মারসিনো, কিহোল, ক্যানিয়ন, ওয়াসি, নেভাডার হিকিসন সামিট পাস, মেসা ভারডা (কলারোডা), নিউ মেক্সিকোর মিমব্রেস ভেলি ও ইন্ডিয়ানার টিপার ক্যানিতে ৭০০ থেকে ৮০০ খ্রিষ্টাব্দে মধ্যে প্রতিষ্ঠিত একাধিক স্কুলের অস্তিস্ত্ব খুঁজে পান। মরুময় পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে পাথরে খোদাই করা শিলালিপিতে তিনি বিভিন্ন লেখা, চিত্র ও চার্ট আবিষ্কার করেন, যা প্রাথমিক ও উচ্চ পর্যায়ের স্কুলের সর্বশেষ ধ্বংসাবশেষ বলে তিনি মনে করেন। এই শিলালিপি লেখা হয়েছিল উত্তর আফ্রিকার সুপ্রাচীন কুফি লিপিতে। এসব লিপিতে স্থান পেয়েছে শিক্ষাদীক্ষা, গনিত, ধর্ম, ইতিহাস, ভূগোল, পাটি গনিত, সমুদ্রবিজ্ঞান ও জ্যতির্বিদ্যার মত বিষয় গুলো। উত্তর আমেরিকার মুসলিম আগমনকারীদের বংশধররা এখন কয়েকটি আদিবাসী গোত্রের সদস্য। ইরোকুইস, আলগোনকুইন, আনসাজি, হোহোকাম ও ওলমেক মুসলিম বংশোদ্ভুত গোত্র।
৬-উত্তর আমেরিকা মহাদেশে ৫৬৫ টি গ্রাম, শহর, নগর, পর্বত, হ্রদ ও নদীর নাম পাওয়া যায়, যা আরবী বা ইসলামী শব্দমূল থেকে উদ্ভূত। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৪৮৪ টি এবং কানাডায় ৮১টি। এর মধ্যে প্রত্যেকটি নাম কলম্বাস উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর পূর্বে আদিবাসী আমেরিকানরাই নামকরন করেছে। এর মধ্যে কিছু নাম উল্লেখ করা হল, যা ইসলামী পরিভাষার সাথে জড়িত। যেমন, মক্কা-৭২০ আবাসিক এলাকা (ইন্ডিয়ানা), ওয়াশিংটনের মক্কা (আদিবাসী গোত্র), মেদিনা-২১০০ (ইডাহো), মদিনা-৮৫০০ (নিউ ওয়ার্ক), মদিনা-১১০০, হাজেন-৫০০০ (নর্থ ডাকোট), মেদিনা-১৭০০০, মদিনা-১২০০০০ (ওহাইও), মদিনা-১১০০ (টেনাসি), মদিনা-২৬০০০(টেক্সাস), মদিনা-১২০০ (ওন্টারিও), মোহামেত-৩২০০ (ইলিনয়েস), মোনা-১০০০ (উটাহ) ও আরবা-৭০০০(ওন্টারিও)। সতর্কভাবে আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের গোত্রের নাম গুলো খেয়াল করলে বুঝা যায়, অনেক গোত্রের নাম আরবী বা ইসলামী শব্দমূল থেকে এসেছে। যেমন, আনসাজি, অ্যাপাচি, আরাওয়াক, আরিকানা, শাবিন, শেরুকি, ক্রি, হোহোকাম, হুপা, হোপি, মাক্কাহ, মাহিগান, মোহওয়াক, নাযকা, যুলু , জুনি ইত্যাদি।

উপরে উল্লেখিত ঐতিহাসিক, ভৌগলিক ও ভাষাতাত্ত্বিক প্রমানাদির উপর ভিত্তি করে কলম্বাসের ৫শ’ বছর পূর্বে আমেরিকা মহাদেশে মুসলিম আগমনের সহস্রাব্দ উদযাপনের আহ্বান তাবৎ দুনিয়ার মুসলিম জাতির জন্য একটি নিঃসন্দেহ গুরত্বপূর্ন বিষয় হয়ে উঠেছিল।
মূলঃ ইউসুফ ম্রুয়েহ
ভাষান্তরঃ মাসরুর মুস্তাফি














মন্তব্য করুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই লিখুন।