মূল কনটেন্টে যান
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬৪ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
অনুসন্ধানী ও সর্বশেষ বাংলা সংবাদ
সর্বশেষ

রায় হয়েছিল, মৃত্যুর পর জানল রাষ্ট্র

সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিষয়টি তারা আগে জানত না। লেখকের মতে, সৌদি আরবের বিচারের অধিকার আছে, কিন্তু অভিযুক্তরা আইনজীবী, দোভাষী, আপিল ও কনস্যুলার সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, তার পূর্ণ বিবরণ এখনো জনসমক্ষে নেই। ভিয়েনা কনভেনশন প্রতিটি মৃত্যুদণ্ডের আগে আগাম নোটিশ বাধ্যতামূলক করে না। তবে আটক ব্যক্তিকে কনস্যুলার অধিকার জানানো হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা জরুরি। সম্পাদকীয়তে বিদেশে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলার জন্য কেস-মনিটরিং ব্যবস্থা, স্বচ্ছ অনুসন্ধান ও প্রবাসীদের আইনি সচেতনতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।#Bangladesh #SaudiArabia #MigrantRights #HumanRights #MeehaNews

রায় হয়েছিল, মৃত্যুর পর জানল রাষ্ট্র

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এবং বিদেশের মাটিতে নাগরিকের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়

একজন মানুষ বিদেশে মারা গেলে তাঁর মৃত্যুসংবাদ দেশে পৌঁছায়। কিন্তু একজন মানুষ বিদেশে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলে তাঁর বিপদের খবর কি তাঁর রাষ্ট্রের কাছে সময়মতো পৌঁছায়? আর রাষ্ট্র যদি জানতে পারে তাঁর নাগরিকের জীবন বিপন্ন, তখন সেই জীবন ও ন্যায়বিচারের অধিকার রক্ষায় সে কী করতে পারে? সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এই প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে।

সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ মক্কা অঞ্চলে নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে মসজিদের ভেতরে কথিত “অনৈতিক কাজের” অভিযোগ আনা হয়েছিল বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সৌদি বিবরণ অনুযায়ী, তদন্তের পর তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়, আদালত মৃত্যুদণ্ড দেন এবং রায় চূড়ান্ত হওয়ার পর তা কার্যকর করা হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা এ বিষয়ে অবহিত ছিল না। পরে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, সৌদি কর্তৃপক্ষ বিচার ও শাস্তির বিষয়ে যে বিবরণ দিয়েছে, সেটি তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য। দ্বিতীয়ত, সেই বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে অভিযুক্তদের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল, তার পূর্ণ বিবরণ এখনো জনসমক্ষে নেই। অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রকৃতি, গ্রেপ্তারের সময়, আইনগত প্রতিনিধিত্ব, দোভাষীর সহায়তা, আপিল এবং কনস্যুলার যোগাযোগের বিষয়ে আরও তথ্য প্রয়োজন।

ফলে আবেগের তাড়নায় কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন অনুচিত, তেমনি পূর্ণ তথ্য না জেনেই বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়াও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। কিন্তু তথ্যের এই শূন্যতা নিজেই একটি বড় প্রশ্ন। দুটি জীবন রাষ্ট্রীয়ভাবে কেড়ে নেওয়ার পরও যদি তাঁদের বিচার ও কনস্যুলার সহায়তার পূর্ণ বিবরণ জনসমক্ষে স্পষ্ট না থাকে, তাহলে ন্যায়বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না কেন?

আইন মানা জরুরি, কিন্তু আইন প্রয়োগেরও সীমা ও শর্ত আছে

সৌদি আরবের ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের বিচার করার অধিকার সে দেশের রয়েছে। বিদেশে অবস্থানকারী কোনো বাংলাদেশি স্থানীয় আইন ভঙ্গ করলে তাঁকে নাগরিকত্বের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। নাগরিকত্ব দায়মুক্তির সনদ নয়।

কিন্তু এখানেই আলোচনার শেষ নয়; বরং শুরু। কারণ আইন প্রয়োগের অধিকার আর ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা এক বিষয় নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি অভিযোগ বুঝতে পেরেছিলেন কি না, নিজের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, যোগ্য আইনজীবী ও প্রয়োজনীয় দোভাষীর সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, সাক্ষ্যপ্রমাণ চ্যালেঞ্জ করতে এবং কার্যকরভাবে আপিল করতে পেরেছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষত মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে ভুলের মূল্য আর অন্য কোনো শাস্তির মতো নয়। কারাবাসের সাজা ভুল হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুক্তি দিয়ে ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ভুল প্রমাণিত হলেও জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো আদালত নেই। তাই নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, কার্যকর প্রতিরক্ষা ও ন্যায়সংগত আপিলের সুযোগ নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এগুলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সবচেয়ে চূড়ান্ত প্রয়োগের বিরুদ্ধে মানুষের অপরিহার্য সুরক্ষা।

প্রশ্নটি তাই শুধু এই নয় যে আইন অনুসরণ করা হয়েছিল কি না। প্রশ্ন হলো, আইন প্রয়োগের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তাগুলো কার্যকর ছিল কি না।

মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নে মানবিকতার জায়গাটি কোথায়?

মৃত্যুদণ্ড নিয়ে পৃথিবীতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। এক পক্ষ মনে করে, কিছু অপরাধ এত গুরুতর যে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োজন। অন্য পক্ষ মনে করে, রাষ্ট্রের হাতে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া নৈতিক ও আইনগতভাবে গভীর ঝুঁকি তৈরি করে—বিশেষত যখন বিচারিক ভুল, অসম প্রতিরক্ষা কিংবা সামাজিক বৈষম্যের সম্ভাবনা পুরোপুরি দূর করা যায় না।

এই বিতর্কে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি: অপরাধ যত গুরুতরই হোক, শাস্তির নৈতিক বৈধতা কি শুধু অপরাধের নিন্দনীয়তা দিয়ে নির্ধারিত হবে, নাকি শাস্তির প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতাও বিবেচনায় আসবে?

সৌদি কর্তৃপক্ষ যে অভিযোগের কথা জানিয়েছে, তার পূর্ণ বিবরণ এখনো প্রকাশ্যে নেই। তাই অভিযোগের প্রকৃতি সম্পর্কে অনুমান করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। তবে প্রকাশিত বিবরণে ইচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগের উল্লেখ নেই। এ অবস্থায় এমন একটি অভিযোগের জন্য মৃত্যুদণ্ড কেন প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক শাস্তি বলে বিবেচিত হলো—তার আইনগত ব্যাখ্যা জানা জনস্বার্থের প্রশ্ন।

এখানে ধর্মীয় অনুভূতি ও মানবিকতার মধ্যে কৃত্রিম বিরোধ তৈরি করারও প্রয়োজন নেই। কোনো পবিত্র স্থানের মর্যাদা রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই মর্যাদা রক্ষার জন্য রাষ্ট্র যে শাস্তি নির্ধারণ করবে, তার ন্যায়সংগততা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়। একটি সমাজের নৈতিক শক্তি শুধু কোন আচরণকে অপরাধ বলে চিহ্নিত করে, তা দিয়ে মাপা যায় না; অপরাধের বিচার করতে গিয়ে কতটা ন্যায়, সংযম ও মানবিক বিবেচনা বজায় রাখে, তা দিয়েও মাপা যায়।

মানবিকতা মানে অপরাধকে অস্বীকার করা নয়। মানবিকতা মানে অভিযুক্ত ব্যক্তিরও অধিকার আছে—এই সত্যটি অপরাধের অভিযোগের মুখেও ভুলে না যাওয়া।

আন্তর্জাতিক আইন: আগাম নোটিশের বাইরে যে প্রশ্নগুলো আছে

বাংলাদেশ ও সৌদি আরব—দুই দেশই ১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের পক্ষভুক্ত। কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ বিদেশে আটক নাগরিকের কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার সুরক্ষিত করে। আটক ব্যক্তিকে তাঁর কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে বিলম্ব না করে জানাতে হয়। তিনি কনস্যুলেটকে অবহিত করার অনুরোধ করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিলম্ব না করে তা জানাতে হয়। কনস্যুলার কর্মকর্তারা আটক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং আইনগত প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করতে সহায়তা করতে পারেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য রয়েছে। কনভেনশন প্রতিটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে অবশ্যই আগাম জানাতে হবে—এমন সর্বজনীন ও স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করে না। ফলে বাংলাদেশকে আগাম জানানো হয়নি—এই তথ্য একাই চুক্তি লঙ্ঘনের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।

কিন্তু তাই বলে কনস্যুলার দায়িত্বের প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না। আটক ব্যক্তিদের তাঁদের অধিকার জানানো হয়েছিল কি না, তাঁরা কনস্যুলার সহায়তা চেয়েছিলেন কি না, তাঁদের সঙ্গে বাংলাদেশি মিশনের যোগাযোগের সুযোগ ছিল কি না, আইনগত সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা ছিল কি না—এসব জানতে হবে। মৃত্যুর পর বিদেশি নাগরিকের বিষয়ে কনস্যুলেটকে অবহিত করার ক্ষেত্রে কনভেনশনের ৩৭ অনুচ্ছেদসহ প্রযোজ্য দায়িত্ব পালন করা হয়েছিল কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।

অর্থাৎ অনুসন্ধানের লক্ষ্য শুধু আগাম নোটিশ না পাওয়ার জন্য কাউকে দায়ী করা নয়। লক্ষ্য হলো, দুই নাগরিকের আটক থেকে বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া পর্যন্ত তাঁদের অধিকার রক্ষার বাস্তব সুযোগগুলো কী ছিল, তা জানা।

আন্তর্জাতিক আইনকে এখানে কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। বরং এটি দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার স্বীকৃত কাঠামো। সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনের দাবি পরস্পরের বিরোধী নয়।

বাংলাদেশের ব্যর্থতা কোথায়—আর তা জানার উপায় কী?

বাংলাদেশ সরকার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। এই উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। কিন্তু এখানেই দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। সরকারের উচিত দুই ব্যক্তির পরিচয়, গ্রেপ্তার ও বিচারসংক্রান্ত তথ্য, কনস্যুলার যোগাযোগের ইতিহাস, আইনগত প্রতিনিধিত্ব এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা চাওয়া। অনুসন্ধানে কোনো ঘাটতি পাওয়া গেলে তা চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।

বাংলাদেশের নিজস্ব দূতাবাস ও কনস্যুলেটের কার্যক্রমও তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনার আওতায় আসা উচিত। তবে আগাম খবর না পাওয়ার বিষয়টি জানলেই মিশনের অবহেলা প্রমাণিত হয় না। কোথায় তথ্যপ্রবাহ ব্যর্থ হয়েছে, আটক ব্যক্তিরা তাঁদের অধিকার সম্পর্কে জানতেন কি না, তাঁরা সহায়তা চেয়েছিলেন কি না এবং মিশনের পক্ষে বাস্তবে কী করার সুযোগ ছিল—এসব যাচাই করেই দায় নির্ধারণ করতে হবে।

এখানে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে পরিমাপ করার একটি বাস্তব কাঠামো প্রয়োজন। দূতাবাস কত দ্রুত আটক নাগরিকের খবর পায়? মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলার তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করা হয়? আইনজীবী ও দোভাষীর সহায়তা পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে কি? পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব কার? এসব সেবার কার্যকারিতা কতটা, তা নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা হয় কি? রাষ্ট্রের সুরক্ষা আছে—এমন ঘোষণা যথেষ্ট নয়। সুরক্ষা বাস্তবে কতটা কার্যকর, তার প্রমাণও থাকা দরকার।

বাংলাদেশের প্রশ্ন: রেমিট্যান্সের মূল্য আছে, নাগরিকেরও আছে

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান নিয়ে আমরা প্রায়ই গর্ব করি। তাঁদের পাঠানো অর্থ পরিবার চালায়, গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবাহ সৃষ্টি করে, বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ায়। প্রবাসী শ্রমিকের সাফল্যের গল্প রাষ্ট্রীয় উদ্‌যাপনের অংশ হয়। কিন্তু প্রবাসীর জীবনে যখন বিপদ নামে, তখন রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার কার্যকারিতা কতটা দৃশ্যমান থাকে?

এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, প্রতিষ্ঠান ও তথ্য দিয়ে দিতে হবে। বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের কতজন নিয়মিত কনস্যুলার সহায়তা পান? মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত নাগরিকদের মামলা শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি? বিদেশি ভাষা ও আইনি ব্যবস্থার সঙ্গে অপরিচিত একজন শ্রমিক কীভাবে দ্রুত যোগ্য আইনজীবী ও দোভাষীর সহায়তা পাবেন? পরিবারের কাছে মামলার খবর পৌঁছানোর নির্ভরযোগ্য পথ কী? দূতাবাসগুলো এসব ক্ষেত্রে কত দ্রুত সাড়া দেয়, আর সেই সেবার জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হয়?

বিদেশে কাজ করতে যাওয়া অনেক মানুষ ভাষা, স্থানীয় আইন ও বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে সীমিত ধারণা নিয়ে নতুন পরিবেশে প্রবেশ করেন। গুরুতর অভিযোগে আটক হলে এই সীমাবদ্ধতা তাঁদের আইনগত অধিকার বুঝতে, আইনজীবী খুঁজতে কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এ বাস্তবতায় কনস্যুলার সহায়তা নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি নাগরিকের অধিকার কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

এখন কী করা প্রয়োজন?

প্রথমত, বাংলাদেশকে কূটনৈতিক চ্যানেলে পূর্ণাঙ্গ ও যাচাইযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কী ঘটেছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কি না এবং তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়ায় কী ধরনের আইনি সহায়তা ছিল—এসবের উত্তর প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, বিদেশে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ কেস-মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রতিটি মামলার তথ্য সংরক্ষণ, দ্রুত আইনজীবী ও দোভাষীর সহায়তা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপের জন্য নির্দিষ্ট প্রোটোকল থাকা দরকার।

তৃতীয়ত, সৌদি আরবসহ যেসব দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন, সেসব দেশের সঙ্গে কনস্যুলার সহযোগিতা আরও কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। বিশেষত গুরুতর অপরাধের মামলা, আটক ব্যক্তির অধিকার সম্পর্কে অবহিতকরণ এবং মৃত্যুদণ্ডের মামলায় যোগাযোগের প্রক্রিয়া নিয়ে স্পষ্ট কার্যপদ্ধতি থাকা প্রয়োজন।

চতুর্থত, বিদেশগামী শ্রমিকদের শুধু কর্মসংস্থান, চুক্তি ও অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য দিলেই হবে না। সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আটক হলে যোগাযোগের উপায়, কনস্যুলার অধিকার এবং জরুরি সহায়তা পাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কেও তাঁদের বাস্তবভিত্তিক ধারণা দিতে হবে। সচেতনতা অবশ্যই রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বিকল্প নয়; তবে বিপদের সময়ে সঠিক সহায়তা চাওয়ার পথটি চিনিয়ে দিতে পারে।

পঞ্চমত, এই ঘটনার অনুসন্ধান ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারকে যথাসম্ভব স্বচ্ছ থাকতে হবে। তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা থাকলে তা জানাতে হবে; কোনো প্রতিষ্ঠান বা কর্মকর্তার ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আর কোনো লঙ্ঘন প্রমাণিত না হলে অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে সেই ফলও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।

এসব পদক্ষেপ মৃত দুই নাগরিককে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। কিন্তু ভবিষ্যতে অন্য কোনো বাংলাদেশি গুরুতর অভিযোগে আটক হলে তাঁর অধিকার রক্ষার সুযোগ যেন অজান্তে হারিয়ে না যায়, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে।

কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রকৃত পরীক্ষা

বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ক শ্রমবাজার, অর্থনীতি, ধর্মীয় বন্ধন ও কূটনৈতিক সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত। এই সম্পর্কের গুরুত্ব অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক মানে কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া নয়। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়া এবং নাগরিকের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ জানানোই দায়িত্বশীল কূটনীতির অংশ।

বাংলাদেশের উচিত দুই ব্যক্তির গ্রেপ্তার, অভিযোগ, বিচার, আপিল, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা। তাঁদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং দেহাবশেষ বা দাফনসংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিত করার বিষয়টিও মানবিক দায়িত্বের অংশ। অনুসন্ধানে কোনো ঘাটতি পাওয়া গেলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে; আর কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করা যাবে না।

এই ঘটনার সব উত্তর এখনো আমাদের জানা নেই। তাই এখনই চূড়ান্ত রায় দেওয়ার চেয়ে বেশি জরুরি হলো তথ্য সংগ্রহ, স্বচ্ছ অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যতের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

সৌদি আরবে ওই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেছে। তাঁদের জীবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁদের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রের সামনে যে প্রশ্নটি রয়ে গেছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই: বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি যখন এমন বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন, যেখানে তাঁর জীবনই চূড়ান্ত শাস্তির ঝুঁকিতে থাকে, তখন তাঁর অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা প্রস্তুত?

রেমিট্যান্সের অঙ্ক রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে; নাগরিকের প্রতি দায়িত্ব রাষ্ট্রের মর্যাদা নির্ধারণ করে। প্রবাসীকে শুধু অর্থনীতির শক্তি হিসেবে দেখলে তাঁর জীবনের পূর্ণ মূল্য বোঝা যায় না। তাঁকে দেখতে হবে অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে—যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও ন্যায়বিচারের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে, যিনি বিদেশে বিপদে পড়লেও রাষ্ট্রের কাছে অদৃশ্য হয়ে যান না। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু আইন প্রয়োগের ক্ষমতায় নয়; সেই ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ানো মানুষের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, তা নিশ্চিত করার সামর্থ্যেও।

প্রতিবেদনটি আপনার কাছে কেমন লাগল?

M M Masum Billah

বিশেষ প্রতিবেদক

এই প্রতিবেদনে কোনো তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে সংশোধনী নীতি অনুযায়ী আমাদের জানান।

মন্তব্য

মন্তব্য দেখতে বা লিখতে চাপ দিন। মন্তব্য সম্পাদকীয় নীতিমালা মেনে প্রকাশ হয়।

মিহা স্পেশাল

আজ

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

পাঠের রং

এখন যা বেশি খোঁজা হচ্ছে

যেকোনো পাতায় / চাপলেই খোঁজ খুলবে। ফলাফলে বিভাগ, তারিখ ও ধরন দিয়ে ছাঁকতে পারবেন।