অর্ধশতকের ফারাক্কা: শুকনো পদ্মা, মেয়াদ ফুরোনো চুক্তি
ফারাক্কা ব্যারাজ ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল চালু হয়। তার পর থেকে পদ্মার শুকনো মৌসুমের সর্বনিম্ন গড় প্রবাহ ফারাক্কা-পূর্ব সময়ের চেয়ে প্রায় ৭৩ শতাংশ কম বলে একটি গবেষণায় উল্লেখ আছে। ওয়াটার পলিসি সাময়িকীর একটি পর্যালোচনা অনুযায়ী, ১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে চুক্তির গ্যারান্টিযুক্ত ১০ দিনের সময়গুলোর ৬৫ শতাংশে বাংলাদেশ প্রাপ্য পানি পায়নি। ১৯৯৬ সালের চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। বাংলাদেশ ১৯৭৭ সালের মতো গ্যারান্টি ক্লজসহ নতুন চুক্তি চাইছে, আর ভারত বলছে আলোচনা চলবে যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে। ভারতের ভেতরেও ফারাক্কা বিতর্কিত। বিহার সরকার ২০১৭ সালে পলি জমে বন্যার অভিযোগ তুলে ব্যারাজটি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছিল। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার মূল লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলে ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের মত। #Farakka #GangesWaterTreaty #Padma #WaterSecurity #MeehaNews

চৈত্রের দুপুরে পাবনার হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দাঁড়ালে নিচে যতটা পানি দেখা যায়, তার চেয়ে বেশি চোখে পড়ে বালু। ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে, ১৯৭৬ সালের ১৬ মে, এই নদীর পানির দাবিতে রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট পর্যন্ত লংমার্চ করেছিলেন নব্বই বছরের মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তাঁর সেদিনের ঘোষণা: “গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে।” অর্ধশতক পরে সেই হিস্যার একমাত্র আইনি দলিল, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর। নতুন চুক্তির আলোচনা কতদূর এগিয়েছে, দুই দেশের সরকারি বক্তব্যে তার স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই।
ফারাক্কা বাঁধ নামে পরিচিত হলেও কারিগরি অর্থে স্থাপনাটি একটি ব্যারাজ। এটি পানি জমিয়ে রাখার জলাধার নয়, নদীর প্রবাহ ঘুরিয়ে দেওয়ার কাঠামো। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে গঙ্গার ওপর তৈরি এই ব্যারাজে ১০৯টি গেট আছে। একটি সংযোগ খাল (ফিডার ক্যানাল) দিয়ে প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক (প্রতি সেকেন্ডে ঘনফুট) পানি ভাগীরথী-হুগলির দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ভারতের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল হুগলিতে বাড়তি পানি পাঠিয়ে পলি ধুয়ে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা করা। যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির আন্তসীমান্ত পানিবিরোধ ডেটাবেইসের নথি অনুযায়ী, পাকিস্তান ১৯৫১ সালেই এ প্রকল্প নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। ১৯৫২ সালে ভারত সেই উদ্বেগকে “অনুমাননির্ভর” বলে উড়িয়ে দেয়। ১৯৬১ সালে নির্মাণ শুরু হয়, ১৯৭০ সালে কাঠামো তৈরি শেষ হয়। তবে সংযোগ খালের কাজ বাকি থাকায় পানি সরানো শুরু হয় ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল।
সেই শুরুটা হয়েছিল একটি পরীক্ষামূলক সমঝোতায়। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে ঢাকায় মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ঠিক হয়, ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ভারত ১০ দিনের ধাপে ১১ থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পানি সরাবে, বাকিটা পাবে বাংলাদেশ। ওরেগন নথি বলছে, পরীক্ষার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনো নতুন চুক্তি ছাড়াই ১৯৭৫-৭৬ সালের শুকনো মৌসুমে ভারত পূর্ণ সক্ষমতায় প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক পানি সরিয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। সে বছরের ২৬ নভেম্বর সাধারণ পরিষদ দ্রুত মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার আহ্বান জানিয়ে একটি সর্বসম্মত বিবৃতি গ্রহণ করে। ভাসানীর লংমার্চ হয়েছিল এই দুইয়ের মাঝখানে।
এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর পাঁচ বছর মেয়াদি প্রথম গঙ্গা চুক্তি সই হয়। চুক্তির ভিত্তি ছিল ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৩ সালের প্রবাহের তথ্য। সবচেয়ে কম পানির সময়ে, অর্থাৎ এপ্রিলের শেষ ১০ দিনে, মোট ৫৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে বাংলাদেশের ভাগ ছিল ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক আর ভারতের ২০ হাজার ৫০০। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটি রক্ষাকবচ: প্রবাহ কমে গেলেও বাংলাদেশ তার নির্ধারিত ভাগের অন্তত ৮০ শতাংশ পাবে। ১৯৮২ সালে দুই দেশ যৌথ ইশতেহারে জানায়, চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হবে না। ১৯৮৫ সালে একটি সমঝোতা স্মারক ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পানি ভাগাভাগির ব্যবস্থা ঠিক করে। এরপর ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬, টানা আট বছর কোনো চুক্তিই ছিল না।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়া আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ বছর মেয়াদি যে চুক্তিতে সই করেন, তার সূত্রটি তিন ধাপের। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কায় প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ অর্ধেক অর্ধেক পাবে। প্রবাহ ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার, বাকিটা ভারত। ৭৫ হাজারের বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার, বাকিটা বাংলাদেশ। এ ছাড়া ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সবচেয়ে শুকনো সময়ে দুই দেশ পালা করে ১০ দিন পরপর ৩৫ হাজার কিউসেকের নিশ্চয়তা পাবে। প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নামলে দুই সরকার জরুরি আলোচনায় বসবে। কিন্তু ১৯৭৭ সালের মতো ৮০ শতাংশের সরাসরি নিশ্চয়তা এই চুক্তিতে নেই, নেই কোনো সালিসি ব্যবস্থাও। পাঁচ বছর পরপর পর্যালোচনায় একমত না হলে ভারত বাংলাদেশের নির্ধারিত ভাগের অন্তত ৯০ শতাংশ ছাড়বে, এই শর্তটিই পরোক্ষ রক্ষাকবচ হিসেবে রয়ে গেছে।
কাগজের সূত্র মাঠে কতটা কাজ করেছে, তার সবচেয়ে বিস্তারিত হিসাব পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক পানি সংস্থার (আইডব্লিউএ) ওয়াটার পলিসি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায়। ১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ফারাক্কা থেকে ছাড়া পানির হিসাব আর হার্ডিঞ্জ ব্রিজে মাপা প্রবাহ মিলিয়ে দেখা হয়েছে সেখানে। মোট ৩০০টি ১০ দিনের সময়ের মধ্যে ৯৪টিতে, অর্থাৎ ৩১ শতাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রাপ্যের চেয়ে কম পানি পেয়েছে। মার্চ-মে সময়ের সবচেয়ে সংকটময় ১২০টি পর্বের মধ্যে ঘাটতি ছিল ৪৩ শতাংশে।
যেসব সময়ে বাংলাদেশের ৩৫ হাজার কিউসেক পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল, তার ৬৫ শতাংশেই সেই নিশ্চয়তা রক্ষা হয়নি।
একই পর্যালোচনায় অন্য একটি গবেষণার উদ্ধৃতি আছে, যাতে ২০০৮ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ৫৫.৫ শতাংশ সময়ে ন্যূনতম নিশ্চিত ভাগ না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে পাঁচ বছরওয়ারি হিসাবে ঘাটতির হার ক্রমেই কমেছে: ১৯৯৭-২০০১ সালে ৪৫ শতাংশ, ২০১২-১৬ সালে ২০ শতাংশ। গবেষকেরা চুক্তির একটি কাঠামোগত দুর্বলতার দিকে আঙুল তুলেছেন: চুক্তির প্রবাহ-অনুমান ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের গড়ের ওপর দাঁড়িয়ে, যেখানে জলবায়ুর ওঠানামা বা ফারাক্কা-পরবর্তী প্রবাহ হ্রাস কোনোটিই হিসাবে নেই। পালা করে ৩৫ হাজার কিউসেক দেওয়ার ব্যবস্থাও শুকনো বছরে দুই দেশের প্রবাহেই হঠাৎ বড় ওঠানামা তৈরি করে।
প্রবাহ কতটা কমেছে, তার একক কোনো সর্বসম্মত অঙ্ক নেই, তবে দিকটি পরিষ্কার। ২০২২ সালে সাসটেইনেবিলিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত এ আর এম তৌহিদুল ইসলাম ও সহকর্মীদের গবেষণা আগের একটি গবেষণা উদ্ধৃত করে জানায়, ফারাক্কা চালুর পর গঙ্গার গড় সর্বনিম্ন প্রবাহ নেমেছে ৫৫২ কিউমেকে (প্রতি সেকেন্ডে ঘনমিটার), যা ফারাক্কা-পূর্ব অবস্থার চেয়ে প্রায় ৭৩ শতাংশ কম। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১৯৭০-২০১৮ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, ব্যারাজ-পরবর্তী সময়ে ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসে সর্বোচ্চ প্রবাহ পরিবেশগত প্রবাহের নিম্নসীমার নিচে, আর সর্বনিম্ন প্রবাহ সারা বছরই সেই সীমার নিচে। তবে গবেষকেরা নিজেরাই জানিয়েছেন, প্রবাহ কমার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও উজানের অন্যান্য মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপও ভূমিকা রাখতে পারে, আর গবেষণাটি একটিমাত্র পরিমাপ কেন্দ্রের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ ফারাক্কা বড় কারণ, তবে একমাত্র কারণ হিসেবে প্রমাণিত নয়।

পদ্মার এই ঘাটতি সবচেয়ে বেশি টের পায় তার শাখানদীগুলো। কুষ্টিয়ার কাছে পদ্মা থেকে বেরিয়ে আসা গড়াই-মধুমতী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিঠাপানির প্রধান পথ। শুকনো মৌসুমে এর মুখ শুকিয়ে যাওয়ার খবর প্রায় প্রতিবছর সংবাদমাধ্যমে আসে। সমস্যার মাত্রা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় সরকারের নিজের পরিকল্পনা থেকেই। ২০২৬ সালের মে মাসে অনুমোদিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রথম ধাপে পাঁচটি নদীব্যবস্থা পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে: হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী। এর মধ্যে শুধু গড়াই-মধুমতীতেই ১৩৫.৬ কিলোমিটার খনন ও পুনর্খননের পরিকল্পনা আছে, ডেইলি স্টার বাংলা প্রকল্পের নথি থেকে এ তথ্য জানিয়েছে। কপোতাক্ষ, ভৈরব, নবগঙ্গা, চিত্রাসহ শতাধিক নদী-খাল মৃতপ্রায় বলে প্রথম আলোর এক মতামত কলামে লিখেছেন টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক সুবাইল বিন আলম। তবে সেখানে নির্দিষ্ট জরিপের সূত্র দেওয়া হয়নি।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নদীর পানি কমলে চাপ পড়ে মাটির নিচের পানির ওপর। নওগাঁর বরেন্দ্র এলাকায় একসময় ৮০-৯০ ফুটে নলকূপে পানি মিলত, এখন প্রায় ১২০ ফুট খুঁড়তে হয়, কোথাও তাতেও পানি ওঠে না। ২০২৪ সালে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলামের বক্তব্য এসেছে: “এখন আর নলকূপে পানি ওঠে না।” পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নকে “অতি উচ্চ” পানি-সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এই সংকটের পুরো দায় ফারাক্কার নয়। একই প্রতিবেদনগুলোতে বিশেষজ্ঞরা সেচের জন্য অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনকে বড় কারণ বলেছেন। শুধু নওগাঁতেই ৪২ হাজারের বেশি অগভীর নলকূপ চলছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য। নদীতে পানি কম থাকায় কৃষক মাটির নিচের পানির দিকে ঝুঁকছেন, আর অতিরিক্ত উত্তোলনে স্তর আরও নামছে। এই দুই প্রক্রিয়া একে অন্যকে বাড়িয়ে তোলে। “মরুকরণ” শব্দটির কোনো আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন এই অনুসন্ধানে পাওয়া না গেলেও জনপরিসরে বহুল ব্যবহৃত শব্দটি অবান্তর নয় ।
কৃষিতে ঘাটতির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরার ১ লাখ ১০ হাজার ১০৭ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনার নকশা ছিল এ প্রকল্পের। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পের তিনটি প্রধান পাম্পই অচল, সেচ পুরো বন্ধ ছিলো বলে প্রথম আলো সূত্রে জানা যায়। কারণ শুধু পদ্মায় পানি কম থাকা নয়। দুটি পাম্প কয়েক বছর ধরে নষ্ট, ১২টি সহায়ক পাম্প ২০০১ সাল থেকে অচল, আর ভেড়ামারায় সেতু নির্মাণের সময় খালের একাংশ মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছিল। ভেড়ামারা পাম্পহাউসের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান কৃষকদের বলেছিলেন, “আপনারা (কৃষক) আপনাদের মতো চালিয়ে (সেচ) নেন।” আলমডাঙ্গার বর্গাচাষি রজব আলী জানিয়েছিলেন, অগভীর পাম্পে সেচ দিতে তাঁর খরচ খালের পানির চেয়ে অনেক বেশি পড়ছে। উজানের পানি কমা আর দেশের ভেতরের রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা, দুটোর দায় একসঙ্গে পড়েছে এখানে।
দক্ষিণ-পশ্চিমে মিঠাপানির প্রবাহ কমলে সমুদ্রের লোনাপানি ঢোকে ভেতরে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) হিসাবে দেশে লবণাক্ততায় আক্রান্ত জমি ১৯৭৩ সালের প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর থেকে বেড়ে ২০০০ সালে প্রায় ১০ লাখ ২০ হাজার এবং ২০০৯ সালে প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, বরগুনাসহ উপকূলীয় জেলাগুলো সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। তবে যেসব প্রতিবেদনে এই হিসাব এসেছে, সেখানে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসকেও কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। খুলনায় লবণাক্ততা ফারাক্কা-পূর্ব ৫০০ মাইক্রোমোস থেকে বেড়ে ২৯ হাজার ৫০০ মাইক্রোমোসে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও নদী বাঁচাও আন্দোলনের রাজশাহী শাখার সভাপতি অধ্যাপক ইফতেখারুল আলম মাসউদ। তাঁর এই অঙ্কের মূল গবেষণাসূত্র এই অনুসন্ধানে খুঁজে পাওয়া যায়নি। লবণাক্ততা মাপা হয় কোন মৌসুমে, কোন নদীর কোন জায়গায়, তার ওপর অঙ্ক অনেক বদলায়।
সুন্দরবনে এর একটি সম্ভাব্য প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে চলতি বছরের আগস্টে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায়। বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠানের (স্পারসো) এম মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জার্মানির টিইউ ড্রেসডেনের গবেষকেরা চাঁদপাই রেঞ্জের প্রায় ২৭২ বর্গকিলোমিটার এলাকা বিশ্লেষণ করেছেন। দেখা গেছে, সুন্দরী-গেওয়াপ্রধান বন ১৯৮৮ সালের প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর থেকে ২০২২ সালে প্রায় ১২ হাজার হেক্টরে নেমেছে, অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে লবণসহিষ্ণু কাঁকড়াগাছপ্রধান এলাকা ৬৬০ হেক্টর থেকে বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার ৪৩৪ হেক্টর। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেছেন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি আর উজানের মিঠাপানি কমে যাওয়া কাঁকড়াগাছের বিস্তারে সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি লবণাক্ততা, জোয়ার ও ভূগর্ভস্থ পানির তথ্য না থাকায় গবেষকেরা কোনো একক কারণ প্রমাণ করতে পারেননি। প্রতিবেদনে ফারাক্কার নামও সরাসরি আসেনি।

মাছের হিসাবে ফারাক্কার প্রভাব সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে দেখা যায় ভারতের ভেতরেই। ভারতীয় নদী-বিষয়ক গবেষণা নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভারস অ্যান্ড পিপলের (এসএএনডিআরপি) ২০১৪ সালের এক বিশ্লেষণ ভারত সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পুরোনো তথ্য উদ্ধৃত করেছে। তাতে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের আগে ইলিশ উজানে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত, আগ্রা-কানপুর-দিল্লি পর্যন্ত যেত। ব্যারাজ চালুর পর এলাহাবাদে প্রতি কিলোমিটারে ইলিশ আহরণ ষাটের দশকের ৯১ কেজি থেকে শূন্যে নেমেছে। ব্যারাজের মাছ চলাচলের পথ (ফিশ লক) অন্তত এক দশক ধরে চালু হয়নি বলেও সেখানে উল্লেখ আছে। বাংলাদেশ অংশে রাজশাহীর পদ্মায় এখন মূলত জাটকাই ধরা পড়ে বলে কালের কণ্ঠ জানিয়েছে। জেলা মৎস্য দপ্তরের হিসাবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জেলায় ইলিশ ধরা পড়েছিল ২৮.৫৫ টন। তবে প্রকাশিত সাম্প্রতিক অঙ্কটি ২০২৫ সালের মাত্র তিন মাসের (৫.৩৭ টন), তাই পূর্ণ বছরের তুলনা এখনো করা যাচ্ছে না।
পলির হিসাবও একই রকম জটিল। এসএএনডিআরপির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গঙ্গা বছরে প্রায় ৭৩ কোটি ৬০ লাখ টন পলি বহন করে, যার প্রায় ৩২ কোটি ৮০ লাখ টন জমা হয় ফারাক্কার উজানে। একই বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক খালেকুজ্জামানের বরাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পৌঁছানো পলি ষাটের দশকের বছরে প্রায় ২০০ কোটি টন থেকে কমে ১০০ কোটি টনের নিচে নেমেছে। অন্যদিকে প্রথম আলোর সুবাইল বিন আলমের কলামে পদ্মার পলিপ্রবাহ ১৯৬০ সালের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম বলা হয়েছে। দুটি অঙ্কের ব্যবধান বড়, আর কোনোটিই সরকারি পরিমাপ নয়। তবু একটি বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিরোধ কম: বদ্বীপের জমি গড়ে ওঠে পলি দিয়ে, আর পলি কমলে উপকূলের ভূমি গঠন ও জমির উর্বরতা দুটোই চাপে পড়ে।
বর্ষায় চিত্রটা উল্টো। ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট বিহারে গঙ্গার পানি বিপৎসীমার ওপরে ওঠায় ফারাক্কার ১০৯টি গেটই খুলে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে তখন অন্য অঞ্চলের বন্যা চলছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়ায় যে ফারাক্কার গেট খোলায় বাংলাদেশ ডুবছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ফারাক্কা “বাঁধ নয়, ব্যারাজ”। বর্ষায় গেট খোলা মৌসুমি স্বাভাবিক ঘটনা। যৌথ নদী কমিশনের তৎকালীন সদস্য মোহাম্মদ আবুল হোসেনও জানান, বর্ষায় গেটগুলো সাধারণত খোলাই থাকে। জলাধার না থাকায় ফারাক্কা বর্ষার পানি আটকে রাখতে পারে না। তবে “হঠাৎ সব গেট খুলে বন্যা” দাবিটা আযৌক্তিক বলে উড়িয়েও দেয়া যায় না।
নদীভাঙন নিয়েও একই সতর্কতা দরকার। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ডেইলি স্টারের এক বিশ্লেষণ সরকারি তথ্য ও সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) উপগ্রহ বিশ্লেষণ ব্যবহার করেছে। তাতে দেখা যায়, ১৯৭৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মা মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৫৮৫ বর্গকিলোমিটার জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে যমুনায় ৯৪২.২ বর্গকিলোমিটার, পদ্মায় ৩৩৮.৪৩ আর গঙ্গায় ৩০২.৯ বর্গকিলোমিটার। সিইজিআইএসের হিসাবে প্রতি বর্গকিলোমিটার ভাঙনে গড়ে প্রায় এক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভাঙন যমুনায়, যার উৎস ব্রহ্মপুত্র; ফারাক্কার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই। গঙ্গা-পদ্মার ভাঙনেও ফারাক্কার আলাদা অবদান মাপা কোনো গবেষণা এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। ভাঙনে ভিটেমাটি হারানো মানুষের ঢাকার বস্তিতে আশ্রয় নেওয়ার বাস্তবতা সত্য, তবে তাদের “ফারাক্কার শরণার্থী” বলা প্রমাণের চেয়ে বেশি দাবি করা হবে। ফারাক্কার উজানে ভারতের মালদহে ১৯৭০-এর দশক থেকে চার হাজার হেক্টরের বেশি জমি ভেঙেছে বলে এসএএনডিআরপির বিশ্লেষণে আছে। ২০০৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার একটি কমিটি এর জন্য ফারাক্কাকে “এককভাবে দায়ী” বলেছিল, আর ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশন সেই মতের সঙ্গে একমত নয়।
পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের মোট আর্থিক ক্ষতি কত, এই প্রশ্নের উত্তরই সবচেয়ে কম নির্ভরযোগ্য। নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী আমার দেশকে বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ক্ষতির কথা বলেছেন। একই প্রতিবেদনে নাম না জানা “গবেষক ও বিশ্লেষকদের” বরাতে ৫০ বছরে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের প্রত্যক্ষ ক্ষতির অঙ্ক এসেছে। অন্যদিকে প্রথম আলোর কলামে ক্ষতি ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বলে দাবি করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে ছোট অঙ্কের ব্যবধান ৩০ গুণের বেশি, আর কোনোটির পদ্ধতিই প্রকাশিত হয়নি। সরকারি বা স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কোনো সমন্বিত ক্ষতি-হিসাব এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের দাবি জোরালো করতে যে কাজটি সবচেয়ে জরুরি, সেটিই এখনো হয়নি।

ফারাক্কা যে উদ্দেশ্যে তৈরি, সেটি কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে ভারতের ভেতরেই প্রশ্ন আছে। এসএএনডিআরপির বিশ্লেষণে ভারতীয় নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রের বরাতে বলা হয়েছে, কলকাতা বন্দরের পলি ধোয়ার লক্ষ্য “ব্যর্থ” হয়েছে। কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, ফারাক্কার আগে বছরে ৬৪ লাখ ঘনমিটার পলি খনন করতে হতো। ১৯৯৯-২০০৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ১৮ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটারে, প্রায় সাড়ে তিন গুণ। ২০১৬ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে গঙ্গার পলি অপসারণ ও জাতীয় পলি ব্যবস্থাপনা নীতির দাবি জানান। দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ফারাক্কা ব্যারাজ সরিয়ে ফেলার কথাও তোলেন। পরের বছর কেন্দ্রের গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির কাছে বিহার সরকার লিখিতভাবে জানায়, পাটনা থেকে ভাগলপুর পর্যন্ত গঙ্গায় পলি জমে বন্যা তীব্র হওয়ার “উৎস” এই ব্যারাজ। তাই এটি বন্ধ (ডিকমিশন) করা হোক। ভারতীয় পানিবিশেষজ্ঞ হিমাংশু ঠক্কর দ্য ওয়্যারকে বলেছেন, ব্যারাজটি তার মূল উদ্দেশ্য প্রায় পূরণই করেনি। তবে তিনি পুরো নদী খনন করে পলি তোলাকে অবাস্তব বলেছেন এবং বিহারের বন্যার জন্য অন্য বাঁধকেও আংশিক দায়ী করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে বলেন, রাজ্যকে না জানিয়ে গঙ্গা চুক্তি নবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। কেন্দ্র তখন জানায়, রাজ্যের প্রতিনিধি আগে থেকেই পর্যালোচনায় যুক্ত ছিলেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লোকসভায় ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং জানান, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চারটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিদল অংশ নিয়েছে এবং খাবার ও শিল্পকারখানার পানির চাহিদা নিয়ে রাজ্যের তথ্য নেওয়া হয়েছে। একই জবাবে তিনি জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে নবায়নের আলোচনা তখনো শুরু হয়নি। অর্থাৎ ভারতের অবস্থান কেবল দিল্লির নয়; কলকাতা আর পাটনার পরস্পরবিরোধী চাপও এতে যুক্ত।
আন্তর্জাতিক আইনে বাংলাদেশের অবস্থান নীতিগতভাবে শক্ত, কিন্তু প্রয়োগে দুর্বল। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক জলপ্রবাহ কনভেনশন “ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ব্যবহার” আর “উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করার” নীতি দাঁড় করিয়েছে। আমার জানা মতে কনভেনশনটি ২০১৪ সালে কার্যকর হয়, তবে বাংলাদেশ বা ভারত কেউই এর পক্ষ নয়। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ১৯৯২ সালের জাতিসংঘ পানি কনভেনশনে যোগ দিয়েছে। কিন্তু ভারত এরও পক্ষ নয়, তাই নেপালের দ্য আন্নাপূর্ণা এক্সপ্রেসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই কনভেনশন সরাসরি ভারতের ওপর বাধ্যতামূলক নয়। সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের গবেষক অমিত রঞ্জনের বিশ্লেষণে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক সোবহান বলেছেন, চুক্তিতে সালিসি ব্যবস্থা না থাকাটা বড় সমস্যা। ১৯৭৬ সালে জাতিসংঘে যাওয়ার নজির থাকলেও ভারত এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাই পছন্দ করে। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ আবুল হোসেনও এ কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, বহুপক্ষীয় সহযোগিতার লাভ ভারতকে দেখাতে হবে বাংলাদেশকেই।
এই প্রেক্ষাপটে আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের চাওয়াটা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশ পুরোনো চুক্তির নবায়ন নয়, গ্যারান্টি ক্লজসহ নতুন চুক্তি চায়। ৮ অক্টোবর এএনআইয়ের বরাতে দ্য ট্রিবিউন জানায়, তিনি ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো নিশ্চয়তার বিধান চেয়েছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির আন্তর্জাতিক আইনের অবস্থানের কথা তুলে আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের আশা প্রকাশ করেছেন। অমিত রঞ্জনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে ঢাকা কয়েকবার বিষয়টি তুলেছে, কিন্তু জবাবের খবর প্রকাশিত হয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, নদী-বিষয়ক আলোচনা যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমেই হয় এবং চুক্তি নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক চলছে। মোদি সরকারের শরিক দল জনতা দল (ইউনাইটেড) সভাপতি সঞ্জয় কুমার ঝা নতুন করে আলোচনার দাবি জানিয়েছেন। মেয়াদ শেষ হতে দুই মাসও বাকি নেই, অথচ মন্ত্রী পর্যায়ের কোনো আলোচনার তারিখ প্রকাশ্যে আসেনি।
সমঝোতার অপেক্ষার পাশাপাশি দেশের ভেতরে একটি বড় সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রথম ধাপ অনুমোদন করে। ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, মেয়াদ জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩। রাজবাড়ীর পাংশায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজে পদ্মায় প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি ধরে রাখার পরিকল্পনা আছে। প্রথম ধাপের অর্থায়ন সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। পুরো প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। লক্ষ্য শুকনো মৌসুমে গড়াইসহ শাখানদীতে প্রবাহ ফেরানো, লবণাক্ততা ঠেকানো আর জিকে প্রকল্প ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানির জোগান নিশ্চিত করা। তবে আগস্টে ঢাকায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্ক (বেন) আয়োজিত আলোচনায় কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। বাপার সহসভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলামের হিসাবে, শুকনো মৌসুমে প্রতিশ্রুত ৬৯৮ কিউমেক পানির মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ আসবে জমানো পানি থেকে, বাকিটা নির্ভর করবে নদীর চলমান প্রবাহের ওপর। অর্থাৎ ফারাক্কা থেকে যথেষ্ট পানি না এলে ব্যারাজ পুরো কাজ করবে না। তিনি এ-ও সতর্ক করেন, চুক্তি নবায়নের আগে ব্যারাজ নির্মাণ শুরু হলে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হতে পারে। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবির পলি জমার ঝুঁকির কথা বলেন। পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ মালিক ফিদা এ খান পূর্ণ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকাশের দাবি জানান। কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান অবশ্য মনে করেন, পরিবেশগত আপত্তি বাস্তবায়নের সময় সমাধান করেই প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া উচিত।
পঞ্চাশ বছরের তথ্য পাশাপাশি রাখলে একটি চিত্র দাঁড়ায়, যা আবেগী স্লোগানের চেয়ে জটিল, কিন্তু কম উদ্বেগজনক নয়। শুকনো মৌসুমে পদ্মার প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ১৯৯৬ সালের চুক্তির পরও বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ের একটি বড় অংশে প্রাপ্য পানি পায়নি। আর চুক্তিতে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই যা দিয়ে ঘাটতির জবাবদিহি আদায় করা যায়। একই সঙ্গে লবণাক্ততা, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট, সুন্দরবনের পরিবর্তন বা নদীভাঙনের মতো অনেক ক্ষতির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, দেশের ভেতরের অতিরিক্ত পানি উত্তোলন আর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যর্থতাও আছে। এগুলোর পুরো দায় ফারাক্কার ঘাড়ে চাপালে বাংলাদেশ নিজের করণীয় থেকেই চোখ ফিরিয়ে নেয়।
নথিপত্র কোনো একক পক্ষের পরিকল্পিত চক্রান্তের কথা বলে না। বলে উজানের দেশের প্রাকৃতিক সুবিধা, দুর্বল ভাষার চুক্তি আর তথ্যের অস্বচ্ছতার এক দীর্ঘ কাঠামোগত সমস্যার কথা।
তাই সমাধানও কাঠামোগত হওয়া দরকার। নতুন চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের মতো নিশ্চয়তার বিধান আর সালিসি ব্যবস্থা থাকা দরকার। ১৯৪৯-১৯৮৮ সালের পুরোনো গড়ের বদলে হালনাগাদ প্রবাহের তথ্যে ভাগাভাগি হওয়া উচিত। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও ফারাক্কার ১০ দিনওয়ারি যৌথ পরিমাপ জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত, আর বর্ষার জন্য বাধ্যতামূলক যৌথ বন্যা-তথ্য ব্যবস্থা দরকার। দেশের ভেতরে প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগে ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ, আর পদ্মা ব্যারাজের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকাশ। ভাসানীর ন্যায্য হিস্যার দাবি পঞ্চাশ বছর পরও প্রাসঙ্গিক। পার্থক্য হলো, এখন সেই হিস্যা মাপার মানদণ্ড, তথ্য আর আইনি কাঠামোও দাবির অংশ।





