প্রধান কন্টেন্টে যান
সোম ৫ অক্টোবর ২৬
হেডলাইন
বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন
পাঠক কথন / পাঠক কথন

ডেঙ্গু কি শুধু এডিস মশার গল্প? খুলনার বাস্তবতা বলছে অন্য কথা

খুলনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ শুধু মশার সমস্যা নয়, নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতির ঘাটতির প্রতিফলন।

মোট শেয়ারমোঃ: 1

ডেঙ্গু কি শুধু এডিস মশার গল্প? খুলনার বাস্তবতা বলছে অন্য কথা
খুলনায় ডেঙ্গু রোগীর চাপে ধারণক্ষমতার বাইরে হাসপাতালগুলো।

একটি মশা খুব বেশি কিছু চায় না—একটু পানি, একটু উষ্ণতা, আর কয়েক দিন সময়। আশ্চর্যের বিষয়, এই সামান্য তিনটি জিনিস আমরা তাকে কত সহজেই দিয়ে দিই। ডেঙ্গুর গল্প তাই শুধু এডিস মশার গল্প নয়। এটি আসলে আমরা কেমন শহর বানিয়েছি, কীভাবে বৃষ্টির পানি সামলাই, কীভাবে বর্জ্য ফেলি, নির্মাণ করি, হাসপাতাল প্রস্তুত রাখি এবং বিপদ আসার আগে কতটা বুঝতে পারি—তার গল্প।

সংখ্যার আড়ালে যে শহর

খুলনার দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা বিভাগে এ বছর ৯,১০৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শুধু একদিনেই নতুন করে হাসপাতালে গেছেন ৩০২ জন। খুলনা জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩,৪০৩; এর মধ্যে ২,০০৭ জনই চিকিৎসা নিয়েছেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। একই সময়ে বিভাগে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৩০ জনের।

সংখ্যাগুলো আসলে কী বলছে? বলছে, ডেঙ্গু এখন আর ‘মশার মৌসুমে একটু সাবধান’ ধরনের কোনো বিষয় নয়। এটি এমন একটি রোগ, যার বিস্তার আমাদের শহরের কাঠামোর সঙ্গে মিশে গেছে।

শুধু ‘পরিষ্কার রাখুন’ বললেই কি চলে

আমরা সাধারণত বলি—বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন। কথাটি সত্য, কিন্তু অসম্পূর্ণ। একজন মানুষ তাঁর বাড়ির টবের পানি ফেলে দিতে পারেন, কিন্তু পাশের নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে জমে থাকা পানি তিনি সরাতে পারেন না। নিজের বারান্দা পরিষ্কার রাখতে পারেন, কিন্তু রাস্তার পাশে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার বা বন্ধ ড্রেনের দায় একা নিতে পারেন না। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব যখন কেবল নাগরিকের ঘাড়ে চাপানো হয়, তখন সমস্যার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।

হাসপাতাল কেন রোগীর পরে প্রস্তুত হয়

খুলনার হাসপাতালগুলোর সাম্প্রতিক চিত্র সেই অদৃশ্য অংশটিকেই দৃশ্যমান করেছে। আগস্টে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গুর জন্য নির্ধারিত ২৫টি শয্যার বিপরীতে ৬১ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪০টি শয্যার বিপরীতে রোগী ছিলেন ১১৩ জন। কোথাও রোগীকে শিশু ওয়ার্ডে, কোথাও মেঝে বা বারান্দায় রাখতে হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে—হাসপাতাল কেন সবসময় রোগীর পরে প্রস্তুত হয়? ডেঙ্গু হঠাৎ এসে পড়া কোনো ভূমিকম্প নয়। এর প্রকৃতি সম্পর্কে আমরা বহু বছর ধরে জানি। বৃষ্টি বাড়বে, তাপমাত্রা বাড়বে, এডিসের প্রজনন বাড়বে, রোগী বাড়বে—এই ধারাটিও অজানা নয়। তবু যদি রোগী বাড়ার পর শয্যা বাড়াতে হয়, তাহলে বোঝা যায় আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে প্রতিরোধমূলক নয়, প্রতিক্রিয়াশীল।

বদলে যাচ্ছে রোগের ক্যালেন্ডার

জলবায়ু পরিবর্তন এই সমস্যাকে আরও কঠিন করে তুলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গু একসময় মৌসুমি ও মূলত নগরকেন্দ্রিক রোগ হলেও এখন তা বছরজুড়ে এবং দেশব্যাপী হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। ২০২৩ সালে দেশে ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত এবং ১,৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল—দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব। সংস্থাটি এখন রোগ নজরদারিতে জলবায়ুর তথ্য যুক্ত করে আগাম সতর্কতা তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎ জলবায়ু শুধু গরম বাড়াচ্ছে না, এটি রোগের ক্যালেন্ডারও বদলে দিচ্ছে।

মৌসুমি অভিযান, সারাবছরের সমস্যা

আর এখানেই আমাদের পুরোনো পদ্ধতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আমরা ডেঙ্গুকে এখনো অনেকটা মৌসুমি অভিযান দিয়ে মোকাবিলা করি। বর্ষা এলে ফগিং, মাইকিং, লিফলেট, পরিষ্কার অভিযান। অথচ মশা কোনো সরকারি ক্যালেন্ডার মানে না। একটি এলাকায় আজ লার্ভা পাওয়া গেল, কাল তা সরানো হলো কি না—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। কোন ওয়ার্ডে রোগী বাড়ছে, কোথায় প্রজননস্থল বেশি, কোন নির্মাণস্থলে বারবার একই সমস্যা হচ্ছে—এই তথ্য যদি প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে না আসে, তাহলে ফগিং অনেক সময় দৃশ্যমান কাজ হয়, কার্যকর কাজ নয়।

খুলনাতেও এখন মশক নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়া হচ্ছে; নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডকে তিনটি জোনে ভাগ করে অভিযান, ফগিং এবং প্রজননস্থল শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই উদ্যোগের মধ্যেই একটি প্রশ্ন লুকিয়ে আছে—এটি কি আগাম প্রস্তুতি, নাকি রোগী বাড়ার পর জরুরি প্রতিক্রিয়া?

সমস্যাটি আরও গভীর। ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকের দায়িত্ব অবশ্যই আছে। কিন্তু নাগরিককে শুধু বলা ‘পানি জমতে দেবেন না’ যথেষ্ট নয়। তাঁকে এমন নগরব্যবস্থা দিতে হবে যেখানে বর্জ্য পড়ে থাকবে না, নির্মাণস্থল নজরদারির বাইরে থাকবে না, বৃষ্টির পানি দীর্ঘদিন আটকে থাকবে না এবং রোগের তথ্য সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছাবে। একইভাবে হাসপাতালের দায়িত্বও শুধু রোগী ভর্তি করা নয়। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে কখন রোগী সংকটাপন্ন হতে পারে, জ্বর কমার পরও কেন নজরদারি জরুরি—এসব বিষয়ে দ্রুত শনাক্তকরণ ও পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ডেঙ্গুর চিকিৎসা শুরু হয় হাসপাতালের বিছানায়, কিন্তু ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হওয়া উচিত তার অনেক আগে।

মশা মারা নয়, জন্মানো ঠেকানো

তাহলে করণীয় কী? আমাদের ডেঙ্গু নীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হতে পারে ‘মশা মারা’ থেকে ‘মশা জন্মানোর সুযোগ কমানো’য় যাওয়া। প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত প্রজননস্থল ম্যাপিং, নির্মাণাধীন ভবনে বাধ্যতামূলক নজরদারি, বৃষ্টির পর দ্রুত পানি অপসারণ, স্থানীয় পর্যায়ে রোগের তথ্য প্রকাশ এবং হাসপাতালের আগাম প্রস্তুতি—এসবকে একই ব্যবস্থার অংশ করতে হবে। জলবায়ু ও রোগের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে কোথায় কখন ঝুঁকি বাড়তে পারে, সেই পূর্বাভাসও কাজে লাগাতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের জলবায়ু ও স্বাস্থ্য কাঠামোও নজরদারি, আগাম সতর্কতা, স্বাস্থ্যকর্মীর সক্ষমতা এবং স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন খাতের সমন্বিত ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই—আমরা রোগটিকে মশার সমস্যা ভাবি বলে মশা মারতে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু ডেঙ্গু আসলে আমাদের ব্যবস্থার সমস্যা বলে প্রশ্নটি হওয়া উচিত—কেন একটি মশা এত সহজে আমাদের শহরে বেঁচে থাকার জায়গা পেয়ে যায়? একটি এডিস মশা কয়েক মিলিলিটার পানিতে জন্ম নিতে পারে। কিন্তু তার পেছনে থাকে একটি বাড়ির অসচেতনতা, একটি নির্মাণস্থলের অব্যবস্থা, একটি শহরের দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, একটি দেরিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং কখনো কখনো একটি অপ্রস্তুত হাসপাতাল।

তাই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সত্যিকারের বিজয় মানে শুধু এ বছর কতজন কম আক্রান্ত হলো, তা নয়। সত্যিকারের বিজয় হবে সেই দিন, যেদিন একটি শহর রোগী বাড়ার অপেক্ষা না করে রোগের জন্ম নেওয়ার আগেই তাকে দেখতে শিখবে। কারণ মশাটি ছোট। কিন্তু তাকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থাটি অনেক বড়।

মোট শেয়ারমোঃ: 1

পোস্টটি কেমন লাগলো?

মন্তব্য করুন

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো * দ্বারা চিহ্নিত।

সম্পর্কিত খবর

সাম্প্রতিক খবর

সর্বাধিক পঠিত