“সুইচটা আমাদের হাতে, বিদ্যুৎটা কেন আমাদের হাতে নেই?”
রাতে হঠাৎ ঘরের বাতি নিভে গেলে আমরা প্রথমে সুইচটা দেখি। তারপর ঘড়ি। তারপর হয়তো পাশের বাড়ির আলো জ্বলছে কি না, সেটাও দেখি। কয়েক মিনিট পর মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বলে ওঠে। অথচ যে সুইচটি টিপে আমরা আলো চাই, সেই আলোর নিশ্চয়তা আমাদের হাতে নেই। বিদ্যুৎ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত আমাদের, কিন্তু বিদ্যুৎ পাওয়ার নিশ্চয়তা অনেক বড় এক ব্যবস্থার হাতে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৩২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। অথচ চলতি বছরে সর্বোচ্চ প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট।
এই দুটি সংখ্যা পাশাপাশি রাখলেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—আমাদের কি আসলে বিদ্যুতের ঘাটতি, নাকি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎব্যবস্থার ঘাটতি?
একটি সংখ্যার আড়ালে লুকানো শৃঙ্খল
একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামের পাশে কয়েকশ মেগাওয়াট লেখা থাকলেই সেই বিদ্যুৎ প্রয়োজনের মুহূর্তে পাওয়া যায় না। কেন্দ্র চালাতে জ্বালানি লাগে, জ্বালানি আনতে অবকাঠামো লাগে, আমদানি করতে বৈদেশিক মুদ্রা লাগে, আর উৎপাদিত বিদ্যুৎ মানুষের ঘরে পৌঁছাতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা। অর্থাৎ বিদ্যুতের সুইচটি দেয়ালে থাকলেও তার পেছনে কাজ করে একটি দীর্ঘ ও জটিল শৃঙ্খল।
সাম্প্রতিক গ্যাস সংকট এই সত্যটিই নির্মমভাবে দেখিয়েছে। আগস্টের শুরুতে ১৪৩টি তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬২টি জ্বালানি সংকটে ছিল। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার পর এক সপ্তাহে দৈনিক গড় বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩২০ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ১,৪৮২ মেগাওয়াটে ওঠে, আর কিছু দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াটও ছাড়িয়ে যায়।
অর্থাৎ আমাদের বিদ্যুতের সুইচ ঘরের দেয়ালে, কিন্তু সেই সুইচের পেছনের শক্তির একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রা, সমুদ্রপথ এবং ভূরাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
আদানি-রামপাল: একটি কেন্দ্র বন্ধ হলেই যে চাপ পড়ে
সম্প্রতি একটি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালের সমস্যায় গ্যাস সরবরাহ কমে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনও চাপে পড়েছিল। ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর সরবরাহ কমে যায়; ইউনিটটি চালু হওয়ার দিনই রামপালের আরেকটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জাতীয় চাহিদা ছিল ১৫,২৮০ মেগাওয়াট, সরবরাহ ছিল ১৪,৬১০ মেগাওয়াট—ঘাটতি ৬৭০ মেগাওয়াট।
এই অস্থিরতা থামেনি। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্যমতে, কয়লাসংকটে আদানির গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট আবারও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর—টানা দুই দিন দেশে লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। বিপিডিবি জানিয়েছে, ইউনিটটি পুনরায় চালু হতে আরও চার দিন সময় লাগবে। একটি একক কেন্দ্রের সমস্যাই কীভাবে পুরো জাতীয় গ্রিডকে নাড়িয়ে দিতে পারে, এই ঘটনাক্রম তারই সবচেয়ে সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত।
এখানে তাই প্রশ্নটি শুধু “বিদ্যুৎ কোথায়?” নয়; প্রশ্ন হলো, “আমাদের বিদ্যুৎব্যবস্থা কতটা স্থিতিস্থাপক?” কারণ একটি ভালো বিদ্যুৎব্যবস্থা শুধু বেশি উৎপাদন করে না; একটি উৎস ব্যর্থ হলে অন্য উৎস দিয়ে সামলায়, জ্বালানির দাম বাড়লে ধাক্কা সামলায়, আন্তর্জাতিক সংকট এলে দেশকে অন্ধকারে ঠেলে দেয় না।
ভোক্তার পকেট থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার—দুদিক থেকেই চাপ
তার চেয়েও বড় কথা, ভোক্তা বিদ্যুতের জন্য মূল্য দিচ্ছে, আবার রাষ্ট্রও ভর্তুকি দিচ্ছে। জুন ২০২৬ থেকে খুচরা বিদ্যুতের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা করা হয়েছে, এরপরও বিপিডিবির বার্ষিক ভর্তুকির প্রয়োজন ধরা হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা।
তাহলে সংকটটা শুধু বিদ্যুতের নয়—এটি জ্বালানি-নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সংকট। আমাদের এখন বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা গোনার চেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে, কতটা নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ আমরা দিতে পারি—তার হিসাব করা।
সমাধান কোন পথে
সমাধান তাই শুধু আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানির উৎস বহুমুখী করতে হবে; সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বাড়াতে হবে; সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বিদ্যুৎ পরিকল্পনাকে শুধু “কত মেগাওয়াট উৎপাদন হবে” দিয়ে নয়, “কত ঘণ্টা নির্ভরযোগ্যভাবে সরবরাহ করা যাবে” দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।
বিদ্যুৎ না থাকা মানে শুধু একটি ঘর অন্ধকার হওয়া নয়। একটি কারখানার উৎপাদন থামে, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আয় কমে, একজন শিক্ষার্থীর পড়া থামে, হাসপাতালের ঝুঁকি বাড়ে। বিদ্যুৎ সংকট তাই ধীরে ধীরে অর্থনীতির ওপরও অদৃশ্য করের মতো চাপ ফেলে।
সুইচটি অবশ্যই আমাদের হাতে থাকবে। কিন্তু সেই সুইচ টিপলে আলো জ্বলবে কি না—তার সিদ্ধান্ত যেন আর দোহা, হরমুজ প্রণালি, এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজার কিংবা কোনো দূরদেশের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ত্রুটির হাতে না থাকে। যতদিন এই নিয়ন্ত্রণ সত্যিকার অর্থে আমাদের নিজেদের হাতে না আসবে, ততদিন প্রতিটি অন্ধকার ঘর আসলে একটি নীরব প্রশ্ন তুলে যাবে—এত বছর পরও কেন আমাদের আলো জ্বলা-নেভা নির্ভর করে অন্যের সিদ্ধান্তের ওপর? কারণ বিদ্যুৎ নিছক আলো নয়; এটি একটি জাতির জ্বালানি-স্বাধীনতার সবচেয়ে দৃশ্যমান ও নির্মম পরীক্ষা।













মন্তব্য করুন