জীববৈচিত্র্যের মঞ্চে আর্মেনিয়ার খনির ছায়া
রুশ অর্থনীতিবিদ ভ্লাদিস্লাভ ইনোজেমৎসেভের মতে, জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ১৭-এর আয়োজক আর্মেনিয়ার নিজের পরিবেশ রেকর্ডই দুর্বল। ইয়েল সূচকে দেশটি ৭৫তম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১৬৪তম। সম্মেলনের কয়েক দিন আগে বিতর্কিত আমুলসার সোনার খনি চালু করেছে আর্মেনিয়া। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। আর্মেনিয়ার অর্থনীতিমন্ত্রীর দাবি, প্রকল্পটি জিডিপিতে দেড় থেকে ২ শতাংশ যোগ করতে পারে, আর বছরে বাজেটে প্রায় ১৩ কোটি ডলার। বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য অর্থায়নও লক্ষ্যের চেয়ে পিছিয়ে। ক্যালি ফান্ডে জমা পড়েছে মাত্র ৬ হাজার ডলার।#COP17 #Armenia #Biodiversity #Environment #MeehaNews

গত সপ্তাহান্তে ইয়েরেভানে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের (Convention on Biological Diversity) পক্ষগুলোর ১৭তম সম্মেলন, কপ১৭ (COP17)-এর সূচনা হয়েছে। এই প্রথম কোনো সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র এই সম্মেলনের আয়োজন করল। আর্মেনীয় সরকার ঘটনাটিকে পরিবেশ সুরক্ষায় নিজেদের নেতৃস্থানীয় দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে দেখছে। তবে পরিবেশ ক্ষেত্রে আর্মেনিয়ার নিজের অতীত রেকর্ড এই ভূমিকার জন্য তাদের উপযুক্ততা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
২০২৪ সালে ইয়েরেভানকে কপ১৭ আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হলে আর্মেনীয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তটিকে দেশটির পরিবেশগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্বীকৃতি হিসেবে উদ্যাপন করেছিল। অথচ কার্যকর সংরক্ষণ নীতিমালা প্রণয়নে আর্মেনিয়া কয়েক দশক ধরেই হিমশিম খাচ্ছে, আর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান এখনো দুর্বল।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশগত কর্মক্ষমতা সূচক (Environmental Performance Index) অনুযায়ী, ১৭৭টি দেশের মধ্যে আর্মেনিয়ার অবস্থান ৭৫তম। অথচ একই অঞ্চলের আরেক সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র এস্তোনিয়া তালিকার শীর্ষে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আর্মেনিয়ার অবস্থান ১৬৪তম, বর্জ্যপানি শোধনে ১৬৫তম। এই পরিসংখ্যান মৌলিক পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুতর ঘাটতির দিকেই ইঙ্গিত করে।
এই বৈপরীত্য একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন সামনে আনে: যে দেশ নিজেই গুরুতর পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তাকে কেন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে বেছে নেওয়া হলো? এই নির্বাচন হয়তো পরিবর্তনের সুযোগ হতে পারত। কিন্তু উপলক্ষটিকে কাজে লাগিয়ে দেশটির দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলো সমাধানে আর্মেনীয় কর্তৃপক্ষ কোনো উদ্যোগ নিয়েছে, এমন লক্ষণ তেমন দেখা যায় না।
খনিনির্ভর অর্থনীতি
আর্মেনিয়ার অর্থনীতির কাঠামো একটি বড় বাধা, যেখানে খনিশিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি রয়েছে পুরোনো শিল্প অবকাঠামো আর অপর্যাপ্ত পরিবেশ নীতিমালা। জাঙ্গেজুর (Zangezur), আগারাক (Agarak) ও তেঘুতের (Teghut) মতো তামা-মলিবডেনাম খনিসহ দেশটির বৃহত্তম খনি প্রকল্পগুলোতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে (open-pit mining) আকরিক তোলা হয়। এতে প্রচুর বর্জ্য তৈরি হয়, যা মারাত্মক দূষণের ঝুঁকি তৈরি করে। বিশ্বব্যাংক আর্মেনিয়ায় পরিবেশদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে খনিশিল্পকে চিহ্নিত করেছে।
এ ছাড়া মেঘরাসারে (Meghrasar) উন্মুক্ত পদ্ধতিতে সোনা তোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এলাকাটি আগে আরেভিক জাতীয় উদ্যানের (Arevik National Park) অংশ ছিল, কিন্তু ২০১৫ সালে সরকার উদ্যানের সীমানা কমিয়ে ফেলায় এটি এখন বাইরে পড়েছে। আর্তসভানিক (Artsvanik) টেইলিংস রিজার্ভারে, অর্থাৎ খনিবর্জ্য জমা রাখার আধারে, লাখ লাখ টন খনিবর্জ্য জমা আছে, যা কাছের জলাশয়গুলোতে ভারী ধাতুর দূষণ ঘটাচ্ছে।
আর্মেনিয়ার পরিবেশ সমস্যা কেবল খনিশিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির মাত্র ১১ দশমিক ১ শতাংশ এলাকা বনভূমি। রাজধানী ইয়েরেভানে ক্ষতিকর সূক্ষ্ম বস্তুকণার দূষণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
আর্মেনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য পরিবেশ নীতিমালা জোরদারের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করেছে। এই কোম্পানিগুলো কেবল বড় বিনিয়োগকারী বা কর্মসংস্থানের উৎস নয়, রাষ্ট্রীয় বাজেটেও বড় অঙ্কের অবদান রাখে। ফলে তাদের কার্যক্রম রক্ষায় সরকারের সামনে শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রণোদনা কাজ করে। জাঙ্গেজুর তামা-মলিবডেনাম কমপ্লেক্সে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগকারীদের নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারি রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এই প্রতিষ্ঠানই ছিল আর্মেনিয়ার সবচেয়ে বড় করদাতা।
সম্মেলনের আগে আমুলসার বিতর্ক
অর্থনৈতিক স্বার্থ আর পরিবেশ সুরক্ষার এই দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে কপ১৭ সম্মেলনের ঠিক কয়েক দিন আগে, যখন আর্মেনিয়া বিতর্কিত আমুলসার (Amulsar) সোনার খনির কার্যক্রম উদ্বোধন করে। গ্লোবাল ফরেস্ট কোয়ালিশন (Global Forest Coalition) এবং আর্মেনিয়ার বিভিন্ন নাগরিক সমাজ সংগঠনসহ পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলো এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, এতে দীর্ঘদিনের পরিবেশগত উদ্বেগ উপেক্ষা করা হয়েছে এবং বার্ন কনভেনশনের (Bern Convention) সুপারিশ অগ্রাহ্য করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, আমুলসার প্রকল্পের বিরুদ্ধে যাঁরা প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাঁদের ভয় দেখানো হচ্ছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে।
আর্মেনিয়ার অর্থনীতিমন্ত্রী অর্থনৈতিক যুক্তিতে প্রকল্পটিকে সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, এটি দেশের জিডিপিতে দেড় থেকে ২ শতাংশ অবদান রাখতে পারে এবং কর ও অন্যান্য খাতে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় বাজেটে প্রায় ১৩ কোটি ডলার যোগ করতে পারে। এই প্রত্যাশিত রাজস্ব সরকারের খনিশিল্প সম্প্রসারণের সংকল্প আর আর্মেনিয়াকে জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক নেতৃস্থানীয় দেশ হিসেবে তুলে ধরার উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যকার বৈপরীত্যকে উন্মোচিত করে।
এই পরস্পরবিরোধী অগ্রাধিকার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আর্মেনিয়া এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে এবং মস্কো থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছে। “ইইউ-আর্মেনিয়া কৌশলগত এজেন্ডা”-য় পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ-সংক্রান্ত আইনের কার্যকর প্রয়োগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং বায়ুর মান, পানি সুরক্ষা ও শিল্পকারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণে আরও পদক্ষেপের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতর সমন্বয়ে আর্মেনিয়ার চেষ্টা মূল্যায়নের সময় এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতিকেই মূল বিবেচ্য হিসেবে গণ্য করা উচিত।
ইয়েরেভানের টেবিলে বৈশ্বিক ঘাটতি
কপ১৭-এ বিভিন্ন দেশের সরকার কুনমিং-মন্ট্রিয়ল বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোর (Kunming-Montreal Global Biodiversity Framework) অধীনে অর্জিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করছে। এই কাঠামোর লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকৃতি ধ্বংসের প্রক্রিয়া থামানো এবং তা উল্টে দেওয়া। আশা করা হচ্ছে, সম্মেলনে লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে একটি “ইয়েরেভান পাথওয়ে” (Yerevan Pathway) চূড়ান্ত হবে।
তবে পরিস্থিতি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। সম্মেলনের আগে প্রকাশিত “স্টেট অব বায়োডাইভার্সিটি অ্যাকশন” (State of Biodiversity Action) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মূল্যায়ন করা জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম সঠিক পথে আছে। অর্থায়নও বড় বাধা হয়ে আছে। উন্নত দেশগুলো আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য অর্থায়নে বছরে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার দিয়েছে, যা ২০২৫ সালের জন্য নির্ধারিত ২ হাজার কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। প্রকৃতি থেকে পাওয়া জিনগত উপাত্ত ব্যবহার করে মুনাফা করা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বছরে ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহের জন্য গঠিত হয়েছিল ক্যালি ফান্ড (Cali Fund)। তাতে এখন পর্যন্ত জমা পড়েছে মাত্র ৬ হাজার ডলার। এই ঘাটতিগুলো দেখায়, জীববৈচিত্র্যের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে সরকারগুলো কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে।
কপ১৭-এর আয়োজক হিসেবে আর্মেনিয়াকে প্রমাণ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে, ইয়েরেভানে যেসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা তাদের নিজের খনিশিল্প, পরিবেশ নীতিমালা এবং সংরক্ষণকর্মীদের প্রতি আচরণেও সমানভাবে প্রযোজ্য। অংশগ্রহণকারী সরকারগুলোর উচিত সম্মেলনকে কাজে লাগিয়ে আর্মেনীয় কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ দেওয়া, যাতে তারা পরিবেশ সুরক্ষা জোরদার করে, দূষণ নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করে, পরিবেশগত প্রভাবের বিশ্বাসযোগ্য মূল্যায়ন নিশ্চিত করে এবং আমুলসারের মতো প্রকল্প নিয়ে নাগরিক সমাজের তোলা উদ্বেগের সমাধান করে।
লেখাটি ২৪ অক্টোবর ২০২৬ আল-জাজিরায় প্রকাশিত ভ্লাদিস্লাভ ইনোজেমৎসেভের মতামত “COP17 puts Armenia’s environmental record in the spotlight” থেকে অনূদিত। এখানে প্রকাশিত মত লেখকের নিজস্ব।





