দেশবন্ধুর বেঙ্গল প্যাক্ট, সম্প্রীতির এক অসমাপ্ত দলিল

১৯২৩ সালের শীত। বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচনে ১৩৯টি আসনের ৪৬টি জিতে সবচেয়ে বড় দল হয়ে উঠেছে স্বরাজ্য দল। গভর্নর লর্ড লিটন মন্ত্রিসভা গড়ার প্রস্তাব দিলেন। দলের নেতা চিত্তরঞ্জন দাশ সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। তিনি বেছে নিলেন কঠিনতর পথ: বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সঙ্গে একটি লিখিত বোঝাপড়া। ডিসেম্বরের শুরুতে শর্তগুলো চূড়ান্ত হয়। ১৬ ডিসেম্বর স্বরাজ্য দলের কাউন্সিলররা আর ১৮ ডিসেম্বর বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি তা অনুমোদন করে। ইতিহাসে এর নাম বেঙ্গল প্যাক্ট।
বাংলাপিডিয়ায় প্যাক্টের শর্তগুলো স্পষ্ট লেখা আছে:
আইন পরিষদে প্রতিনিধিত্ব হবে জনসংখ্যার অনুপাতে।
সরকারি চাকরির ৫৫ শতাংশ পাবেন মুসলমানেরা। সেই অনুপাতে না পৌঁছানো পর্যন্ত নতুন নিয়োগের ৮০ শতাংশ যাবে মুসলমানদের, ২০ শতাংশ হিন্দুদের।
মসজিদের সামনে শোভাযাত্রায় বাজনা বাজানো যাবে না।
ধর্মীয় কারণে গরু কোরবানিতে হস্তক্ষেপ করা হবে না।
যে বাংলায় মুসলমানেরা সংখ্যায় বেশি হয়েও অফিস-আদালতে ছিলেন প্রান্তে, সেখানে এই প্রতিশ্রুতি ছিল এক বড় স্বীকৃতি। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, বাংলার মুসলমানেরা ব্যাপকভাবে প্যাক্টটিকে স্বাগত জানান।
দেশবন্ধুর যুক্তি ছিল এক বাক্যের: হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য ছাড়া স্বরাজ আসবে না। কিন্তু সেই সত্য মেনে নেওয়ার মতো উদারতা সবার ছিল না। মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজের একাংশ প্রভাব হারানোর ভয়ে প্যাক্টের বিরোধিতা করে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আর বিপিনচন্দ্র পাল দাঁড়ালেন বিপক্ষে। হিন্দু পত্রপত্রিকা প্রচার চালাল, দেশবন্ধুর বিরুদ্ধে উঠল মুসলমান-তোষণের অভিযোগ। ডিসেম্বরেই কোকনদে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে প্যাক্টটি নাকচ হয়ে যায়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মুসলমানেরা সেই সিদ্ধান্তকে “অদূরদর্শী ও আগ্রাসী স্বার্থপরতা” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তবু দেশবন্ধু হাল ছাড়েননি। পাশে ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, বীরেন্দ্রনাথ শাসমলেরা। ১৯২৪ সালের জুনে সিরাজগঞ্জে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে তিনি আবার প্যাক্ট অনুমোদনের চেষ্টা করেন।
১৯২৫ সালের জুনে মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে দেশবন্ধুর মৃত্যু হলো, আর তাঁর সঙ্গেই যেন মরে গেল প্যাক্টের প্রাণ। অনুসারীদের কেউ কেউ প্যাক্ট অস্বীকার করলেন। মুসলিম রাজনীতিকেরা কংগ্রেস থেকে দূরে সরে গেলেন। ১৯২৬ সালে গঠিত হলো ইনডিপেনডেন্ট মুসলিম পার্টি, প্রদেশে ফিরে এল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। পরের দুই দশকে বাংলা যে বিভাজনের পথে হেঁটেছে, অনেকে তার এক বড় বাঁক দেখেন এই ব্যর্থতায়।
১৮৭০ সালের ৫ নভেম্বর কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই আইনজীবীর আদি নিবাস মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরে। ১৯০৮ সালে তিনি আদালতে অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে লড়েছিলেন, অরবিন্দ খালাস পান। পরে তিনি কলকাতা করপোরেশনের প্রথম মেয়র হন। তবু বাংলার মুসলমানের কাছে দেশবন্ধুর সবচেয়ে বড় পরিচয় সেই অসমাপ্ত দলিল, যেখানে একজন হিন্দু নেতা প্রকাশ্যে মেনে নিয়েছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের ন্যায্য হিস্যা ছাড়া স্বাধীনতার কোনো মানে নেই। আজ বৃহস্পতিবার তাঁর জন্মের ১৫৬ বছর।
ইতিহাসে আজকের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
১৫৫৬: পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে মোগল বাহিনী হিমুকে পরাজিত করে। তেরো বছরের কিশোর আকবর আর তাঁর অভিভাবক বৈরাম খানের নেতৃত্বে এই জয়ে দিল্লি ও আগ্রা আবার মোগলদের হাতে আসে। এখান থেকেই শুরু আকবরের সাম্রাজ্য গড়ার পথ। সেই সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবেই পরে সুবা বাংলা গড়ে ওঠে।
১৮৮৮: লোকসাহিত্য সংগ্রাহক আশুতোষ চৌধুরীর জন্ম, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর কাবুরখিল গ্রামে। ১৯২৫ সালে দীনেশচন্দ্র সেনের সুপারিশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে লোকগীতি সংগ্রাহক নিয়োগ করে। চট্টগ্রামের নানা অঞ্চল থেকে তিনি পালাগান সংগ্রহ করেন, যার মধ্যে আছে ‘নিজাম ডাকাতের পালা’ আর ‘কমল সদাগরের পালা’। এগুলো প্রকাশিত হয় দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’য়। মৃত্যু ১৯৪৪ সালে।
২০১১: উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী ভূপেন হাজারিকা মুম্বাইয়ে মারা যান। তাঁর গাওয়া ‘মানুষ মানুষের জন্য’ বাংলাদেশে এক জনমত জরিপে জাতীয় সংগীতের পর দ্বিতীয় প্রিয় গান নির্বাচিত হয়েছিল। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা দেয়।




