গণপরিষদে বাংলার প্রথম কণ্ঠ, ময়নামতিতে শেষ নিশ্বাস

করাচি, ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন শুরু হয়েছে ২৩ ফেব্রুয়ারি। পরিষদের কাজ চলবে ইংরেজি আর উর্দুতে, এমনই ঠিক হয়ে আছে। তখন উঠে দাঁড়ালেন পূর্ব বাংলা থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস দলের এক সদস্য, বয়স একষট্টি। প্রস্তাব দিলেন, পরিষদের ভাষার তালিকায় বাংলাকেও রাখা হোক। যুক্তিটা ছিল সরল হিসাবের: পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখই পূর্ব পাকিস্তানের, তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আর পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বিরোধিতা করলেন। প্রস্তাব নাকচ হলো। সেই মানুষটির নাম ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
প্রস্তাব নাকচ হলো ঠিকই, কিন্তু বাংলার মাটিতে তার প্রতিধ্বনি থামানো গেল না। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, এ খবরে পূর্ব বাংলার ছাত্র, বুদ্ধিজীবী আর রাজনীতিকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। মুসলিম লীগের মুখপত্র বলে পরিচিত দৈনিক আজাদও প্রস্তাব নাকচকারী রাজনীতিকদের সমালোচনা করে। ১১ মার্চ পূর্ব বাংলার শহরগুলোতে ধর্মঘট পালিত হয়। গ্রেপ্তার হন শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমানসহ তরুণ নেতারা। যে দাবি করাচিতে একজন হিন্দু আইনজীবীর কণ্ঠে উঠেছিল, ঢাকার রাজপথে তা তুলে নিয়েছিল মুসলমান ছাত্রসমাজ। ভাষার প্রশ্নে বাংলার হিন্দু-মুসলমান সেদিন এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল। চার বছর পর সেই ধারাই রক্তে রাঙিয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি।
ধীরেন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে তিন মাইল উত্তরে রামরাইল গ্রামে। ১৯১১ সাল থেকে কুমিল্লা জেলা বারে ওকালতি করতেন। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন, অসহযোগ আর ভারত ছাড় আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, একাধিকবার জেল খেটেছেন। ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য হয়ে কৃষকদের ঋণভার লাঘবের আইন প্রণয়নে কাজ করেন। পাকিস্তান আমলে ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত আতাউর রহমান খানের মন্ত্রিসভায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী ছিলেন। আইয়ুবের সামরিক শাসন তাঁকে এবডো (EBDO) আদেশে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় তাঁকে গৃহবন্দী রাখা হয়।
পাকিস্তানি শাসকেরা ১৯৪৮ সালের সেই দিনটি ভোলেনি। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার বাড়ি থেকে পঁচাশি বছরের বৃদ্ধ ধীরেন্দ্রনাথ আর তাঁর ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ময়নামতি সেনানিবাসে। সেখানে নির্যাতন করে তাঁদের হত্যা করা হয়। তাঁর কোনো কবর নেই, মৃত্যুর নির্দিষ্ট তারিখও কেউ জানে না। কুমিল্লায় তাঁর বাড়ির সামনের সড়কটি আজ তাঁর নামে। ভাষার প্রশ্নে যে মানুষটি প্রথম সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন, স্বাধীনতার প্রথম প্রহরেই তিনি শহীদ হলেন। আজ সোমবার তাঁর জন্মের ১৪০ বছর পূর্ণ হলো।
ইতিহাসে আজকের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
১৯০৯: কবি ও অনুবাদক অরুণ মিত্রের জন্ম, যশোরে। ফরাসি কবিতার অনুবাদে তিনি বিশেষভাবে খ্যাত, ভলতেয়ারের ‘কাঁদিদ’ও বাংলায় অনুবাদ করেছেন। ‘খুঁজতে খুঁজতে এত দূর’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৮৬ সালে ভারতের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। মৃত্যু ২০০০ সালে, কলকাতায়।
১৯৩৫: কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম, ময়মনসিংহে। ‘মানবজমিন’ উপন্যাসের জন্য ১৯৮৯ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। ‘দূরবীন’, ‘পার্থিব’, ‘হীরের আংটি’ তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। আজ তিনি ৯১ বছরে পা দিলেন।
১৯৭৪: প্রাবন্ধিক ও জীবনীকার মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর মৃত্যু, ঢাকায়। বাংলা ভাষায় মুসলিম ঐতিহ্য ও ইসলামের ইতিহাস চর্চায় তিনি অগ্রণী নাম। লিখেছেন:
‘পারস্য প্রতিভা’
‘মানুষের ধর্ম’
‘কারবালা ও ইমাম বংশের ইতিহাস’
‘নয়া জাতির স্রষ্টা হযরত মুহম্মদ’
‘বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ধারা’
১৯৫৫ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমির পরিচালক ছিলেন। ১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান।




