এক শ এক বছরের কোম্পানি-রাজের শেষ দিন

১৭৫৭ সালের জুনে পলাশীর আমবাগানে যে সূর্য অস্ত গিয়েছিল, তার পরের এক শ এক বছর বাংলা শাসন করেছে একটি বণিক কোম্পানি। সেই কোম্পানি-রাজের সমাপ্তি ঘোষিত হয় ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর। সেদিন এলাহাবাদে বসেছিল এক জাঁকালো দরবার। গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং পাঠ করলেন মহারানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসনভার গেল সরাসরি ব্রিটিশ রাজশক্তির হাতে। কোম্পানির নিজস্ব সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে মিশিয়ে দেওয়া হলো ব্রিটিশ বাহিনীতে। ঘোষণায় বলা হলো, শাসনের ভিত্তি হবে ধর্মীয় সহনশীলতা, আর যোগ্যতা থাকলে জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সবাই সরকারি চাকরি পাবে।
এই ঘোষণা দয়া থেকে আসেনি, এসেছিল ভয় থেকে। এক বছর আগের মহাবিদ্রোহ লন্ডনকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, বণিকের হাতে আর এ দেশ ধরে রাখা যাবে না। বাংলার মাটি সেই বিদ্রোহের সাক্ষী। ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের হাতে প্রথম স্ফুলিঙ্গ জ্বলে। নভেম্বরে আগুন পৌঁছায় পূর্ব বাংলায়। চট্টগ্রামে হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে, সিপাহি জামাল খানকে পাশে নিয়ে, দেশীয় পদাতিক বাহিনীর সিপাহিরা জেলখানা খুলে বন্দীদের মুক্ত করেন। কোষাগার দখল করেন, অস্ত্রাগারে আগুন দেন। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ ঘণ্টা বন্দরনগরী ছিল তাঁদের হাতে। তারপর ফেনী নদী পেরিয়ে, ত্রিপুরা আর সিলেটের পাহাড়-জঙ্গল ভেঙে তাঁদের দীর্ঘ যাত্রা। ১৮৫৮ সালের ৯ জানুয়ারি আকস্মিক এক হামলায় প্রায় ৭০ জন সিপাহি শহীদ হন। রজব আলী সঙ্গী কয়েকজনকে নিয়ে মণিপুরের অরণ্যে হারিয়ে যান। ব্রিটিশ নথি তাঁকে আর খুঁজে পায়নি।
চট্টগ্রামের খবর ঢাকায় পৌঁছানোর পর ২২ নভেম্বর লালবাগ কেল্লায় সিপাহিদের নিরস্ত্র করতে আসে নৌসেনার দল। সিপাহিরা অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানান, লড়াই হয়। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, তড়িঘড়ি গঠিত কোর্ট মার্শাল ১১ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, বাকিদের যাবজ্জীবন। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, পুরান ঢাকার আন্টাঘর ময়দানে বিদ্রোহীদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল। সেই মাঠই আজকের বাহাদুর শাহ পার্ক, নামকরণ হয়েছে নির্বাসিত শেষ মোগল সম্রাটের নামে।
ইতিহাসের সত্যটাও স্বীকার করা দরকার। বাংলাপিডিয়া বলছে, বাংলার জমিদার শ্রেণি সেদিন কোম্পানির পক্ষে ছিল। গরুর গাড়ি আর হাতি জুগিয়েছে, পালিয়ে যাওয়া সিপাহিদের খবর দিয়েছে, বদলে পেয়েছে নবাব আর রায়বাহাদুর খেতাব। প্রতিরোধ এসেছিল নিচ থেকে, সাধারণ সিপাহি আর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। সেই ধারা অবশ্য শুরু হয়েছিল আরও আগে। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা আর হাজী শরীয়তউল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন বাংলার মুসলমান কৃষককে আগেই শিখিয়েছিল মাথা উঁচু করতে। রজব আলী আর জামাল খানেরা সেই ধারারই উত্তরসূরি। আজ থেকে ১৬৮ বছর আগে যে ঘোষণা কোম্পানির পতাকা নামিয়েছিল, তার পেছনে লেখা আছে তাঁদের রক্ত।
ইতিহাসে আজকের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
১৮৭৩: নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের মৃত্যু। ১৮৬০ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘নীলদর্পণ’ নাটক নীলকরদের হাতে বাংলার চাষিদের দুর্দশা তুলে ধরেছিল। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করায় রেভারেন্ড জেমস লংকে জরিমানা করা হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র নাটকটির প্রভাবকে তুলনা করেছিলেন ‘আঙ্কল টমস কেবিন’-এর সঙ্গে।
১৯৩২: সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর জন্ম, কুমিল্লার মুনসেফবাড়িতে নানাবাড়িতে। ১৯৭৯ সালে তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব হন। ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন, পদত্যাগ করেন ২০০২ সালের ২১ জুন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ৯৪ বছর বয়সে তিনি মারা যান।
১৯৫০: ‘পথের পাঁচালী’র স্রষ্টা কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঘাটশিলায় মারা যান। গ্রামবাংলার প্রকৃতি আর মানুষের জীবন তাঁর লেখায় যেভাবে এসেছে, বাংলা সাহিত্যে তার তুলনা বিরল।
২০০৭: বাংলাদেশে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধনী এদিন থেকে কার্যকর হয়। এর ভিত্তি ছিল মাসদার হোসেন মামলায় ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের রায়। তখন ক্ষমতায় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার।




