মূল কনটেন্টে যান
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার ১২ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ৩০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
অনুসন্ধানী ও সর্বশেষ বাংলা সংবাদ
প্রবন্ধ

কন্যাশিশুর অধিকার: আগামী বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার

বাংলাদেশের স্কুলপড়ুয়া কন্যাশিশুরা বই হাতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাগ্রহণ করছে
শিক্ষার সুযোগ, নিরাপত্তা ও সমান অধিকারই কন্যাশিশুর সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের ভিত্তি।

একটি সমাজ কন্যাশিশুকে বড় হতে বলে, অথচ কখনো কখনো তার বড় হয়ে ওঠার সময়টুকুই কেড়ে নেয়। আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস তাই ক্যালেন্ডারের একটি তারিখে আটকে থাকার বিষয় নয়; এটি ঘরের সিদ্ধান্ত, বিদ্যালয়ের দরজা, পাড়ার নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বকে একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। মেয়েটি কী হতে চায়, সে প্রশ্নের আগে যদি জিজ্ঞেস করা হয়—তার বিয়ে কবে, তবে তার ভবিষ্যৎকে আমরা শুরুতেই ছোট করে ফেলি।

দিনের তাৎপর্য, প্রতিদিনের দায়

১১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালিত হয়। এই দিনের তাৎপর্য তখনই পূর্ণ হয়, যখন কন্যাশিশুকে করুণা বা পরিবারের বোঝা হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখা হয়। তার নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মত প্রকাশ এবং নিজের জীবন সম্পর্কে বয়সোপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ—এসব কোনো অনুগ্রহ নয়; এগুলো তার প্রাপ্য। ধানের চারা যেমন আলো, পানি ও যত্ন পেলে মাথা তোলে, তেমনি শিশুর সামর্থ্যও বিকশিত হয় নির্ভয় পরিবেশে।

আমাদের ঐতিহ্যে কন্যা কখনো ঘরের সম্মান, কখনো পরিবারের ভরসা, কখনো লোককথার সাহসী পথিক। সেই সম্মানের ভাষা সুন্দর, কিন্তু সম্মান যদি তার চলাফেরা, পড়াশোনা বা পছন্দের ওপর অযৌক্তিক বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা অধিকার রক্ষা করে না। চর্যাপদের দুর্বোধ্য পঙ্‌ক্তি থেকে আজকের শ্রেণিকক্ষ—বাংলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রা মনে করায়, ভাষা ও জ্ঞান তখনই বেঁচে থাকে, যখন নতুন প্রজন্ম তা নিজের কণ্ঠে বহন করতে পারে।

বাল্যবিয়ে: ভবিষ্যৎকে আগেভাগে থামিয়ে দেওয়া

বাল্যবিয়ে কোনো পরিবারের এক দিনের সিদ্ধান্তমাত্র নয়; এর পেছনে দারিদ্র্য, নিরাপত্তার ভয়, সামাজিক চাপ, শিক্ষার ব্যয় এবং মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংকীর্ণ ধারণা কাজ করতে পারে। অভিভাবকের উদ্বেগকে তুচ্ছ করলে চলবে না—অনেক পরিবার সত্যিই অনিশ্চয়তার মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু উদ্বেগের সমাধান শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়া হতে পারে না। অল্প বয়সে বিয়ে পড়াশোনার ধারাকে ভেঙে দিতে পারে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পথ সংকুচিত করতে পারে।

তাই প্রতিরোধের কাজ কেবল বিয়ের আয়োজনের দিন বাধা দেওয়ায় শেষ হয় না। বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি, জন্মনিবন্ধন, সামাজিক সুরক্ষা, স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি এবং পরিবারকে পাশে নিয়ে কথা বলা—সবকিছুর সমন্বয় দরকার। গ্রামের সালিশে যেমন জমির সীমানা নিয়ে কথা ওঠে, তেমনি শিশুর অধিকার নিয়েও স্পষ্ট কথা উঠুক; সামাজিক মর্যাদার নামে তার ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখা যাবে না।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তির দরজা

স্কুলে ভর্তি হওয়া সাফল্যের শুরু, শেষ নয়। নিরাপদ যাতায়াত, শৌচাগার, মাসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান, পুষ্টিকর খাবার, মানসিক স্বস্তি এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশ ছাড়া শিক্ষা পূর্ণ হয় না। অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া, নিজের শরীর সম্পর্কে নির্ভয়ে প্রশ্ন করা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া—এসব বিষয়কে লজ্জার আড়ালে রাখলে ক্ষতিটা শিশুকেই বহন করতে হয় (লজ্জা অনেক সময় সমস্যাকে আড়াল করে, সমাধানকে নয়)।

প্রযুক্তিও এখন শিক্ষার দরজা খুলতে পারে। মোবাইলের পর্দায় মেয়েটি বিজ্ঞান শিখতে পারে, নতুন ভাষা রপ্ত করতে পারে, দূরের শিক্ষকের ক্লাসে যোগ দিতে পারে; একই পর্দায় হয়রানি, প্রতারণা বা অনুপযুক্ত কনটেন্টের ঝুঁকিও আছে। তাই ফোন কেড়ে নেওয়া বা অবাধে ছেড়ে দেওয়া—দুটোর বদলে দরকার ডিজিটাল দক্ষতা, গোপনীয়তা বোঝানো, নিরাপদ ব্যবহার এবং পরিবারের বিশ্বাসভিত্তিক নজরদারি। সিল্ক রুটের কাফেলার মতো, জ্ঞানের এই নতুন পথেও গন্তব্যে পৌঁছাতে নিরাপদ পথ ও সহযাত্রী দরকার। প্রযুক্তি যেন জানালার মতো হয়—বাইরের পৃথিবী দেখাবে, শিশুকে একা ফেলে রাখবে না।

ভবিষ্যৎ গড়ার কাজ ঘর থেকেই

কন্যাশিশুর অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় ছেলেশিশুর বিরুদ্ধে কোনো দেয়াল তোলার দরকার নেই। সমতা মানে সুযোগের ন্যায্য বণ্টন; একজনের ডানা ছেঁটে অন্যজনকে ওড়ানো নয়। বাবা-মা ছেলেকে যেমন ঘরের কাজে অংশ নিতে শেখাবেন, মেয়েকেও তেমনি প্রশ্ন করতে, মত দিতে, সিদ্ধান্তের আলোচনায় থাকতে উৎসাহ দেবেন। শিক্ষক ভুল করলে শুধরে দেবেন, ভয় দেখিয়ে চুপ করাবেন না; সমাজ বিপদ দেখলে গুজব ছড়াবে না, সহায়তার পথ খুলবে।

একটি মেয়ের স্বপ্ন ডাক্তার, কৃষিবিজ্ঞানী, কারিগর, উদ্যোক্তা, শিক্ষক কিংবা শিল্পী হওয়া—যাই হোক, তার প্রথম প্রয়োজন নিরাপদে বেড়ে ওঠা এবং শেখার সুযোগ। বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর, চর থেকে পাহাড়—প্রতিটি জনপদে সেই সুযোগ পৌঁছানোই টেকসই ভবিষ্যতের শর্ত। কন্যাশিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া মানে পরিবারের উঠানে এমন একটি দরজা বানানো, যার ওপারে সে নিজের পথ নিজেই চিনতে শিখবে। দিবসের আলো একদিনের; সেই দরজাটি খোলা রাখতে হবে প্রতিদিন।

লেখাটি ছুঁয়ে গেলে জানান

আবু আনান

বিশেষ প্রতিবেদক

এই প্রতিবেদনে কোনো তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে সংশোধনী নীতি অনুযায়ী আমাদের জানান।

মন্তব্য

মন্তব্য দেখতে বা লিখতে চাপ দিন। মন্তব্য সম্পাদকীয় নীতিমালা মেনে প্রকাশ হয়।

সারাংশ

কন্যাশিশুর অধিকার: আগামী বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার

- কন্যাশিশুর অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সবার দায়িত্ব।
- বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, লিঙ্গবৈষম্য দূর করা এবং প্রযুক্তিতে নিরাপদ অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
- কন্যাশিশুর সম্ভাবনায় বিনিয়োগ মানে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই বাংলাদেশের ভিত শক্ত করা।
#GirlsRights #GirlsEducation #EndChildMarriage #MeehaNews

আজ

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ৩০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি

পাঠের রং

এখন যা বেশি খোঁজা হচ্ছে

যেকোনো পাতায় / চাপলেই খোঁজ খুলবে। ফলাফলে বিভাগ, তারিখ ও ধরন দিয়ে ছাঁকতে পারবেন।