প্রধান কন্টেন্টে যান
শুক্র ২ October ২৬
হেডলাইন
বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন
মাতৃভূমি / মাতৃভূমি

নদীর পানি, বিদ্যুতের তার: বাংলাদেশ-ভারত সমীকরণ

মোট শেয়ারমোঃ: 0

নদীর পানি, বিদ্যুতের তার: বাংলাদেশ-ভারত সমীকরণ

একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

শুরুর কথা

একটি নদী—যার নাম তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো, ভারতে ব্রহ্মপুত্র, আর বাংলাদেশে যমুনা—তিন দেশের ভূরাজনীতিকে এখন একসূত্রে বেঁধে ফেলেছে। চীন তিব্বতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ বাঁধ বানাচ্ছে। তার জবাবে ভারত অরুণাচল প্রদেশে নিজের বৃহত্তম বাঁধ বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর এই দুই দৈত্যের বাঁধ-প্রতিযোগিতার একেবারে নিচের প্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ—যে দেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের খাবার পানি, সেচ আর মাছের অন্যতম বড় উৎস এই একটিমাত্র নদী।

কিন্তু গল্পটা শুধু বাঁধ নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্যুতের তার, ঋণের বোঝা, একটি ৩০ বছরের পুরনো চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে আসা, আর বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের নিজের ভূখণ্ডকে জোড়া লাগানোর এক দীর্ঘদিনের কৌশলগত আকাঙ্ক্ষা। এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও ভারতের সংবাদমাধ্যম, আন্তর্জাতিক জার্নাল ও থিংক ট্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বিষয়গুলো সাজানো হলো ধাপে ধাপে।


প্রথম অধ্যায়: চীনের ১৬৭ বিলিয়ন ডলারের মেগা বাঁধ

২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের মালভূমিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করে চীন। ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর নির্মিতব্য এই বাঁধ থেকে বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—যা বিশ্বের বর্তমান বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থ্রি গর্জেস বাঁধের প্রায় তিন গুণ। প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬৭ থেকে ১৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দিয়ে পুরো যুক্তরাজ্যকে বিদ্যুতায়িত করা সম্ভব বলে দাবি করা হচ্ছে। পাঁচটি ধাপে নির্মিত এই বাঁধের মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে প্রায় ৬০ গিগাওয়াটে।

সমস্যা হলো, নদীটি তিব্বত ছেড়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আসামে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত হয়, তারপর বাংলাদেশে ঢুকে হয়ে যায় যমুনা। চীন এই প্রকল্প নিয়ে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ না করায় ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশেই উদ্বেগ তীব্র হয়েছে। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা চারজন সূত্র ও একটি সরকারি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের আশঙ্কা—শুষ্ক মৌসুমে এই বাঁধের কারণে নদীর একাংশের পানিপ্রবাহ ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। মার্কিন থিংক ট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক ব্রায়ান আইলার সতর্ক করেছেন, ভাটির দেশগুলোর ঋতুভিত্তিক জলপ্রবাহ চক্রের ওপর এই বাঁধের প্রভাব পড়বে, যা স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আঘাত হানতে পারে। লোয়ি ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সেচের ৫৫ শতাংশ চাহিদা মেটায় এই নদী, ফলে শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কমলে খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।

আরেকটি ভয়ের নাম ভূমিকম্প। বাঁধ এলাকাটি ভারত ও ইউরেশীয় পাতের সংযোগস্থলে অবস্থিত ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর অঞ্চল—বিশেষজ্ঞদের ভাষায় এটি বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ-প্রকল্পগুলোর একটি, যাকে ভারতীয় বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানি বর্ণনা করেছেন এক সম্ভাব্য “টাইম-বোমা” হিসেবে।


দ্বিতীয় অধ্যায়: ভারতের পাল্টা বাঁধ—এবং স্থানীয়দের প্রতিরোধ

চীনের বাঁধের জবাবে ভারত নিজেও পিছিয়ে নেই। অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং জেলায়—চীন সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে—১১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার “সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট” (এসইউএমপি) বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এনএইচপিসি। বাস্তবায়িত হলে এটিই হবে ভারতের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার, বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্য প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ইউনিট। ভারতীয় কর্মকর্তাদের যুক্তি—শুধু বিদ্যুৎ নয়, চীনের আকস্মিক পানি ছাড়ার আশঙ্কা মোকাবিলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্যও এই বাঁধ জরুরি। একজন ঊর্ধ্বতন ভারতীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, চীন আন্তর্জাতিক ফোরামে যতই আশ্বাস দিক না কেন, বেইজিংয়ের কথায় সরল বিশ্বাস রাখা “নির্বোধের মতো কাজ” হবে।

কিন্তু এই প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ আসছে খোদ ভারতের ভেতর থেকেই। সিয়াং উপত্যকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে এই নদী নিছক পানির উৎস নয়—তারা একে বলে “মাদার সিয়াং”, জীবনের উৎস। ধান, কমলা, বাঁশ চাষের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রকল্পটি অন্তত ৪২টি গ্রামকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করবে। ড্রিলিং যন্ত্রপাতি ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েনের পর এলাকায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে। স্থানীয় একজন বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, জনমত নেওয়া হলে প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষই এই বাঁধের বিরোধিতা করত। ২০২২-২৪ সালের এক সমীক্ষায় সিয়াং উপত্যকায় দেড় হাজারের বেশি উদ্ভিদ, পোকামাকড় ও পাখির প্রজাতি চিহ্নিত হয়েছে, যাদের কিছু বিজ্ঞানীদের কাছেও নতুন—বাঁধ নির্মাণে এসব প্রাণের অস্তিত্বও হুমকিতে পড়তে পারে।

টুইস্ট ১: যে বাঁধকে ভারত “চীনের হুমকি থেকে বাঁচার ঢাল” বলছে, সেই একই বাঁধ নিয়ে ভারতের নিজস্ব আদিবাসী জনগোষ্ঠী প্রায় একচেটিয়াভাবে বিরোধিতা করছে—আর ভাটিতে বাংলাদেশ পড়ে যাচ্ছে দুই “প্রতিরক্ষামূলক” বাঁধের মাঝখানে, যেখানে কারও সঙ্গেই তার আলোচনার টেবিলে সরাসরি আসন নেই।


তৃতীয় অধ্যায়: “সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে বাংলাদেশের”

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে ঢাকাভিত্তিক নদী-বিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের সাধারণ সম্পাদক শেখ রোকন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন: ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার মাত্র ৮ শতাংশ বাংলাদেশে হলেও, নদীটি বাংলাদেশে বছরে সরবরাহ করে অববাহিকার মোট পানির ৬৫ শতাংশেরও বেশি। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ নির্ভরতার কারণেই ব্রহ্মপুত্র-যমুনাকে “বাংলাদেশের জীবনরেখা” বলা হয়।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—ভারত ও চীনের মধ্যে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন চললেও, বাস্তবে সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের লাখো মানুষের ওপর, কারণ উজানের কোনো আলোচনাতেই বাংলাদেশের কোনো আসন নেই। একজন জ্যেষ্ঠ পানি বিশেষজ্ঞের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই বাঁধ মিলিয়ে যে “পানিযুদ্ধ” চলছে, তাতে সবচেয়ে কম ক্ষতিপূরণ পাবে, অথচ সবচেয়ে বেশি ভুগবে বাংলাদেশ—কারণ আলোচনার টেবিলে তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানই নেই।


চতুর্থ অধ্যায়: এটা নতুন কিছু নয়—ভারতের ট্র্যাক রেকর্ড

ব্রহ্মপুত্র নিয়ে উদ্বেগ নতুন হলেও, উজানে বাঁধ নির্মাণের প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা পুরনো। বাংলাদেশি নদী-গবেষকদের বরাতে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে একটি তথ্য: আন্তঃসীমান্ত স্বীকৃত ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে ৩৬টির ওপর ভারত মোট ৫৪টি বাঁধ ও ব্যারেজ নির্মাণ করেছে। আন্তর্জাতিক আইনে আন্তঃসীমান্ত নদীতে বাঁধ নির্মাণের আগে ভাটির দেশের সঙ্গে পরামর্শের বাধ্যবাধকতা থাকলেও, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারত এই রীতি অধিকাংশ সময় মেনে চলেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। উইকিপিডিয়ার সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হিসাবে ৫৪টি হলেও রিভারাইন পিপলের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় আরও অস্বীকৃত ৬৯টি যৌথ নদীর সন্ধান মিলেছে, আর কোনো কোনো নদী-বিশেষজ্ঞের হিসাবে প্রকৃত অভিন্ন নদীর সংখ্যা ১৭১টিরও বেশি।

ফারাক্কা ব্যারেজ এই তালিকার সবচেয়ে পুরনো ও আলোচিত উদাহরণ—১৯৭৫ সালে চালু হওয়া এই ব্যারেজ নিয়ে বিতর্কের জেরেই ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সই হয়েছিল, যা নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরের অধ্যায়ে।


পঞ্চম অধ্যায়: তিস্তা—১৫ বছরের অপেক্ষা

তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বিরোধের শিকড় ১৯৪৭ সালের দেশভাগে, যখন নদীর অববাহিকা ভাগ হয়ে যায় ভারত ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে। ১৯৮৩ সালে একটি অস্থায়ী বণ্টন-ব্যবস্থা হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছেছিল ২০১১ সালে—একটি খসড়া চুক্তিতে ভারতকে ৪২.৫ শতাংশ ও বাংলাদেশকে ৩৭.৫ শতাংশ পানি দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের স্বার্থের দোহাই দিয়ে শেষ মুহূর্তে ভেটো দেন, আর সেই থেকে আলোচনা কার্যত থমকে আছে।

এর প্রভাব বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য। আন্তর্জাতিক ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদনের ক্ষতি হচ্ছে—যা দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশের সমান। নরেন্দ্র মোদির সরকার একাধিকবার তিস্তা চুক্তি সইয়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও, পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখনো এই ইস্যুতে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে আছে।


ষষ্ঠ অধ্যায়: গঙ্গা চুক্তির ঘড়ি ফুরিয়ে আসছে

এখানেই এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে জরুরি এবং সবচেয়ে কম আলোচিত তথ্যটি। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তিতে সই করেছিলেন, তার মেয়াদ ফুরাচ্ছে এই বছরই—২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। অর্থাৎ, এই প্রতিবেদন লেখার সময় (আগস্ট ২০২৬) হাতে বাকি মাত্র কয়েক মাস।

দুই দেশ ইতিমধ্যে নবায়ন আলোচনায় সম্মত হয়েছে। যৌথ নদী কমিশনের কারিগরি দলের মধ্যে দিল্লিতে বৈঠক হয়েছে, আর আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ফের বৈঠকে বসার কথা। কিন্তু দুই পক্ষের দাবিতে স্পষ্ট ফারাক রয়েছে। ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত মার্চ-মে সময়ে অতিরিক্ত ৩০-৩৫ হাজার কিউসেক পানি চায়; অন্যদিকে বাংলাদেশ চাইছে ফেব্রুয়ারি-মে সময়ে ৪০ হাজার কিউসেক নিশ্চিত ন্যূনতম প্রবাহ, দীর্ঘমেয়াদি নবায়ন, এবং উন্নত বন্যা তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন চুক্তির আগে বিদ্যমান চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা দরকার—শুধু কূটনীতিক বা প্রকৌশলী নয়, অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদেরও এতে যুক্ত করা উচিত। ভারতের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটিও সম্প্রতি নিজ সরকারকে বিলম্ব না করে নবায়ন আলোচনা শুরুর তাগিদ দিয়েছে।

কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ: ব্রহ্মপুত্র নিয়ে যখন সংবাদের শিরোনাম দখল করে আছে চীন-ভারতের “পানিযুদ্ধ”, ঠিক তখনই বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো ও সবচেয়ে বড় পানি-চুক্তিটির মেয়াদ নিঃশব্দে ফুরিয়ে আসছে। আগামী কয়েক মাসের আলোচনার ফলাফলই ঠিক করে দেবে, পদ্মা অববাহিকার কোটি কোটি মানুষের জন্য শুষ্ক মৌসুমে কতটা পানি থাকবে—অথচ এই আলোচনা তুলনামূলকভাবে অনেক কম আলোচিত।


সপ্তম অধ্যায়: “চিকেন নেক” আর ভারতের আসল দুর্বলতা

এবার প্রশ্ন হলো—ভারত কেন বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগ (কানেক্টিভিটি) নিয়ে এত মরিয়া? উত্তরটা লুকিয়ে আছে একটি মানচিত্রে। ভারতের মূল ভূখণ্ড আর তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যকে (আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল প্রদেশ) জোড়া দেয় মাত্র ২১-৪০ কিলোমিটার চওড়া একটি সরু ভূখণ্ড—শিলিগুড়ি করিডোর, যা পরিচিত “চিকেন নেক” নামে। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও চীন সীমান্তবেষ্টিত এই করিডোর দিয়েই যায় উত্তর-পূর্বের সঙ্গে সড়ক, রেল, জ্বালানি পাইপলাইন, বিদ্যুৎ লাইন ও ইন্টারনেট কেবল—সবকিছু। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভাষায়, এই করিডোরে বড় কোনো বিঘ্ন মানেই উত্তর-পূর্বের সঙ্গে ভারতের স্থল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া।

আর এই উত্তর-পূর্বাঞ্চলেই লুকিয়ে আছে ভারতের অব্যবহৃত জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনার ৮০ শতাংশের বেশি—একা অরুণাচল প্রদেশেরই সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৫২ গিগাওয়াট। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার একাধিক বাঁধ থেকে উৎপাদিত বিপুল বিদ্যুৎ মূল ভারতে পৌঁছাতে হলে হয় সরু চিকেন নেক দিয়ে যেতে হবে, নয়তো সরাসরি ছোট, সোজা পথ—বাংলাদেশের ভূখণ্ড দিয়ে। এই বাস্তবতা থেকেই ভারত ২০১৬ সাল থেকে একের পর এক রেল ও বিদ্যুৎ-সংযোগ প্রস্তাব দিয়ে আসছে বাংলাদেশকে—যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি প্রকল্পের কথা পরের অধ্যায়ে।


অষ্টম অধ্যায়: বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের নিজস্ব বিদ্যুৎ করিডোর

এখানেই লুকিয়ে আছে এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে হাল আমলের চমক।

২০২৩ সালের মে মাসে, তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের আমলে, ভারতের ৭৬৫ কেভি সক্ষমতার “কাটিহার–পার্বতীপুর–বরনগর” বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। প্রায় ১১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইনের উদ্দেশ্য পরিষ্কার—ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিদ্যুৎ বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সরাসরি ভারতের মূল ভূখণ্ডে (পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বিহারের কাটিহার পর্যন্ত) নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, বাংলাদেশ এখানে বিদ্যুতের ক্রেতা নয়, বরং ভারতের নিজের এক অংশ থেকে আরেক অংশে বিদ্যুৎ পাঠানোর “শর্টকাট রাস্তা”।

সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ হলো অর্থায়ন কাঠামো: প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের নিজের প্রয়োজনে নির্মিতব্য এই করিডোরের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ঋণ নিতে হতো বাংলাদেশকেই। ২০২৫ সালের জুনে ক্ষমতার পালাবদলের পর অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পটি নিয়ে পুনর্বিবেচনা শুরু করে। জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান তখন বলেছিলেন, গ্রিড নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা বিবেচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, আর জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সময়ে নেপাল থেকে অতিরিক্ত ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির একটি সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তও বাতিল হয়। প্রকৌশল-সংশ্লিষ্ট একটি যুক্তি ছিল, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল শিল্প-ঘন নয় এবং সেখানে অতিরিক্ত বিদ্যুতের বড় চাহিদাও নেই—ফলে করিডোর তৈরি হলেও তা কার্যত অব্যবহৃত পড়ে থাকতে পারে, অথচ তার জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হতে পারে বাংলাদেশকেই।

সবচেয়ে তাজা মোড়: এই প্রতিবেদন তৈরির মাত্র দিন দশেক আগে, ১৩-১৪ আগস্ট ২০২৬, খবর আসে—বিদ্যুৎ বিভাগ আবার এই ৭৬৫ কেভি করিডোর প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় দীর্ঘ পোস্টে সরাসরি আপত্তি জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই করিডোরের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্যুৎ বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের মূল ভূখণ্ডে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানিতে তাঁর আপত্তি নেই, কিন্তু দেশের নদী ও পানির ভবিষ্যৎ বন্ধক রেখে এই করিডোর বাস্তবায়ন করা যাবে না। পোস্টের শেষ লাইনে তিনি লেখেন—যমুনা নদীর পানির ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে ভারতকে এই বিদ্যুৎ করিডোরে “না” বলার আহ্বান জানান।

এই একটি ঘটনাতেই আসলে গোটা প্রতিবেদনের কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি মূর্ত হয়ে ওঠে: পানি আর বিদ্যুৎ—দুটো বিষয় যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। উজানে বাঁধ দিয়ে যে পানি আটকানো হচ্ছে তার একাংশ থেকেই উৎপন্ন বিদ্যুৎ, ভাটির দেশের ভূখণ্ড দিয়েই পাঠানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে—আর সেই ভূখণ্ড-ব্যবহারের খরচও চাওয়া হচ্ছে ভাটির দেশের কাছ থেকেই।


নবম অধ্যায়: আরেকটি প্রমাণ—নেপালের বিদ্যুৎ, ভারতের হাতের মুঠোয়

যদি মনে হয় আগের অধ্যায়টি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তাহলে এই অধ্যায়টি দেখায় প্যাটার্নটি কতটা বাস্তব।

২০২৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়—নেপাল তার জলবিদ্যুৎ ভারতের ট্রান্সমিশন লাইন ব্যবহার করে বাংলাদেশে রপ্তানি করবে। ২০২৫ সালের জুন থেকে বাস্তবেই ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসতে শুরু করে, প্রতি ইউনিটের দাম পড়ে প্রায় ৬.৪০ মার্কিন সেন্ট—বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন ব্যয়ের (প্রতি ইউনিট ১১ টাকার বেশি) চেয়ে যা উল্লেখযোগ্য রকম সস্তা। এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের এক আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত।

কিন্তু ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির সভায় এই সরবরাহ বাড়িয়ে ৬০ মেগাওয়াট করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হলেও, ২০২৬ সালের জুনে কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে জানা যায়—ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) “সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা নেই” এমন অজুহাত দেখিয়ে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট রপ্তানির অনুমোদন সাময়িকভাবে আটকে দেয়। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, ভারতের রাষ্ট্রীয় সংস্থা এনভিভিএন সরাসরি জানিয়ে দেয়—ভারত-বাংলাদেশ ১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিড লাইনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেওয়ার মতো কোনো “ক্যাপাসিটি” আর অবশিষ্ট নেই।

টুইস্ট: নেপাল ও বাংলাদেশ—দুই দেশই রাজি, চুক্তিও সই হয়ে গেছে, দামও নির্ধারিত—কিন্তু মাঝে বসে থাকা ভারতের একটি প্রশাসনিক “না”-তেই পুরো লেনদেন আটকে যায়। এমনকি যেখানে ভারত নিজে নেপাল থেকে প্রায় ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে, সেখানে বাংলাদেশের জন্য মাত্র ২০ মেগাওয়াট বাড়তি সরবরাহেও “গ্রিড সক্ষমতা নেই” যুক্তি দাঁড় করানো হয়। এই একটি উদাহরণই দেখিয়ে দেয়, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতার আন্তরিক কাঠামোতেও ভারতের হাতে আছে বাস্তব ও ব্যবহারযোগ্য “গেটকিপার” ক্ষমতা।


দশম অধ্যায়: আদানি-বিতর্ক—আরেকটি অসম অংশীদারিত্বের নজির

শুধু পানি বা করিডোর নয়, সরাসরি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিতেও “অসম অংশীদারিত্বের” অভিযোগ পুরনো। ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদির প্রথম বাংলাদেশ সফরের দুই মাসের মাথায় ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের ভেতরেই বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানোর প্রস্তাব থাকলেও, দুই বছর পর ২০১৭ সালে সিদ্ধান্ত পাল্টে ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের গোড্ডা জেলায় কেন্দ্র বসানোর চুক্তি হয়—২৫ বছরের জন্য ১,৪৯৬ মেগাওয়াট কয়লাবিদ্যুৎ কেনার শর্তে। জ্বালানি অর্থনীতি বিশ্লেষণ সংস্থা আইইএফএর ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনের বরাতে প্রথম আলোর এক রিপোর্টে বলা হয়, এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশকে ২৫ বছরে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি গুনতে হতে পারে। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে জ্বালানি বিশ্লেষক টিম বাকলি মন্তব্য করেছেন, গোড্ডা থেকে সরাসরি ডেডিকেটেড ট্রান্সমিশন লাইন গিয়েছে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে, অথচ সেখানে অত বিদ্যুতের চাহিদাই নেই—ফলে কেন্দ্রটি ব্যবহার না হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ডলার গুনে যেতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বাস্তবেই একাধিকবার সরঞ্জাম-জটিলতায় সঞ্চালন লাইন প্রস্তুত না হওয়া সত্ত্বেও কোটি কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের খবর গণমাধ্যমে এসেছে।


একাদশ অধ্যায়: তাহলে কি বাংলাদেশের জন্য এটা “প্লাস পয়েন্ট” হতে পারে?

এত ঝুঁকির বিপরীতে প্রশ্ন থেকে যায়—বাংলাদেশ কি আদৌ এই পরিস্থিতি থেকে কোনো সুবিধা আদায় করতে পারে? তথ্য-প্রমাণ বলছে, সম্ভাবনা আছে, তবে তা এখনো মূলত অব্যবহৃত।

  • ভৌগোলিক অবস্থান আসলে দর-কষাকষির শক্ত কার্ড। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিশাল জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা (৮০ শতাংশের বেশি অব্যবহৃত সম্ভাবনা) মূল ভারতে পৌঁছাতে বাংলাদেশের ভূখণ্ডই সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ। এই বাস্তবতা ভারতকে বাংলাদেশের কাছে আসতে বাধ্য করে—প্রশ্ন হলো, এই নির্ভরতাকে ন্যায্য শর্তে (ট্রানজিট ফি, দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ-ক্রয়ের সুবিধা, অবকাঠামোয় বিনিয়োগ) রূপান্তর করা যাচ্ছে কিনা।
  • সস্তা জলবিদ্যুতের সুযোগ বাস্তব। নেপালের উদাহরণ দেখাচ্ছে, আঞ্চলিক জলবিদ্যুৎ আমদানি বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন খরচের চেয়ে সস্তা হতে পারে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ২০২৪ সালে জানিয়েছিলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির আগ্রহ রয়েছে বাংলাদেশের।
  • কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখন পর্যন্ত লাভের অঙ্কটা প্রশ্নবিদ্ধ। কাটিহার-পার্বতীপুর-বরনগর করিডোরে বাংলাদেশ ঋণগ্রহীতা ও ঝুঁকি-বহনকারী, উপকারভোগী মূলত ভারত। আদানি চুক্তিতে সমালোচকদের ভাষ্য অনুযায়ী মূল্য প্রতিযোগিতামূলক নয়। আর নেপালের বাড়তি বিদ্যুৎ পেতেও বাংলাদেশকে নির্ভর করতে হচ্ছে ভারতের প্রশাসনিক অনুমোদনের ওপর।

অর্থাৎ সম্ভাবনার দরজাটা খোলা আছে বটে, কিন্তু বর্তমান কাঠামোয় নিয়ন্ত্রণ ও শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা এখনো মূলত ভারতের হাতেই কেন্দ্রীভূত।


দ্বাদশ অধ্যায়: ভারতের যুক্তি—উল্টো পিঠের গল্প

সুষম চিত্রের স্বার্থে ভারতের অবস্থানও উল্লেখ করা জরুরি। ভারত সরকার ও নীতিনির্ধারকদের যুক্তি মূলত তিনটি:

১. নিরাপত্তা: চীনের ইয়ারলুং সাংপো বাঁধ নিয়ে ভারত নিজেও ভাটির দেশ, এবং তার নিজস্ব উদ্বেগ—হঠাৎ পানি ছাড়া বা প্রবাহ কমিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা—বাস্তব ও গুরুতর বলে ভারতীয় সরকারি সূত্র বারবার উল্লেখ করেছে। সিয়াং বাঁধকে তাই তারা আগ্রাসন নয়, প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে।

২. পারস্পরিক উপকারিতা: অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ওআরএফ) একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সংযোগ সহযোগিতা দ্বিপাক্ষিকভাবে উপকারী হতে পারে—বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায় (“ইন্ডিয়া লকড”) তারও শক্তিশালী সংযোগের প্রয়োজন আছে, আবার ভারতের জন্যও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সংযোগ পেলে উত্তর-পূর্বাঞ্চল বঙ্গোপসাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের সুযোগ পাবে।

৩. যৌথ ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতি: ভারতের সরকারি বিবৃতিতে বারবার বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী থাকায় পানি সহযোগিতা তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আর দ্বিপাক্ষিক পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এই যুক্তিগুলো নাকচ করে দেওয়ার সুযোগ নেই—ভারতও প্রকৃতপক্ষে চীনের সম্ভাব্য পদক্ষেপের কাছে একটি ভাটির দেশ, এবং যেকোনো অঞ্চলের জন্যই ভালো সংযোগ অবকাঠামো তাত্ত্বিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। প্রশ্নটা তাই “সহযোগিতা করা উচিত কিনা” তা নিয়ে নয়—প্রশ্নটা হলো, এই সহযোগিতার শর্তাবলি, ঝুঁকি-বণ্টন ও স্বচ্ছতা কতটা ন্যায্য।


উপসংহার: একটি অসমাপ্ত সমীকরণ

এই অনুসন্ধান থেকে যে ছবিটি ফুটে ওঠে তা এক কথায় “উপনিবেশ” বা “বন্ধুত্ব”—কোনোটির মধ্যেই সম্পূর্ণভাবে আটকে রাখা যায় না। বরং এটি এক জটিল, বহু-স্তরীয় ভূরাজনৈতিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক, যেখানে:

  • চীন-ভারতের বাঁধ-প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের কোনো আসন নেই, অথচ ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি তারই;
  • তিস্তার ১৫ বছরের অচলাবস্থা আর গঙ্গা চুক্তির আসন্ন মেয়াদ-উত্তীর্ণতা—দুটোই বাংলাদেশের জন্য চাপের বিষয়, যার একটি (গঙ্গা চুক্তি) আসছে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই নিষ্পত্তি হতে হবে;
  • বাংলাদেশের ভূখণ্ড ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অমূল্য—বিশেষত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্যুৎ ও সংযোগের প্রশ্নে—কিন্তু বর্তমান চুক্তি-কাঠামোয় (কাটিহার-পার্বতীপুর-বরনগর করিডোর, আদানি চুক্তি) সেই কৌশলগত গুরুত্বকে বাংলাদেশ এখনো নিজের পক্ষে যথেষ্ট ব্যবহার করতে পারছে না বলে সমালোচকদের অভিযোগ;
  • নেপাল-বাংলাদেশ বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ঘটনা দেখাচ্ছে, নামমাত্র “ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার” কাঠামোতেও ভারতের হাতে বাস্তব প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থেকে যায়;
  • আর সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা—ভারতকে বিদ্যুৎ করিডোরে “না” বলার আহ্বান—প্রমাণ করে, পানি ও বিদ্যুৎ প্রশ্নে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জনমত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার ও সতর্ক।

আগামী কয়েক মাস—বিশেষত ডিসেম্বরে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের আলোচনাগুলো এবং বিদ্যুৎ করিডোর প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত—নির্ধারণ করে দেবে, বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানকে সত্যিকারের দর-কষাকষির শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে, নাকি পুরনো প্যাটার্নই আরেকবার পুনরাবৃত্তি হয়।

মোট শেয়ারমোঃ: 0

আবু আনান

বিশেষ প্রতিবেদক

পোস্টটি কেমন লাগলো?

মন্তব্য করুন

একটি মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো * দ্বারা চিহ্নিত।

সম্পর্কিত খবর

সাম্প্রতিক খবর

নেতানিয়াহুর ৮ ঘণ্টার সফর, ট্রাম্পহীন সাক্ষাৎ—পশ্চিমারা কি সত্যিই পতন চায়?

নেতানিয়াহুর ৮ ঘণ্টার সফর, ট্রাম্পহীন সাক্ষাৎ—পশ্চিমারা কি সত্যিই পতন চায়?

১ ঘণ্টা আগে
বন্ধ দরজা আর একটি ‘না’: স্বরা ভাস্করের সেই রাতের গল্প

বন্ধ দরজা আর একটি ‘না’: স্বরা ভাস্করের সেই রাতের গল্প

১ ঘণ্টা আগে
সাদের অনুরোধে বদলে গেল এলেনার গল্প: আগে ইন্দোনেশিয়া, এখন নেপাল

সাদের অনুরোধে বদলে গেল এলেনার গল্প: আগে ইন্দোনেশিয়া, এখন নেপাল

১ ঘণ্টা আগে
ময়মনসিংহে বাসচাপায় নিহত ৭, একই পরিবারের ৪ জন

ময়মনসিংহে বাসচাপায় নিহত ৭, একই পরিবারের ৪ জন

১ ঘণ্টা আগে
সুইচ আমাদের হাতে, বিদ্যুৎ কার হাতে?

সুইচ আমাদের হাতে, বিদ্যুৎ কার হাতে?

৬ ঘণ্টা আগে
নামফলকে লেখা হলো, মুছে গেল, আবার ফিরল—ঢাবির এক হল, দুই নাম আর অভ্যুত্থানের অসমাপ্ত প্রশ্ন

নামফলকে লেখা হলো, মুছে গেল, আবার ফিরল—ঢাবির এক হল, দুই নাম আর অভ্যুত্থানের অসমাপ্ত প্রশ্ন

১ দিন আগে
গোল নয় গোলপাতা: সুন্দরবনের সবুজ আচ্ছাদন, যার আড়ালে লুকিয়ে বাঘের নিঃশ্বাস

গোল নয় গোলপাতা: সুন্দরবনের সবুজ আচ্ছাদন, যার আড়ালে লুকিয়ে বাঘের নিঃশ্বাস

৫ দিন আগে
মেহেরুনকে নিয়ে ‘উধাও’ আইএইচটি শিক্ষক অসীম কুমার

মেহেরুনকে নিয়ে ‘উধাও’ আইএইচটি শিক্ষক অসীম কুমার

২ সপ্তাহ আগে

সর্বাধিক পঠিত