রিলস কিংবা শর্ট ভিডিও: এক ছদ্মবেশী আসক্তির নাম
লেখকের মতে, রিলস বা শর্ট ভিডিও নিছক বিনোদন নয়; শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাইকে টেনে নেওয়া এক ছদ্মবেশী আসক্তি। ২০২৫ সালে নিউরোইমেজ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় শর্ট ভিডিও আসক্তির লক্ষণের সঙ্গে আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গবেষণাটি ছোট এবং কার্যকারণ প্রমাণ করে না। ঘুমের আগে দীর্ঘক্ষণ ভিডিও দেখলে ঘুম কমে, মেজাজ খিটখিটে হয় আর পরদিনের কাজে ব্যাঘাত ঘটে বলে লেখকের পর্যবেক্ষণ। বাংলাদেশের ৪ থেকে ৯ বছর বয়সী ৪১২ শিশুর ওপর করা একটি গবেষণায় রিলসে আসক্ত শিশুদের মনোযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা এবং অনুকরণমূলক আচরণ দেখা গেছে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। #ShortVideoAddiction #Reels #DigitalWellbeing #MentalHealth #MeehaNews

শর্ট কিংবা রিলস ভিডিও এখন যাপিত জীবনের নিত্য অনুষঙ্গ। একে নিছক বিনোদনের উপকরণ বলাটা বোধ হয় ভুল হবে। শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী কিংবা পুরুষ, কেউ বাদ নেই; সবাই যেন শর্ট ভিডিওর ফাঁদে আটকা। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার সুরে মোহাচ্ছন্ন হয়ে ছুটছে সবাই। এ এক ছদ্মবেশী আসক্তি।
এই তো সেদিনের কথা। অবসরে সবাই গল্পগুজবে ব্যস্ত থাকত, নয়তো খেলাধুলার আসরে মেতে থাকত, কেউবা মজার বই পড়ত। হঠাৎ স্মার্টফোনের দমকা হাওয়ায় সবকিছু যেন নিমেষেই দপ করে নিভে গেল। এখন অবসর মানেই স্মার্টফোন, আর তার মধ্যে রিলস যেন এক নীরব ঘাতক। হাঁটাচলা, খাওয়াদাওয়া, ঘুমের আগে-পরে, সব সময়ই রিলস। টিকটক, ফেসবুক, ইউটিউব আর ইনস্টাগ্রামের শর্ট ভিডিও এক অতলস্পর্শী জগৎ। এটা কি শুধুই সুখানুভূতি, নাকি মিটমিটে আলোর নিচে বিশাল অন্ধকার? বিশেষজ্ঞরাও এর উত্তর খুঁজছেন।
গবেষকদের আশঙ্কা, শর্ট ভিডিও আসক্তি অস্থিরচিত্ততা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি আর পরিকল্পনাহীনতার মতো আচরণকে উসকে দিতে পারে। ২০২৫ সালে নিউরোইমেজ (NeuroImage) সাময়িকীতে প্রকাশিত চীনের তিয়ানজিন নরমাল ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় ৩৬ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মস্তিষ্ক স্ক্যান করা হয়। দেখা যায়, শর্ট ভিডিও আসক্তির লক্ষণ যাঁদের বেশি, তাঁরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ক্ষতির ঝুঁকিকে কম গুরুত্ব দেন এবং দ্রুত, আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের মস্তিষ্কের কয়েকটি অংশের সক্রিয়তাতেও পার্থক্য পাওয়া গেছে। তবে গবেষকেরা নিজেরাই বলেছেন, নমুনা ছোট এবং এটি সম্পর্ক দেখায়, কারণ নয়। অর্থাৎ রিলস দেখার ফলে মস্তিষ্ক বদলায়, নাকি আগে থেকেই আবেগপ্রবণ মানুষ রিলসে বেশি আসক্ত হন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এই আসক্তির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সম্ভবত শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘক্ষণ রিলস দেখা আর খুব দ্রুত এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিওতে যাওয়ার অভ্যাস গভীর পড়াশোনা ও দীর্ঘ মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় বলে আশঙ্কা রয়েছে। গবেষক আলঘামদি (Alghamdi) ও আলজাবরের (Aljabr) গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতি তিন থেকে পাঁচ সেকেন্ডে দৃশ্য বদলানো ভিডিও মস্তিষ্কের কর্মস্মৃতিতে (Working Memory) অতিরিক্ত তথ্যভার (Cognitive Overload) তৈরি করে। ফলে শিক্ষার্থীরা গভীর পড়াশোনায় মন বসাতে পারে না, বারবার মনোযোগ হারায়।
শর্ট ভিডিওর প্রভাব শুধু মনোজগতে নয়, শরীরেও পড়ে। সারা দিনের ক্লান্তি শেষে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু ঢুঁ মারেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিপত্তিটা এখানেই। একটুখানি কখন অনেকখানি হয়ে যায়, টের পাওয়া মুশকিল। ঘুমের আগে দীর্ঘক্ষণ ভিডিও দেখলে ঘুমের সময় কমে যায়, পরদিনের কাজে ব্যাঘাত ঘটে। মেজাজ খিটখিটে হয়, কর্মদক্ষতাও কমে।
শিশুদের ঝুঁকি আরও বেশি। প্রি-প্রিন্ট গবেষণার প্ল্যাটফর্ম সায়েটিতে (Sciety) বাংলাদেশের শহর ও শহরতলির ৪ থেকে ৯ বছর বয়সী ৪১২ শিশুকে নিয়ে করা একটি গবেষণা পাওয়া যায়। তাতে দেখা গেছে, রিলস বা শর্ট ভিডিওতে আসক্ত শিশুদের মনোযোগে ঘাটতি রয়েছে, আবেগ নিয়ন্ত্রণে তারা খেই হারিয়ে ফেলছে। অবিরাম স্ক্রলিংয়ের ফলে তাদের মধ্যে অনুকরণমূলক আচরণও গড়ে উঠছে।
শর্ট ভিডিও আসলে শর্ট নয়। আমাদের জীবনে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। এটি বদলে দিচ্ছে আমাদের সহজাত আচরণ। মানুষের খোলসের ভেতরে ধীরে ধীরে আমরা পরিণত হচ্ছি অথর্ব জড়বস্তুতে। মূল্যবান সময় অবলীলায় হারিয়ে যাচ্ছে তুচ্ছ বিনোদনে, আর দিনের পর দিন আমরা হয়ে উঠছি আরও এককেন্দ্রিক। রিলস বা শর্ট ভিডিও এক ছদ্মবেশী দানব, যার কাছে প্রতিনিয়ত হেরে চলেছে তথাকথিত এই আধুনিক সমাজ। নিজের আত্মার সঙ্গে কী নিদারুণ উপহাস!





