ক্যাম্প ছাড়ার দায় স্বীকার করে শাস্তি চাইলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো
নেশন্স লিগের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়াকে ভুল বলে স্বীকার করেছেন রোনালদো। তাঁর মতে, ফেডারেশনের উচিত তাঁকে শাস্তি দেওয়া এবং সেই শাস্তি কমানো উচিত নয়। দীর্ঘ বিবৃতিতে কোচ হোর্হে জেসুসের বিরুদ্ধে দুবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ করেছেন তিনি। বিশ্বকাপের পর অবসরের কথা ভাবলেও ফেডারেশন সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনসার পরামর্শে…

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জানিয়েছেন, তিনি পর্তুগাল জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছেন না। একই সঙ্গে ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে ভুল হিসেবে স্বীকার করে নিজের শাস্তি হওয়া উচিত বলেও মত দিয়েছেন ৪১ বছর বয়সী এই ফুটবলার। কোচ হোর্হে জেসুসের বিরুদ্ধে দুবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
প্রায় ২ হাজার শব্দের দীর্ঘ এক বিবৃতিতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকা। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে না খেলানো এবং ডেনমার্কের বিপক্ষে শুরু থেকে খেলানো হবে না জানতে পেরে গত সপ্তাহে নেশন্স লিগের ক্যাম্প ছেড়ে যান রোনালদো। এরপর তাঁর অবসর নিয়ে জল্পনা ওঠে।
পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন রোনালদো। দুটি সংখ্যাই বিশ্বরেকর্ড। তাঁর নেতৃত্বে পর্তুগাল জিতেছে ২০১৬ ইউরো এবং দুটি নেশন্স লিগ শিরোপা।
‘আমাকে শাস্তি দেওয়া উচিত’
ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে ভুল হিসেবে স্বীকার করেছেন রোনালদো। নিজের আচরণের জন্য শাস্তি পেতেও প্রস্তুত তিনি। রোনালদো বলেন, ‘পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনকে আমার কর্মকাণ্ডের পরিণতি মূল্যায়ন করতে হবে এবং আমাকে এর জন্য শাস্তি দিতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, শাস্তি কমানো উচিত নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি ইতোমধ্যে ক্ষমা চেয়েছি, কিন্তু আমি জানি, কর্মকাণ্ডের পরিণতি থাকে।’
জেসুসের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসভঙ্গের’ অভিযোগ
বিবৃতিতে জেসুসের সঙ্গে নিজের বিরোধের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন রোনালদো। তাঁর দাবি, নরওয়ে ও ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচ দুটিতে তাঁর খেলার বিষয়ে আগে থেকেই একটি পরিকল্পনা ছিল। ফিটনেস ব্যবস্থাপনার কথা বিবেচনা করে দুই ম্যাচেই তাঁকে না খেলানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। রোনালদোর ভাষ্য, নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের দিন ৭২ বছর বয়সী জেসুস তাঁকে জানান, তিনি ৩০ মিনিট খেলবেন। রোনালদো বলেন, ‘বাকিটা সবাই জানে। আমি দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ওয়ার্মআপ করেছি, সময় যেতে দেখেছি এবং আমাকে মাঠে নামানো হয়নি। ম্যানেজার আমাকে দেওয়া ওয়াদা ভেঙেছিলেন।’
এরপর জেসুসের সঙ্গে তাঁর একটি বৈঠক হয়। রোনালদো জানান, সেখানে পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি পরিষ্কার করার ব্যাপারে সমঝোতা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার ভিত্তিতে একটি আট দফার নথিও তৈরি করা হয়েছিল। তাতে উল্লেখ ছিল, রোনালদো কখনোই খেলার সময় দাবি করেননি, তিনি কোচের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেছেন এবং পেলে বা ম্যারাডোনার মতো মর্যাদার একজন খেলোয়াড়কে ওয়ার্মআপ করিয়ে মাঠে না নামানো ভুল ছিল। ওই নথিতে জেসুসের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন ছিল না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
রোনালদোর অভিযোগ, পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে জেসুসের বক্তব্য ব্যক্তিগত বৈঠকের সঙ্গে মেলেনি। তাঁর দাবি, সংবাদ সম্মেলনে জেসুস এমন কিছু অভিব্যক্তি ও আক্রমণাত্মক ভঙ্গি ব্যবহার করেন, যা তিনি প্রাপ্য ছিলেন না। ব্যক্তিগত আলোচনায় জেসুসের যে আচরণ দেখেছিলেন, সংবাদ সম্মেলনে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখেছেন বলেও দাবি করেছেন রোনালদো। তিনি বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলনটি যা হয়েছিল, সবাই জানে। তার মনোভাব আমাদের বৈঠকের সঙ্গে কোনোভাবেই মেলেনি।’
রোনালদোর মতে, জেসুসের সঙ্গে এটি ছিল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দ্বিতীয় ঘটনা। তিনি বলেন, ‘এটি ছিল দ্বিতীয়বার, যখন জেসুস আমার সঙ্গে করা কথা ভেঙেছিলেন।’ ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি আর কোনো প্রতিশ্রুতি ভাঙার অপেক্ষা না করে ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’
‘দায়িত্ব শুধু আমার’
জেসুসের কথার ওপর ‘পরম আস্থা নষ্ট হওয়া’ সত্ত্বেও ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়া উচিত হয়নি বলে মনে করেন রোনালদো। এই সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে দাবি করেননি তিনি, দায়ও নিজের ওপর নিয়েছেন। সতীর্থ ও পর্তুগালের জনগণের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন। রোনালদো বলেন, ‘ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার জন্য আমার জাতীয় দলের সতীর্থদের কাছে ক্ষমা চাই। আমি আবারও পর্তুগালের মানুষের কাছে ক্ষমা চাইছি। তবে একটি কথা ভেঙে দেওয়া আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।’
পর্তুগালের প্রধান কোচ হওয়ার আগে আল-নাসরে রোনালদোর কোচ ছিলেন জেসুস। রোনালদো জানান, জাতীয় দলের কোচ হিসেবে নিয়োগের আগে তিনি জেসুসকে ‘সঠিক পছন্দ’ বলেই মনে করতেন।
অবসর নিয়ে সিদ্ধান্ত বদল
এবারের গ্রীষ্মের বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন রোনালদো। বিশ্বকাপে পর্তুগাল শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেয়। সমর্থকদের উদ্দেশে অবসরের ঘোষণায় কী লিখবেন, তা একটি চিঠিতে লিখেও রেখেছিলেন বলে জানান তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার বিমানে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনসা তাঁকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন রোনালদো।
তিনি শারীরিকভাবে ফিট থাকলে, ক্লাবের হয়ে খেলতে থাকলে এবং গোল করতে পারলে জাতীয় দলের হয়েও খেলতে চান। রোনালদো বলেন, ‘আমার শাস্তির সময় শেষ হলে আমি সবসময় যেমন ছিলাম, তেমনই জাতীয় দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জয়ের জন্য প্রস্তুত থাকব।’
জেসুস বলছেন, দরজা খোলা
রোনালদোর বিবৃতির আগে জেসুস বলেছিলেন, অধিনায়কের সঙ্গে তাঁর কোনো বিরোধ নেই। রোববার পর্তুগাল কোচ জানান, জাতীয় দলে রোনালদোর জন্য দরজা এখনো খোলা। রোনালদো অনুশীলন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন— এমন দাবি ওঠার পরও জেসুস দলের ভেতরে কোনো দ্বন্দ্বের কথা স্বীকার করেননি।




